আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় কুষাণ সাম্রাজ্য : কণিষ্ক – যা প্রাচীন ভারতের সাম্রাজ্য এর অন্তর্ভুক্ত।
কুষাণ সাম্রাজ্য : কণিষ্ক

যে সকল বিদেশী জাতি ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল তাদের মধ্যে কুষাণরা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কুষাণ বংশ এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। অন্যান্য বিদেশী জাতির তুলনায় কুষাণদের ইতিহাসের উপাদানের পরিমাণ বেশি। সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলো এক্ষেত্রে খুবই সহায়ক। কুষাণ বংশের ইতিহাস রচনার জন্য চীনা ঐতিহাসিকদের রচনা থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। চীনা উৎসে পাওয়া তথ্য ও সন, তারিখগুলো নির্ভরযোগ্য এবং মূল্যবান।
চীনা গ্রন্থগুলোর মধ্যে পান-কু রচিত প্রথম হান বংশের ইতিহাস, ফ্যান-ই রচিত পরবর্তী হান বংশের ইতিহাস, মা-তোয়ান লিন রচিত বিশ্বকোষ এবং সু-মা-কিয়েন সংকলিত সি-চি (ঐতিহাসিক দলিল) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কুষাণ রাজাদের প্রথম দিকের ইতিহাস, কুষাণদের আদিপরিচয়, ভারতে কুষাণ সাম্রাজ্যের বিস্তার ইত্যাদি বিষয়ে চীনা উৎসগুলোতে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। ভারতীয় সাহিত্যিক উৎসগুলোর মধ্যে কল্হণের রাজতরঙ্গিনী ও অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত থেকে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায় ।
কুষাণ যুগের ইতিহাস রচনার জন্য বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানও পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলোর মধ্যে লেখ বা লিপি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এগুলোর মধ্যে পাঞ্জতির লিপি, পেশোয়ার পেটিকা লিপি, মথুরা লিপি ইত্যাদি প্রধান। এগুলোর সাহায্যে কণিষ্কের সিংহাসনারোহণের তারিখ ও রাজ্যের সীমা নির্ধারণ করা যায়। কুষাণ বংশের ইতিহাস রচনায় কুষাণ মুদ্রাগুলোও মূল্যবান। ড. রায়চৌধুরীর মতে কুষাণ যুগের কালপঞ্জি তৈরিতে কুষাণ মুদ্রা অত্যন্ত সহায়ক। তাছাড়া কুষাণদের মুদ্রা থেকে তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে।
কুষাণ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি সম্পর্কেও কুষাণ মুদ্ৰা থেকে ধারণা লাভ করা যায়। কুষাণ যুগের স্তুপ, বিহার, প্রাসাদ, ইত্যাদির ধ্বংসাবশেষ থেকে সে যুগের স্থাপত্যশিল্প, ধর্মীয় বিশ্বাস ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। চীনা ঐতিহাসিক সু-মা-কিয়েন ও পান-কুর বিবরণ থেকে জানা যায় যে, কুষাণরা ছিল ইউ-চি জাতির একটি শাখা। ইউ-চি জাতি আদিতে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে পশ্চিম চীনের কান-সু প্রদেশের বাস করতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউ-চিরা হিউং-নু (হুণ) নামে এক উপজাতি দ্বারা বিতাড়িত হয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা করে।
এ সময় তাঁরা গোবি মরুভূমির উত্তরে চলে আসে এবং উ-সুন নামে এক উপজাতিকে পরাজিত করে আরো পশ্চিম দিকে এগিয়ে যায় এবং শিরদরিয়া নদীর উপত্যকায় উপস্থিত হয়। তাঁরা সেখান থেকে শকদের বিতাড়িত করে। শিরদরিয়া উপত্যকায় ইউ-চিরা বেশিদিন বসবাস করতে পারেনি। হুণদের সাহায্য নিয়ে উ-সুন উপজাতি তাঁদের এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। ইউ-চিরা তখন আরো পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আমুদরিয়া নদীর তীরে এসে সেখান থেকেও শকদের বিতাড়িত করে। পরে তাঁরা ব্যান্ড্রিয়া দখল করে নেয়।
ব্যান্ড্রিয়ায় বসবাসকালে ইউ-চিরা যাযাবর জীবন ত্যাগ করে এবং পাঁচটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এদেরই এক শাখা ছিল কুষাণ। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দ নাগাদ কুষাণ শাখার নেতা কুজলা কদফিসেস ইউ-চিদের পাঁচটি শাখাকে নিজের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি কাবুল, পেশোয়ার, কাশ্মির অধিকার করেন। কুজলা কদফিসেসের পর তাঁর পুত্র বিম কদফিসেস সিংহাসনে বসেন।
বিম কদফিসেস তাঁর পিতার রাজ্য ব্যাট্রিয়া সহ উত্তর-পশ্চিম ভারত ও কাশ্মির লাভ করেন। পরে তিনি তক্ষশীলা ও পাঞ্জাব দখল করেন। বিম কদফিসেসের মুদ্রা থেকে জানা যায় যে তিনি কান্দাহার ও নিম্ন সিন্ধু অঞ্চল অধিকার করেছিলেন। বিম কদফিসেসের সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্থান থেকে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তাঁর মুদ্রায় ‘মহেশ্বর’ নাম এবং শিবমূর্তি, ষাঁড় ও ত্রিশূল চিহ্ন উৎকীর্ণ দেখা যায় যা থেকে মনে করা যায় যে, বিম কদফিসেস শৈব ধর্মের অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর আমলে ভারতের সঙ্গে চীন ও রোমান সাম্রাজ্যের ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। কুষাণ সাম্রাজ্য থেকে মশলা, রেশম, মণি-মুক্তা, হাতির দাঁত, চন্দন ইত্যাদি রপ্তানি হতো। বিনিময়ে রোম থেকে আসতো প্রচুর সোনা। খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বিম কদফিসেস যুদ্ধে চীনা সেনাপতি প্যান-চাওর কাছে পরাজিত হন এবং চীন সম্রাটকে বাৎসরিক করদানে বাধ্য হন ।
বিম কদফিসেসের মুত্যুর পর কণিষ্ক সিংহাসনে বসেন। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, কণিষ্ক কদফিসেস রাজাদের পূর্বেই সিংহাসনে বসেছিলেন। বিম কদফিসেসের সঙ্গে কণিষ্কের সম্পর্ক কি ছিল তাও সঠিকভাবে জানা যায় না। কণিষ্ক ছিলেন কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। তিনি কদফিসেস রাজাদের পরেই সিংহাসনে বসেছিলেন বলে অধিকাংশ পন্ডিত মনে করেন। কণিষ্কের সিংহাসনারোহণের তারিখ নিয়েও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
ড. ফ্লিট মনে করেন যে, কণিষ্ক ৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহাসনে বসেছিলেন এবং একটি সম্বতের প্রচলন করেছিলেন যা পরবর্তীকালে বিক্রম সম্বৎ নামে পরিচিতি লাভ করে। তাঁর এ মত গ্রহণ করলে বলতে হয় যে কণিষ্ক কদফিসেস রাজাদের আগে রাজত্ব করেছিলেন। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য থেকে দেখা যায় যে, কণিষ্ক বিম কদফিসেসের পরে রাজত্ব করেছিলেন। কণিষ্ক সারনাথ অধিকার করেছিলেন। কদফিসেস কণিষ্কের পরবর্তী রাজা হলে তিনি শুধু গান্ধার অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলেন কেন? তক্ষশীলায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে কণিষ্ক গোষ্ঠীর রাজাদের মুদ্রা মাটির ওপরের স্তরে এবং কদফিসেস রাজাদের মুদ্রা মাটির নীচের স্তরে পাওয়া গেছে।
এ থেকে বলা যায় যে, কদফিসেস রাজাদের পরে কণিষ্ক সিংহাসনের বসেছিলেন। কণিষ্কের মুদ্রায় সাসানীয় প্রভাবও দেখা যায় যার ফলে তাঁর সিংহাসনারোহণকে ৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, সাসানীয়রা ছিলেন অনেক পরবর্তীকালের। অ্যালানের মতে, কণিষ্কের স্বর্ণমুদ্রা রোমান মুদ্রা দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
সুতরাং কণিষ্কের রাজত্বকালকে রোম সম্রাট টিটাস (৭৭-৮১ খ্রি:) এবং ট্রাজানের (৯৮-১১৭ খ্রিঃ) আগে স্থান দেওয়া অনুচিত বলে মনে হয়। শিলালিপি, মুদ্রা এবং হিউয়েন সাং- এর সাক্ষ্য থেকে দেখা যায় যে, গান্ধার ছিল কণিষ্কের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু চীনা সাক্ষ্য অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে গান্ধার ছিল শক শাসনাধীন। কদফিসেস রাজাদের মুদ্রায় শক মুদ্রার প্রভাব দেখা যায়। ফলে মনে করা যায় যে ঐ অঞ্চলে শক শাসনের পরেই তাঁরা শাসন করেছিলেন।
মার্শাল, স্টেনকোনো, স্মিথ প্রমুখ পন্ডিত মনে করেন যে, কণিষ্ক ১২৫-১২৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁর রাজত্ব শুরু করেছিলেন। ডঃ রায়চৌধুরী এ মতের বিরুদ্ধে দুটি জোরালো আপত্তি তুলেছেন। প্রথমত, সুইবিহার শিলালিপি থেকে জানা যায় যে নিম্নসিন্ধু উপত্যকার কিছু অংশ কণিষ্কের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অন্যদিকে শক মহাক্ষত্রপ রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালিপি থেকে জানা যায় যে নিম্ন সিন্ধু উপত্যকা তাঁর শাসনাধীন ছিল । রুদ্রদামন ছিলেন স্বাধীন নরপতি। কুষাণদের প্রতি তাঁর আনুগত্যের কোনো উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায় না। রুদ্রদামনের রাজত্বকাল (১৩০-১৫০ খ্রি:) নিশ্চিতভাবে জানা যায়। কাজেই কণিষ্কের রাজত্বকাল খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকের তৃতীয় দশকে নির্ধারণ করেেল একই অঞ্চলে একই সময়ে দুজন রাজার শাসন দেখা যায়- যা নিশ্চিতভাবেই অসম্ভব। রুদ্রদামনের সময়কাল নিশ্চিত হওয়ায় মনে করা যায় যে, কণিষ্ক ১২৫-১২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সিংহাসনে বসেননি ।
দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ভারতীয় শিলালিপিতে দ্বিতীয় কদফিসেসের পরবর্তী কুষাণ সম্রাটদের তারিখ সম্বলিত নাম পাওয়া গেছে যেমন কণিষ্ক (১-২৩), বসিষ্ক (২০-২৮), হুবিষ্ক (২৬-৬০), দ্বিতীয় কণিষ্ক ( ৪১) এবং বাসুদেব (৬৭-৯৮)। এই তারিখগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে কণিষ্ক একটা অব্দের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে উত্তর-পশ্চিম ভারতে কোনো অব্দ প্রচলিত হয়েছিল বলে জানা যায় না।
ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন যে, কণিষ্ক যে অব্দের প্রচলন করেছিলেন সেটি ছিল ২৪৮ ২৪৯ খ্রিস্টাব্দের ত্রৈকুটক-কলচুরি-চেদি অব্দ এবং তিনি ঐ সময়ে সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু তাঁর এমতও গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি। কণিষ্কের সিংহাসনারোহণের প্রায় একশ’ বছর পরে প্রথম বাসুদেবের রাজত্বকাল শেষ হয়েছিল।
একাধিক শিলালিপি থেকে জানা যায় যে মথুরা বাসুদেবের শাসনাধীন ছিল। তাছাড়া সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে গুপ্তবংশের আগে মথুরা নাগবংশের অধিকারভুক্ত ছিল। অর্থাৎ খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে এ অঞ্চল ছিল নাগদের শাসনাধীন। কাজেই বাসুদেবের রাজত্বকাল খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যভাগে শেষ হয়েছিল একথা বলা যায় না। সুতরাং কণিষ্কের রাজত্বকাল খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে শুরু হয়েছিল একথাও গ্রহণযোগ্য নয় ।
দীর্ঘকাল আগে ফার্গুসন মত প্রকাশ করেছিলেন যে, কণিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনের বসেন এবং এ বছরটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তাঁর অব্দ বা সম্বৎ চালু করেন। পরবর্তীকালে ওল্ডেনবার্গ, টমসন, ড. রায় চৌধুরী, ড. ডি.সি. সরকার, ড. বি.এন. মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি পন্ডিত এ মত সমর্থন করেন । কণিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেছিলেন এবং শকাব্দের প্রবর্তন করেছিলেন এ মতের বিরুদ্ধে অধ্যাপক দুব্রেইল কয়েকটি আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু ড. রায়চৌধুরী যুক্তি দিয়ে সফলভাবে যেসব আপত্তিগুলো খন্ডন করেছেন।
দুব্রেইল বলছেন যে আমরা যদি স্বীকার করি যে প্রথম কদফিসেস ৫০ খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব করছিলেন এবং কণিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব শুরু করেন, তবে প্রথম কদফিসেসের রাজত্বকালের অবসান এবং দ্বিতীয় কদফিসেসের সমগ্র রাজত্বকালের জন্য মাত্র ২৮ বছর সময় পাওয়া যায় যা তাঁর মতে খুবই সংক্ষিপ্ত। তবে এ সময়কাল খুব সংক্ষিপ্ত মনে হবেনা যদি আমরা মনে রাখি যে প্রথম কদফিসেস ৮০ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন এবং ফলে দ্বিতীয় কদফিসেস বৃদ্ধ বয়সে রাজা হয়েছিলেন এবং তাঁর রাজত্বকাল খুব দীর্ঘ হওয়া স্বাভাবিক নয়। দ্বিতীয়ত, দুব্রেইল তক্ষশীলায় মার্শাল আবিষ্কৃত ১৩৬ সম্বৎসরের দলিলের উল্লেখ করেছেন ।
তিনি বলেছেন যে বিক্রম সম্বতের ১৩৬ সালকে খ্রিস্টাব্দে রূপান্তরিত করলে দাঁড়ায় (১৩৬-৫৮) ৭৮ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর মতে, এ দলিলে যে রাজার উল্লেখ করা হয়েছে তিনি ছিলেন প্রথম কদফিসেস, কণিষ্ক নন। এই দলিলে রাজার নামোল্লেখ না করে দেবপুত্র অভিধা ব্যবহার করায় দুব্রেইল মনে করেন যে, এই অভিধা দিয়ে কুষাণ রাজা প্রথম কদফিসেসকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ড. রায়চৌধুরী বলেছেন যে, দেবপুত্র অভিধাটি কণিষ্ক গোষ্ঠীর রাজাদের বৈশিষ্ট্য ছিল, কদফিসেস গোষ্ঠীর নয়।
অনেকে মনে করেন যে, দেবপুত্র অভিধা প্রথম কদফিসেস প্রথমে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু এতে ফার্গুসনের মত খন্ডিত হয় না। ড. রায়চৌধুরী যেমন বলেছেন যে, রাজার ব্যক্তিগত নামোল্লেখ না থাকার কারণে এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে প্রথম কুষাণ রাজাকেই বোঝানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি গুপ্ত শিলালিপিতে কুমারগুপ্ত এবং বুধগুপ্তের মত পরবর্তী গুপ্ত সম্রাটদের শুধুমাত্র ‘গুপ্ত নৃপ’ রূপে উল্লেখিত হওয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।
কণিষ্ক প্রবর্তিত এই অব্দটি পরবর্তীকালে শকাব্দ নামে পরিচিত হয়। কোনো কোনো পন্ডিত এই মতের বিরোধিতা করে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে কণিষ্কই যদি এই অব্দের প্রবর্তক হয়ে থাকেন তবে এটা কণিষ্কাব্দ বা কুষাণাব্দ হিসাবে পরিচিত না হয়ে ‘শকাব্দ’ নামে পরিচিতি লাভ করে কেন? উল্লেখ করা যেতে পারে যে কণিষ্কের সময় এই অব্দটি শকাব্দ নামে পরিচিত ছিল না।
পরবর্তীকালে খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে বিভিন্ন শিলালিপিতে এটাকে শকাব্দ আখ্যা দেওয়া হয়। র্যাপসন বলেছেন যে, কণিষ্কের প্রবর্তিত অব্দটি পশ্চিম ভারতের শক ক্ষত্রপরা দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহার করেন। কুষাণদের পতনের পরেও তাঁরা এই অব্দটির প্রচলন অব্যাহত রাখেন । শকদের দ্বারা দীর্ঘকাল ব্যবহৃত হওয়ার কারণেই এই অব্দের নাম হয় শকাব্দ ।
সুতরাং ওপরের আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি যে কণিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেছিলেন এবং তিনিই শকাব্দের প্রবর্তক। কণিষ্ক ছিলেন কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট। কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠত্ব এবং ভারতের ইতিহাসে কুষাণ বংশের গুরুত্ব তাঁর কার্যকলাপের দ্বারাই অর্জিত হয়েছিল। কণিষ্ক উত্তরাধিকারীসূত্রে দ্বিতীয় কদফিসেসের বিশাল সাম্রাজ্য পেয়েছিলেন।
তিনি নিজেও বহু রাজ্যজয় করে এর আরো বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন। কল্হণের রাজতরঙ্গিনী এবং বৌদ্ধ কাহিনী-কিংবদন্তী থেকে জানা যায় যে কণিষ্ক কাশ্মির জয় করেছিলেন। কাশ্মিরে তিনি বহু সৌধ, স্তুপ ইত্যাদি নির্মাণ করেছিলেন এবং কণিষ্কপুর নামে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শহরটি ধ্বংস হয়ে গেলেও সেখানে কণিষ্কপুর নামে একটি গ্রাম আজও তাঁর স্মৃতি বহন করছে।
কিংবদন্তী অনুসারে কণিষ্ক ভারতের অভ্যন্তরে হানা দিয়েছিলেন এবং পাটলিপুত্র আক্রমণ করেছিলেন। বৌদ্ধ কিংবদন্তী থেকে জানা যায় যে পাটলিপুত্র আক্রমণকালে বিখ্যাত বৌদ্ধ দার্শনিক অশ্বঘোষ তাঁর হাতে বন্দী হন এবং কণিষ্ক তাঁকে তাঁর রাজধানীতে নিয়ে আসেন। বৌদ্ধ পন্ডিত অশ্বঘোষ যে কণিষ্কের রাজসভা অলঙ্কৃত করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কণিষ্কের রাজসভায় অশ্বঘোষের উপস্থিতি থেকে কণিষ্কের মগধের কিয়দংশ জয়ের সমর্থন পাওয়া যায়। মুদ্রার সাক্ষ্য থেকেও কণিষ্কের পূর্ব ভারত জয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গোরখপুর ও গাজীপুরে কণিষ্কের বহু মুদ্রা পাওয়া গেছে। এই অঞ্চল তাঁর অধিকারভুক্ত না থাকলে এখানে কণিষ্কের এত মুদ্রা পাওয়া যেত না।
কণিষ্ক উজ্জয়িনীর শক ক্ষত্রপদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি সম্ভবত শক ক্ষত্রপ চস্তনকে পরাজিত করেছিলেন। এ যুদ্ধের ফলে কণিষ্ক শকদের কাছ থেকে মালবের কিছু অংশ লাভ করেছিলেন এবং শকরা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছিল।ড. স্মিথের মতে, কণিষ্ক পহ্লবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও সাফল্য লাভ করেছিলেন।
কণিষ্ক ভারতের বাইরেও তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। কণিষ্ক বর্তমান সোভিয়েত তুর্কিস্তানের কিছু অংশ, যথা কাশগড়, ইয়ারখন্দ এবং খোটান জয় করেছিলেন। সে আমলে এ স্থানগুলো চীন সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। দ্বিতীয় কদফিসেস প্যান চাওর হাতে পরাজিত হয়ে চীন সম্রাটকে কর দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কণিষ্ক চীন সাম্রাজ্যভুক্ত এ সব অঞ্চল দখল করে পূর্বসুরীর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। তিনি চীন সম্রাটের এক করদরাজ্যের রাজপুত্রকে প্রতিভূস্বরূপ নিজ রাজসভায় নিয়ে এসেছিলেন। হিউয়েন সাং এর বিবরণে এর উল্লেখ রয়েছে।
ভারতের এক বিশাল এলাকা জুড়ে কণিষ্ক তাঁর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পূর্ব ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য সারনাথ, বারাণসী, অযোধ্যা ও মথুরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শিলালিপি থেকে এই অঞ্চলে কণিষ্কের অধিকার প্রমাণিত হয়। আরো পূর্বদিকে পাটলিপুত্র, পশ্চিম বাংলা, এমনকি উড়িষ্যা পর্যন্ত তাঁর রাজ্য বিস্তৃত ছিল বলে কোনো কোনো পন্ডিত মনে করেন।
তিনি বৌদ্ধ পন্ডিত অশ্বঘোষকে পাটলিপুত্র থেকে নিজ দরবারে নিয়ে গিয়েছিলেন। কুষাণ মুদ্রা তমলুক, বগুড়া, মুর্শিদাবাদ ও মালদায় পাওয়া গেছে যা থেকে অনুমান করা যায় যে পশ্চিম ও উত্তর বাংলার কিছু অংশ তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। পশ্চিম ভারতের মালব, সৌরাষ্ট্র প্রভৃতি অঞ্চলের শক ক্ষত্রপরা কণিষ্কের আনুগত্য স্বীকার করেছিল।
মধ্যভারত কণিষ্কে সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। এখানে কণিষ্কের উত্তরাধিকারী বসিষ্কের লিপি পাওয়া গেছে। কাশ্মির যে কণিষ্কের সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল তা কল্হণের বর্ণনা থেকে জানা যায়। পাঞ্জাব, সিন্ধু ও গান্ধার তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল- পেশোয়ার লিপি, সুইবিহার লিপি ইত্যাদি থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কাজেই বলা যায় যে ভারতে কণিষ্কের সাম্রাজ্য উত্তর-পশ্চিমে পেশোয়ার থেকে পূর্বে পশ্চিম বাংলা এবং উত্তরে কাশ্মির থেকে দক্ষিণে মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ ছাড়া ভারতের বাইরে বর্তমান সোভিয়েত তুর্কিস্তানের কিছু অংশ এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশও তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল।
কণিষ্কের রাজধানী ছিল পুরুষপুর বা বর্তমান পেশোয়ার। এখান থেকেই তিনি বিভিন্ন রাজকর্মচারীদের সাহায্যে তাঁর সাম্রাজ্য শাসন করতেন। কণিষ্ক নিজেকে ‘দেবপুত্র’ বলে অভিহিত করেছেন যা থেকে মনে করা যায় তিনি রাজার দৈব অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে তিনি প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের অনেক ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন। শাসনকাজে তাঁকে সাহায্য করার জন্য তাঁর একটি মন্ত্রী পরিষদ ছিল।
কুষাণ সম্রাটগণ প্রায়ই তাঁদের উত্তরাধিকারীকে সহযোগী সম্রাটরূপে গণ্য করতেন। উত্তরাধিকার ভাবী সম্রাট শাসনকারী সম্রাটের জীবিতকালেই শাসনকাজে অংশগ্রহণ করতেন। এ কারণেই কণিষ্ক তাঁর অব্দের ২৩ বছর পর্যন্ত রাজত্ব করলেও ঐ অব্দের ২০ বছরে উৎকীর্ণ তাঁর উত্তরাধিকারী বসিষ্কের লিপি পাওয়া যায়। বসিষ্ক সম্রাট হলে হুবিষ্ক তাঁর সহযোগী সম্রাটের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কণিষ্ক তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ক্ষত্রপ বা মহাক্ষত্রপ উপাধিধারী রাজকর্মচারীদের মাধ্যমে সেগুলো শাসন করতেন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষত্রপ বা মহাক্ষত্রপগণ হতেন বংশানুক্রমিক । কণিষ্কের রাজত্বকালে উৎকীর্ণ বিভিন্ন শিলালিপিতে তাঁর অধীনস্থ বহু ক্ষত্রপ ও মহাক্ষত্রপের নাম পাওয়া যায়। কণিষ্কের একটি মন্ত্রীপরিষদ ছিল যার সদস্যগণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ দিতো। মাথর ছিলেন কণিষ্কের প্রধানমন্ত্রী। শাসনব্যবস্থায় সর্বনিম্ন স্তর ছিল গ্রামিকের অধীনে গ্রাম। বিভিন্ন ধরনের ‘গিল্ড’ বা শ্রেণী বিভিন্ন পেশা ও ধর্মীয় দান সম্পর্কিত বিষয়ের দেখাশুনা করতো। অট্টালিকা নির্মাণের বা সংস্কারের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীর উপাধি ছিল ‘নবকর্মিক’।
রাজ্য জয় ও সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃক্মখলা রক্ষার জন্য কণিষ্কের এক বিরাট সৈন্যবাহিনী ছিল। সেনাবাহিনী ছিল ‘দন্ডনায়কের’ অধীনে। তাঁরা প্রদেশ শাসনের ব্যাপারে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের সাহায্য করতেন। তাঁর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শাসনকাজে বহু কুষাণ, শক এবং গ্রিক কর্মচারী নিযুক্ত ছিল।
শুধুমাত্র বিজেতা ও সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতারূপেই নয়, বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকরূপেও কণিষ্ক ইতিহাসে খ্যাতি অর্জন করেছেন।কোনো কোনো পন্ডিতের মতে রাজত্বের শুরুতেই কণিষ্ক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, কয়েক বছর রাজত্ব করার পর পাটলিপুত্র জয় করে অশ্বঘোষকে পেশোয়ারে নিয়ে আসার পর অশ্বঘোষের প্রভাবে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। হিউয়েন-সাং এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে কণিষ্ক পেশোয়ারে একটি বহুতল চৈত্য ও একটি মঠ নির্মাণ করেছিলেন।
এই চৈত্য পরবর্তীকালে চৈনিক ও মুসলমান পর্যটকদের প্রশংসা অর্জন করেছিল। কাঠের তৈরি চৈত্যটি ছিল ১৩ তল বিশিষ্ট এবং এর উচ্চতা ছিল ৪০০ ফুট। মঠটি খ্রিস্টিয় নবম শতাব্দী পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে টিকে ছিল।
কণিষ্কের রাজত্বকালে শেষ বা চতুর্থ বৌদ্ধ সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কোনো কোনো উৎস অনুসারে এ সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কাশ্মিরে, আবার অন্য কোনো কোনো উৎস অনুসারে এটা হয়েছিল জলন্ধরে। বৌদ্ধধর্ম সংক্রান্ত পান্ডুলিপি সংগ্রহ এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা ও টীকা তৈরি করা এবং বৌদ্ধধর্মের অভ্যন্তরীণ মতভেদ দূর করাই ছিল এই সঙ্গীতির উদ্দেশ্য। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বৌদ্ধ পন্ডিত বসুমিত্র এবং অশ্বঘোষ ছিলেন এ সম্মেলনের সহ-সভাপতি।
বিখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত পার্শ্ব ও অশ্বঘোষ ত্রিপিটক সম্পাদনা ও এর টীকা রচনা করেন। সংস্কৃত ভাষায় রচিত এই ভাষ্য ও টীকা একটি তাম্রশাসনে উৎকীর্ণ করে স্তূপের মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়। তবে সেই স্তুপ বা তাম্রশাসন কোনোটিই পাওয়া যায়নি। কণিষ্কের আমলে বৌদ্ধ ধর্মমত ‘মহাযান’ ও ‘হীনযান’-এই দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আগে বুদ্ধের কোনো মূর্তি বা প্রতিকৃতি তৈরি করা হতো না এবং যারা প্রতীকের মাধ্যমে নিরাকার বুদ্ধের উপাসনা করতেন তারা হীনযান রূপে পরিচিত ছিলেন। মহাযান মতে বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণ ও মূর্তির মাধ্যমে তাঁর উপাসনা শুরু হয়।
হীনযানদের মতে গৌতম বুদ্ধ ছিলেন একজন মানুষ, সংস্কারক ও ধর্মপ্রচারক। মহাযান মতাবলম্বী বৌদ্ধরা গৌতম বুদ্ধকে দেবতার পর্যায়ে স্থাপন করে এবং তাঁর মূর্তিপূজা শুরু করে। চতুর্থ বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে মহাযান মতবাদ গৃহীত হয়। কণিষ্ক শুধুমাত্র নিজেই বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে ক্ষান্ত হননি।
ভারতে ও ভারতের বাইরে এ ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি বিশেষ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ভারতে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং খ্রিস্টিয় সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এ জনপ্রিয়তা স্থায়ী হয়েছিল। খ্রিস্টিয় সপ্তম শতাব্দীতে হিউয়েন সাং ভারতে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের জনপ্রিয়তা লক্ষ করেছিলেন। কণিষ্ক ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের প্রচেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম তখন মধ্য এশিয়া, চীন, জাপান ও কোরিয়ায় বিড়ার লাভ করেছিল।
কণিষ্ক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও অন্যান্য ধর্মের প্রতি যে সহিষ্ণু ও উদার ছিলেন তা তাঁর বিভিন্ন স্বর্ণ ও তাম্রমুদ্রায় গ্রিক, হিন্দু, জোরোষ্ট্রীয় প্রভৃতি দেব-দেবীর মূর্তি থেকে অনুমান করা যায়। কণিষ্ক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাঁর মুদ্রায় গৌতম বুদ্ধের প্রতিকৃতিও দেখা যায়। এমনও হতে পারে যে রাজনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে কণিষ্ক পরধর্ম সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করেছিলেন।
কণিষ্ক শুধুমাত্র ধর্মানুরাগী ও বিজেতাই ছিলেন না। তিনি শিক্ষা, শিল্প ও সাহিত্যেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর রাজসভায় বহু জ্ঞানীগুনী ব্যক্তির সমাবেশ ঘটেছিল। পার্শ্ব, বসুমিত্র, অশ্বঘোষ, নাগার্জুন, চরক প্রমুখ বহু মনীষী তাঁর রাজসভা অলঙ্কৃত করেছিলেন। অশ্বঘোষ ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা- পন্ডিত, কবি, সঙ্গীত ও শাস্ত্রবিদ। তিনি সংস্কৃত ভাষায় তাঁর গ্রন্থাবলী রচনা করেছিলেন। বুদ্ধচরিত হচ্ছে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ। তিনি সূত্রালঙ্কার, মৌন্ত্রানন্দ ও সারিপুত্রপ্রকরণও রচনা করেছিলেন। বুদ্ধচরিত গ্রন্থে অশ্বঘোষ অত্যন্ত সরলভাবে বৌদ্ধ ধর্মের বাণী প্রচার করেছেন। সারিপুত্রপুত্রপ্রকরণ একটি নাটক।
সূত্রালঙ্কার সংস্কৃত উপাখ্যানের একটি সংকলন। অশ্বঘোষের রচনা প্রাচীন ভারতে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সপ্তম শতাব্দীতে ভারতে আগত চৈনিক পরিব্রাজক ইৎ-সিং ভারতবাসীকে অশ্বঘোষের রচনা বারংবার আবৃত্তি করতে দেখেছিলেন। পার্শ্ব ছিলেন এক বৌদ্ধ পন্ডিত। তিনি কণিষ্কের আমলে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বসুমিত্র এ সঙ্গীতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ছিলেন শাস্ত্রবিদ। তিনি অভিধর্ম-প্রকর্ণ-পদ রচনা করেছিলেন।
তৎকালীন ভারতের অন্য একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন নাগার্জুন। তিনি ছিলেন মহাযান বৌদ্ধমতের ব্যাখ্যাকারী। নাগার্জুন শুধুমাত্র দার্শনিকই ছিলেন না, তিনি বৈজ্ঞানিকও ছিলেন। তিনি রসায়ন বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। অনেকে তাঁকে মার্টিন লুথারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি প্রজ্ঞা পারমিতা-সূত্র শাস্ত্র রচনা করেন। চিকিৎসা-বিজ্ঞানে বিখ্যাত চরক ছিলেন কণিষ্কের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। চরক সংহিতায় এমন বহু উদ্ভিদ ও গাছের শিকড়ের নাম আছে যেগুলো থেকে ওষুধ তৈরি হতো।
বিভিন্ন উদ্ভিদের মিশ্রণ ঘটিয়ে ওষুধ তৈরি করা হতো যা থেকে মনে হয় যে সেকালে ভারতবাসী রসায়নবিদ্যার সঙ্গে পরিচিত ছিল। শল্যবিদ্যায় দক্ষ শুশ্রুত ছিলেন কণিষ্কের আমলের অন্য একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। গ্রিক স্থপতি অ্যাজেসিলাস কণিষ্কের দরবার অলঙ্কৃত করেছিলেন। তারই নির্দেশনায় পেশোয়ারের বিখ্যাত চৈত্য নির্মিত হয়েছিল।
কণিষ্ক শিল্পেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। শিল্পের মধ্যে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যই ছিল প্রধান। তাঁর আমলে বহু চৈত্য, মন্দির, স্তূপ ও নগর নির্মিত হয়েছিল। কণিষ্কের আমলে পেশোয়ারে বিখ্যাত চৈত্যটি নির্মিত হয়েছিল। খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতাব্দীতে ফা-হিয়েন গান্ধার অতিক্রম করার সময় মুক্তকণ্ঠে এই চৈত্যটির প্রশংসা করেছিলেন। কণিষ্ক মথুরাতে বহু সুন্দর অট্টালিকা নির্মাণ করেছিলেন। মথুরায় স্থানীয় ভাস্কররা বহু বৌদ্ধ ও জৈন মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। মথুরাতে কণিষ্কের মস্তকবিহীন মূর্তিও পাওয়া গেছে। ভাস্কর্য শিল্পে এ আমলে এক নতুন রীতির সৃষ্টি হয়।
কুষাণ সাম্রাজ্যে বিভিন্ন দেশের শিল্পী ও কারিগরদের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের (গান্ধার) ভারতীয় কারিগররা গ্রিক ও রোমানদের সংস্পর্শে এসেছিল। এই সংমিশ্রণের ফলে এক নতুন ধরনের শৈল্পিক রীতি গড়ে ওঠে যা গান্ধার শিল্প রীতি নামে খ্যাত। এতদিন পর্যন্ত বুদ্ধের উপাসনা মুর্তির মাধ্যমে করা হতো না। এ জন্য ব্যবহৃত হত বুদ্ধের পদচিহ্ন, স্তুপ অথবা বোধি বৃক্ষের প্রতীক। কিন্তু এখন বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণ শুরু হয় এবং বৌদ্ধদের মধ্যে মূর্তিপূজা শুরু হয়। এই বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করেই গান্ধার শিল্পরীতি গড়ে ওঠে।
বিষয়বস্তুর দিক থেকে গান্ধার শিল্প ছিল ভারতীয়, কিন্তু শিল্পরীতির দিক থেকে তা ছিল গ্রিক প্রভাবিত। ফলে এই রীতিতে নির্মিত বুদ্ধের মূর্তি দেখতে অনেকটা গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর মত। গান্ধার শিল্প সম্পর্কে বলা হয় যে ভাস্করের হৃদয় ছিল ভারতীয়, কিন্তু তার হাত দুটি ছিল গ্রিক।
কণিষ্কের ১-২৩ বছর পর্যন্ত মুদ্রা পাওয়া যায়। ফলে মনে করা যায় যে, তিনি ২৩ বছর রাজত্ব করেছিলেন। ৭৮ খ্রিস্টাব্দে রাজত্ব শুরু করে ২৩ বছর রাজত্ব করার পর ১০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কণিষ্ক যে শুধু মাত্র কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন তাই নয়, প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্রাটদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

সারসংক্ষেপ
যে সকল বিদেশি জাতি ভারতবর্ষে সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিল তাদের মধ্যে কৃষাণদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুষাণ যুগের ইতিহাস রচনার জন্য বেশ কিছু সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস পাওয়া যায়। কুষাণরা ছিল ইউ-চি জাতির একটি শাখা। কুষাণ শাখার নেতা কুজলা কদফিসেস কর্তৃক খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দ নাগাদ পাঁচটি শাখায় বিভক্ত ইউ-চিরা ঐক্যবদ্ধ হয়। তিনি কাবুল, সোমায়ার, কাশ্মির অধিকার করেন। এরপর তাঁর পুত্র বিম কদফিসেস সিংহাসনে বসেন। তাঁর সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্থান থেকে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন কণিষ্ক । ৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং একটি অব্দ বা সম্বৎ প্রবর্তন করেন যা পরবর্তীতে শকাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। ভারতে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, এটি উত্তর- পশ্চিমে পেশোয়ার থেকে পূর্বে পশ্চিমবাংলা, উত্তরে কাশ্মির থেকে দক্ষিণে মধ্যপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
ভারতের বাইরে বর্তমান সোভিয়েত তুর্কিস্থানের এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশও তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। পুরুষপুর বা বর্তমান পেশোয়ার তাঁর রাজধানী ছিল। বিশাল সাম্রাজ্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন রাজকর্মচারীদের মাধ্যমে এখান থেকেই তিনি শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। শুধুমাত্র বিজেতা ও সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতারূপেই নয়, বৌদ্ধধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তিনি ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন।
পার্শ্ব, বসুমিত্র, অশ্বঘোষ, নাগার্জুন, চরক প্রমুখ বহু মনীষী তাঁর রাজসভা অলঙ্কৃত করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে চতুর্থ বা শেষ বৌদ্ধ সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর আমলেই বৌদ্ধ ধর্ম ‘মহাযান’ ও ‘হীনযান’ -এ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মহাযান মতাবলম্বীরা গৌতম বুদ্ধকে দেবতার পর্যায়ে স্থাপন করে তাঁর মূর্তি পূজা শুরু করে। কণিষ্কের প্রচেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম ভারত ও ভারতের বাইরে প্রসার লাভ করে।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তিনি পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে তাঁর আমলে গান্ধার শিল্পরীতি নামক নতুন শিল্প রীতি গড়ে ওঠে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি ছিল ভারতীয়, কিন্তু শিল্পরীতির দিক থেকে গ্রিক প্রভাবিত। ২৩ বছর রাজত্ব করার পর কণিষ্ক ১০১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন ।
