আজকে আমদের আলোচনার বিষয় পূর্ববাংলায় অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদঃ রাজনৈতিক, সামরিক, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য
পূর্ববাংলায় অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদঃ রাজনৈতিক, সামরিক, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য

পূর্ববাংলায় অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদঃ রাজনৈতিক, সামরিক, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পূর্ববাংলা লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক পৃথক রাষ্ট্রের মর্যাদাতো পায়ইনি, বরং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনাধিকারের দাবিতে পূর্ববাংলাকে সুদীর্ঘ ২৪ বছর আন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে। এ সুদীর্ঘ সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পূর্ববাংলার প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক নীতি অনুসরণ করে ।
শাসকগোষ্ঠীর এ বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক নীতির বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় প্রথমে প্রতিবাদী আন্দোলন এবং শেষপর্যন্ত স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয় । নিম্নে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি উল্লেখিত বিষয়ে বৈষম্যনীতি এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন সংক্ষেপে আলোচিত হল-
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য নীতি
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে একাধিক রাষ্ট্র গঠনের উল্লেখ থাকলেও ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় উল্লেখিত অঞ্চলসমূহ নিয়ে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকাংশ অধিবাসী পূর্ববাংলায় বসবাস করলেও এর রাজধানী পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে পূর্ববাংলার অধিবাসীদের রাজনৈতিকভাবে মর্যাদা না দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের মুখাপেক্ষী করে রাখা হয়। আবার ১৯৪৭ সালে নতুন রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা নিজ নিজ দেশের সংবিধানের প্রণয়নের কথা উল্লেখ থাকলেও পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫৪ সালে।
ইতোপূর্বে মুসলিম লীগের একাধিপত্য নীতি লক্ষ করে পূর্ববাংলার সচেতন মধ্যবিত্ত শ্ৰেণী তথা কতিপয় উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা ১৯৪৯ সালে মাওলানা ভাসানীকে সভাপতি করে মুসলিম লীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল এ নবগঠিত রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দকে নানাভাবে কটাক্ষ করে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও সমমনা দলসমূহ যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং কৃষক-শ্রমিক পার্টির প্রধান ফজলুল হকের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্র এ মন্ত্রিসভাকে কখনো সফল হতে দেয়নি।
তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে জনগণের সম্মুখে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত করা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের জনমনে অনীহা ভাব জাগ্রত করা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি পশ্চিমাদের এহেন অনীহার কারণে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হতে সময় লেগেছিল নয় বছর। পূর্ববাংলার যথাযথ প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতিতেই ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়।
এ সংবিধানে পূর্ববাংলাকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম দেওয়া হয় এবং পাকিস্তানকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণার মাধ্যমে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করা হয়। এ সংবিধানে সমস্ত ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের লোকজনকে পশ্চিমাদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়। এতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও যুক্ত নির্বাচনের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়।
নতুন সংবিধানে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার স্থলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে পূর্বাঞ্চলের ওপর প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ প্রধান সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পুনরায় কেন্দ্র কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলেও গণতন্ত্রের প্রতি ভীত মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের ষড়যন্ত্রের কারণে মাত্র ১৩ মাসের মাথায় এ মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেওয়া হয়।
এরপর বার বার মন্ত্রিসভা গঠন ও বাতিল হওয়ার পালা চলতে থাকলে দেশে আইন-শৃক্মখলার চরম অবনতি ঘটে এবং সম্ভবত পশ্চিমা শাসককূল এ রকম একটা ক্ষণের জন্যই অপেক্ষা করছিল। এরূপ রাজনৈতিক বিশৃক্মখলার মাঝে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর ইস্কান্দার মীর্জা আইন-শৃক্মখলার অবনতির অজুহাত দেখিয়ে সামরিক আইন জারি করে শাসনতন্ত্র ও মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন এবং রাজনৈতিক দল বিলুপ্তি ঘোষণা করেন।
এর ২১ দিন পর আইয়ুব খান মীর্জাকে অপসারিত করে সমুদয় ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করেন। এর মধ্যদিয়ে পাকিস্তানে ১০ বছরের জন্য গণতন্ত্রের সমাধি রচিত হয়। আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে পূর্ব পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে এ অঞ্চলের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
আইয়ুব খান মনেপ্রাণে গণতন্ত্র ও পূর্ব পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন। তাঁর দশ বছরের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অধিকাংশ সময়ই কারাগারে বন্দি জীবন যাপন করেছেন। তিনি তিনবার নির্বাচনের নামে প্রহসন চালিয়েছেন। মৌলিক গণতন্ত্রের নামে পূর্ব পাকিস্তানের গণতন্ত্রমনা লোকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন।
১৯৬০-এর দশকের শেষার্ধে পূর্ববাংলায় গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে কঠোর হস্তে দমন করেছেন এবং নেতৃবৃন্দকে অন্যায়ভাবে জেলে বন্দি রেখেছেন। তিনি ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের মতামত ব্যতীত তাদের ওপর অগণতান্ত্রিক একটি শাসনতন্ত্র চাপিয়ে দেন। তার পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান ইয়াহিয়া খান বাধ্য হয়ে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
কিন্তু নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান দল আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তাদেরকে সরকার গঠনের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। নির্বাচন ও সরকার গঠন ছাড়াও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বাঙালিদের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার থেকে সজ্ঞানে বঞ্চিত করেছিল।
সেক্রেটারী ও মন্ত্রীর পদটি ছিল রাজনৈতিক পদ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার শিক্ষিত ও যোগ্যতা সম্পন্ন নাগরিকদের এ পদে নিয়োগ করতো না। মন্ত্রিপরিষদে দেখা যায়, লিয়াকত আলী খানের সময় (১৯৪৭-৫১) মাত্র ৩১.২%, নাজিমুদ্দিনের সময় (১৯৫১-৫৩) মাত্র ৪০%, আইয়ুব খানের সময় মাত্র ৩২%, ইয়াহিয়া খানের সময় মাত্র ৪৫.৫% মন্ত্রী ছিলেন বাঙালি।
তবে এসব বাঙালিদের মধ্যে কেউ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাননি। দেখা যায় যে, ১৯৬৪-১৯৬৫ সনে কেন্দ্রীয় সরকারের ১৭ জন সেক্রেটারির মধ্যে মাত্র দু’জন ছিল বাঙালি তাও আবার ভারপ্রাপ্ত। সম্পদের ভাগাভাগিতে বাঙালিদের অধিকার সম্বন্ধে যেন কেউ কোন কথা বলতে না পারে, সেজন্য বাঙালিদের কোন সময় অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিয়োগ করা হতো না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও একই চিত্র দেখা যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরা বাঙালিদের পররাষ্ট্র দফতরে নিয়োগ করতো না। কারণ পাকিস্তানি পররাষ্ট্রনীতি একমাত্র প্রতিক্রিয়াশীল চক্র দ্বারা প্রণীত হতো। বাঙালিদের প্রগতিশীল আদর্শকে তারা কখনো মূল্য দিত না। এ কারণে পররাষ্ট্র দফতরে ১০৪ জন প্রথম শ্রেণীর কর্মচারির মধ্যে মাত্র ৩০ জন ছিলেন বাঙালি। দ্বিতীয় শ্রেণীর নন-গেজেটেড ২০৪ জন কর্মচারীর মধ্যে বাঙালি ছিলেন ৫৫ জন।
কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, বৈষম্য নীতির মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীরা বাঙালিদের সকল রাজনৈতিক অধিকার ও পদ থেকে বঞ্চিত করেছিল। তারা এক্ষেত্রে বাঙালিদের দাবি কোন দিনই মেনে নেয়নি।
প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য
সামরিক :
সামরিক, নৌ এবং বিমান বাহিনী নিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে উঠেছিল। পাকিস্তানের শাসকবর্গ ছিল স্বৈরাচারী ও গণতন্ত্র বিরোধী। তারা পূর্ববাংলার অধিবাসীদের গণতান্ত্রিক আদর্শ ও স্বাধীনচেতা মানসিকতাকে ভয় পেতো। তারা বাঙালির অতীত সাহসিকতার কথা স্মরণ করে তাদেরকে দুর্বল করে রাখার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা বুঝতো ও জানতো বাঙালি সুযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে।
তাই কৌশলে প্রতিরক্ষা বিভাগের চাকরিতে বাঙালিদের কমসংখ্যক নিয়োগ করা হতো। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী- সর্বক্ষেত্রে এ বৈষম্যনীতি পরিলক্ষিত হয়। সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি। অফিসার পদে বাঙালিদের খুব কম নিয়োগ করা হতো। নিয়োগের সময় ৪/৫ জন বাঙালি সুযোগ পেতো।
১৯৬৬ সালে দেখা যায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মোট ১৭টি উচ্চপদস্থ সামরিক পদের মধ্যে সেনাবাহিনীর জেনারেল, ২টি লেফট্যানান্ট জেনারেল ও ১৪টি মেজর জেনারেলের মধ্যে মাত্র মেজর জেনারেল পদে ছিল একজন বাঙালি। সামরিক অফিসারদের মধ্যে ৫% ছিল বাঙালি আর বাকি ৯৫% ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি।
শুধু অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে নয়, সাধারণ সৈনিক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাঙালিদের সুযোগ ছিল সীমিত। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫,০০,০০০ সদস্যের মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ২০,০০০ জন অর্থাৎ মাত্র ৪% ।
নৌবাহিনী:
নৌবাহিনীতে ১৯% টেকনিক্যাল লোক ছিল বাঙালি এবং বাকি ৮১% ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি । নন-টেকনিক্যাল লোকের মধ্যে বাঙালি ছিল ৯% জন ।
বিমান বাহিনী:
বিমান বাহিনীতেও বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য নীতি অনুসরণ করা হয়। বিমান বাহিনীতে মাত্র ১১% বাঙালি পাইলট অফিসার এবং ১.৭% বাঙালি টেকিনিশিয়ান ছিল। পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের মোট ৭,২৮০ জন লোকের মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ২৮০ জন এবং পি.আই.এ’র ১০ জন পরিচালকের মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন বাঙালি এবং ৫ জন এরিয়া ম্যানেজারের মধ্যে সবাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি ।
পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের ১০৩ জন বিমানবালার মধ্যে মাত্র ৪ জন ছিল বাঙালি। শুধু সৈনিক ও অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রেই নয়, পূর্বাঞ্চলের জন্য যথাযথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান কখনো দৃষ্টিপাত করেনি। ফলে পুর্ববাংলার সীমান্ত সবসময় অরক্ষিত থাকতো। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়।
এ সময় পূর্ববাংলা দীর্ঘদিন যাবৎ অরক্ষিত ছিল। আবার পাকিস্তানের সামরিক, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদর দফতর পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত হওয়ায় নিয়োগ, বদলীর ক্ষেত্রে বাঙালিরা হয়রানির শিকার হতো। শুধু তাই নয়, বেতন-ভাতা, বদলী প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো।
সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য
পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে সামাজিক বৈষম্যও প্রকট রূপ লাভ করেছিল। সরকারের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পরিকল্পনাগত বৈষম্যের কারণে পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের সমাজ জীবন ছিল দু’ধরনের। শাসক মহলের উদ্দেশ্য ছিল, বাঙালিদেরকে অভাব-অনটনে ও রোগগ্রস্থ রাখতে পারলে তারা রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবে না।
এজন্য কৌশলে পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা হতো এবং তা বাঙালিদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টা করা হতো। রাস্তাঘাট, স্কুল- কলেজ, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, ডাকঘর, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাঙালিদের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা বেশি সুবিধা ভোগ করতো।
আবার বিভিন্ন সমাজ কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল পশ্চিমাদের সেবার লক্ষে। যুবসমাজের উন্নতির জন্য পূর্ব পাকিস্তানে কোন ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। ফলে সার্বিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত ছিল ।
সাংস্কৃতিক বৈষম্য ও নিপীড়ন
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাঙালিদের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা বেশি সুবিধা ভোগ করতো। পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র উল্লেখযোগ্য খেলার মাঠ ছিল ঢাকা স্টেডিয়াম। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে এ ধরনের অনেকগুলো স্টেডিয়াম ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে খেলাধুলার জন্য কোন ভাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল না। সরকার কখনোই এ ব্যাপারে বাঙালিদের উৎসাহ দেয়নি।
এছাড়াও, পূর্ব পাকিস্তানে বৃদ্ধ ও শিশুদের মানসিক ও শারীরিক উন্নতির জন্য ভাল পার্ক, অবসর বিনোদনের স্থান, শিশুপার্ক ইত্যাদির অভাব ছিল। এ অঞ্চলে যুবকদের আনন্দ বিনোদনের যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল। সাংস্কৃতিক বৈষম্যের তুলনায় বাঙালিদের ওপর সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ছিল খুবই অমানবিক। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে পাকিস্তানের দু’অংশের মধ্যে দু’ধরনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিরাজমান ছিল।
কিন্তু শাসক মহল শুরু থেকেই বাঙালিদের সাংস্কৃতিকে মুছে ফেলে উর্দু সংস্কৃতিকে এদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা চালায়। তাই ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের মাত্র ৭% লোকের ভাষা উর্দুকে ৫৬% লোকের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে চাইল। অবশ্য এক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার দামাল ছেলেরা শাসকচক্রের হীন চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছিল।
বাঙালির সংস্কৃতির ওপর আবার আঘাত আসে ১৯৫৬ সালে। এ বছর পূর্ববাংলার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান । বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বড় ধরনের আঘাত আসে ১৯৬৭ সালে। এ বছর আইয়ুব সরকার রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং একই বছর ‘বাংলা নববর্ষ’ উদযাপনও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
এছাড়া সরকার সর্বদা বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার চক্রান্তে লিপ্ত থাকতো। কিন্তু সরকারের এরূপ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি সর্বদা সচেতন ও সক্রিয় ছিল।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া
বেশ কয়েকটি পর্যায়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়-
ভাষা আন্দোলন:
পাকিস্তানি শাসকদের শাসন, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় প্রথম প্রতিবাদ গড়ে ওঠে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে নিয়ে। দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরপরই এর রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তানের ৫৬% লোকের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে এর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
এ প্রতিবাদ ক্রমে প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপলাভ করে এবং অবশেষে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান বিরোধী সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে পরিণত হয়। বস্তুতপক্ষে ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়েই বাঙালি পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে একত্রিত হওয়ার শিক্ষা লাভ করে এবং ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রথম অস্ত্রধারণ করে। ভাষা আন্দোলন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম বিজয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনী আন্দোলন:
পাকিস্তানের শাসন, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির দ্বিতীয় প্রতিবাদ ছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করা। এর মাধ্যমে বাঙালি প্রমাণ করল যে, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ বাঙালিদের পরম শত্রু।
আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন:
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করার বিরুদ্ধে বাঙালিরা আবার প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। তবে এ সময় রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ও দলীয় নেতাদের গ্রেফতার করার ফলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু এর মাঝেও ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন আঙ্গিকে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যাহত রাখে ।
ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলন:
পাকিস্তান সরকার কর্তৃক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো কঠোর প্রতিবাদ হচ্ছে ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবি উত্থাপন। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও ন্যায্য অধিকার সম্বলিত ছয় দফাভিত্তিক দাবি উত্থাপন করেন । এগুলোর সংক্ষিপ্তরূপ ছিল নিম্নরূপ-
ক. পূর্ববাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দাবি।
খ. কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি ।
গ. পূর্ববাংলা থেকে মূলধন পাচার রোধকল্পে পৃথক মুদ্রার প্রচলন বা বিশেষ শর্তে একক মুদ্রা চালু ।
ঘ. কর, ট্যাক্স, খাজনা ধার্য ও আদায়ে আঞ্চলিক সরকারকে ক্ষমতা প্রদান ।
ঙ. অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পৃথক হিসাব রাখা এবং
চ. পূর্ববাংলার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের অধিকার প্রদান ।
কিন্তু আইয়ুব খানের মতো স্বৈরশাসকের পক্ষে এর কোনটিই মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। ফলে একদিকে ছয় দফাভিত্তিক বাঙালির দাবি ও আন্দোলন জোরদার হতে থাকে, অপরদিকে সরকার আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে নির্যাতনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বস্তুতপক্ষে ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই পূর্ববাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে এবং এর চরম পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালে।
সারসংক্ষেপ
পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ে ওঠার সূচনালগ্ন থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলাকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে বিবেচনা করে এ অঞ্চলের মানুষকে রাজনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক, সামাজিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কৌশল অনুসরণ করতে থাকে।
বাঙালি তাদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়নকে কখনো সহজে মেনে নেয়নি। অবশেষে চরম ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে পাকিস্তানের শোষণ ও নির্যাতনের কবল থেকে আত্মরক্ষা করতে তথা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য সংক্ষেপে লিখুন।
২। প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য সম্পর্কে একটি টীকা লিখুন।
৩। পাকিস্তান আমলে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কি কি বৈষম্য করা হয়েছিল তার বিবরণ দিন।
রচনামূলক প্রশ্নঃ
১। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, প্রতিরক্ষা, শিক্ষাক্ষেত্রে বাঙালির ওপর পাকিস্তান সরকারের বৈষম্য নীতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিন ।
২। পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করুন।
