আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ছয় দফা আন্দোলন। ছয়দফা কর্মসূচীর ভিত্তি ছিল ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব। পরবর্তীকালে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হয়। বাংলাদেশের জন্য এই আন্দোলন এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে একে ম্যাগনা কার্টা বা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদও বলা হয়। প্রতি বছর ৭ই জুন বাংলাদেশে ‘৬ দফা দিবস’ পালন করা হয়।
ছয় দফা আন্দোলন

ছয় দফা আন্দোলন
পাকিস্তানি অত্মতরীণ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার লক্ষে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের সম্মেলন চলাকালে ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পূর্ববর্তী আঠার বছরের সংগ্রামের পটভূমিতে ঐ ঘোষণা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ দাবি।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সামরিক ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানকে চরম অবহেলার ফলে বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরো তীব্র করে তোলে। তাসখন্দ চুক্তি ঘোষণার পর যখন পাকিস্তানি শাসকচক্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয় তখনই শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ছয় দফা প্রস্তাব ঘোষণা করেন।
ছয় দফা কর্মসূচি প্রচারিত হওয়ার পরপরই পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ব্যাপকভাবে এ কর্মসূচি সমর্থন করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান যথার্থই বলেন, ৬ দফা আন্দোলন ক্ষণস্থায়ী হলেও তা বাঙালির রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায় এবং পরবর্তীকালের রাজনৈতিক আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে।
বস্তুত, ১৯৬৬ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক আন্দোলন, ‘৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় তথা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে উৎসাহ যুগিয়েছিল ছয় দফাভিত্তিক স্পৃহা।
ছয় দফার পটভূমি
ছয় দফা দাবি উত্থাপন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বস্তুতপক্ষে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকে পূর্বাঞ্চলের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের ঔপনিবেশিক মনোভাব তথা এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদদের অবমূল্যায়ন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যনীতি অনুসরণ, সামরিক দিক থেকে গুরুত্ব না দেওয়া প্রভৃতি ছয় দফা দাবিকে যুক্তিযুক্ত করে তুলেছিল। তাই ছয় দফা দাবি উত্থাপনের পেছনে একটা তাৎপর্যপূর্ণ পটভূমি রয়েছে।
রাজনৈতিক পটভূমি :
ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পূর্ব পাকিস্তানকে কখনোই লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনাধিকার দেওয়া হয়নি। ১৯৪৭ সালের ভারত শাসন আইনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা ও গণমুখী সংবিধান প্রণয়নের কথা বলা হলেও পাকিস্তানের প্রথম সরকার গঠন ও সংবিধান প্রণয়ন করতে এক দশক অতিবাহিত হয়ে যায়।
তাছাড়া ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠন করলেও পশ্চিমা স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তে যুক্তফ্রন্ট সরকার সফল হতে পারেনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করেন।
১৯৫৯ সালে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামক অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে বাংলার মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে ১৯৬০ ও ১৯৬৫ সালে নির্বাচনের নামে প্রহসন কায়েম করেন। এভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে ১৯৬৬ সাল তথা স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তানে কোন জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। তাই এ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের ওপর সকল পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত মূলত কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া হতো।
এছাড়া ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধকালে দীর্ঘদিন কেন্দ্রের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সামরিক দিক থেকে পূর্বাঞ্চল একেবারে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। জরুরি অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মত ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের ছিল না। এমনি অবস্থার প্রেক্ষিতে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনাধিকার দাবি করেন।
প্রশাসনিক পটভূমি:
পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রথম শ্রেণীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পর্যন্ত সকল স্তরে পূর্ব পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ ছিল নিতান্তই নগণ্য সংখ্যক । পরিকল্পিত উপায়ে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানিদের নিয়োগ করা হয়নি। পাকিস্তানি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হাসান আশকারী রিজভি একটি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন আইয়ুব আমলে মোট ৬২ জন মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র ২২জন ছিলেন বাঙালি মন্ত্রী।
এই ২২ জনের মধ্যে কাউকে কোন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে যে কোন পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের তেমন কোন ভূমিকা থাকতো না। এজন্যই ৬ দফায় স্বায়ত্তশাসনাধিকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের সীমিত ক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি উত্থাপিত হয়েছিল।
অর্থনৈতিক পটভূমি:
পাকিস্তান রাষ্ট্রের উৎপত্তি থেকেই পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হতে থাকে। ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত আয় স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমে চলে যেতো। আবার চাকরির ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিরা সংখ্যাধিক্য থাকায় এ সমস্ত আয় মূলত: তারাই ভোগ করতো।
১৯৬১ সালে সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় রাজস্ব আয়-ব্যয়ে দুই প্রদেশের অবদান নিয়ে একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে, কেন্দ্রীয় রাজস্ব আয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অবদান ২২% এবং চলতি ব্যয়ে সে হিস্যা হল ১২%। কিন্তু এ হিসাবও যথার্থ নয়। কারণ, পূর্ব পাকিস্তানিদের আমদানি ও আয়কর শুল্ক পশ্চিম পাকিস্তানে জমা দিতে হতো।
আবার রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত মোট আয়ের ৬০% আসে পূর্বাঞ্চল থেকে। কিন্তু আয়ের ক্ষেত্রে পুর্ব পাকিস্তানের অবদান বেশি হলেও ভোগ ও উন্নয়ন ব্যয়ে এ অঞ্চলের লোকজন তাদের ন্যায্য অংশ পেতো না। পাকিস্তানের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে মাথাপিছু ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৮০ টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ২০৫ টাকা।
দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বৈষম্য কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পূর্বাঞ্চলে মাথাপিছু ব্যয় হয়েছিল ১৯০ টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে ২৯২ টাকা। ১৯৬০-৬১ থেকে ১৯৬৪-৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যয় হয়েছিল ৯৭০ কোটি টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানে ২,১৫০ কোটি টাকা। অথচ আয়ের ক্ষেত্রে দুই প্রদেশের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
বহির্বাণিজ্যে প্রথম দশ বছরে পশ্চিম পাকিস্তানে যেখানে ৪০৭.৬ কোটি টাকার ঋনাত্মক ভারসাম্য ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে সেখানে ৮৬৮ কোটি টাকা ঋনাত্মক ভারসাম্য বজায় রাখে। কেন্দ্রীয় সরকারের ট্রেজারিতে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান ২০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা জমা দেয়। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার এ সময় প্রতি বছর প্রায় ৪০ কোটি টাকার বিদেশী দ্রব্য আমদানির ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করে ।
পশ্চিমাঞ্চলের বৈদেশিক ঋণের বোঝা মেটানো হতো পূর্ব পাকিস্তানের ঋনাত্মক আয় থেকে। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান থেকে সম্পদ নানা উপায়ে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হয়ে যেতো। ১৯৫৬ সালের পূর্বে প্রতি বছর জাতীয় আয়ের ২% পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে পাচার হতো। এরূপ বৈষম্য নীতি ও শোষণের প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ৬ দফা উত্থাপিত হয়।
সামরিক পটভূমি:
৬ দফা উত্থাপনের সামরিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ ছিল স্বল্পসংখ্যক। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হচ্ছে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধকালে পূর্ব পাকিস্তান সামরিকভাবে প্রায় অরক্ষিত ছিল।
সম্ভাব্য ভারত আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কোন শক্তি পূর্বাঞ্চলের ছিল না। তাই ৬ দফায় আঞ্চলিক আধাসামরিক বাহিনী গঠনের দাবি উত্থাপিত হয়।
এরূপ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি প্রণয়ন করেন এবং ১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লাহোরে পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্সে উত্থাপনের চেষ্টা করেন।
ঐদিন ৬ দফা দাবি উত্থাপনে ব্যর্থ হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর ৬ দফা প্রচার করেন এবং দেশে ফিরে আসেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা উত্থাপিত হলে সঙ্গে সঙ্গে তা গৃহীত হয়।
ছয় দফার রূপরেখা
১ম দফা
শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রকৃতি: ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নপূর্বক পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে হবে। এই যুক্তরাষ্ট্রের সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির। প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভাগুলো হবে সার্বভৌম ।
২য় দফা
কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: যুক্তরাষ্ট্র (কেন্দ্রীয়) সরকারের হাতে থাকবে দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয় অঙ্গরাজ্যসমূহের হাতে থাকবে।
৩য় দফা
মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা: এ দফায় দেশের মুদ্রা ব্যবস্থা সম্পর্কে দু’টি বিকল্প প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়-
ক. দেশের দু’অঞ্চলের জন্য সহজে বিনিময়যোগ্য দু’টি মুদ্রা চালু থাকবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রার লেনদেন হিসাব রাখার জন্য দু’অঞ্চলে দু’টি স্বতন্ত্র স্টেট ব্যাংক থাকবে এবং মুদ্রা ও ব্যাংক পরিচালনার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। অথবা-
খ. দু’অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকবে, তবে শাসনতন্ত্রে এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে এক অঞ্চল থেকে মুদ্রা ও মূলধন অন্য অঞ্চলে পাচার হতে না পারে। এ ব্যবস্থায় পাকিস্তানে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং দু’অঞ্চলের জন্য দু’টি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।
৪র্থ দফা
রাজস্ব, কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা ও কর ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে জমা হবে। শাসনতন্ত্রে এ ব্যাপারে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের ওপর বিধান থাকবে।
৫ম দফা
বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রদেশগুলোর হাতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্যের ব্যাপারে প্রদেশগুলো যুক্তিযুক্ত হারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মিটাবে ।
৬ষ্ঠ দফা
প্রতিরক্ষা: আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে ৬ষ্ঠ দফা প্রদেশগুলোকে নিজস্ব কর্তৃত্বাধীনে আধাসামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও পরিচালনা করার ক্ষমতা দেওয়া হবে।
ছয় দফার প্রতিক্রিয়া
ছয় দফা প্রকাশিত হবার পর এর প্রতি পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সরকার ও ইসলামপন্থী বিরোধী দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। যথা-
১. সরকারি প্রতিক্রিয়া: ছয় দফার প্রতি পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নেতিবাচক ও কঠোর। লাহোরে ছয় দফা উত্থাপিত হবার পরদিনই পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দেওয়া হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৬) করাচিতে পূর্ব পাকিস্তানের আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী আব্দুল হাই চৌধুরী ছয় দফাকে রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা বলে আখ্যা দেন।
একইভাবে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ছয় দফাকে ‘হিন্দু আধিপত্যাধীন যুক্তবাংলা গঠনের ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেন এবং ছয় দফা সমর্থকদের ‘গোলযোগ সৃষ্টিকারী’ আখ্যা দিয়ে তাদের উচ্ছেদকল্পে প্রয়োজনে অস্ত্রের ভাষা ব্যবহারের হুমকি দেন। অপরদিকে ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলন জোরদার হতে দেখে আইয়ুব খান ছয় দফার প্রণেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারসহ বহু আন্দোলনকারীকে কারারুদ্ধ করেন।
২. পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব দলই ৬ দফার সমালোচনা করে। কাউন্সিল মুসলীম লীগ একে ‘পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার দাবি’ হিসেবে চিহ্নিত করে। পিপিপি প্রধান জে.এ. ভুট্টো একে দেশ বিভাগের ফর্মুলা আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। জামায়াতে ইসলামী ৬ দফাকে বিচ্ছিন্নতার লক্ষে পরিচালিত দাবি বলে আখ্যা দেয়।
নেজামে ইসলামী এই কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করে শেখ মুজিবকে একনায়ক কায়দায় সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সমালোচনা করেন। সকল ধর্মভিত্তিক দলের অভিন্ন বক্তব্য ছিল, ৬ দফা ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে।
ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনের বিকাশ
আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে ৬ দফা পাশ হবার পর শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষে বিভিন্ন স্থানে জনসভায় বক্তৃতা করে বেড়ান এবং ছয় দফা তুলে ধরেন। তিনি ছয় দফাকে ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ আখ্যা দেন। শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ৬ দফার পক্ষে দ্রুত ব্যাপক জনমত গড়ে উঠতে থাকে।
এদিকে ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলন জোরদার হতে দেখে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন এবং বিভিন্ন জনসভায় ৬ দফাকে ষড়যন্ত্রমূলক রাষ্ট্রদ্রোহী ও পাকিস্তান ভাঙ্গার দলিল বলে আখ্যা দিতে থাকেন। সরকার এবং প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর কটূক্তি সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে ৬ দফা আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকলে পাকিস্তান সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর নির্যাতন চালাতে থাকে।
আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবসহ আরো অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে। নির্যাতন ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ঐদিকে মিছিলে পুলিশের গুলিতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য স্থানে বহু লোক প্রাণ হারায়। ১৯৬৬ সালে ৭ জুনের রক্তস্নাত আন্দোলনের মধ্যদিয়েই ছয় দফার প্রতি পূর্ববাংলার জনগণের তুলনাহীন সমর্থন প্রমাণিত হয়। সরকারের প্রতি জনগণের ঘৃণা তীব্রতর হয়।
ছয় দফা আন্দোলনের গুরুত্ব
পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনাধিকার তথা স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ছয়দফার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এর বিভিন্নমুখী গুরুত্ব নিম্নরূপ-
শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর:
ছয়দফা ভিত্তিক দাবিগুলো ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক দীর্ঘকাল ধরে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। প্রস্তাবের প্রণেতা শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই ছয় দফাকে ‘বাংলার কৃষক, মজুর, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত তথা আপামর জনসাধারণের মুক্তির সনদ এবং বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার নিশ্চিত পদক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
স্বায়ত্তশাসনের দাবি:
ছয় দফার পূর্বে বাংলার পক্ষ থেকে যেসব দাবি উত্থাপিত হয়েছিল সেগুলো ছিল মূলত পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাঙালির অধিকারের দাবি। বস্তুতপক্ষে, ছয় দফার মধ্যদিয়েই পূর্ববাংলাকে একটি পৃথক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে অধিক স্বায়ত্তশাসনাধিকার দাবি করা হয়েছিল।
স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ:
ছয় দফাভিত্তিক দাবির মধ্যদিয়ে পূর্ব পাকিস্তান বস্তুতপক্ষে স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। পৃথক মুদ্রা চালু ও পৃথক হিসাব রাখা এবং আঞ্চলিক মিলিশিয়া বাহিনী গঠন প্রভৃতি ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার পরিচয় বহন করে।
সর্বাত্মক আন্দালন:
ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলন ছিল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রথম সর্বাত্মক দুর্বার আন্দোলন। এ দাবিগুলোর মধ্যে আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় তারা ছয় দফাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে জাগ্রত:
ছয় দফা ছিল একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসনাধীন পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার প্রথম হাতিয়ার। ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন করে এবং পরবর্তীকালে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি:
ছয় দফাভিত্তিক দাবিগুলো ছিল পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রাণের দাবি। বৈষম্যের শিকার বাঙালি জাতি এর মাধ্যমে দিক নির্দেশনা পায়। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম দাবিগুলো পাকিস্তান সরকারের নিকট তুলে ধরার মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
এতোদিনের বিক্ষিপ্ত স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে অগ্রসর হয় প্রফেসর রওনক জাহানের ভাষায়, “Sixpoint movement whose main thrust was demand of autonomy for East Pakistan is regarded as the turning point in Mujib’s rise to charismatic leadership”.
পাকিস্তানের ঐক্যের প্রতি হুমকিস্বরূপ কী-না?
১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ৬ দফা দাবি উত্থাপিত হওয়ার পরপরই পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকা, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও তার দোসর শোষকগোষ্ঠী ছয় দফাকে পাকিস্তান ভাঙ্গার হাতিয়ার এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিতে থাকে। এমনকি ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার হুমকি দেয়।
পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামপন্থী ও বামপন্থী দলের নেতারাও ছয় দফাকে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার দলিল রূপে আখ্যা দেয় এবং দেশের ঐক্য রক্ষার্থে জিহাদ ঘোষণা করে। বস্তুতপক্ষে ছয় দফার কোথাও পাকিস্তান ভাঙ্গার অথবা পূর্ব পাকিস্তান কে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার উল্লেখ ছিল না বা প্রস্তাবের প্রণেতা শেখ মুজিবুর রহমান কখনো পাকিস্তান থেকে পৃথক হবার কথা ঘোষণা করেন নি।
ছয় দফা বিশ্লেষণ করলে আমরা স্পষ্টত উপলব্ধি করতে পারি যে, এর প্রথম ও দ্বিতীয় দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দফা ছিল পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার ন্যায়সঙ্গত দাবি এবং ষষ্ঠ দফা ছিল পূর্বাঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি। কিন্তু পাকিস্তান সরকার ও তাদের দোসররা ছয় দফাকে বিকৃত ভাষায় ব্যাখ্যা দিয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবদুল ওদুদ ভূঁইয়া যথার্থই বলেছেন, “ছয় দফা দাবি কোনদিনই পাকিস্তান হতে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার দাবি ছিল না। এটা শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ের মাধ্যমে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।”
ছয় দফা আন্দোলনের সারসংক্ষেপ
১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত ও শোষণের প্রতিবাদস্বরূপ ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববাংলায় স্বায়ত্তশাসনাধিকার সম্বলিত ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন। আর পাকিস্তানের শোষক শ্রেণী কোন অবস্থাতেই ছয় দফাভিত্তিক দাবি মানতে রাজি ছিল না।
তাই ছয় দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করার লক্ষে সরকার বাঙালিদের ওপর কঠোর দমননীতি অনুসরণ করে। কিন্তু দুর্বার বাঙালি তাতে মাথা নত না করে ৬ দফাভিত্তিক গণআন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয় এবং শেষপর্যন্ত এ গণঅভ্যুত্থান সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করে। তাই বলা যায় যে, ছয় দফার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশ : জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ২০০০।
২। মওদুদ আহমদ (অনুবাদ: জগলুল আলম), বাংলাদেশ, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯২।
৩। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ‘ছয় দফা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি পত্রিকা, সংখ্যা ২৩-২৪, ১৪০২-০৪।
৪। সালাহউদ্দিন আহমদ ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ১৯৪৭-১৯৭১, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৭।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন:
১। ৬ দফার মুদ্রা ও অর্থ এবং রাজস্ব সংক্রান্ত ধারা বর্ণনা করুন।
২। ৬ দফার সরকারি ও বেসরকারি প্রতিক্রিয়া সংক্ষেপে আলোচনা করুন।
৩। ৬ দফা আন্দোলনের বিকাশ সংক্ষেপে বর্ণনা করুন ।
৪। ১৯৭০-এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধে ৬ দফা কি প্রভাব ফেলেছিল?
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। কি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা উত্থাপিত হয় তা আলোচনা করুন।
২। ৬ দফার বর্ণনা দিন। এ দফাগুলোর গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচনাপূর্বক এর প্রতিক্রিয়া নির্ণয় করুন ।
