সুলতান রাজিয়া

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সুলতান রাজিয়া – যা দিল্লি সালতানাত এর অন্তর্ভুক্ত।

সুলতান রাজিয়া

 

সুলতান রাজিয়া

 

ক্ষমতারোহণের প্রেক্ষাপট

সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর দিল্লির সিংহাসন নিয়ে সংকটের সৃষ্টি হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র নাসিরউদ্দিন মাহমুদের অকাল মৃত্যু এবং অকর্মণ্য অন্য পুত্রদের নিয়ে ইলতুৎমিশ খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। মৃত্যুর পূর্বে ইলতুৎমিশ তাই পুত্রদের দাবি উপেক্ষা করে কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। কিন্তু রাজ্যের আমীর-ওমরাহগণ নারীর প্রভুত্ব স্বীকার করতে অনিচ্ছুক হয়ে ইলতুৎমিশের জীবিত পুত্রদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সুলতান মনোনীত করেন। তুর্কি আমীরগণ বংশানুক্রমিক অধিকার অপেক্ষা তাদের মনোনীত প্রার্থীকেই সিংহাসনে স্থাপন করা তুর্কি প্রথা ও সংবিধানসম্মত বলে মনে করতেন।

এভাবে রাজিয়ার দাবি নস্যাৎ হয় এবং রুকনউদ্দিন ফিরোজ শাহ সিংহাসনে বসেন। রুকনউদ্দিন উচ্ছৃক্মখলতা ও দুর্বলতার জন্য কুখ্যাত ছিলেন। অকর্মণ্য এই সুলতান ব্যাভিচারে ও হীনকার্যে মত্ত থাকতেন এবং রাজকোষের অর্থ যথেচ্ছভাবে খরচ করতেন। মাতা শাহ তুর্কান ছিলেন সুলতানের প্রধান মন্ত্রণাদাত্রী। এমনকি শাসনকার্য পরিচালনার সকল ক্ষমতা ধীরে ধীরে সুলতানের ন্যায়ান্যায়বোধহীন মাতার হস্তগত হয় । শাহ তুর্কান ছিলেন ক্ষমতালিপ্সু রমণী। প্রথমে তিনি অন্তঃপুরের দাসী ছিলেন। পরে তিনি রাজমাতা হন ।

একই সাথে এই রমণী ছিলেন স্বেচ্ছাচারী ও নিষ্ঠুর। যাহোক মাতা-পুত্র উভয়ের যথেচ্ছ ব্যবহারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দেখা দেয়। প্রাদেশিক শাসনকর্তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। মাতা-পুত্র চক্রান্ত করে ইলতুৎমিশের অপর এক পুত্র কুতুবউদ্দিনকে হত্যা করেন, ফলে রাজধানীর অনেক আমীর ওমরাহ্ সুলতানের প্রতি বৈরি ভাবাপন্ন হন। অবশেষে মুলতান, লাহোর, হান্সি ও বাদাউনের বিদ্রোহী শাসনকর্তাগণ ও কিছু তুর্কি আমীর সুলতান রুকনউদ্দিন ফিরোজ শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন।

সুলতান সম্মিলিত বাহিনীকে বাধা দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। এদিকে সুলতান রুকনউদ্দিন যখন বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন রাজিয়া সিংহাসন লাভের জন্য চেষ্টায় রত। রাজ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দিল্লির নাগরিকদেরকে তিনি শাহ তুর্কানের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলেন।

জানা যায়, দিল্লির জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায়রত মুসলমানদের নিকট হাজির হয়ে রাজিয়া রুকনউদ্দিন ফিরোজের আত্মঘাতী নীতির প্রতি উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং সুলতান হিসেবে তাঁকে মেনে নেয়ার জন্য সকলের প্রতি বিনীত আহ্বান জানান। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রমাণ করবেন বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। প্রার্থনারত মুসলমানদের মধ্যে এই আবেদন ইতিবাচক সাড়া জাগায় এবং যারা এতোদিন নিরপেক্ষ ছিলেন তারা রাজিয়ার পক্ষাবলম্বন ও তাঁকে সিংহাসনে বসাতে মনস্থির করেন।

রাজধানীর সামরিক কর্মকর্তারাও রাজিয়ার পক্ষ নিলে রুকনউদ্দিনের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছে। অবশেষে দিল্লির আমীরগণ রুকনউদ্দিনকে সিংহাসনচ্যুত করে রাজিয়াকে সিংহাসনে স্থাপন করেন। রাজিয়াকে ‘সুলতান’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। মাত্র সাত মাসের রাজত্ব শেষে রুকনউদ্দিন বন্দি ও নিহত হন (১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে)।

রাজিয়ার সিংহাসনারোহণের তাৎপর্য

সুলতান রাজিয়ার সিংহাসনে আরোহণের কিছু সাংবিধানিক তাৎপর্য ছিল।

প্রথমত, এই প্রথম দিল্লির সিংহাসনে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে নাগরিকগণ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রকৃতই রাজিয়ার শক্তির প্রধান উৎস ছিল দিল্লির নাগরিকবৃন্দ। রাজধানীর নাগরিকদের সমর্থনে কোনো একজন নারীর পক্ষে সিংহাসনে উপবেশন করার এটাই হলো প্রথম দৃষ্টান্ত।

দ্বিতীয়ত, জনসাধারণের সমর্থনে সিংহাসন লাভের ফলে রাজিয়া একটি অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন। জনগণকে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে তিনি সিংহাসন ত্যাগ করবেন।

তৃতীয়ত, সুলতান ইলতুৎমিশ যোগ্য ও উপযুক্ত হিসাবেই যে রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন তার পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়। একদিকে ইলতুৎমিশের ইচ্ছা সম্মানিত হয় এবং অন্যদিকে সিংহাসনের ওপর রাজিয়ার দাবিও বৈধ বা স্বীকৃত হয়।

চতুর্থত, মধ্যযুগের ভারতীয় ইতিহাসে রাজিয়াই হলেন সর্বপ্রথম নারী ‘সুলতান’। রাজিয়ার সিংহাসনারোহণের পিছনে উলামাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, দিল্লির সিংহাসনে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে উলামাদের সমর্থন নিস্প্রয়োজন।

পঞ্চমত, রাজিয়ার সিংহাসনে আরোহণের আরো তাৎপর্য এই ছিল যে, তিনি তুর্কি অভিজাতদের হাতে বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে নিজ হাতে কেন্দ্ৰীভূত করার ব্যবস্থা করেন। রাজিয়াই সর্বপ্রথম কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন যা পরবর্তীতে গিয়াসউদ্দিন বলবন দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেন বলে অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা।

সিংহাসনারোহণের বিরোধিতা

রাজিয়ার সিংহাসনারোহণ একেবারে নিষ্কন্টক ছিল না। সৈন্যবাহিনী, রাজকর্মচারী, দিল্লির জনগণ এবং প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের একটি বড় অংশের সমর্থনে সিংহাসনে বসলেও অচিরে রাজিয়া এক জটিল সমস্যার সম্মুখীন হন। বিশেষ করে যে সকল ইক্তাদার বা প্রাদেশিক আমীর, রুকনউদ্দিনের বিরুদ্ধে দিল্লি অভিযান করেন, তাঁরা দিল্লির জনসাধারণ ও দরবারের আমীরদের দ্বারা রাজিয়ার নির্বাচনকে সহজে মেনে নিতে পারেননি। এই প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ ‘উপেক্ষিত ও অপমানিত বোধ করে জোরেশোরে রাজিয়ার বিরোধিতা করেন।

বদাউন, মুলতান, হান্সি ও লাহোরের শাসনকর্তাগণ দিল্লিতে রাজিয়াকে অবরোধ করেন। এ সকল শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো শক্তি রাজিয়ার ছিল না, কিন্তু কূটনীতির মাধ্যমে তিনি বিরোধী জোটে ভাঙ্গন সৃষ্টির প্রয়াস পান। বিদ্রোহীদের একতা বিনষ্ট হয় এবং কেউ কেউ পালিয়েও যান। অতঃপর ‘লখনৌতি হতে (সিন্ধুদেশের) দেবল পর্যন্ত বিস্তৃত রাজ্যের সমস্ত মালিক ও আমীরগণ বশ্যতা ও আনুগত্য স্বীকার করেন’ । বিরোধী চক্রের নেতা নিজাম-উল-মুলক জুনাইদি নিহত হন। বাংলার শাসনকর্তা পুনরায় দিল্লির আনুগত্য গ্রহণ করেন এবং উচে জনৈক বিশ্বস্ত শাসনকর্তাকে নিয়োগ করা হয়। এভাবে আপাতত রাজিয়া বিপদমুক্ত হন।

 

তুর্কি অভিজাতদের বিদ্রোহ

মহিলার পক্ষে শাসনকার্য পরিচালনা মুসলিম জগতে অবিদিত বা অননুমোদিত না হলেও রাজিয়ার বিরুদ্ধে কিছু আপত্তি ছিল। তিনি স্ত্রীলোকের বেশভূষা ত্যাগ করে এবং অন্তঃপুর ছেড়ে বাইরে আসায় অনেক গোঁড়া মুসলমান তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। রাজিয়া পুরুষের বেশে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। তাছাড়া রাজিয়ার শাসন সংগঠন নীতিও তুর্কি আমীরগণ ঠিকমতো মেনে নিতে পারেননি; বিশেষ করে একজন হাবসী ক্রীতদাসকে উচু পদ প্রদান। জামালউদ্দিন ইয়াকুত নামে আবিসিনিয়া হতে আগত এই কর্মচারীর প্রতি রাজিয়া মাত্রাতিরিক্ত অনুগ্রহ দেখাতেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

তখনকার দিনে তুর্কি আমীর- ওমরাহগণ এক সংকীর্ণ সামন্ততন্ত্র গঠন করেছিলেন, তাঁরা ক্ষমতা ও পদমর্যাদার একাধিপত্য দাবি করতেন। তাঁরা তাঁদের জাতিগত অধিকার ত্যাগ করতে বা রাজকীয় কর্তৃত্বের নিকট নতি স্বীকার করতে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। এমতাবস্থায় সুলতান রাজিয়ার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। রাজিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী যে আমীর প্রথম প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেন, তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের শাসনকর্তা কবীর খা আয়াজ। ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে রাজিয়া সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে এ বিদ্রোহ দমন করেন। কবীর খাঁ বিনাযুদ্ধে রাজিয়ার বশ্যতা স্বীকার করে নেন।

কিন্তু অচিরেই তিনি আরও তীব্রতর বিদ্রোহের সম্মুখীন হন। তুর্কি ওমরাহদের প্ররোচনায় ভাতিন্দার শাসনকর্তা ইখতিয়ারউদ্দিন আলতুনিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ‘আমীর- ই-হাজিব’ পদাধিকার ইখতিয়ারউদ্দিন আইতিগীন ছিলেন বিদ্রোহীদের নেতা। বিদ্রোহ দমন করতে রাজিয়া বিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করেন।

তিনি ভাতিন্দায় পৌঁছুবার পর রাজিয়ার প্রিয়পাত্র জামালউদ্দিন ইয়াকুতকে হত্যা করা হয় এবং রাজিয়া বন্দি হন। রাজিয়া স্বীয় কুটবুদ্ধির দ্বারা এই বিপদ হতে পরিত্রাণ পাবার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে বন্দি রাজিয়ার সাথে আলতুনিয়ার বিয়ে হয়। অতঃপর উভয়ে এক সাথে দিল্লির দিকে রওনা হন। কিন্তু ইতোমধ্যে ইলতুৎমিশের অপর এক পুত্র মুইজউদ্দিন বাহরামকে আমীর- ওমরাহ্ণ দিল্লির সিংহাসনে বসাবার ব্যবস্থা করেন। সিংহাসন পুনরুদ্ধারে রাজিয়া ও আলতুনিয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁরা উভয়েই মুইজউদ্দিন বাহরামের কাছে পরাজিত ও নিহত হন ।

রাজিয়ার পতনের কারণ

সুলতান রাজিয়া প্রায় সাড়ে তিন বছর রাজত্ব করেন। তাঁর পতনের মূল কারণ হিসেবে সুলতান ও আমীরদের মধ্যে বিরোধের কথা বলা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার সময় হতে আমীর- -ওমরাহগণ অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। আরাম শাহের বিরুদ্ধে ইলতুৎমিশের সিংহাসনারোহণের মূলেও ছিল আমীরদের কারসাজি।

মুসলমানদের মধ্যে কোনো বিধিবদ্ধ নিয়ম না থাকায় উত্তরাধিকারের প্রশ্নে প্রায়শই তরবারির ব্যবহার হতো। ইলতুৎমিশের কোনো সুযোগ্য পুত্র সন্তান না থাকায় এ সময়ে আমীরগণ আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর থেকে বলবনের ক্ষমতা লাভ পর্যন্ত সময়ে আমীর-ওমরাহ্ণই রাজ্যের সর্বেসর্বা ছিলেন- এ মন্তব্যে কোনো অত্যুক্তি নেই।

আমীরগণ ‘চল্লিশ জন’- এর জোট গঠন করে নিজেদের মধ্যে সাম্রাজ্যের বড় বড় জায়গীর এবং রাজ্যের প্রধান প্রধান পদ ভাগ করে নিতেন। এই চল্লিশ জনের (বন্দেগান-ই-চেহেলগান) ক্ষমতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পায়। সুলতান অনেক ক্ষেত্রে এদের ক্রীড়ানকে পরিণত হন। যাহোক রাজকার্য সম্পাদনকালে প্রচলিত প্রথাকে উপেক্ষা এবং তুর্কি আমীরদের একাধিপত্যে হস্তক্ষেপ- প্রধানত এ দুটি কারণেই রাজিয়ার পতন ত্বরান্বিত হয়।

কৃতিত্ব

রাজিয়া একজন গুণধর রমণী ছিলেন। তিনি সহসী, সফল রাজনীতিবিদ, ন্যায়পরায়ণ ও জনহিতকামী ছিলেন। তিনি বিদ্যা ও গুণের কদর জানতেন। প্রাদেশিক শাসকদের বিদ্রোহ দমন শেষে তিনি শাসন সংগঠনের কাজে হাত দেন। তাঁর অনুগতরা বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান।

রাজিয়ার শাসন সংগঠনের ফলে পূর্বে বাংলা হতে পশ্চিমে সিন্ধু অঞ্চলে তাঁর ‘কর্তৃত্ব বলয় সম্প্রসারিত হয়। তিনি একজন পুরুষ সুলতানের মতোই রাজকার্য পরিচালনায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। পর্দার ব্যবহার তিনি ত্যাগ করেন। এমনকি হাতির পিঠে চড়ে তিনি বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। সরকারি পদে অ-তুর্কিদের নিয়োগ দান তাঁর আমলে পরিলক্ষিত হয়। ‘আমীর-ই-আখুর’ (রাজকীয় অশ্বশালার অধিপতি) পদে তিনি আবিসিনিয়ার জামালউদ্দিন ইয়াকুতকে নিয়োগ দান করেন। সুলতান রাজিয়াকে অনায়াসে একজন যোগ্য শাসক বলা যেতে পারে। কোন কোন লেখক তাঁকে ‘সুলতানা’ বলে থাকেন।

প্রকৃতপক্ষে তুর্কি ভাষায় ‘সুলতানা’ শব্দের অর্থ ‘সুলতানের পত্নী’— ‘রাজ্যের শাসনকর্তৃ’ নয়। তাছাড়া রাজিয়াও নিজের মুদ্রায় ‘সুলতান’ খেতাব ব্যবহার করেছেন। সুলতানি যুগের ঐতিহাসিক মিনহাজ-উস-সিরাজ তাঁকে “শ্রেষ্ঠ শাসক, বুদ্ধিমতি, ন্যায়পরায়ণা, দয়াশীলা, বিদ্যোৎসাহিনী, সুবিচারক, প্রজাবৎসলা, সমরকুশলা এবং অন্যান্য সকল প্রশংসনীয় রাজোচিত গুণের অধিকারিণী” বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু মিনহাজ একই সাথে দুঃখভরে প্রশ্ন করেন, ‘এসকল অসামান্য গুণ রাজিয়ার কোন্ উপকারে এলো?’

 

সুলতান রাজিয়া

 

সারসংক্ষেপ

সুলতান ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে সুলতান রাজিয়া সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। রাজিয়াই প্রথম সুলতান যিনি নাগরিকগণের স্বতঃপ্রবৃত্ত সিদ্ধান্তে ক্ষমতায় বসেন। এছাড়া তিনিই হলেন সর্বপ্রথম মহিলা সুলতান এবং তিনিই প্রথম কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। কয়েকজন প্রাদেশিক শাসনকর্তা রাজিয়ার বিরোধিতা করেন।

রাজিয়া তুর্কি অভিজাতদের বিদ্রোহ দমনে সক্ষম হন। যাহোক, সাড়ে তিন বছরের রাজত্ব শেষে রাজিয়ার পতন হয়। রাজকার্য সম্পাদনকালে প্রচলিত প্রথাকে উপেক্ষা এবং তুর্কি আমীরদের একাধিপত্যেহস্তক্ষেপ- প্রধানত এ দুটি কারণেই রাজিয়ার পতন ত্বরান্বিত হয়। এছাড়া রাজিয়ার রাজত্বকালেই ‘চল্লিশের দল’ বেশশক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুলতান রাজিয়াকে অনায়াসে একজন যোগ্য শাসক বলা যেতে পারে ।

Leave a Comment