ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

 

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

 

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ঊনসত্তরে জনগণের আন্দোলন যে কেবল ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল তাই-ই নয়, এর মাধ্যমে আইয়ুব খানের শাসনামলে সাধিত ‘উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি’র যথার্থ রূপটিও পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে।

ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে যে প্রাথমিক ঘটনাবলির সূত্রপাত তা পরবর্তীকালে কেবলমাত্র ছাত্র সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিক-কৃষক ও ব্যাপক সাধারণ মানুষের মধ্যে। একটি সাধারণ দাবি- আইয়ুবের পতনকে কেন্দ্র করে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের দু’অংশের মানুষ এ সময়ে একযোগে পথে নামে। এ অভ্যুত্থানের পরিণতিতে শুধু আইয়ুব খানেরই পতন ঘটেনি বরং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।

অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট সূচিত হয় দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনা থেকেই। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার স্বায়ত্তশাসন ইস্যুতে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে থাকে। স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে ১৯৪৯ সালে পূর্ববাংলা থেকে সংগঠিত দাবি প্রথম উচ্চারিত হয়।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করে। তবে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে তদানীন্তন পূর্ববাংলায় আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে ১৯৫০ সালের সংবিধান প্রণয়নের লক্ষে গঠিত মৌলিক নীতিমালা কমিটি কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবের বিপক্ষে।

প্রস্তাবটিতে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলা হয় এবং প্রদেশসমূহকে কার্যকরীভাবে কোন স্বায়ত্তশাসন প্রদান করার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। তাই এ প্রস্তাবের বিপক্ষে পূর্ববাংলায় গড়ে ওঠে মৌলিক নীতিমালা কমিটি বিরোধী আন্দোলন। ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার কমিটির সুপারিশমালার ওপর গণপরিষদের আলোচনা স্থগিত রাখে।

পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বাঙালিদের দ্বিতীয় প্রতিবাদী ও প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে। পাকিস্তান সরকার বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত হানতে শুরু করে ১৯৪৮ সাল থেকে। এ সময় থেকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা মূলত বাংলা ভাষার প্রতি প্রকাশ্য হামলা।

তখন থেকে পূর্ববাংলার ছাত্র সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় উন্নীত করার দাবিতে পূর্ববাংলায় সরকার বিরোধী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন প্রকটরূপ লাভ করে।

ছাত্র সমাজ গঠন করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং এ পরিষদের উদ্যোগে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সমাজ সরকারের দেয়া ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন ছাত্র নিহত ও বহু ছাত্র আহত হয়। এর প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সমগ্র দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং পাকিস্তান সরকার প্রথমবারের মতো বাঙালিদের কঠোর আন্দোলনের মুখোমুখি হয়।

অবশ্য এ আন্দোলনে শেষপর্যন্ত বাঙালিদেরই বিজয় সূচিত হয় এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। অপরদিকে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই পূর্ববাংলায় পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকার তথা আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে জনগণকে উৎসাহিত করে।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। এ নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিরোধী দলগুলো যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয় এবং মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করে। যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৫ সালের ৩ এপ্রিল মন্ত্রিসভা গঠন করে। কিন্তু একমাস যেতে না যেতেই ৩০ মে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল ঘোষণা করে পূর্ববাংলায় গভর্নরের শাসন চালু করেন।

যুক্তফ্রন্ট সরকার ব্যর্থ হলেও নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ও যুক্তফ্রন্টের বিজয় বাঙালিদের মনে জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উৎসাহ প্রদান করে। পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয় ১৯৫৬ সালে। বিভিন্ন দিক থেকে এ সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়।

কিন্তু ‘৫৬ পরবর্তীকালে পূর্ববাংলায় দলবদলের প্রেক্ষাপটে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে কোন জোরালো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। উপরন্তু, ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তিন বছর পর গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।

কিন্তু তিন বছর পরও আইয়ুবের স্বৈরাচারী মনোভাব তথা নির্যাতন ও গ্রেফতারী নীতি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহল ও সর্বসাধারণকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এমনি মুহূর্তে ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হয়। এ সংবাদ পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

এটাই আইয়ুবের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য আন্দোলন এবং এ আন্দোলনের পথ ধরেই ‘৬০-এর দশকে আইয়ুব বিরোধী ঘটনাবহুল আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক আইনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং সরকারের কতিপয় আমলা ছাত্রদের হাতে নাজেহাল হন। এভাবেই শুরু হল বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন ।

১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান পাকিস্তানের দ্বিতীয় সংবিধান ঘোষণা করেন। সংবিধানে পুর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত শাসনাধিকারের বিষয়টি দারুনভাবে উপেক্ষিত এবং দেশে কঠোর একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাই এ সংবিধানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে নতুন করে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ইতোপূর্বে শেখ মুজিবুর রহমান সহ কতিপয় নেতাকে গ্রেফতার করা হলে সেটাও আন্দোলনের ইস্যুতে যুক্ত হয় ।

তাই নতুন সংবিধান বাতিল, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব সহ গ্রেফতারকৃত নেতাদের মুক্তির দাবিতে ১৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। এদিন পুলিশী নির্যাতনের প্রতিবাদে ২৪ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। অবশেষে ব্যাপক আন্দোলন ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়ে আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে ৮ জুন সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন।

আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্ৰ করে। আগস্ট মাসে এ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে ছাত্ররা নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেয়। কেননা এ কমিশনে পূর্ববাংলার স্কুল, কলেজ শিক্ষাকে সংকুচিত করা হয়েছিল। ঢাকা কলেজ থেকে শুরু করে আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা ধর্মঘট আহ্বান করে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্ররা দেশব্যাপী হরতাল ডাকে। এদিন ছাত্রদের সাথে উৎসাহ নিয়ে যোগ দেয় দেশের সাধারণ মানুষ। এ দিনের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে তিন জন নিহত সহ দু’শতাধিক আহত হয়। উত্তেজিত ছাত্ররা আইয়ুবের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয় এবং তার কুশপুত্তলিকা দাহ করে।

১৯৬২ সালে সামরিক আইন প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মুক্তি এবং দলীয় কার্যক্রমের কিছুটা সুযোগ দেওয়া হলে পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয়। ১৯৬২ সালে ফজলুল হক এবং ‘৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করলে মূলত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন শেখ মুজিবুর রহমান (আওয়ামী লীগ সভাপতি) এবং মাওলানা ভাসানী (ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ সভাপতি)।

ইতোমধ্যে শেখ মুজিব নেতৃত্ব গ্রহণ করে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী ভিত্তিতে দাঁড় করান। ১৯৬৪ সালে ‘ভোটাধিকার কমিশনের’ রিপোর্টকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন আবার জোরদার হতে থাকে । কমিশন অন্যান্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের কথা সুপারিশ করলেও পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরোক্ষ নির্বাচনের সুপারিশ করলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে।

১৯৬৪ সালের ১১ মার্চ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয়। এ কমিটি প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের দাবি নিয়ে ১৯ মার্চ হরতাল আহ্বান করে। এ দিন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ৬৪ সালে এক উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটে ১৬ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে।

এ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো থেকে কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করলে সেখানে উত্তেজনা দেখা দেয়। ২২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে গভর্নর মোনায়েম খান বাধার সম্মুখীন হন। এদিন পুলিশ ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে কয়েকশত ছাত্রকে গ্রেফতার করে।

এর প্রতিবাদে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করলে পরের কয়েক দিনে সারা প্রদেশে ১৪ শত স্কুল ও ৭৪টি কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ১২শত ছাত্র গ্রেফতার হয়। ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও গ্রেফতার হন। ২৯ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন করে। ১৯৬৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চলতে থাকে।

২৯ আগস্ট ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশী নির্যাতন ও ছাত্র নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতারা মিলিতভাবে ২২ দফা দাবিনামা রচনা করে। দাবিগুলো ছাত্র-স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হলেও এতে স্বৈরাচারের অবসান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, রাজবন্দীদের মুক্তি প্রভৃতি রাজনৈতিক ইস্যুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

 

বস্তুতপক্ষে, এ সময় থেকেই ছাত্রদের স্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ করা হয়। ২২ দফা দাবি নিয়ে ছাত্ররা ১৭ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষা দিবস’ পালন করে এবং এ দিন থেকে আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। সরকার পরদিনই পূর্ব পাকিস্তানের সকল স্কুল-কলেজ ও ১৯ তারিখে ঢাকা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে।

ছাত্র আন্দোলনের সংবাদ ছাপানোর ব্যাপারে পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এতকিছু করেও সরকার আন্দোলন দমাতে পারেনি। ক্রমে ছাত্র আন্দোলন জাতীয় আন্দোলনে একত্রীভূত হয়ে বিশাল রূপ ধারণ করে। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতায় পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের বৈষম্যের চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন এবং আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের কঠোর সমালোচনা করতে থাকেন যা পূর্ববাংলার জনসাধারণকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। এ সময় ১৯৬৬ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে বাংলার প্রতি অবহেলার চিত্রটি পূর্ববাংলার জনগণকে হতাশ করে এবং তাদের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি জোরালো হয়ে ওঠে।

যুদ্ধ শেষে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে এক কনফারেন্সে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার সম্বলিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু চরম বিরোধের মুখে ছয়দফা দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল-

১. লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক ফেডারেল সরকার গঠন ও পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান ।

২. দেশ রক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ব্যতীত অন্যান্য ব্যাপারে আঞ্চলিক সরকারকে ক্ষমতা প্রদান ।

৩. পাকিস্তানের দু’অঞ্চলে পৃথক মুদ্রা চালু অথবা বিশেষ সাপেক্ষে একই মুদ্ৰা বহাল ।

৪. কর ধার্য ও আদায়ে আঞ্চলিক সরকারকে ক্ষমতা প্রদান।

৫. বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অঞ্চলকে স্বাধীনতা প্রদান।

৬. পূর্ব পাকিস্তানের জন্য মিলিশিয়া বাহিনী গঠনের অনুমতি প্রদান।

গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল আইয়ুব খানের শাসনামলে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও জঙ্গী আন্দোলন। এটি শুরু হয়েছিল সরকারি নির্যাতনবিরোধী একটি সাধারণ লড়াই হিসেবে। কিন্তু অচিরেই স্বত:স্ফূর্ত আন্দোলনের রূপ নিয়ে তা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামে-গঞ্জে। আন্দোলনের চরিত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ব্যাপক গণজাগরণের মধ্যদিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের তাৎপর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রথমত, গণআন্দোলন সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গেলেই বলতে হয় ১১ দফার কথা। এ কর্মসূচির ফলে ছাত্র সমাজ স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ ও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। ১১ দফা ও ৬ দফার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দেশব্যাপী এক প্রচন্ড গণবিপ্লবের সৃষ্টি হয়। এ গণআন্দোলনের গতি-প্রকৃতি লক্ষ করে ক্ষমতাসীন সরকার দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং তা প্রতিহত করতে পাক সরকার হত্যা ও নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

ফলে আন্দোলন আরো তীব্র ও জোরালো হতে থাকে এবং সমগ্র দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইয়ুব খান মুজিব সহ সকল রাজবন্দিদের বিনাশর্তে মুক্তি প্রদান করেন। তীব্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান শেষপর্যন্ত ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

দ্বিতীয়ত, এ আন্দোলনের সুফল হিসেবে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের স্বীকৃতি মিলে।

তৃতীয়ত, এ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শ্রেণী চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং শ্রেণী সংগ্রামের আংশিক বিকাশ সাধিত হয়।

চতুর্থত, এ আন্দোলনের ফলে সবচেয়ে বড় লাভ হলো স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালিদের যে জাতীয়তাবোধ ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছিল তা পূর্ণতা লাভ করে। এ আন্দোলনের মধ্যদিয়েই বামপন্থীদের বৃহৎ অংশ এবং ডানপন্থী সংগঠনভুক্ত সদস্যদের মধ্যে পূর্ববাংলায় পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়।

ছাত্রলীগের সভায় স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার চেতনা জনপ্রিয়তা লাভ করে, যার ফলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

পঞ্চমত, ১৯৬৯- এর গণঅভ্যুত্থান জাতীয় চেতনার প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল। ‘৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ২১ ফেব্রুয়ারিকে ছুটির দিন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ‘৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর এ ছুটি বাতিল হয়ে যায়। ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্বের মর্যাদা ফিরে পায় ।

ষষ্ঠত, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয়। বাঙালিদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং বাঙালি জাতির স্বাধিকার অর্জনের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সর্বদা অটল এবং প্রতিবাদমুখর। ‘৬৯-এর গণআন্দোলন শেখ মুজিব সহ আওয়ামী লীগ নেতাদের মুক্তির পথ সুগম করেছিল।

মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিব বাঙালির স্বার্থ রক্ষায় সদা সজাগ ও সক্রিয় ছিলেন। এরফলে তাঁর জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে সমাজতান্ত্রিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আর ‘৭০-এর নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে শেখ মুজিব সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও আদর্শকে সংযুক্ত করায় বামপন্থীদের সমর্থন লাভ করেন।

সর্বোপরি ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে পূর্ববাংলায় যে জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে ‘৭০-এর নির্বাচনে তা পুরোপুরি আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যায়। আর এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সরকারের নির্যাতন, নিপীড়ন আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করতে উৎসাহী করেছিল। মোটকথা, সরকারের জনবিদ্বেষী নীতি ও শেখ মুজিবুর রহমানের জনমুখী চরিত্র ‘৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে সহজ করেছিল।

সারসংক্ষেপ

১৯৬৯-এর গণআন্দোলন ছিল পূর্ববাংলার ইতিহাসে বিভিন্ন আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি ভিন্ন চরিত্রের আন্দোলন এবং নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের ২২ বছরের গণআন্দোলনসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ আন্দোলনের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং শেষপর্যন্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনে সক্ষম হয়েছিল।

‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান বাঙালি জাতির জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটিয়েছিল এবং স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। এজন্য পূর্ববাংলার ওপর থেকে পশ্চিমা স্বার্থান্বেষী মহলের আধিপত্যের অবসান এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের পেছনে ‘৬৯-এর গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব অপরিসীম।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। লেনিন আজাদ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, রাষ্ট্র সমাজ ও রাজনীতি, ইউপিএল, ঢাকা ১৯৯৭।

২। মেজবাহ কামাল, ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একটি সমীক্ষা’, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি পত্রিকা ।

৩। মোহাম্মদ ফরহাদ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৮৯।

৪। মওদুদ আহমদ (অনুবাদ: জগলুল আলম), বাংলাদেশ : স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ইউপিএল, ঢাকা ১৯৯২ ।

 

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম পর্যায় সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।

২। গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায় সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখুন।

৩। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পেছনে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করুন ।

রচনামূলক প্রশ্ন:

১। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট আলোচনা করুন ।

২। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের বিকাশ সংক্ষেপে আলোচনাপূর্বক এর গুরুত্ব মূল্যায়ন করুন।

Leave a Comment