আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় – শান্তি গণতন্ত্র উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ
শান্তি গণতন্ত্র উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। শুরু হয়েছে দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা হতে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ঐতিহাসিক কালপর্ব। পূর্ণ হয়েছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪২ বছর। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুমহান নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
স্বাধীনতা বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেবল এই অর্জনের রূপকারই নয়; ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি বাঙালি জাতির যা কিছু মহৎ অর্জন- বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, ভাষা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিরও রূপকার।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই সূচিত হয়েছিল উন্নত- সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ নির্মাণের মহৎ কর্মযজ্ঞ। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে আবার মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলাদেশ। ৩ নভেম্বর কারাগারে আটক চার জাতীয় নেতাকেও একই খুনি চক্র হত্যা করে। খুনি মোশতাক ও জিয়া চক্র স্বাধীন বাংলাদেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের ধারা। সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়; নিষিদ্ধ ঘোষিত দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অঙ্গীকার হয় নির্বাসিত।
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী, যুদ্ধাপরাধী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাতে ইসলামী প্রভৃতি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাদের কেবল পুনর্বাসিতই করা হয় নি, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীকালে তার উত্তরসূরি খালেদা জিয়া তাদের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার করে।
অবৈধ সামরিক শাসকরা সংবিধান কর্তন, জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক ছাউনিতে গড়ে তোলা হয় একাধিক রাজনৈতিক দল।
হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু হয়ে দাঁড়ায় নিত্যদিনের ঘটনা। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার, মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানদের হত্যা এবং চাকরিচ্যুত করার মাধ্যমে দুর্বল করা হয় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী গৌরবোজ্জ্বল সেনাবাহিনীকে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের অপব্যবহার, কালো টাকা, পেশিশক্তি, দুর্নীতি, লুটপাট এবং দুর্বৃত্তায়নকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে পরিণত করা হয়।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও ক্ষমতাসীন বিএনপি স্বৈরশাসনের এ ধারাই অব্যাহত রাখে। এভাবেই পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এবং একটি সুখী সুন্দর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার সকল সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়।
বাংলাদেশের স্বর্ণযুগ (১৯৯৬-২০০১)
এই দুঃসহ অবস্থার অবসান ঘটে ১৯৯৬ সালে। দেশবাসীর বীরত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং অগণিত শহীদের আত্মদানের পটভূমিতে ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ ২১ বছর পর আবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যগাথা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মাত্র পাঁচ বছরে খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন, দ্রব্যমূল্য হ্রাস, মূল্যস্ফীতির হার ১.৫৯ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশে উন্নীতকরণ, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, দারিদ্র্য বিমোচনে নানা উদ্ভাবনী কর্মসূচি গ্রহণ ও হত-দরিদ্র মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ, মানব দারিদ্র্যা সূচক দ্বিগুণ হারে কমিয়ে আনা, সাক্ষরতার হার ৬৫ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং ২১ ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ প্রভৃতি অর্জন বাংলাদেশকে বিশ্বে অমিত সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত করে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে অর্জিত হয় অভূতপূর্ব সাফল্য। মাত্র পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩০০ মেগাওয়াট। যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ, ৬২ হাজার কিলোমিটার রাস্তা, ১৯ হাজার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ নির্ভরযোগ্য ভৌত কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে।
ওই সময়ে দেশে ছোট-বড় ১ লাখ ২২ হাজার শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়। সরকারি ও বেসরকারি খাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। মনোপলি ভেঙে স্বল্পমূল্যে সবার হাতে মোবাইল, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তিকে সকলের জন্য অবারিত করে দেওয়া হয়। সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য গ্রহণ করা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি।

আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, জেলহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু এবং আইন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নারীনীতি প্রণয়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর প্রথা চালু, স্থায়ী কমিটিতে মন্ত্রীর বদলে সদস্যদের চেয়ারম্যান নিয়োগ, চার স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার জন্য আইন প্রণয়ন এবং সরকারের সর্বস্তরে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা হয়। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ধারা। ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।
