আজকে আমদের আলোচনার বিষয় বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫ ও বঙ্গভঙ্গ রদ ১৯১১
বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫ ও বঙ্গভঙ্গ রদ ১৯১১

বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫ ও বঙ্গভঙ্গ রদ ১৯১১
ব্রিটিশ ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মালদা জেলার চীফ কমিশনার শাসিত আসামের সাথে সংযুক্ত করে পূর্ববাংলা ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করেন। যদিও মাত্র ৬ বছরের মধ্যে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করা হয়।
১৯০৫-১৯১১ সাল বাংলার ইতিহাসে ঘটনাবহুল। বঙ্গভঙ্গ ও রদ উপলক্ষে ভারত উপমহাদেশে মুসলিম জাগরণের সূত্রপাত হয়। অবশ্য বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তবে একথা ঠিক, বঙ্গভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি হতে তৎকালীন মুসলিম সমাজ আত্মপ্রতিষ্ঠায় সচেতন হয়ে ওঠে। যদিও ছয় বছর এর স্থায়িত্বকাল ছিল।
কিন্তু এই কয়েক বছর মুসলমান নেতৃবৃন্দ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা পরবর্তীকালে অবিভক্ত বাংলার শাসন পরিচালনায় (১৯৩৭-৪৭) যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। বস্তুত, ভারত উপমহাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে বঙ্গভঙ্গ ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।
অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু নেতৃবৃন্দ যে স্বদেশী বা স্বরাজ আন্দোলনের সৃষ্টি করে তা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। যদিও হিন্দু-মুসলিম অনৈক্য যে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে তার পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়।
বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার প্রেক্ষাপট
যদিও কেউ কেউ মনে করেন লর্ড কার্জনই বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে নতুন প্রদেশ গঠনের একক কৃতিত্বের দাবিদার; কিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে তা ভুল প্রমাণিত হবে। মূলত এটি ছিল সুদীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বেশ ক’জন প্রশাসকের পরিকল্পনার ফসল। লর্ড কার্জনের সময় এসে তা সাফল্যের মুখ দেখে। মজার ব্যাপার হলো, বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয় ভারপ্রাপ্ত ভাইসরয় অ্যাম্পটহিলের সময়। এ সময় কার্জন ছুটিতে লন্ডনে ছিলেন ।
বাংলাকে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া ও উদ্যোগ লর্ড কার্জনের আগে নিম্নোক্তভাবে শুরু হয়-
১৮৫৩ সালে চার্লস গ্রান্ট বাংলা প্রদেশকে দু’ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেন। পরের বছর ডালহৌসি একই প্রস্তাব করেন। ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যার দূর্ভিক্ষের সময় বাংলা সরকারের ব্যর্থতার বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য ভারত-সচিব লর্ড নর্থকোট যে কমিটি নিযুক্ত করেন, তার রিপোর্টেও বাংলা প্রদেশকে ভাগ করার সুপারিশ করা হয়। ব্রিটিশ সরকার এ সকল বিবেচনা করে আসামকে বাংলা থেকে পৃথক করে চীফ কমিশনার শাসিত প্রদেশে পরিণত করে।
১৮৯৬ সালে আসামের চীফ কমিশনার উইলিয়াম ওয়ার্ড ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম জেলাকে আসামের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরামর্শ দেন। তবে শেষপর্যন্ত প্রতিবাদের কারণে তা নাকচ হয়ে যায়। ১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভারতবর্ষের বড়লাট হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। শিক্ষা, কর্মদক্ষতা, দায়িত্বজ্ঞান এবং সর্বোপরি এ অঞ্চল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়েই তিনি ভারতে আসেন।
তাঁর শাসনকাল (১৯৯৮-১৯০৫) নানাদিক থেকে তাই তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সকল সংস্কার কার্যাবলীর মধ্যে বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তৎকালে সমগ্র বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে ছিল বঙ্গদেশ বা বাংলা প্রেসিডেন্সি। এ অংশের লোকসংখ্যা ছিল সমগ্র উপমহাদেশের এক-তৃতীয়াংশ । লর্ড কার্জন প্রথম হতেই এত বড় প্রদেশকে একটি মাত্র প্রশাসনিক ইউনিটের অধীনে রাখা অনুচিত মনে করেন।
১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত সরকার বাংলার সীমানা নির্ধারণ সম্পর্কে প্রাদেশিক সরকারগুলোর মতামত জানতে চাইলে তারা পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ জেলাকে আসামের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয়। কেন্দ্রীয় সরকার সীমানা রদবদলের পর তা অনুমোদন করে। বলাবাহুল্য, ১৯০৩ সালের প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি প্রবল গণ-অসন্তোষের শিকার হয়।
বিভিন্ন মহল এমন কি মুসলমানদের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ আসে। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কার্জন পূর্ববঙ্গ সফরে এসে সর্বত্রই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী উত্তেজনা লক্ষ করেন। তিনি কয়েক স্থানের ভাষণে প্রস্তাবিত পুনর্বিন্যাসে আরো কিছু এলাকা যুক্ত করার ইঙ্গিত দেন। যার ফলে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর, একটি আইন পরিষদ ও পৃথক রাজস্ব বোর্ড নতুন প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে থাকবে।
তিনি নতুন প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় করার এবং এ অঞ্চলের মুসলমানদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। এরপর কার্জন প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি পুনরায় পর্যালোচনা করেন এবং কিছু সংযোজনসহ ১৯০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুমোদনের জন্য ভারত সচিবের নিকট প্রেরণ করেন। নতুন বিন্যাসে আসামের সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ছাড়াও দার্জিলিং বাদে জলপাইগুড়ি, পার্বত্য ত্রিপুরা ও মালদহ অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। ঢাকায় নতুন প্রদেশের রাজধানী স্থাপন করা হয়। নতুন প্রদেশের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশ’। এর আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৬৫ হাজার ৬৪০ বর্গমাইল এবং লোকসংখ্যা ৩ কোটি ১০ লক্ষ। তারমধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মুসলমান ও ১ কোটি ২০ লক্ষ হিন্দু। স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার নতুন প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিযুক্ত হন।
বঙ্গভঙ্গের কারণ
প্রশাসনিক কারণ: সুমিত সরকারের মতে, ১৯০৩ সাল পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের পেছনে সরকারের প্রশাসনিক ইচ্ছাই অধিক কাজ করেছে। মূলত নতুন প্রদেশ গঠনের পেছনে প্রশাসনিক সুবিধা ও দক্ষতা বৃদ্ধিই ছিল কার্জনের মূল উদ্দেশ্য। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকেই সমগ্র বাংলার শাসনব্যবস্থা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক।
কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, যাতায়াত সমস্যা এবং প্রদেশের অন্তর্গত প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ববাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন যাবত অবহেলিত ছিল। এ অবস্থা শুরু হয় সুদূর অতীতে, যখন মুর্শিদকুলী খান ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে বাংলার রাজধানী স্থানান্তর করেন। ফলে ভূস্বামী, ব্যবসায়ী ও রাজধানীর ওপর নির্ভরশীল গোষ্ঠী ঢাকা ছেড়ে সেখানে গমন করে।
কালক্রমে তারাই কলকাতায় প্রভাব বিস্তার করে। কারণ, ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুর্শিদাবাদ থেকে শাসনযন্ত্র কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই পূর্ববাংলা অবহেলিত থাকে। পূর্ববাংলার প্রশাসন ব্যবস্থা ছিল দুর্বল, অদক্ষ এবং সে কারণে কার্যকর ও সক্রিয় ছিল না। জনকল্যাণ ও অগ্রগতির জন্য যে অর্থ এ এলাকায় ব্যয় করা হতো, তা ছিল বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
তাছাড়া এ অঞ্চলের প্রধান সমস্যাবলীকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হতো। শিক্ষা ছিল অবহেলিত; যোগাযোগ ও উৎপাদন ব্যবস্থা অনুন্নত। পূর্ববঙ্গের কৃষকরা কলকাতায় অবস্থানকারী জমিদারদের এজেন্ট ও কর্মচারীদের হাতে অত্যাচারিত হতো। ব্যবসা- বাণিজ্যের দিক থেকেও এ অঞ্চল দারুণভাবে পিছিয়ে পড়ে ।
চট্টগ্রামের কোন উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হয়নি; অথচ বৃহত্তর কলকাতা অচিরেই ওয়ারেন হোস্টিংসের প্রত্যাশা অনুযায়ী উপমহাদেশে ব্রিটিশ সংস্কৃতি, আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি অগ্রভূমিতে পরিণত হয়। তবে একথা ঠিক, শাসনতান্ত্রিক দিক বিবেচনা করলে বাংলা প্রদেশের বিশালত্ব এর অন্যতম কারণ। বাংলা ছিল ভারতের বৃহত্তম প্রদেশ।
ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব রিইজলি’র ১৯০৩ সালের ডিসেম্বরে লিখিত এক চিঠিতে জানা যায় যে, বাংলা সরকারকে বিরাট প্রদেশের প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়াও রাজস্ব আদায়, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রসার এবং আরো অনেক জটিল সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। এ সমস্ত দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পাদনের জন্য বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের দায়িত্ব লাঘব অত্যাবশ্যক ছিল।
রিইজলি ভৌগোলিক সীমারেখার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রশাসনিক উন্নতির জন্য এ সমস্ত পরিবর্তন যে সঙ্গত ও যুক্তিপূর্ণ, সে বিষয়টি উল্লেখ করেন। সংক্ষেপে এ কথা বলা যায় যে, বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার পিছনে বঙ্গ প্রদেশের বিশাল সীমারেখা একটা বড় কারণ ছিল।পশ্চাৎপদ আসাম ও পূর্ববাংলাকে যুক্ত করে এক উন্নয়নের সমান্তরাল ধারায় নিয়ে আসার মহৎ উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ছিল।
রাজনৈতিক কারণ: সুমিত সরকারের মতে, ডিসেম্বর ১৯০৩ থেকে ১৯ জুলাই ১৯০৫ সালের মধ্যে “Transfer plan was transformed into full scale partition”। এ সময়ের রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের বিভক্ত করা। ১৯০৩ সালের ২৮ মার্চের চিঠিতে ফ্রেজার প্রথমবারের মতো বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক ফায়দার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
বেশিরভাগ ঐতিহাসিকের অভিমত, বঙ্গভঙ্গের পিছনে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল মুখ্য। প্রথম দিকে প্রশাসনিক উদ্দেশ্য থাকলেও শেষ পর্যায়ে এর সঙ্গে রাজনৈতিক সুবিধাগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে এবং যুক্ত হয় রাজনৈতিক আয়তন। কার্জন যখন প্রস্তাবের পক্ষে পূর্ববঙ্গ সফর শুরু করেন, তখন তিনি বিরুদ্ধবাদীদের সম্মুখীন হন। পূর্ববঙ্গে প্রস্তাবের পক্ষে কেউ ছিল না, তা কিন্তু নয়।
সেই নির্বাক পক্ষভুক্ত মানুষদের কার্জন চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এবং এ থেকে তিনি রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চেয়েছিলেন। ফলে ব্রিটিশদের সনাতন নীতি Divide and Rule Policy অনুসরণ করা হয়। বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক দিকটি তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যদিও আমরা লক্ষ করি এ দিকটি গোপন রাখার ব্যাপারে ইংরেজ সিভিলিয়ানরা সতর্ক ছিলেন। সামগ্রিকভাবে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি এলিটদের একটা ক্ষোভ ছিলই।
এ ক্ষোভ এবং স্বাতন্ত্রবোধের বিষয়টি ইংরেজ সিভিলিয়ানদের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল তা বলা যাবে না। একটা শতাব্দীর শুরু বা শেষ মহাকালের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ না হতে পারে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিংশ শতকের প্রারম্ভ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটিশ ভারতের বিংশ শতক শুরু হয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে। এ সম্ভাবনাকে ব্রিটেনের নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত ‘অশুভ’ বলে চিহ্নিত করেন।
ভারত সাম্রাজ্য সম্পর্কে আঠার ও উনিশ শতকে যে নিশ্চিন্ততার ভাব তাদের মধ্যে ছিল, বিশ শতকের শুরুতে তা আর রইল না। মূলত ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হবার পর ভারতবাসীর রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পেয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে আরম্ভ করে। এ সকল আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা।
ভারতের বৃহত্তম প্রদেশ বাংলাকে বিভক্ত করে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতি স্তিমিত করে দিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল।
দ্বিতীয়ত, বিশ শতকের প্রথম হতেই রাজনীতি সচেতন ভারতীয়গণ ইংরেজ শাসকদের সমীপে নতুন সমস্যা ও দাবি উত্থাপন করতে থাকে। এই প্রেক্ষিতে প্রদেশটিকে ছোট করলে সমস্যা ও দাবি মেটানো সহজ হবে বলে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
তৃতীয়ত, যুক্ত বাংলার ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন ক্রমেই তীব্রতর হতে থাকলে হিন্দু ও মুসমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে এই জাতীয় কর্মকান্ডকে স্তিমিত করার উদ্দেশেও ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের আগ্রহ প্রকাশ করে ।
চতুর্থত, মুসলিম নেতৃবৃন্দ নতুন প্রদেশের শাসন কাঠামোকে কেন্দ্র করে নিজেদের ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ়করণপূর্বক রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে বলে যুক্তি দেখানো হয়।
পঞ্চমত, আলীগড় আন্দোলনের প্রভাবে মুসলমান পুনর্জাগরণের ফলে পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বঙ্গভঙ্গের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন পূর্ববঙ্গের আপামর জনসাধারণ।
অর্থনৈতিক কারণ:
কলকাতা ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রাণকেন্দ্র। স্বাভাবিকভাবেই পূর্ববাংলার ঢাকা ছিল অবহেলিত বিশেষ করে বাঙালি এলিট শ্রেণীভুক্ত লোকদের কলকাতায় অবস্থান একে সর্বভারতীয় মিলনস্থল হিসেবে গড়ে তোলে। স্বাভাবিকভাবেই সকল প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান সেখানে গড়ে পূর্ববাংলার রাজধানী এ সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। ওঠে
দ্বিতীয়ত, পূর্ববাংলায় জমিদারি ব্যবস্থা থাকলেও জমিদারগণ অবস্থান করতেন কলকাতায়। তাদের নিযুক্ত লোকজন নিরীহ পূর্ববঙ্গবাসীদের ওপর শোষণ করত। আর এর সুফল ভোগ করতেন কলকাতাবাসী জমিদারগণ, পূর্বের অর্থ এভাবে পশ্চিমে ব্যয় হতো।
তৃতীয়ত, তৎকালীন সময়ে সরকারি চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হিন্দুদের একচেটিয়া প্রাধান্য থাকায় পূর্ববাংলার মুসলিম জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লে নিজেদের আর্থিক উন্নতির জন্য পূর্ববঙ্গবাসী বঙ্গভঙ্গের পক্ষে আন্দোলন করে।
সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ:
ইংরেজ শাসনের শুরু থেকে তাদের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রাধান্য হারাতে থাকে। ফলে ১৯০৫ সালে পূর্ববাংলার মুসলিম সমাজ তাদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের আশায় ব্রিটিশ সরকারে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব জোরালোভাবে সমর্থন করে। তাছাড়া অনেক আগে থেকেই পূর্ববাংলায় মুসলমান এবং পশ্চিম বাংলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রাধান্য লক্ষণীয় ছিল।
স্বাভাবিকভাবেই, প্রত্যেকে তাদের স্বধর্মের মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইবে, সেজন্যে প্রয়োজন হয়ে পড়ে স্বাধীনতা তথা মুক্ত পরিবেশ। বলা বাহুল্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও পূর্ববাংলার মুসলমানরা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে হিন্দু জমিদার ও প্রভাবশালীদের হাতে বাধাগ্রস্ত হতো। এজন্যে নতুন প্রদেশে নিজেদের জীবনদর্শন অনুযায়ী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশে মুসলমানদের মধ্যে যে জাগরণ দেখা দেয়, তা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে জোরদার করে তোলে ।
পূর্ববাংলা শোষণ:
কলকাতায় বসবাসকারী জমিদারগণের আরাম-আয়েসের জন্য ব্যয়িত অর্থ সংগ্রহ করা হতো পূর্ববাংলার কৃষকদের নিকট থেকে। অথচ এখানকার কৃষক সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য তারা কোনরূপ দৃষ্টি দিতেন না। সর্বোপরি, কৃষকদের ওপর জমিদার ও ব্রিটিশ সরকারের শোষণনীতির ফলে এখানকার জনজীবনে যে কালো ছায়া দেখা দেয়, সেটাই অবহেলিত পূর্ববঙ্গ বাসীদের বঙ্গভঙ্গের পক্ষে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে।
উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে বৈষম্য:
ভারতবর্ষের রাজধানী হিসেবে কলকাতাকে কেন্দ্র করেই বাংলা প্রদেশের সকল প্রকার শিক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন করা হতো। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ববাংলা হতে সরবরাহকৃত কাঁচামালের বদৌলতে কলকাতার বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
অপরদিকে, উন্নয়নমূলক কাজের অভাবে পূর্ববাংলাবাসীদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। ফলে এ অঞ্চলের জনগণের মধ্যে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন অত্যন্ত আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
মুসলিম পুনর্জাগরণ:
অধিকার বঞ্চিত মুসলমানদের দাবি আদায়ের ব্যাপারে বিভিন্ন মনীষীদের সোচ্চার আবেদন তাদেরকে আত্মসচেতন করে তোলে। ফলে পূর্ববাংলা ও আসাম নিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ গঠনের উদ্দেশে গঠিত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন এই এলাকার মুসলমানদের মধ্যে ক্রমে তীব্রতর হয়ে ওঠে।
ভাগ কর, শাসন কর নীতি (Divide and Rule Policy):
বঙ্গভঙ্গ মুসলমানদের আন্দোলন বা দাবির ফসল ছিল না। পরবর্তীকালে এর ঘোর সমর্থক ও প্রবর্তক ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ্ স্বয়ং শুরুতে এ ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ব্রিটিশ শাসকদের নিকট থেকে আসে। কার্যত এটি ছিল ব্রিটিশদের চিরাচরিত Divide and Rule Policy’র ধারাবাহিকতা।
প্রস্তাবিত বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মুসলিম জনমত গঠনের লক্ষে ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ববাংলার কয়েকটি বড় শহর ভ্রমণের সময় লর্ড কার্জন যে ভাষণ দেন, তা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। ঢাকার জনসভায় তিনি বলেন, “ঢাকা এখন তার পূর্বের ছায়া মাত্র।
বঙ্গভঙ্গ হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যা এসব জেলার জনগণকে তাদের সংখ্যাধিক্য ও উচ্চতর সংস্কৃতির বদৌলতে বঙ্গভঙ্গের ফলে সৃষ্ট জেলাসমূহে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম করবে এবং পূর্ববাংলার মুসলমানদের মধ্যে এমন ঐক্য গড়ে তুলবে, যা তারা প্রাচীন মুসলমান ভাইসরয় ও রাজাদের আমলের পর আর কখনো অর্জন করতে পারেনি।
” লর্ড কার্জনের এ ভাষণের সারকথা ছিল হিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে মুসলিম মানস জাগিয়ে তোলা এবং কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলার বিপরীতে নতুন প্রদেশের রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলাকে দাঁড় করানো।
বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন
১৯০৩ সালের শেষ নাগাদ প্রথমবারের মতো বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব জনসাধারণে প্রকাশিত হওয়ার পর এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তবে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন তীব্রতা লাভ করে । হিন্দু রাজনীতিবিদ, জমিদার, সাংবাদিক, আইনজীবীরা এর বিরুদ্ধে বেশি প্রতিবাদমুখর ছিল। তারা বঙ্গভঙ্গকে জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি আঘাত বলে অভিহিত করেন।
হিন্দু নেতৃবৃন্দ একে বাঙালি বিরোধী, জাতীয়তাবাদ বিরোধী ও বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ প্রভৃতি বিশেষণে আখ্যায়িত করেন। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী মন্তব্য করেন, বাংলা বিভাগ করে হিন্দুদের অপমান ও অপদস্থ করা হয়েছে। এছাড়া গঙ্গাধর তিলক, অরবিন্দু ঘোষ, বিপরীনচন্দ্র চান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। কংগ্রেস নেতৃবন্দ সরাসরি বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে যোগ দেন।
যেদিন বঙ্গভঙ্গ সরকারিভাবে ঘোষিত হয় পর বৎসর সেদিন কংগ্রেস দেশব্যাপী শোক দিবস পালন করে। বাঙালির ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক ‘রাখিবন্ধন’ অর্থাৎ বাহুতে লাল ফিতা ধারণ করে। ১৬ অক্টোবর অনশন করে, সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখে, খালি পায়ে হেঁটে গঙ্গা স্নানে যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং রাখিবন্ধনে অংশ নেন। এই আন্দোলন ক্রমে মুসলিম বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
বাংলার সর্বত্র এবং বাংলার বাইরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন জোরালো হয়। হিন্দু তরুণরা গঠন করে স্বদেশী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। কুমিল্লা, ঢাকা, ফরিদপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনাসহ পূর্ববাংলার বহু স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়। ১৯০৬ সালের ৭ আগস্ট স্বদেশী আন্দোলন আরম্ভ হয়।
এই কর্মসূচির আওতায় বিলেতি পণ্য বয়কট, বিলেতি পণ্যে অগ্নিসংযোগ ও ছাত্ররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন করে। বাংলায় হিন্দুদের মধ্যে গড়ে ওঠে সন্ত্রাসবাদী সংস্থা । অনেক উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মচারী হত্যার শিকার হয়। হিন্দু মালিকানাধীন পত্রিকাগুলো ব্রিটিশ সরকারের ওপর বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। বেঙ্গলী, অমৃতবাজার পত্রিকা স্বদেশী ও বর্জন আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা পালন করে।
ফলে হিন্দু বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী, জমিদার, কৃষকদের বড় অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন। মুসলমান নেতাদের মধ্যে ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, খান বাহাদুর ইউসুফ, লিয়াকত হোসেন স্বদেশী আন্দোলন সমর্থন করেন। স্বদেশী আন্দোলনই ক্রমে স্বরাজ আন্দোলনে পরিণত হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি। মহাত্মা গান্ধী এ কারণে ১৯০৮ সালে মন্তব্য করেন, “বঙ্গভঙ্গের পরেই ভারতের প্রকৃত জাগরণ ঘটেছে।
এই বঙ্গভঙ্গই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভাগের কারণ হবে।” আন্দোলনের তীব্রতা সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার প্রকট রূপ লাভের কারণে ব্রিটিশ সরকার শেষপর্যন্ত নতি স্বীকার করে। ১৯০৬ সালে পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ফুলার পদত্যাগ করেন। ১৯১০ সাল থেকেই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদের গোপন তৎপরতা চালায়।
১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লি দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করেন। ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। নতুন পরিকল্পনায় বর্ধমান প্রেসিডেন্সী, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম- এই পাঁচটি বাংলা ভাষাভাষী বিভাগ নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠনের সুপারিশ করা হয়। এই নতুন বাংলা প্রদেশের রাজধানী করা হবে কলকাতায়। বিহার ও উড়িষ্যাকে বাংলা থেকে পৃথক করা হয়।
বঙ্গভঙ্গ রদের কারণ
সংকীর্ণ হিন্দু জাতীয়তাবাদ:
বঙ্গভঙ্গের শুরুতেই হিন্দুদের একটি বড় অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। তাদের মতে এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। কাশিমবাজারের মহারাজা মহীন্দ্রচন্দ্র নদীর একটি মন্তব্য থেকেই এর পেছনে হিন্দু জমিদারদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যায়। তিনি বলেন, “নতুন প্রদেশে মুসলমানরা হবে সংখ্যাগুরু আর বাঙালি হিন্দুরা সংখ্যালঘু। ফলে স্বদেশেই আমরা হব প্রবাসী।”
এভাবে হিন্দু নেতৃবৃন্দ এমনকি কংগ্রেসও এতে যুক্ত হওয়ায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ক্রমান্বয়ে মুসলিম বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। স্বার্থগত কারণে হিন্দু জমিদার ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী এমনকি বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশও এতে যোগ দেন। এভাবে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনা ক্রমান্বয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নেয় ।
অর্থনৈতিক কারণ:
ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসনের শুরুতে যেসব জমিদারদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়, এদের বড় অংশই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। জমিদারদের বড় অংশ আবার কলকাতায় বিলাস-ব্যসনে ব্যস্ত থাকতেন এবং নায়েব গোমস্তাদের দিয়ে কর আদায় করতেন। ঢাকায় রাজধানী হলে ঢাকার অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটবে এ আশংকায় কলকাতাকেন্দ্রিক জমিদার ও ব্যবসায়ীরা এর বিরোধিতা করেন।
কলকাতার আইনজীবীরা মনে করতেন এর ফলে ঢাকায় হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের পূর্ববঙ্গের মক্কেলরা সেখানকার আইনজীবীদের কাছে যাবে। সাংবাদিকরা মনে করতেন ঢাকায় নতুন নতুন পত্রিকা বের হলে তাদের পত্রিকার চাহিদা কমে যাবে। এভাবে স্বার্থগত কারণে বাঙালি হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন।
গবেষক ড. বি. আর. আমবেদকর (Ambedkar) বলেন, মুসলমানরা পূর্ববাংলায় যাতে তাদের যথার্থ স্থান না পায় মূলত এই দূরভিসন্ধি থেকেই হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছে।
বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিক্রিয়া
মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও নতুন প্রদেশ গঠন পূর্ববঙ্গে মুসলিম সমাজে ব্যাপক প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে ঢাকায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্পর্কে এক হিসাব থেকে দেখা যায় যে, ১৯০৫-১১ পর্যন্ত এই ৫ বছরে মুসলমান শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৩৫% বৃদ্ধি পায়।
বিশেষ করে শিক্ষিত মুসলমানদের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে সুবিধা বৃদ্ধির পথ সুগম হয়। তাই বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানরা মর্মাহত হয় এবং ব্রিটিশ সরকারকে চরম বিশ্বাসঘাতক ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী বলে আখ্যায়িত করে। নওয়াব ওয়াকার উল মূলক বলেন, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ভবিষ্যতে মুসলমানরা ব্রিটিশ সরকারের কোনো কথা ও কাজে আস্থা রাখতে পারবে না।
এছাড়া ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা করেন মওলানা মোহাম্মদ আলী এবং নবাব সলিমুল্লাহ। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিক্ষোভের ফলে বাঙালি মুসলমানরা অবাঙালি মুসলমানদের সাথে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলমানদের একমাত্র দল মুসলিম লীগ প্রথম থেকেই বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিল। বঙ্গভঙ্গ রদকে কেন্দ্র করে মুসলমানরা মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে।
এরপর মুসলিম লীগ মুসলমানদের মুখপাত্রে পরিণত হয়। তারা মুসলমানদের স্বতন্ত্র নির্বাচন দাবি করে যা ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃত হয়। ১৯১৩ সালে লক্ষ্ণৌতে মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে ভারতের জন্য স্বরাজ দাবি দলের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মুসলমান তরুণরা রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিবর্তনের দাবি জানায়। নবাব সলিমুল্লাহ যিনি মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন বঙ্গভঙ্গের পর স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসর নেন।
বঙ্গভঙ্গের পরের বছর লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা এলে তিনি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। অবশ্য তাঁর জীবদ্দশায় না হলেও ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৩২ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে নির্বাচন স্বীকৃত হয় এবং বাংলার মুসলমানদের জন্য শতকরা ৪৮ ভাগ আসন দেয়া হয়। ১৯৩৭-১৯৪৭ পর্যন্ত সময়কালে পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে মুসলমানদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া:
বঙ্গভঙ্গ রদ করায় হিন্দুগণ সন্তোষ প্রকাশ করে। কংগ্রেস সভাপতি অম্বিকাচরণ মজুমদার ব্রিটিশ সরকারকে অভিনন্দন জানান। কংগ্রেসের ইতিহাস লেখক পট্টভি সীতারাময় লিখেছেন, ১৯১১ সালে কংগ্রেসের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন জয়যুক্ত হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ করে ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসনে ন্যায়নীতির পরিচয় দেয়।
হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ:
এন.সি. চৌধুরী তাঁর আত্মজীবনীতে যথার্থই বলেছেন,“বাংলা বিভাগ হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে একটি স্থায়ী বিরোধের কারণ রেখে যায় এবং মুসলমানদের প্রতি একটি চরম ঘৃণা আমাদের মধ্যে স্থায়িত্ব লাভ করে।” ফলে বন্ধুত্বের সর্বপ্রকার অন্তরঙ্গতা দূর হয়। সর্বত্র এই বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে হিন্দু-মুসলমানরা একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও সংঘটিত হয়। এরপর যেকোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাপকাঠি নির্ণীত হয় ধর্ম পরিচয়ে। অবশেষে ধর্মের ভিত্তিতেই ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়।
সারসংক্ষেপ
বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ প্রথমে ছিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক। বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব দেওয়া থেকে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়া পর্যন্ত সারা বাংলায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা প্রথমবারের মতো সারা বাংলায় একটি আন্দোলন গড়ে তোলার পদ্ধতি তৈরি করে। হিন্দুদের এই আন্দোলন স্বদেশী আন্দোলনে পরিণত হয়। অন্যদিকে মুসলমান সম্প্রদায় স্বার্থ সংরক্ষণে সচেতন হয়। এর ফলে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত স্থায়িত্ব লাভ করে। বহু চেষ্টা করেও তাই ১৯৪৭ সালে যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সফল হয়নি।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। মুনতাসীর মামুন (সম্পাদিত), বঙ্গভঙ্গ, ঢাকা, সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দ্র।
২। মুহাম্মদ আবদুর রহিম, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, ঢাকা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০০২।
৩। জন আর ম্যাকলেন, “বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) : হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক” সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, প্রথম খন্ড, ঢাকা, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯৩।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক কারণ লিখুন।
২। বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য কংগ্রেস ও হিন্দু রাজনীতিবিদরা কী কর্মসূচি গ্রহণ করেন লিখুন।
৩। বঙ্গভঙ্গ রদে মুসলমানদের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আলোচনা করুন ।
রচনামূলক প্রশ্নঃ
১। বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে বর্ণনা করুন। কী কারণে বঙ্গভঙ্গ করা হয় লিখুন।
২। বঙ্গভঙ্গ রদের কারণ ও ফলাফল সংক্ষেপে লিখুন ।
