আজকের আলোচনার বিযয় ১৯৪৯-১৯৭১ আওয়ামী লীগ এর উপসংহার , যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত ।
১৯৪৯-১৯৭১ আওয়ামী লীগ এর উপসংহার

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের স্বাধীনতা ঘোষণা ও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ও প্রভাবসম্পন্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। একটি হলো এক নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় আর অন্যটি পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠন। তা দক্ষিণ এশিয়ার এক অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সমাজ-রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা পর্বের অবসান যুগপৎভাবে চিহ্নিত করেছে ।
এভাবে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র ব্যবস্থার নির্মাণগত পরিবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এই পরিবর্তনের সার্বিক প্রক্রিয়ায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বোধগম্যভাবেই কয়েকটি কারণে অন্যতম ছিল । এ সংগঠনটি এই পরিবর্তন সম্ভব করে পাকিস্তানের জাতীয় পুনর্গঠনে যথা অংশ বা পাওনা লাভের “ইচ্ছা”কে স্বশাসনতুল্য স্বায়ত্তশাসনের “দাবিতে” রূপান্তরিত করে।
এই প্রক্রিয়ায় খোদ আওয়ামী লীগেও ধারাবাহিক পরিবর্তন ঘটে তার নিজ অগ্রাধিকার ও কার্যধারার প্রয়োজনে । মূলত বলা চলে অগ্রাধিকার রূপান্তরিত হয় “জাতীয়” থেকে “আঞ্চলিক” অগ্রাধিকারে আর কার্যধারা রূপান্তরিত হয়, “আপোসরফা” থেকে “মোকাবেলায়”।
পূর্ব পাকিস্তানী জনসমাজের রাজনীতি সচেতন স্তরগুলিতে “স্থিতাবস্থা” পরিবর্তনের একটা বলবতী ইচ্ছা সন্দেহাতীতভাবেই ছিল। কিন্তু সেই “ইচ্ছা”কে “দাবি”তে রূপান্তরিত করার কাজটি এক বড় ধরনের সাফল্য বলতেই হয়। এ দুই পর্যায়ের মধ্যবর্তী সময় ও সেই সাথে অনুভূতির তীব্রতা বেড়ে ওঠার বিষয়টি কার্যকর নেতৃত্বের অভ্যুদয়ের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল যে নেতৃত্ব জনসমষ্টির একটা বেশ বড় অংশকে সংগঠিত করে তাদের সক্রিয়তাকে বাঞ্ছিত লক্ষ্যাভিমুখে পরিচালিত করতে সক্ষম।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এই জনসংগঠনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আশু সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি না করে খুব সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে। এ ছাড়াও, এই দলটি যে পাকিস্তানী রাষ্ট্রসত্তা পুনর্গঠনের বড় দায়িত্ব পালন করেছে সে বিষয়টিও আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে আরো তাৎপর্যময় করে তুলেছে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে তার সূচনা (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ) থেকে সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, প্রাদেশিক স্তরের অন্যতম নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রাদেশিক দলছুট অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও অচিরেই এ দলটি জাতীয় বিরোধীদল নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক শাখার মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়। এটি সম্ভব হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রচেষ্টায় ।
সম্ভবত তিনিই একমাত্র পূর্ববাংলার রাজনৈতিক নেতা পাকিস্তানে যাঁর গুরুত্ব ও প্রভাব ছিল জাতীয় পর্যায়ে।` পূর্ব পাকিস্তান যতদিন পাকিস্তানী রাষ্ট্র কাঠামোর অংশ ছিল ততদিন দলের এই মর্যাদা বজায় থাকে। তবে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাথে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল বহিরঙ্গগত। আর সে সম্পর্কের মাঝেও ছিল অনেক শর্তের দেওয়াল তোলা।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে এমনকি সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কেরও অভাব ছিল যা পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে অবয়বগত ঐক্যের পরিপূর্ণ অনুপস্থিতির মাঝে অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবেই স্পষ্ট।জাতীয় পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে রাষ্ট্রের মৌল প্রকৃতি, এর অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং বাংলা ভাষার ভূমিকাসহ সকল ক্ষেত্রেই পাকিস্তানের দুই অংশের দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট তারতম্য পরিলক্ষিত হয় পাকিস্তানী রাষ্ট্রব্যবস্থার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে
। পাকিস্তান আন্দোলনকালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সিদ্ধান্ত নির্ধারক সংস্থাগুলিতে পর্যাপ্ত বাঙালি প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতি, ফজলুল হক-জিন্নাহ্ সম্পর্কে বৈরিতা, আবুল হাশিমের ম্যানিফেস্টো প্রত্যাখ্যান এবং দেশবিভাগের (১৯৪৭) প্রশ্নে তাঁর নেওয়া অবস্থান – এ সবই অবশিষ্ট ভারতীয় মুসলমানদের (পরে পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলমানদের) তুলনায় এ সব বাঙালি মুসলমানদের (পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমানদের) ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কয়েকটিমাত্র বহিঃপ্রকাশ।
শামসুল হকের মূল দাবি ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ম্যানিফেস্টোতে পাকিস্তানী রাষ্ট্রব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে কিছু মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। এটি করা হয়েছে স্ববিরোধী আদর্শিক, সমাজ-সাংস্কৃতিক, এবং আর্থ-রাজনৈতিক ইস্যুগুলির নিষ্পত্তির প্রয়াসে। বলাবাহুল্য, এ সব ইস্যু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র নেতৃত্বে গড়ে তোলা এক সাধারণ সর্বজনীন ঐকমত্যের আড়ালে পাকিস্তান আন্দোলন চলাকালে সুপ্ত অবস্থায় ছিল।
কিন্তু, একটা জনসমাজের ভেতরের বিভেদ মর্জিমাফিক দূর করা যায় না। এ কারণেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গোড়ার দিকের নেতৃত্ব—যাঁরা পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং যার প্রতীক ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী—রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে মজবুত, সংহত করার জন্য কাজ করেছেন।
তাঁরা পাকিস্তানী রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেন্দ্রাতিগ নানা প্রবণতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন তবুও তাঁরা ঐ সব শক্তিকে যদ্দূর সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করার ও অখণ্ড পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। একটি নিখিল পাকিস্তানী রাজনৈতিক দল—নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ থেকে বিরাট সমর্থন বলে বলীয়ান হয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সমস্যার সমাধান চেয়েছিলেন দরকষাকষি ও রফার স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক পন্থায়।
তাঁর এই আপোসরফার পদ্ধতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি । তিনি যুক্ত নির্বাচন প্রথাকে আইনসিদ্ধ করেন এবং কিছু সরকারি উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানের প্রাদেশিকীকরণে সক্ষম হন। তিনি আশা করেছিলেন, সাধারণ নির্বাচনের পর ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের আওতায় স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের নানা রকমের গলদ ও বৈষম্য দূর করবে এবং এক পর্যায়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা আর থাকবে না।
তবে একজন “আঞ্চলিকতাবাদী” বা “প্রাদেশিকতাবাদী” পূর্ব পাকিস্তানী হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানোর বদলে নিজেকে“অনুগত” অথবা “জাতীয়তাবাদী” পাকিস্তানী হিসেবে দেখানোর প্রয়াসে পাশ্চাত্যের সাথে (বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে) আঁতাতের সমর্থন জানিয়ে সুনিশ্চিতভাবেই তিনি পাকিস্তানের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
স্বায়ত্তশাসনের দাবির নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক দিক থেকে বিরাট রকমের বঞ্চনার বিষয়টির বেশ অনেকখানিই সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রশ্নে গৃহীত নীতির অন্যতম পরিণাম হিসেবে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক নীতিমালা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলিতে ঐ নীতির প্রতিফলন ঘটে।
এ সব অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রধানত তৈরি করেছিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মার্কিন বিশারদ । তাঁরা প্রথমে পাকিস্তানে আসেন পাকিস্তানের প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই। সম্ভবত পাকিস্তানের জন্য এর চেয়ে ভালো বিকল্প ছিল এর আগে অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্কেরº সুপারিশ বাস্তবায়িত করা।
তবে পাকিস্তান ইচ্ছা করেই অর্থনীতির জন্য এমন এক প্রবৃদ্ধি মডেল বাছাই করে যার আওতায় সম্পদের স্থানান্তর ঘটবে কৃষি থেকে আধুনিক উৎপাদন শিল্পে। আর এরই ফল হিসেবে সম্পদ পূর্ব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি কৌশল গ্রহণের নেপথ্য উদ্দেশ্য ছিল গোড়ার দিকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক অভিলাষ পূরণ ।
শিল্প ও বাণিজ্য পরিমণ্ডলের এই প্রভাবশালী বিত্তবানদের বেশিরভাগই ছিলেন ভারত থেকে দেশত্যাগ করে আসা মুসলিম ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। গোড়ার দিকের স্তরে, তাঁদের এই অর্থনৈতিক অভিলাষ লালনের জায়গা করে দেন পাকিস্তানী রাজনীতির কুলীন মহল । আর সেখানেও ছিল ভারত থেকে আগত ব্যক্তিদের প্রাধান্য। তারা নিরাপত্তার অভাববোধে তাড়িত হয়ে ভারত থেকে আগত ব্যবসায়ী শ্রেণীর সাথে সহযোগিতা করে আর ঐ ব্যবসায়ী শ্রেণীটিই পরে কুলীন শিল্পপতিকুলের অবস্থানে উন্নীত হয়।
তুলনামূলকভাবে নিরাপত্তাহীন এই দুই গোষ্ঠী এক অধিকতর সুরক্ষিত গোষ্ঠীর যেমন, পাঞ্জাবীপ্রধান সশস্ত্র বাহিনী ও আমলাদের সাথে আঁতাতে আসে। স্পষ্ট কারণেই সম্পর্কের এই ধারাবিন্যাস চলতে থাকে যদিও পরবর্তীকালে জিন্নাহ্ ও লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর “মৃত্তিকার সন্তানেরা” রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ ‘মুজাহিদ’দের হাত থেকে তাদের নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
বেতালা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, এর বিপদ ও এর সম্ভাব্য প্রতিকার—এ সব কিছুই আলোচিত হয় সজাগ, সচেতন শিক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানীদের বিভিন্ন মহলে আর কেন্দ্রীয় এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সদস্যরা এ সব আলোচনা-সমালোচনাকে আরো সুতীক্ষ্ণ, সুচর্চিত করে তোলেন।
পাকিস্তানী সিদ্ধান্ত প্রণেতাদেরকে একই নীতি আঁকড়ে থাকলে তার কী কুফল দেখা দিতে পারে সে কথা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে ঘন ঘন মনে করিয়ে দেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দী, আগেই বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে অন্তসমাজ বিভেদগুলির নিষ্পত্তির জন্য যে রফামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছিলেন তারই অংশ হিসেবে দরকষাকষির জন্য ঐ সব কুফল-সংক্রান্ত হুঁশিয়ারিকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগান ।
কিন্তু পূর্ব বাংলা ও পাঞ্জাবের (পাঞ্জাব বলতে কার্যত পশ্চিম পাকিস্তান) মধ্যেকার বিরোধ-সংঘাতের আপোস-নিষ্পত্তি ছিল মূলত অসম্ভব।” কৌশলগত কারণে, পাঞ্জাব একটা কর্তৃত্বসর্বস্ব স্বৈরাচারী শক্তি কাঠামোর আনুকূল্য করেছিল যাতে আধিপত্য থাকবে আমলা-সামরিক কর্মকর্তা আঁতাতের। অন্যদিকে, পূর্ব বাংলা এক প্রতিযোগিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চেয়েছিল।
১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মুসলিম লীগকে পুরোপুরি সরানোর পর পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রের শাসক কুলীনদের রাজনৈতিক কলকাঠি নাড়ার একমাত্র অবলম্বনটিও লুপ্ত হয়। আগামীর জন্য সাবধানতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলবর্তী করা হয় কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীগুলির স্বৈরাচারী শাসনের পর সামরিকরাজকে। আর এমনি করে, পূর্ব বাংলা প্রথম-দফাতেই হেরে যায় ।
কিছুটা পরিমাণে রাজনীতি সচেতনকৃত কোনো জনসমাজে প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও ঐ সমাজে পুরোপুরি রাজনৈতিক তৎপরতা লুপ্ত হয় না । এমনিভাবেই বলা যায়, জনসমাজের মানব উপকরণের ওপর নির্মিত কোনো স্বৈরশাসন পরিকাঠামো সমাজের ঐ মানুষগুলির আর্থ-রাজনৈতিক ও সমাজ-সাংস্কৃতিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে দাবিয়ে দিতে পারে না।
এ কারণে সোহরাওয়ার্দী জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা এনডিএফ-এর মাধ্যমে এক সম্মিলিত গণআন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন আর একটা অস্থায়ী মেয়াদের জন্য অন্যান্য ইস্যু স্থগিত রেখেছিলেন এই আশায় যে, গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হলে সেই ব্যবস্থাদি পরে ঐ সব সমস্যার সমাধান দেবে। জিন্নাহ্ ভেবেছিলেন, পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পর তৎকালীন ভারতীয় মুসলমানদের যে সব অন্তঃসাম্প্রদায়িক সমস্যা রয়েছে সেগুলির সমাধান করা যাবে।
সোহরাওয়ার্দীও সেভাবেই মনে করেছিলেন যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে খাড়া করা গেলে পাকিস্তানের আন্তঃআঞ্চলিক সমস্যাগুলির ঐ-সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেইনিষ্পত্তি হয়ে যাবে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর সে মিশন সফল হয়নি। কেননা, আইয়ুব খানের ‘রাজনৈতিক দর্শনে” এমন কোনো ব্যবস্থার স্থান ছিল না। এ ছাড়া, মিলমিশের এই দৃষ্টিভঙ্গির নিষ্ফলতা এনডিএফ-এর সদস্য সংগঠনগুলির একাংশের কাছে, বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। আর এনডিএফ-এর প্রয়োজনও তাই ফুরিয়ে যায়।
১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সময় নাগাদ পাকিস্তানী রাজনীতির উভয় সঙ্কট পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নয়া নেতৃত্বের কাছে স্ফটিক স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।১০ এ কারণে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার অগ্রাধিকারগুলি বদলায়। এর আগে এ সংগঠনটি ছিল জাতীয় স্তরে অন্যতম প্রধান বিরোধীদলের প্রাদেশিক শাখা। এখন সেটি নিজেকে সম্পূর্ণত প্রাদেশিক দলে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয় যে দলের কাজ হবে পূর্ব পাকিস্তানের অভাব-অভিযোগ প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করা ।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি অংশীদারিভিত্তিক যদি হতো, যদি সরকার ও শাসিতদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা থাকতো, পূর্ব পাকিস্তানীদের “আকাঙ্ক্ষা-অভিলাষ”কে হিসেবে নেওয়ার জন্য উপকরণ-উৎপাদন-ফলাবর্তনের একটা ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সুতীব্র বঞ্চনাবোধ প্রশমিত হতে পারতো। আর জনগণের মাঝে ঐ সব অভাব-অভিযোগ চেতনাকে আরো তীক্ষ্ণ, শাণিত করে তোলায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাফল্যও কমে যেতো।
কিন্তু সে ব্যবস্থার পরিবর্তে মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা ও পিএল-৪৮০ তহবিলপুষ্ট পূর্ত কার্যক্রম বরং ঐ সব অভাব-অভিযোগকে আরো ঘনীভূত করে তোলে ।১১ স্বাভাবিক কারণেই অন্যেরা ছাড়াও এমনকি মূর্খ, গ্রামের গরিব মানুষ যাদের প্রায় সবাই চাষী, যারা পরিবর্তনে আগ্রহী তারাও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে তাদের পক্ষের সোচ্চার এক প্রবক্তার সন্ধান পায়।
আইয়ুব খান, মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা ও পূর্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁর যে সমর্থক বুনিয়াদটি গড়তে চেয়েছিলেন সেটি কেবল কিছু অকেজো বশংবদ তৈরির মতো অতি সীমিত উদ্দেশ্য সাধনে সক্ষম হয়। মৌলিক গণতন্ত্রী তথা উদ্বৃত্ত চাষীরা তাঁর ও গণমানুষের মধ্যে কোনো ফলদায়ক যোগসূত্র স্থাপনে ব্যর্থ হয় যদিও তিনি হয়তো তাঁদেরকে সে ভূমিকায়ই ভেবেছিলেন।
তাঁরা ও তাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পোষকতাপ্রাপ্ত পূর্ব পাকিস্তানী উদ্যোক্তা শ্রেণী সরকারপন্থী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয় আর প্রান্তিক চাষী (ও বহুউদ্বৃত্ত প্রান্তিক চাষী) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, কেননা এই দল স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের অঙ্গীকারে আবদ্ধ ।১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার উপনিবেশসুলভ সম্পর্কটি উন্মোচিত হওয়ার পর আপোস-নিষ্পত্তির শেষ সম্ভাবনাটুকু উবে যায়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব অনমনীয় হয়ে ওঠে।
এই দল পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্কে পরিপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন দাবি করে। ছয়-দফা ফর্মুলা ঘোষণা করা হয় ও স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সূচনা ঘটে। বস্তুত ছয়-দফা ফর্মুলার বিষয়বস্তুগুলি ১৯৫০দশকের গোড়া থেকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করে আসছিলেন পূর্ব পাকিস্তানী জনজীবনের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা ।এমনকি এই পর্যায়েও আপোসরফার প্রত্যাবর্তন সম্ভব হতে পারতো যদি পরিস্থিতির সঙ্কটজনক নাজুক অবস্থা উপলব্ধির মতো চেতনা থাকতো শাসকচক্রের। কিন্তু ভ্রান্ত নীতি গ্রহণ করা হয় ।
তাই সে সবে উল্টো ফল ছাড়া আর কিছুই হয়নি। “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা” স্বায়ত্তশাসনবাদীদের সংহতি দুর্বল করার পরিবর্তে বরং খোদ শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক প্রচণ্ড বুমেরাং হয়ে ওঠে । গোলটেবিল আলোচনায় নামাবলি দেখে পূর্ব পাকিস্তানের লড়াকু ছাত্রদের এবং তাদের শহর, নগর এমনকি গ্রামীণ সহযোগীদেরও অবদমিত করতে পারেনি।
১৯৬৯ সালের গোড়ার দিকে পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের দৃষ্টতই দুর্বল অবস্থা ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের নিয়তির পরিষ্কার আভাস দিয়েছিল বলে মনে হয়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের পক্ষে তাঁদের কুণ্ঠাহীন আস্থা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’ লোকের নেতৃত্বে ন্যস্ত করার কারণ আর কী হতে পারে? শেখ মুজিব এভাবে জনসমর্থন পাওয়ার ফলে তাঁর পেছনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জনগণের প্রচ্ছন্ন স্বীকৃতি পেয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব নাটকীয়ভাবে গদি না ছেড়ে দিলে ও পরে সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া না হলে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারবিরোধী আন্দোলন আরো বিরাট ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে যেতে পারতো। আইয়ুব খানের ক্ষমতা থেকে সহজে সরে যাওয়া ও জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকারের বিষয় এক সাথে বিবেচনায় নিলে নিরাপদ নিশ্চিন্তে এ কথাও ধরে নেওয়া যায় যে, এগুলি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের “সন্ধির” প্রস্তাব।
শাসকচক্র এমনটি ধরে নিয়েছিল বলেই মনে হয় যে, শেখ মুজিবের সাথে দরকষাকষির আলোচনায় বসলে সঙ্কট সামাল দেওয়া যাবে কিংবা বৈরিতা কমানো যাবে। আসলে তারা এ ক্ষেত্রে খুব বেশি অতিকথা বা কিংবদন্তীনির্ভর হয়ে পড়েছিল। সে অতিকথা এই যে, শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর “রাজনৈতিক ওয়ারিশ” হিসেবে হয়তো পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও ঐক্যের খাতিরে আপোসরফাকে অগ্রাধিকার দেবেন আর সে জন্য তিনি ছয় ও এগারো- দফা প্রশ্নে একটা রফায় আসতে সাহায্য করবেন।
যেভাবেই হোক, পাকিস্তানের শাসকচক্র এ বিষয়টি বিবেচনায় নিতে ভুল করেছিল যে, শেখ মুজিব শুধুমাত্র সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী নন, বাঙালি মুসলিমের ভাগ্য উন্নয়নে একনিষ্ঠ ফজলুল হকের আবেগ এবং বাঙালি মুসলিমের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে অবাঙালি মুসলিমদের ওপর হক সাহেবের আস্থাহীনতার ঐতিহ্যও তিনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার হিসেবে।

শেখ মুজিব বিক্ষোভপ্রবণ ছাত্রদের ওপর সংযম আরোপে গোড়ায় সফল হয়েছিলেন। তাই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ একটু বিভ্রান্ত হওয়ার কারণে ছাত্রদের সহিংসতাকে তেমন প্রাসঙ্গিক মনে করেননি, আমলও দেননি। তবে শেখ মুজিব একটা বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্য বিভিন্ন বিকল্প হাতে রেখেছিলেন।
এর অন্যতম ছিল, কর্তৃপক্ষকে তাদের হাতের তুরুপের তাসগুলি খেলতে দেওয়া ও সেই অবকাশে তাদের মতলবগুলি উন্মোচিত করা । আর এভাবে তাদের জন্য পিছু হঠার কোনো জায়গা না রাখা। আরেকটি কৌশল ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে মোকাবেলা অবস্থার জন্য সতর্ক ও মানসিকভাবে তৈরি রাখা—যা বাস্তবিকপক্ষে অনিশ্চিত বস্তুগত প্রস্তুতির প্রয়াসের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ছয়-দফা ফর্মুলাকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সময় থেকেই এ প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। সরকারের সর্বাত্মক বিরোধিতা ও কিছু বেসরকারি বিরোধিতার বিরুদ্ধে ছয়-দফার অনুকূলে জনমত গড়ে তোলার কাজটি ক্রমেই ছয়-দফাকে একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতীকে রূপান্তরিত করে। স্বায়ত্তশাসনের নামে (যাতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি প্রচ্ছন্ন) ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নির্বাচনী লড়াইয়ের ফলাফলই জনমত সংগঠিত করায় ঐ দলের সাফল্যের অকাট্য প্রমাণ ।
এর বেশি কিছু প্রমাণের দরকার যদি পড়েই তা রয়েছে ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাথে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংহতি ও একাত্মতায়।এই অনন্য পরোক্ষ প্রতিরোধ এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যার ফলে কেন্দ্ৰীয় বেসামরিক কর্তৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মকভাবে অচল হয়ে পড়ে ।
মোকাবেলা পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার গন্তব্যে এটিও ছিল এক ইতিবাচক পদক্ষেপ যদিও তা আনুষ্ঠানিক ঘোষণাবর্জিত। ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রধানত জাতীয়তাবাদী পূর্ব পাকিস্তানী জনগণের আবেগতাড়িত সংশ্লিষ্টতার প্রকাশ ঘটে অসহযোগ আন্দোলনে যার অনিবার্য পরিণতি ছিল পাকিস্তানের অবশিষ্টাংশ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি মূল সমস্যা তথা অন্তঃসামাজিক উত্তেজনা বিবর্জিতভাবে জনগণকে সংগঠিত করার কাজ অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে। কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সাফল্য আনতে হলে সংশ্লিষ্ট জনসমাজে যথেষ্ট মাত্রায় ঐক্য থাকতে হবে। তবে জনমত গড়ে তোলা বা সংগঠিত করার কাজে সাধারণত অভ্যন্তরীণ শ্রেণী, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীগত সংঘাত দেখা দিয়ে থাকে আর তাতে জাতীয়তাবাদী স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়।
‘২০ ও ৩০-এর দশকে অবিভক্ত ভারতে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব কর্তৃক এ ধরনের জনমত সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ঐ ধরনের সমস্যা সুস্পষ্ট ছিল। পাকিস্তানের ভেতরে পূর্ব পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের বিকাশের অন্য বাধাটি ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ধর্মের বন্ধন। পূর্ব পাকিস্তানে স্বকীয় সংস্কৃতি ছিল ও জনসমাজ খুব বেশি উল্লম্ব শ্রেণী বিন্যস্ত ছিল না।
ধর্ম বস্তুতপক্ষে এই সুবিধাজনক অবস্থার প্রতিসাম্যবিধায়ক হতে পারতো। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকচক্র দেশের ধর্মীয় মহলের কাতারে শামিল না হয়ে ধর্মকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে গেলে ব্যাপারটা হতে পারতো শাঁখের করাতের মতো। তাতে হয়তো শাসকগোষ্ঠীকে আরেক গুচ্ছ সমস্যায় পড়তে হতো। এ ছাড়া, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ধর্মের ভূমিকার
ব্যাপারে নিম্নলয়ের ভূমিকা গ্রহণ করায় পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্ম কার্যত আর কোনো ইস্যু থাকেনি ।কোনো লাগাতার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য জনগণকে সংগঠিত করতে প্রতীক ব্যবহারের দরকার হয় । পূর্ব পাকিস্তানীরা এ ধরনের এক চমৎকার প্রতীকের সন্ধান পায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ছয়-দফা কর্মসূচিতে। পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণের বিষয়টিকে জনসাধারণ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় ।
এটি ছিল এক সুনির্বাচিত প্রতীক । কারণ, পূর্ব পাকিস্তানী জনসমষ্টির সকল স্তরে এর প্রভাব ও এ থেকে অনুকূল সাড়া সমান ছিল । এ প্রতীক শ্রেণীবৈরিতাকে সীমিত রাখায় সক্ষম ছিল । দারিদ্র্যপীড়িত জনসাধারণের ক্রোধকে পশ্চিম পাকিস্তানী শোষকদের দিকে সহজে চালিয়ে নেওয়া যেতো বলে পূর্ব পাকিস্তানে শ্রেণীবৈরিতাকে সহনীয় মাত্রায় সীমিত রাখা সম্ভব ছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানীদের সহজাত আনুগত্যের সুযোগ নেওয়া সম্ভব ছিল।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিরোধীরা ধর্মপন্থী হোক কিংবা অন্য মধ্যপন্থী হোক তাদের তাৎপর্যপূর্ণ সমর্থনের বুনিয়াদ তেমন ছিল না। বামপন্থীরাও ছিল বেশ উপান্তিক পর্যায়ে সীমিত। তাদের আদর্শও ছিল তাদের জন্য অন্তরায় আর ঐ পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানী জনসমাজের জন্য ঐ আদর্শ খুব একটা প্রাসঙ্গিক ছিল না— —কেননা, তৎকালীন জনসমাজে খুব একটা সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়িত শ্রেণী সংঘাত ছিল না, ধর্মবিরোধী কোনো সুগঠিত বিশ্বাসের অস্তিত্বও ছিল না ।

শ্রেণীবৈরিতা ও ধর্মান্ধতা কার্যত না থাকায় পূর্ব পাকিস্তানের বস্তুনিষ্ঠ পরিবেশ পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের মতো উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক লক্ষ্য এবং সমাজ পরিবর্তনে মধ্যনীতিসম্পন্ন একটি মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলের১৩ অভ্যুদয়ের জন্য অত্যন্ত অনুকূল ছিল। তাই “উপনিবেশ” থেকে পূর্ব পাকিস্তানের একটি স্বাধীন সত্তার উত্তরণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
তবে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রাসঙ্গিকতায় ‘ইচ্ছা’কে ‘দাবি’তে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় এই দলটি বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়াটিকে আরো দ্রুততর করে তোলে যদিও রাজনৈতিক দল (যা মূলত এক সংহতিবিধায়ক উপব্যবস্থা বিশেষ) হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যাত্রা শুরু করেছিল এক সংহতিবিধায়ক ভূমিকায় ।নিঃসন্দেহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালে ছয়-দফা প্রণয়ন করে পূর্ব পাকিস্তানীদের অসন্তোষ তীব্রতর করে তোলার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
তবে পাকিস্তানী রাষ্ট্রসংস্থার অবস্থা বৈগুণ্যেই আওয়ামী লীগ এই পথে যেতে বাধ্য হয় । বলতে গেলে পর্যাপ্ত রকমে অংশীদারিমূলক একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন এবং দেশের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পদের অধিকতর ন্যায্য বিলিবণ্টনের নিশ্চয়তা বিধানে । যথার্থ শাসকগোষ্ঠীর ব্যর্থতার জন্যই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ একান্তভাবে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের অনুকূলে তার পাকিস্তানী ভাবমূর্তি বিসর্জন দিতে বাধ্য হয় ।

আধুনিক রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অবশ্যই একটি দক্ষ অবকাঠামো গড়ায় সক্ষম হতে হবে (হয় বহুত্ববাদী প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ নয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির মতো পরিসঞ্চালন বলয়ের মাধ্যমে) যাতে জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলিকে তীক্ষ্ণ, শাণিত, পরিচর্চিত করে তোলার প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করা যায় এবং এক সংবেদনশীল, সক্ষম ও দায়িত্বশীল ফলপ্রদায়ক কার্যপ্রণালীতে গোটা ব্যবস্থার দাবি মেটানো যায়।
অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন পাকিস্তানী শাসককুলীনেরা কোটারি আধিপত্যময় এক স্বৈর পরিকাঠামো গড়ে তোলার অনুকূলে জাতি গঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলিকে অবহেলা করে। ভ্রান্ত অগ্রাধিকারগুলিতে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। অংশীদারি ভিত্তিতে জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি পুরোপুরি অবহেলিত হয়। পাকিস্তানী ক্ষমতার শীর্ষস্থানীয়দের এই ভূমিকার সাথে তাদের “ভারত-আতঙ্ক”
নিবিড় সম্পর্কিত ছিল আন্তর্জাতিক ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে, আগে কমিউনিজম রোধের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বারোপের সঙ্গে ও পরে দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে চীনের সাথে আঁতাতে উপনীত হওয়ার ব্যগ্রতায় আর এরই নীট ফল হিসেবে পাকিস্তান হয়ে ওঠে এক জাতিসন্ধানী সেনাবাহিনী!পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় ঐ দেশের একেবারেই ভিন্ন দুটি শাখার জনসমষ্টির রাজনৈতিক চেতনার স্তরও ভিন্ন।
নগর ও শিল্পায়নের নিম্নস্তর সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের রাজনৈতিকীকরণের স্তর পশ্চিম পাকিস্তানীদের তুলনায় অনেক বেশি উঁচু।১৫ পাকিস্তানের রাষ্ট্র প্রকৃতির প্রশ্নে পাকিস্তানের দুটি শাখার নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির পরিপূর্ণ মেরুকরণের বিষয়টিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রকাশ করেছেন চার্লস বার্টন মার্শাল । তিনি ১৯৫৯ সালে লিখেছিলেন: “পূর্ব পাকিস্তান রাজনীতিভাবাপন্ন, আর পশ্চিম পাকিস্তান সরকারগত প্রাণ।
”১৬ তাই পাকিস্তানী রাজনীতির স্ববিরোধিতা ‘৬০-এর দশকের মধ্যভাগ অবধি পশ্চিম পাকিস্তানী জনসমষ্টির রাজনীতি সংশ্লিষ্ট অংশগুলির তুলনামূলক নিষ্ক্রিয়তায় প্রলম্বিত হয়েছে ও তাতে করে পরিবর্তনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে অনুপ্রেরণাও দিয়েছে। দলটি তাতে সফল হয়েছে ঠিকই কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কার্যত স্বাধীনতা ঘোষণার আগে অবধি নয় কিংবা একটা সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থাকে সার্বিকভাবে জায়গা ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তানের তৎকালীন বিরাজমান ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়া অবধি নয়।
তাই যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলা যায় যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ইতিহাস-নির্ধারিত ভূমিকা সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছে। এর অন্যথা করার খুব সামান্য বিকল্পই তার সামনে খোলা ছিল ।আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলিকে জনসমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক বা প্রয়োজনীয় হতে হলে এ সব দলকে মানব বিষয়াবলির একটা যৌক্তিক ও উদ্দেশ্যসাধক গন্তব্যে সামাজিক অগ্রগতির বাহন হতে হবে।
নিখিল ভারত মুসলিম লীগের উত্তরসূরি এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ/পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পিতৃ সংগঠন পাকিস্তান মুসলিম লীগ কার্যত খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায় এ কারণে যে, এই দলটির কোনো ব্যাপক ও সুসংজ্ঞায়িত সামাজিক লক্ষ্য ছিল না । আর সে কারণেই দলটি কর্তৃপক্ষ ও জনসমাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র হতে পারেনি। আশু রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলি ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সে তুলনায় সুপরিসরভাবে সংজ্ঞায়িত সামাজিক উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও অঙ্গীকার ছিল ।
তবে এ দলের কার্যপরিচালনাগত নীতির গঠনপ্রক্রিয়া ছিল অনেকটাই খণ্ড খণ্ডভাবে যাতে কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপক ব্যবস্থাপত্রের বিধান ছিল না। এর অবশ্য এক ব্যাখ্যাও দেওয়া চলে এভাবে যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাছে রাজনৈতিক সমস্যাই, কিংবা জাতীয়তাবাদের তাল-লয় বিহীন বিকাশ বা ইত্যাকার বিষয় ছিল সর্বাগ্রগণ্য। কিন্তু আসলে সেগুলিই কি সব? কিংবা এটিকে অন্যভাবে বলা যায়: ঘটনা এ রকমই বা ছিল কেন?
পূর্ব পাকিস্তানে শাসকগোষ্ঠীবিরোধী শক্তিগুলির রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এবং এ শক্তিগুলির সাথে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্পর্কের সমীকরণের একটা মোটামুটি পর্যালোচনায় দেখা যাবে, পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ বৈশিষ্ট্যগতভাবে একটি উপনিবেশবিরোধী প্ল্যাটফরম দল যা আবশ্যিকভাবেই অনিয়তাকার প্রকৃতির। এ দলটির অস্তিত্ব রক্ষার রসদ আসে সবচেয়ে সক্রিয় ও গোলযোগময় দিনগুলিতে অভাব-অনটন প্রপীড়িত কৃষককুল, প্রান্তিক উদ্বৃত্ত চাষী, শিল্প শ্রমিক, শহরে শিক্ষিত অথচ প্রধানত পল্লী জনপদভিত্তিক ছাত্রদের কাছ থেকে ।
পূর্ব পাকিস্তান বলতে যে অঞ্চলকে বোঝাতো সে অঞ্চলের গ্রামীণ জনসাধারণের রাজনৈতিকীকরণ শুরু হয় ‘৩০-এর দশকে ফজলুল হকের ডাল-ভাত রাজনীতি থেকে আর তা তীব্রতর হয়ে ওঠে ‘৪০-এর দশকে কৃষক সভাগুলির প্রয়াসের বদৌলতে। তাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যে সময় নাগাদ প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনগণকে সংগঠিত করার কাজে নামে সেই সময় নাগাদ চরম দারিদ্র্য ও শোষণজনিত সামাজিক আঁতাত ও উত্তেজনায় ঐ সব লোকের মনে ভোটের অধিকারের আশা-আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি অন্ততপক্ষে ন্যায়বিচার লাভের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানজনিত ধারণা উজ্জীবিত হয়।
‘৬০-এর দশকের শেষ ভাগে শাসকগোষ্ঠীবিরোধী গণজোয়ারের মেজাজে সে ধরনের সমাজ রাজনৈতিক আঁতাতের যৌথ প্রভাব পড়তে লক্ষ্য করা যায় যখন তারা জোতদার, গ্রাম্য টাউট, উদ্বৃত্ত চাষী তথা মৌলিক গণতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে, এমনকি গণআদালতে তাদের “বিচারানুষ্ঠানও” করে।
পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের কৃষককুলের সংখ্যাশক্তির বিচারে তার শ্রমিক শক্তি নগণ্য (‘৬০-এর দশকের শেষভাগে ৯৭৬,০০০)। এর মধ্যে অর্ধেকেরও কম আধুনিক শিল্প খাতের শ্রমিক । এ সব শ্রমিকদের মধ্যে যারা সংগঠিত ছিল তারা ‘৬০-এর দশকের শেষভাগ অবধি বামপন্থী রাজনৈতিক গ্রুপগুলির সাথে সম্পর্কিত।
এ সময় নাগাদ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার শ্রমিক ফ্রন্ট শ্রমিক লীগের মাধ্যমে অধিকতর আধিপত্যশীল হয়ে ওঠে। শিল্প উৎপাদিত পণ্যের বর্ধিত মূল্যের পাশাপাশি ‘৬০-এর দশকে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি সূচক পড়ে গেলে শ্রমিক অসন্তোষ ধূমায়িত হয় ও তারা রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের একেবারে গোড়া থেকেই এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও অসন্তোষ কার্যত নারায়ণগঞ্জ শিল্প শহর থেকে ১৯৬৯ সালে শুরু হয়।
এখানকার শিল্প শ্রমিকরা যথেষ্ট জঙ্গি মনোভাব প্রকাশ করে নিজ দাবি-দাওয়া আদায়েমালিকদের বিরুদ্ধে নিগ্রহমূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করে। আর কৌতূহলোদ্দীপকভাবে পরবর্তীকালে সরকারি ছাড়, রেয়াত ইত্যাদি পাওয়ার ফলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। তাদের জঙ্গি কার্যকলাপ অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে শিখরে পৌঁছায়। এ অসহযোগ আন্দোলনের উদ্গাতা ও সংগঠক ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। এ আন্দোলনটি হয় ১৯৭১ সালের মার্চে।

স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ও আইয়ুববিরোধী গণজাগরণের সংগঠক ছাত্ররা বরাবরই পূর্ব পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোভাগে ছিল। তারা ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এবং কৃষক শ্রমিকদের এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। এই ছাত্র সমাজের মধ্যে ছিল সক্রিয়তাবাদী ছাত্রদের একটি অংশ যাদের মার্কসবাদী বা মার্কস-লেনিনবাদ প্রবণতাসম্পন্ন বলে উল্লেখ করা হয়।
এ বাস্তবতার কারণে বোঝা যায় যে, আন্দোলনে গণমানুষের অংশীদার হওয়ার প্রেরণা কেবল রাষ্ট্রীয় অধিকার পাওয়ার জন্যই ছিল না বরং ন্যায়বণ্টনের প্রশ্নটিও গুরুত্ব লাভ করেছিল।পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নয়া নেতৃত্ব ব্যাপক জনসংগঠনের মাধ্যমে একটা মোকাবেলামূলক মনোভঙ্গির ভূমিকা গ্রহণ করে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকে এক নতুন অভিমুখিতাসম্পন্ন বৈশিষ্ট্য দেয়।
ঐ সময়কার দাবির প্রয়োজনে দলটি আদর্শিক মতাদর্শ নির্বিশেষে গ্রামের কৃষক, শিল্প শ্রমিক ও ছাত্র সমাজের আরো কাছাকাছি যায়। আর সে কারণেই ১৯৬৪ সালের পর থেকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে উত্তরণের কথা ক্রমবর্ধমান হারে উচ্চারণ করতে থাকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। স্পষ্টত এটি করা হয় কিছুটা বিশ্বাস, কিছুটা বাগাড়ম্বর সর্বস্ব আবেগ হিসেবে।
বোধগম্যভাবেই যারা সমাজতান্ত্রিক বুলি সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, আর যারা সমাজতান্ত্রিক বুলির জন্যই দলটিকে সমর্থন জানায় তারা তা করে তাদের নিজ নিজ নেপথ্য কারণ ও স্বার্থে। বলা যায়, সামাজিক সমস্যাবলির প্রশ্নে যারা স্থিতাবস্থাবাদী ও যারা কাঠামোগত সংস্কারপন্থী তাদের উভয় তরফই আশু-রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে যেতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে।
সমস্যার অহিংস নিষ্পত্তির সম্ভাবনা প্রথমে কিছু মরীচিকাবৎ হয়ে দেখা দিলেও গোলটেবিল আলোচনার ব্যর্থতায় তার দফারফা ঘটে। পরিশেষে নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। ক্রমান্বয়ে গোড়ার দিকে বিক্ষিপ্ত সশস্ত্র প্রতিরোধের ঘটনা ঘটে ও পরে পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। আওয়ামী লীগ অস্থায়ী সরকারের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক আনুগত্য সত্ত্বেও তাদের মাঝে মেরুকরণ ঘটে । এই অস্থায়ী সরকার সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায়সম্মত সার্বভৌমত্ব লাভ করে।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সংগ্রামের প্রকৃতিকে সামগ্রিক বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে, উল্লিখিত ধরনের মেরুকরণ ছিল অনিবার্য, যেমন অনিবার্য ছিল একটা গতানুগতিক উপনিবেশবিরোধী দৃশ্যপটে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোয়ালিশন ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ফলত অনিবার্য ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পুনর্নির্মাণের জন্য সুস্পষ্ট কর্মধারার ব্যাপারে বিভ্রান্তির উদ্ভব ।
