আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বৌদ্ধ ধর্ম – যা আর্য সমাজ ও সভ্যতা এর অন্তর্ভুক্ত।
বৌদ্ধ ধর্ম

গৌতম বুদ্ধ
সমসাময়িক ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক উপাদানের অভাবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। জাতক গ্রন্থগুলো, সিংহলি ইতিবৃত্তগুলো এবং পরবর্তীকালে সংস্কৃতে লেখা ললিতবিস্তার এ বিষয়ে আমাদের কিছুটা তথ্য সরবরাহ করে।
গৌতম বুদ্ধের পূর্বনাম ছিল সিদ্ধার্থ। গৌতম গোত্রজাত বলে তিনি গৌতম নামে পরিচিত। ভারতের উত্তর প্রদেশের এবং বিহারের উত্তরে নেপালের তরাই অঞ্চলে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী গ্রামে শাক্যবংশে তাঁর জন্ম হয় । তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এখন প্রায় সব পন্ডিতই মনে করেন যে, গৌতম বুদ্ধ ৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা শুদ্ধধন ছিলেন শাক্য জাতির গোষ্ঠী নেতা। তাঁর মাতার নাম মায়া দেবী। বাল্যকালে গৌতম অস্ত্র ও শাস্ত্র উভয় বিষয়েই শিক্ষালাভ করেছিলেন।
ষোল বছর বয়সে গোপা নামে এক সুন্দরী কন্যার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ২৯ বছর বয়সে তাঁর এক পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। তখন গৌতম সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে প্রথমে তিনি আলারাকালাম নামে এক সন্ন্যাসীর কাছে ধ্যান ও তপস্যাবিদ্যা অর্জন করেন। কিছুদিন পর তিনি পাঁচজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে ছয় বছর কঠোর ধ্যান ও কৃচ্ছ্রসাধন করেন এবং এ পথে মুক্তি লাভ করা যাবেনা বুঝতে পেরে তা ত্যাগ করেন। এবার তিনি উরুবিল্ব নামক স্থানে এক পিপল গাছের নিচে সাধনা করতে থাকেন। ৪৯ দিন সাধনার পর তিনি দিব্যজ্ঞান বা বোধি লাভ করে বুদ্ধ (জ্ঞানী) বলে পরিচিত হন।
বারাণসীর কাছে সারনাথে গৌতম বুদ্ধ তাঁর ভূতপূর্ব পাঁচ সঙ্গীর কাছে প্রথম তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন। এই ঘটনা ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ রূপে আখ্যায়িত। এরপর তিনি বরাণসী, রাজগৃহ প্রভৃতি স্থানে তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন। মগধের রাজা বিম্বিসার তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। বুদ্ধের ধর্মমত প্রধানত মগধে প্রচারিত হলেও উত্তর প্রদেশের কোশল দেশেই তাঁর ধর্মের বিকাশ ঘটে। গৌতম বুদ্ধ প্রায় ২১ বছর কোশল দেশে তাঁর ধর্মপ্রচার করেছিলেন। কোশল রাজা প্রসেনজিৎ তাঁর ভক্ত ছিলেন। প্রসেনজিৎ -এর রাণী মল্লিকাও ছিলেন গৌতম বুদ্ধের শিষ্যা।
বারাণসী ও রাজগৃহ থেকে তিনি নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসেন এবং তাঁর পিতা, স্ত্রী ও পুত্রকে তাঁর ধর্মমতে দীক্ষিত করেন। জীবনের ৪৫ বছর তিনি অক্লান্তভাবে ধর্মপ্রচার করেন এবং এক বিশাল সংখ্যক মানুষ তাঁর ধর্মগ্রহণ করেন। ৮০ বছর বয়সে গোরখপুর জেলার কুশিনগরে ৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ।
পালি ভাষায় রচিত ত্রিপিটক থেকে বৌদ্ধ ধর্মের মতবাদ সম্পর্কে জানা যায়। ত্রিপিটক বলতে বুঝায় বিনয় পিটক, সুত্ত পিটক, এবং অভিধম্ম পিটক। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মঠ-জীবন সম্পর্কিত বিধান হচ্ছে বিনয় পিটকের বিষয়বস্তু। সুত্ত পিটকে বৌদ্ধ ধর্মের নৈতিক দিক এবং অভিধম্ম পিটকে বৌদ্ধ ধর্মের আধ্যাত্মিক বা দার্শনিক দিক আলোচিত হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মের মূলনীতি
বৌদ্ধ ধর্ম মূলত: দুঃখবাদী। গৌতম বুদ্ধের ধর্মের মূল লক্ষ ছিল মানুষকে দুঃখের হাত থেকে রক্ষা করা । বুদ্ধ মনে করতেন যে মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা আবার নতুন দেহে জন্মলাভ করে এবং পূর্বজন্মের কর্মফল ভোগ করে। কর্ম থেকে আসে আসক্তি ও বাসনা এবং তার থেকে আসে দুঃখ। তাঁর মতে জন্মগ্রহণ করাটাই দুঃখের। কাজেই পুনর্জন্মকে রোধ করা সম্ভব হলে মানুষকে দুঃখের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে; মানুষের আত্মা নির্বাণ লাভ করবে। কর্মফল ও তার পরিণাম দুঃখ সম্পর্কে বুদ্ধ আর্যসত্য নামে পরিচিত চারটি সত্য উপলব্ধি করেন।
এগুলো হচ্ছে (১) মানুষের জীবনে দুঃখ আছে এবং জন্মই দুঃখের কারণ; (২) কামনা, বাসনা, অতৃপ্তি প্রভৃতি হচ্ছে দুঃখের কারণ; (৩) এই কামনা, বাসনা, অতৃপ্তি রোধের উপায় আছে; এবং (৪) দুঃখ নিরোধের জন্য সঠিক মার্গ বা পথ অনুসরণ করতে হবে। দুঃখ থেকে মুক্তিলাভের জন্য বুদ্ধ আটটি পথ বা মার্গের (অষ্টাঙ্গিক মার্গ) কথা বলেছেন। এগুলো হচ্ছে: সৎ বৰ্ণ, স কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ চেষ্টা, সৎ চিন্তা, সৎ চেতনা, সৎ সংকল্প এবং সৎ দর্শন ।
গৌতম বুদ্ধ মধ্যপন্থা অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অত্যধিক ভোগ-বিলাস বা অত্যধিক কৃচ্ছ্রসাধন না করে মাঝামাঝি পথ অনুসরণ করাকেই তিনি মধ্যপন্থা বলে অভিহিত করেছেন। অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করে একজন মানুষ দুঃখের হাত থেকে মুক্তি এবং নির্বাণ লাভ করতে পারে। নির্বাণ হচ্ছে পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি। নির্বাণ লাভ করলে মানুষকে আর দুঃখ ভোগ করতে হবে না। স্বৰ্গ বা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মিলন বৌদ্ধ ধর্মের লক্ষ নয়। গৌতম বুদ্ধ সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কেও নীরব ছিলেন। বৌদ্ধরা হিন্দু ও জৈনদের মত কর্মফল ও জন্মান্তরে বিশ্বাস করে। জৈনদের মত বৌদ্ধরাও অহিংসবাদী।
তারা বেদের পবিত্রতা এবং বৈদিক যাগ-যজ্ঞের ফলপ্রসূতাকে স্বীকার করে না। জাতি বা বর্ণ নিয়ে গৌতম বুদ্ধের কোন মাথাব্যথা ছিলনা। যে কোন পেশা, ধর্ম বা বর্ণের মানুষই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে পারতো। জৈন ধর্মের মত বৌদ্ধ ধর্মও বিপুল সংখ্যায় সমাজের নিপীড়িত মানুষকে আকর্ষণ করেছিল। বৈশ্যদের অর্থ ও বিত্ত থাকলেও তেমন সামাজিক মর্যাদা ছিলনা। শূদ্রদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। ফলে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের উদ্দেশ্যে তারা এ নতুন ধর্মে যোগ দিয়েছিল। অধ্যাপক রোমিলা থাপার বলেছেন যে, সম্প্রতিকালেও ধর্মান্তরের এ প্রক্রিয়া চলছে।
ভারতের আদমশুমারি রিপোর্টের ভিত্তিতে তিনি বলেছেন যে, ১৯৫১ সালে ভারতে বৌদ্ধদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২,৪৮৭ জন। দশ বছর পরে তাদের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩,২৫০,২২৭ জনে। এর মধ্যে শুধুমাত্র মহারাষ্ট্রেই বৌদ্ধদের সংখ্যা ছিল ২০ লক্ষের ওপরে। সাধারণত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে হরিজনদের মধ্যেই এ ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রবণতা ছিল বেশি।
গৌতম বুদ্ধ মধ্যপন্থী হওয়ায় তিনি তাঁর শিষ্যদের মঠে বাস করার অনুমতি দিয়েছিলেন। মঠগুলো সন্ন্যাসীদের শুধু আবাসনস্থলই ছিলনা।কালক্রমে এগুলো বিদ্যাচর্চার বড় বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এ প্রসংগে বিক্রমশিল, সোমপুর এবং নালান্দা মঠের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। একসঙ্গে মঠে থাকার এবং সেখানে উপাসনা করার নিয়ম থাকায় ভারতের প্রাচীনতম এ স্থাপত্য থেকে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়।
গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ লাভের পর তাঁর বাণীগুলোকে নিয়ে তাঁর শিষ্যদের মধ্যে প্রথম মতভেদ দেখা দিয়েছিল।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতবিভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে সম্রাট অশোক পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। এটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। চতুর্থ বা শেষ বৌদ্ধ মহাসঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয় কণিষ্কের রাজত্বকালে কাশ্মিরে। কোন কোন সূত্র মতে এটা হয়েছিল জলান্ধরে। এতে সভাপতি ছিলেন বসুমিত্র এবং সহ-সভাপতি ছিলেন অশ্বঘোষ। এই সম্মেলনে বৌদ্ধ গ্রন্থের বিভিন্ন অংশের অর্থ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পর আলোচনার সারাংশ বিভাষ-শাস্ত্ররূপে সংকলিত হয়। এ সময়ই বৌদ্ধদের মধ্যে গুরুতর মতবিরোধের সূত্রপাত হয় এবং মহাযানপন্থী বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব ঘটে। আগে বৌদ্ধরা ছিল হীনযানপন্থী ।
মহাযান ও হীনযান বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। মহাযানপন্থী বৌদ্ধরা বোধিসত্ত্বের ধারণার প্রচলন করে। বোধিসত্ত্ব অর্থ যারা বুদ্ধত্ব লাভ না করলেও সে পথে অগ্রসর হচ্ছেন। হীনযানপন্থী বৌদ্ধদের মতে গৌতম বুদ্ধ ছিলেন এক সর্বজ্ঞ পুরুষ, শিক্ষক ও সংস্কারক। মহাযানপন্থী বৌদ্ধদের মতে তিনি ছিলেন দেবতা।
হীনযানপন্থী বৌদ্ধরা ব্যক্তির মুক্তির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। অন্য দিকে মহাযানপন্থায় সমষ্টির মুক্তির চিন্তা করা হয়। মহাযানপন্থী বৌদ্ধরা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি তৈরি করে তাঁর পূজা শুরু করে। হীনযানপন্থী বৌদ্ধরা অষ্টমার্গের সাধনাকেই মুক্তি লাভের শ্রেষ্ঠ উপায় বলে মনে করে। হীনযানপন্থী বৌদ্ধরা নৈতিক আচরণ ও সৎ কাজের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতেন; মহাযানপন্থী বৌদ্ধরা বিভিন্ন বোধিসত্ত্বের আরাধনার ওপর গুরুত্ব দিতেন। হীনযানপন্থী বৌদ্ধরা ব্যবহার করেছিলেন পালি ভাষা, মহাযানপন্থী বৌদ্ধরা ব্যবহার করেছিলেন সংস্কৃত ভাষা।
কণিষ্কের সভাসদ নাগার্জুন ছিলেন মহাযানপন্থী বৌদ্ধ ধর্মের একজন প্রবক্তা। অশোকের আমলে হীনযান বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের বাইরে শ্রীলংকা এবং মায়ানমারে বিস্তার লাভ করেছিল। কণিষ্কের আমলে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম মধ্য এশিয়া, চীন ও তিব্বতে প্রসার লাভ করে।
বৌদ্ধ ধর্মের জনপ্রিয়তার কারণ
ভারতের এক কোণে বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব হলেও কালক্রমে এ ধর্ম সমড় ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে শ্রীলংকা, মায়ানমার, তিব্বত, জাভা, সুমাত্রা, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ও মধ্য এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। সংখ্যার বিবেচনায় বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম। প্রাচীন ভারতে এ ধর্মের ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভের বহু কারণ ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষাবলী ছিল সহজ- সরল ।এ ধর্মে কোন জটিল দার্শনিকতত্ত্ব নেই এবং এ ধর্ম পালন করতে পুরোহিত বা অর্থেরও প্রয়োজন হয় না।ফলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ব্যয়বহুল জটিল অনুষ্ঠানাদি নিয়ে ক্লান্ত সাধারণ মানুষ বৌদ্ধধর্মকে স্বাগত জানিয়েছিল।
গৌতম বুদ্ধের শিক্ষাবলীই যে শুধু সহজ-সরল ছিল তাই নয়- এগুলো প্রচারিত হয়েছিল জনগণের পরিচিত ও সহজবোধ্য পালি ভাষায়। গৌতম বুদ্ধ নিজেও তাঁর ভক্তদের কাছে পালি ভাষায় ধর্মের বাণী প্রচার করতেন। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এটা বিরক্তিকর বৈদিক সংস্কৃতের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।
বৌদ্ধ ধর্মে জাতিভেদ বা বর্ণপ্রথা ছিল না। বহু বর্ণে বিভক্ত হিন্দু সমাজে সকলেই সমান সুযোগ-সুবিধার অধিকারী ছিলনা। ব্রাহ্মণরা সমাজে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করলে তা অন্যদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করে । ক্ষত্রিয়রা শাসন ও দেশরক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতো। বৈশ্যরা ছিল বিত্তশালী। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা ছিল প্রচুর অর্থের অধিকারী। কিন্তু সঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক মর্যাদা না থাকায় এ দুই বর্ণের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ব্রাহ্মণদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল।শূদ্রদের অবস্থা ছিল নিতান্তই করুণ। কাজেই বর্ণহীন বৌদ্ধ সমাজে সকলেরই সমান সুযোগ-সুবিধা থাকায় সবাই এ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।
হিন্দু ধর্মের পূজা-অর্চনা এবং যাগ-যজ্ঞ ছিল জটিল ও ব্যয়বহুল। পূজা ও যজ্ঞে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হতো, যা ছিল সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম পালন করতে অর্থের প্রয়োজন হতো না। অর্থ ব্যয় না করেও একজন মানুষ ধার্মিক বা সৎ জীবন-যাপন করতে পারতো।
সংযমী জীবন-যাপনের মাধ্যমে মানুষ নির্বাণ লাভ করতে পারতো এবং এজন্য কোন পুরোহিতেরও প্রয়োজন হতো না। কাজেই সাধারণ মানুষকে বৌদ্ধ ধর্ম সহজেই আকর্ষণ করেছিল। তা ছাড়া পশুবলির প্রতি সাধারণ মানুষ ছিল বীতশ্রদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্মে পশুবলি না থাকায় জনসাধারণ এ ধর্মের প্রতি উৎসাহী হয়ে পড়ে। গৌতম বুদ্ধের ব্যক্তিত্বও বৌদ্ধ ধর্মের জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। বর্ষাকালের চার মাস ছাড়া গৌতম বুদ্ধ সারা বছরই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে তাঁর ধর্মের বাণী প্রচার করতেন।
আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও সুবক্তা গৌতম বুদ্ধ তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে জনসাধারণকে মুগ্ধ করতে পারতেন। এ ব্যাপারে তাঁকে মার্টিন লুথারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে ।
বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারে বৌদ্ধ সংঘেরও বিরাট অবদান ছিল।
ধর্ম প্রচারে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুনীরা সমন্বিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। ধর্ম প্রচারই ছিল তাদের জীবনের লক্ষ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁরা ধর্ম প্রচারের কাজে ব্যস্ত থাকতো। সংসার বা অর্থ সম্পর্কে তাদের কোন চিন্তা না থাকায় তাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের ধর্ম প্রচারের কাজ করতে পারত। তা ছাড়া বৌদ্ধ ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের সহজ-সরল ও সৎ জীবন যাত্রাও অনেককে মুগ্ধ করে; এ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল। বৌদ্ধবিহারগুলো ক্রমে হয়ে ওঠে শিক্ষাকেন্দ্র এবং জ্ঞান-পিপাসু বহু ব্যক্তি এসব বিহারে জ্ঞানচর্চার জন্য আসত। সে কালে শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে নালন্দা বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিল।
চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এ শিক্ষাকেন্দ্রে পাঁচ বছর জ্ঞানচর্চা করেছিলেন। অধ্যাপক রোমিলা থাপার বলেছেন যে, বৌদ্ধ বিহারগুলো শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছিল। সকল শ্রেণীর নারী-পুরুষই ভিক্ষুনী বা ভিক্ষু হতে পারত বলে শিক্ষা শুধুমাত্র সমাজের উঁচু শ্রেণীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভও বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ও জনপ্রিয়তা লাভের একটি কারণ। অশোক, কণিষ্ক ও হর্ষবর্ধনের মত শক্তিশালী রাজারা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।
শুরুতে বৌদ্ধ ধর্মের তেমন কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্ম ছিলনা । তখনও খ্রিস্টধর্ম বা ইসলামের উদ্ভব হয়নি। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুপস্থিতি বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারের সহায়ক হয়েছিল।
বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াবার ক্ষমতাও বৌদ্ধ ধর্মের সাফল্যের একটি কারণ। গৌতম বুদ্ধ নিজেই ছোটখাটো বিধানগুলোর ব্যাপারে বৌদ্ধ সংঘগুলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছিলেন।ফলে পরবর্তীকালে পরিবর্তিত সময় ও পরিস্থিতিতে কিছু কিছু পরিবর্তন বৌদ্ধ ধর্মে আনা হয়েছিল। মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব থেকেই এটা প্রমাণিত হয়। একজন বৌদ্ধ কেবলমাত্র বুদ্ধে বিশ্বাসী হতে পারত না বহু বোধিসত্ত্বেও বিশ্বাস স্থাপন করতে পারতো। মূর্তি পূজারী হয়ে বা মাংসভক্ষণকারী হয়েও সে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হতে পারত। এ সমস্ত কারণে প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধধর্ম জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।
জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণ
বৌদ্ধ ধর্ম বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম। বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রচলিত থাকলেও ভারতে এ ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা বর্তমানে অত্যন্ত কম।ভারতে এ ধর্মের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার বা অবনতির অনেকগুলো কারণ ছিল।
বৌদ্ধ সংঘের দুর্বলতা এ ধর্মের অবনতির জন্য দায়ী ছিল। কালক্রমে সংঘগুলো ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। বৌদ্ধ বিহারগুলোতে অবস্থানকারী ভিক্ষু-ভিক্ষুণীরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ব্যাঘাত ঘটে।
পরবর্তীকালে হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণও বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গুপ্ত সম্রাটরা ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং পরধর্মসহিষ্ণু হলেও তাঁরা হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ফলে পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে বৌদ্ধধর্ম কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মের অহিংস নীতি জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দী থেকে উত্তর ভারতের অনেক অঞ্চলই রাজপুত রাজাদের শাসনাধীন ছিল। তাঁরা ছিলেন যুদ্ধপ্রিয়। বৌদ্ধ ধর্মের অহিংসার বাণী তাদের মনে কোন সাড়া জাগায়নি। তারা মনে করতেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে বিপর্যয়ের জন্য বৌদ্ধ ধর্মের অহিংস নীতিই দায়ী ছিল। এজন্য তারা হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ফলে উত্তর ভারত থেকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে একই কারণে দক্ষিণ ভারতেও বৌদ্ধ ধর্মের অবনতি ঘটে।
গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর এক শতাব্দীর মধ্যেই বৌদ্ধরা মহাযান ও হীনযান দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কালক্রমে এরা আরও অনেক উপ-শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়লে বৌদ্ধদের ঐক্য ও সংহতি নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে জনগণ এ ধর্মের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।
বৌদ্ধসংঘে ভিক্ষুণীদের প্রবেশাধিকার ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কিন্তু এটা বৌদ্ধ ধর্মের অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশায় সংঘের শৃক্মখলা ও পবিত্রতা ছিল প্রশ্নাতীত।কিন্তু ক্রমে সংঘগুলোতে দুর্নীতি প্রবেশ করে।ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের চিরকৌমার্য পালন করার বিধি থাকলেও তারা সংসার জীবন-যাপন করতে শুরু করে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে এ ধর্মের আকর্ষণ কমে যায়।
হিন্দু ধর্মের আত্মীকরণ শক্তিও বৌদ্ধ ধর্মের অবনতির অন্যতম কারণ। হিন্দুরা গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতাররূপে পূজা করতে শুরু করে। গৌতম বুদ্ধের মূর্তিপূজা, মন্দিরে বুদ্ধমূর্তি প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির ফলে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের পার্থক্য কমে আসে। মহাযান শাস্ত্রগুলো সংস্কৃত ভাষায় রচিত হলে হিন্দু শাস্ত্রের সঙ্গে এগুলোর মিলনের পথ রচিত হয়। হিন্দুধর্ম সংস্কারকরা বৌদ্ধ দেব-দেবীকে হিন্দু দেব-দেবীর বিকল্প বলে প্রচার করেন। বৌদ্ধ তারাকে দেবী দুর্গার অবতার হিসাবে কল্পনা করা হয়। সেন যুগের কবি জয়দেব গৌতম বুদ্ধকে কৃষ্ণের অবতাররূপে বর্ণনা করেন। হিন্দু ধর্ম গুরু ও পন্ডিতগণ বৌদ্ধ ধর্মকে হিন্দু ধর্মের শাখা হিসাবে গণ্য করলে বৌদ্ধ ধর্মের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়ে যায়।
কালক্রমে বৌদ্ধ ধর্মে তন্ত্র-মন্ত্রের প্রাধান্য বেড়ে যায়। ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের মধ্যে নীতিবোধ ও তপস্যার চেয়ে তান্ত্রিক ও অলৌকিক শক্তি প্রকাশের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। দেব-দেবী ও বোধিসত্ত্বের পূজা এবং উচ্চারণ প্রাধান্য লাভ করে এবং অষ্টমার্গের সাধনার গুরুত্ব লোপ পায়। ফলে জনমনে বৌদ্ধ ধর্মের আবেদনও লোপ পায়।
ঐতিহাসিকদের মধ্যে কেউ কেউ মুসলমানদের অত্যাচারকে বৌদ্ধ ধর্মের অবনতির জন্য দায়ী করেছেন। কিন্তু বৌদ্ধদের ওপর মুসলমানদের অত্যাচারের কোন প্রমাণ ইতিহাসে নেই। তাঁরা হিন্দুদের ওপর মুসলমানদের অত্যাচারেরও অভিযোগ করেছেন।কিন্তু হিন্দু ধর্মতো আজও টিকে আছে। প্রকৃতপক্ষে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বৌদ্ধধর্মকে ক্ষয়িষ্ণু করে ফেলেছিল এবং শেষ পর্যন্ত হিন্দু ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মকে আত্মীভূত করে ফেলে।
বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্মের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য
বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উৎপত্তি প্রায় একই সময়ে এবং পাশাপাশি অঞ্চলে ঘটেছিল। এ দুটি ধর্মের মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য দেখা যায় :
উভয় ধর্মের প্রবর্তকই ছিলেন ক্ষত্রিয় বংশোদ্ভূত।
উভয় ধর্মেরই জন্ম হয়েছিল হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ধর্মরূপে। হিন্দু ধর্মের যাগ-যজ্ঞ এবং আড়ম্বরপূর্ণ পূজা সম্পর্কে হতাশাবোধ থেকে এ দুটি ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল।
এ দুটি ধর্মের কোনটিই বেদকে ঐশ্বরিক গ্রন্থরূপে এবং ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে না।
উভয় ধর্মই দার্শনিক তত্ত্বের চেয়ে ভক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
উভয় ধর্মই অহিংসবাদী। প্রাণী হত্যা উভয়ের কাছেই মহাপাপ বলে বিবেচিত।
দুটি ধর্মই শ্রেণীভেদ প্রথার বিরোধী। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষেরই এ দুটি ধর্মে যোগদানের অধিকার ছিল।
হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা করলেও উভয় ধর্মেই হিন্দু ধর্মের কিছু কিছু প্রভাব দেখা যায়। যেমন উভয় ধর্মই কর্মফল ও পুনর্জন্মে বিশ্বাসী।
কর্মফল ও পুনর্জন্মের দুঃখ থেকে মুক্তি লাভই হচ্ছে উভয় ধর্মের লক্ষ।
উভয় ধর্মই জনগণের ভাষা অর্থাৎ পালি ভাষায় প্রচারিত হয়েছিল।
উভয় ধর্মেই মঠ-জীবনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
দুটি ধর্মের কোনটিই প্রচলিত অর্থে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিশ্বাস করেনা। অবশ্য জৈন ধর্ম সরাসরি ঈশ্বরকে
অস্বীকার করলেও বৌদ্ধ ধর্ম এ ব্যাপারে নীরব
উভয় ধর্মই প্রধানত বৈশ্য, শূদ্রদের আকর্ষণ করেছিল।
উভয় ধর্মই প্রধানত দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত। বৌদ্ধরা মহাযান ও হীনযান সম্প্রদায়ে বিভক্ত। জৈনরা বিভক্ত দিগম্বর ও শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ে ।
সমসাময়িক এ দুটি ধর্মের মধ্যে কিছু কিছু সাদৃশ্য থাকলেও এদের মধ্যে বেশ কিছু বৈশাদৃশ্যও দেখা যায় :
গৌতম বুদ্ধ ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক। কিন্তু জৈন ধর্ম প্রচারিত হয়েছিল ২৪ জন তীর্থঙ্করের মাধ্যমে এর প্রবর্তক সম্পর্কে কিছু জানা যায় না । মহাবীরকে জৈন ধর্মের প্রবর্তকরূপে বিবেচনা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন এ ধর্মের শেষ তীর্থঙ্কর। –
দিগম্বর সম্প্রদায়ের জৈনরা নগ্ন থাকার পক্ষপাতী। কিন্তু বৌদ্ধদের মধ্যে এ ধরনের কোন রীতি নেই। উভয় ধর্মই অহিংসবাদী হলেও জীবহত্যার ব্যাপারে জৈনরা চরমপন্থী। কোন ভাবেই যেন জীবহত্যা না হয় সে ব্যাপারে জৈনরা অত্যন্ত সতর্ক।
জৈন ধর্ম কখনই ভারতের বাইরে প্রসার লাভ করেনি। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং আজও টিকে আছে। অন্যদিকে ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম লুপ্তপ্রায় হলেও জৈন ধর্ম কোনও দিনই ভারতে বিলুপ্তির সম্মুখীন হয় নি।
জৈন ধর্মে আত্মার চিন্তা অত্যন্ত ব্যাপক। তারা জড় পদার্থের আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী। জৈনদের এই সর্বপ্রাণবাদে বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে না ।
জৈনরা কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের পক্ষপাতি।কিন্তু গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের মধ্যপথ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জৈন ধর্মে মুক্তির উপায় হচ্ছে কৃচ্ছ্রসাধন, তপস্যা ও উপবাসে প্রাণত্যাগ। বৌদ্ধ ধর্মে নির্বাণ লাভের উপায় হচ্ছে অষ্টমার্গ অনুসরণ করা।

সারসংক্ষেপ
সমসাময়িক ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক উপাদানের অভাবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত।তিনি ৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী গ্রামে শাক্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব নাম ছিল সিদ্ধার্থ। ২৯ বছর বয়সে তিনি সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। উরুবিল্ব নামক স্থানে একটি পিপল গাছের নিচে ৪৯ দিন সাধনার পর তিনি দিব্যজ্ঞান বা বোধি লাভ করে বুদ্ধ বলে পরিচিত হন।সারনাথে তিনি প্রথম তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন। তিনি সুদীর্ঘ ৪৫ বছর অক্লান্তভাবে ধর্মপ্রচার করেন। অতঃপর ৮০ বছর বয়সে গোরখপুর জেলার কুশিনগরে ৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর ধর্মের মূল লক্ষ ছিল মানুষকে দুঃখের হাত থেকে রক্ষা করা।দুঃখ থেকে পরিত্রাণের জন্য তিনি আটটি পথ বা মার্গের কথা বলেছেন। তিনি মধ্যপন্থা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বৌদ্ধ ধর্মের অহিংসবাদ, সহজ-সরল শিক্ষাবলী সহজেই সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। কেননা, হিন্দু ধর্মের ব্যয়বহুল, জটিল পূজা-অৰ্চনা, যাগযজ্ঞ এবং জাতিভেদ প্রথা সাধারণ মানুষকে ক্লান্ত-অসন্তুষ্ট করে তুলেছিল। সম্রাট অশোকের সময়কালে গুরুতর মতপার্থক্যের দরুন বৌদ্ধরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েপড়ে- হীনযান ও মহাযানপন্থী ।
ভারতের এক কোণে উদ্ভব হলেও কালক্রমে বৌদ্ধ ধর্ম সমস্ত ভারত এবং উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে শ্রীলংকা, চীন, মায়ানমার, তিব্বত, জাভা, সুমাত্রা, জাপান, থাইল্যান্ড ও মধ্যএশিয়ায় প্রসার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে জনমনে এ ধর্মের আবেদন কমে যায়। তা সত্ত্বেও, সংখ্যার বিবেচনায় এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম।
