আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় – সম্ভাবনার অপমৃত্যু : বিএনপি-জামাত দুর্বৃত্তকবলিত বাংলাদেশ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
সম্ভাবনার অপমৃত্যু : বিএনপি-জামাত দুর্বৃত্তকবলিত বাংলাদেশ

পক্ষপাত দুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মদতে কারচুপি ও কারসাজির ফলে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত বিজয় ছিনতাই হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামাত জোট প্রায় সমান সংখ্যক (৪০ শতাংশ) ভোট পেলেও বিএনপি-জামাত জোটের জন্য দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিশ্চিত করা হয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের ধারণা।
রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিএনপি-জামাত জোট তাদের পাঁচ বছরের দুঃশাসনে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে। হত্যা, সন্ত্রাস, রক্তপাত, জঙ্গিবাদী উত্থানের ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয় মৃত্যু উপতাকায়। স্বয়ং খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা করে হত্যার চেষ্টা চালাতে গিয়ে নারী নেত্রী বেগম আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২২ নেতাকে হত্যা করা হয়।
হত্যা করা হয় সংসদ সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এএসএম কিবরিয়া, সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার, অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম ও সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজউদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতা-কর্মীকে।
হত্যা করা হয় হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী বিশিষ্টজনসহ বহুসংখ্যক মানুষকে। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে শত শত নারী এবং শিশু-কিশোরী হয় গণধর্ষণ ও ধর্ষণের শিকার। সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, কৃষক, শ্রমিক কেউই বিএনপি-জামাত জোটের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ফ্যাসিস্ট হামলার হাত থেকে রেহাই পায় নি। মন্ত্রিসভায় স্থান পায় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা।
সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্র জঙ্গিবাদের সশস্ত্র উত্থান ঘটে। ১৭ আগস্ট, ২০০৫ তারিখে দেশের ৬৩টি জেলায় একই সময়ে পাঁচ শতাধিক স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, বিএনপি-জামাত এটি সরকারের আমলের বিভিন্ন সময়ে আদালত, সিনেমা হল, মেলা, দরগা, মসজিদ, গীর্জা, মন্দির, অফিস, সভা-সমাবেশ প্রভৃতি স্থানে জঙ্গিবাদীদের বোমা হামলায় বিচারক, আইনজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীসহ অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। আহত হয় ও চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করে হাজার হাজার মানুষ। বাংলাদেশ পরিণত হয় জঙ্গিবাদীদের অভয়ারণ্যে। সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ।
অন্যদিকে দেশ পরিচালনায় বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকেই উল্টে দেয়। নস্যাৎ করে দেয় সব সম্ভাবনা। তারেক রহমানের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরাল বা বিকল্প কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’।
এই হাওয়া ভবন থেকেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। হাওয়া ভবন’ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও কমিশন সংগ্রহ, প্রশাসনের নিয়োগ-বদলি, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা প্রভৃতি দেশবিরোধী অবৈধ কর্মকাণ্ডের অঘোষিত হেড কোয়ার্টার।
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং দলীয়/অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের দুর্নীতি, দৌরাত্ম দেশবাসীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলের পাঁচ বছরই টিআইবির রেটিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করে।
হাওয়া ভবনের মদতপুষ্ট অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে কৃত্রিম সংকট। আওয়ামী লীগ আমলের তুলনায় দ্রব্যমূল্য ১০০-২০০ গুণে বৃদ্ধি পায়। মূল্যস্ফীতি আওয়ামী লীগ আমলের ১.৫৯ থেকে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তারেক রহমান, আরাফাত রহমান ও বিএনপির মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় ব্যক্তিরা আমদানি ব্যবসা করার প্রতি বেশি তৎপর ছিল; তারা বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল করতে চায় নি। ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথেই বিএনপি সরকার বেশি যুক্ত ছিল।
তারা নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছে। রাতারাতি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছে। অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছিল দেশ। এসবের ফলে আওয়ামী লীগ আমলে খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল দেশ আবার খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত হয়। আবার মঙ্গা দেখা দেয়। খাদ্যাভাব ও কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষের মৃত্যু সংবাদ সংবাদপত্রের হেডলাইন হয়।
আওয়ামী লীগ আমলে চালু কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাক্ষরতার হার ৬৫ থেকে আবার ৫০ শতাংশে নেমে আসে। ১৯৯৭ সালের নারীনীতি ও শিক্ষানীতি বাতিল করা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সৃষ্ট স্থবিরতা আওয়ামী লীগ আমলের উন্নয়নের ধারাকে বানচাল করে দেয়।
টানা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপি-জামাত জোট সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারে নি, বরং কার্যকর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার মেগাওয়াট হ্রাস পায়। গ্যাস উৎপাদনেও বিরাজ করে স্থবিরতা। কিন্তু খালেদা-পুত্র তারেক ও তার বন্ধুর খাম্বা লিমিটেডের অতিমুনাফা ও লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য শত শত কোটি টাকার বিদ্যুতের খুঁটি ক্রয় করা হয়।
বিদ্যুতের দাবি জানানোর অপরাধে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার কানসাটে এক বছরে ১৭ কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে। ফলে দেশের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়ে। এর পাশাপাশি সার, বীজ, ডিজেল প্রভৃতি কৃষি উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও দুষ্প্রাপ্যতার জন্য মারাত্মকভাবে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়। কৃষিতে সৃষ্টি হয় স্থবিরতা।
প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুলিশ প্রশাসনসহ সর্বস্তরে নির্লজ্জ দলীয়করণ, চাকরিচ্যুতি, দখল, অবদমন প্রভৃতির ফলে সুশাসন ও ন্যায় বিচারের অবসান ঘটে। বিএনপি-জামাত জোট দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অর্থহীন করে তোলে।
দলীয় অনুগত ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতির চাকরির বয়সসীমা দুই বছর বৃদ্ধি, আজ্ঞাবহ অযোগ্য ব্যক্তিদের বিচারপতি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার করেই ক্ষান্ত হয় নি, তারা কারচুপি ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নীল-নকশা কার্যকর করার মরিয়া প্রচেষ্টা চালায়।
২০০৬ সালে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও জনমত উপেক্ষা করে বিএনপির দলীয় রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন নিজেকে একতরফাভাবে ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করেন। কিন্তু হাওয়া ভবনের আজ্ঞাবহ ইয়াজউদ্দিনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও দলীয় নীল-নকশা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করার পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়ে দফায় দফায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা পদত্যাগ করেন।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নীল-নকশা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকার একটি অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অসম্ভব করে তোলে। এ পটভূমিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। দেশে জরুরি অবস্থা জারি ও সংসদ নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ড. ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার পর থেকে অপসারিত হন। সেনাবাহিনীর সমর্থনে ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
