সৈনিক ও পুলিশের প্রতিরোধ

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় সৈনিক ও পুলিশের প্রতিরোধ

সৈনিক ও পুলিশের প্রতিরোধ

 

সৈনিক ও পুলিশের প্রতিরোধ

 

সৈনিক ও পুলিশের প্রতিরোধ

পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে বাঙালি নিধনযজ্ঞে নামার সাথে সাথেই প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। পাকবাহিনীর মার খেয়ে পালিয়ে ঘরে না গিয়ে হাতের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে ছাত্র, শ্রমিক, জনতা এবং সেনাবাহিনীর চাকরিরত বাঙালি সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

অনেকে তাদের পাখি মারা বন্দুক দিয়ে, কেউ কেউ হাতের কাছের অস্ত্র দিয়ে, কেউ কেউ থানা বা ট্রেজারি থেকে অস্ত্র নিয়ে বের হয়। এ বিপুল সাহস, উৎসাহ, উদ্দীপনায় বলীয়ান হয়ে সামান্য রাইফেল, বন্দুক নিয়ে আধুনিক মারণাস্ত্রে সুসজ্জিত পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রচনা করে। বাংলাদেশের অনেক স্থানে এসব বাহিনীর সদস্যরা জনগণকে সাথে নিয়ে উল্টো পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ করে তাদের পর্যুদস্ত করে।

প্রতিরোধের এ লড়াই চলে ২৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণের দিন পর্যন্ত। অবশ্য কোথাও কোথাও প্রতিরোধকারীরা এতোই শক্তিশালী ছিল যে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিজেদের এলাকা শত্রুমুক্ত রাখে। মুজিবনগর সরকার সেক্টর গঠনের পর প্রতিরোধ পর্যায়ের যুদ্ধের অবসান ঘটে, শুরু হয় পরিকল্পিত ও সংগঠিত যুদ্ধ।

সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান ও সংখ্যা

পাকিস্তান সরকারের বৈষম্য নীতির ফলে সামরিক বাহিনীতে বাঙালি নিয়োগ ছিল খুব সামান্য। সামরিক বাহিনীর সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে মাত্র ৪% ছিলেন বাঙালি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে গঠিত হয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড। গোলন্দাজ বাহিনীর ব্রিগেড ছিল ঢাকা, যশোর, রংপুর, সৈয়দপুর সব মিলিয়ে বাঙালি সৈন্য ছিলেন মাত্র ৬,০০০ জন।

সেনাবাহিনী ছাড়া তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর, বর্তমান বিডিআর)-এ প্রায় ১৫,০০০ বাঙালি সৈনিক নিযুক্ত ছিলেন। এদের বড় অংশ সীমান্ত এলাকায় অবস্থানের ফলে তাদের পক্ষে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া সহজ ছিল। পুলিশ বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে মোট পুলিশের সংখ্যা ছিল ৩৩,৯৯৫ জন।

এর মধ্যে সশস্ত্র পুলিশ ২৩,৬০৬ জন এবং বাকিরা অস্ত্র সজ্জিত না হলেও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ছিল। এসব পুলিশের অনেকেই প্রতিরোধ ও পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। অবশ্য স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে এদের অনেকে গণহত্যার শিকার হন। আনসার, মুজাহিদদের কয়েক হাজার, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, পুলিশ, পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন, ছুটিতে আসা বাঙালি সৈনিকরা যুদ্ধে যোগ দেন।

এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যরা মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে সমস্ত স্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের ফলে সংখ্যায় প্রায় দ্বিগুণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে।

পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার সূচনা এবং সামরিক বাহিনীর প্রতিরোধ

পাকিস্তান সরকার ১৯৭০ সালের নির্বাচনের রায় অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন না করতে দেয়ার পরিকল্পনা হিসেবে অসহযোগ আন্দোলন দমনের নামে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাসহ বিভিন্ন শহরে বাঙালি নিধনে মেতে ওঠে। ১৫ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকের আড়ালে কালক্ষেপণ করে সৈন্য সমাবেশ করা হয় এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র সম্ভার এনে গণহত্যার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।

এই সময়ে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত ও অনুমোদিত হয়। অপারেশন সার্চলাইট অনুযায়ী ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর, কুমিল্লাসহ সেনানিবাস, ইপিআর সদর দপ্তর পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ সব সেনা, ইপিআর ও পুলিশ অবস্থান ঢাকা, রাজশাহী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আক্রমণ চালানো হয়। যদিও মধ্যরাত থেকেই পাকিস্তানি অভিযান ও পুলিশের প্রতিরোধ সমানতালে চলতে থাকে।

ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর প্রতিরোধ

পিলখানা: সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ইপিআর-এর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এরা ছিল অগ্রণী। প্রাথমিক পর্যায়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদের বড় অংশও এদের মাধ্যমে এসেছে। ২৫ মার্চ ঢাকার পিলখানায় ২৫০০ ইপিআর সদস্য অবস্থান করছিলেন। ঢাকা সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসা পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি দল পিলখানা আক্রমণ করে।

বাঙালি সৈন্যরা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে এবং পাকিস্তানি হানাদার ও বাঙালি ই.পি.আর সদস্যদের মধ্যে যুদ্ধ সারা রাত ধরে চলে । শত শত বাঙালি সৈন্য নিহত হন। ২৬ মার্চ ট্যাংক বাহিনী পাকিস্তানি সৈন্যদের সহায়তায় পিলখানায় এলে বাঙালি সৈন্যরা অসম যুদ্ধে টিকতে না পেরে পিছু হটে যায়। পিলখানায় বাঙালি সৈন্যদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্বে এই প্রতিরোধ যুদ্ধে বীরত্ব বাঙালি জনগণকে অনুপ্রাণিত করে ।

চট্টগ্রাম সেনানিবাস : ২৫ মার্চ রাত ১১টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চট্টগ্রাম সেনানিবাস আক্রমণ করে। প্রায় ১০০০ বাঙালি সৈন্যকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে। চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২৫০০ বাঙালি সৈন্য ছিল। বাঙালি সৈনিকরা মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ষোলশহরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

চট্টগ্রাম ইপিআর সেক্টরের প্রতিরোধ: চট্টগ্রামের ইপিআর সেক্টরের এডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রফিক ২৫ মার্চ রাতের প্রথম প্রহর থেকে বিদ্রোহ করেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানি ইপিআর সৈন্যদের নিরস্ত্র করেন। এরপর ২/৩ দিন তিনি চট্টগ্রাম শহর দখলে রাখেন। এসময় কুমিল্লা থেকে আরো পাকিস্তানি সৈন্য এনে সমাবেশ করা হয়।

২৬ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে চট্টগ্রামের কুমিরায় ইপিআর-এর যুদ্ধ হয়। এ অভিযানে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া নেতৃত্ব দেন। প্রায় ২০০ পাক সেনা নিহত হয়। ৩১ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী ইপিআর সেক্টর আক্রমণ করে এবং ইপিআর বাহিনী প্রতিরোধ করলেও সংখ্যা ও শক্তির দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় পিছু হটে যায়।

রাজশাহী: রাজশাহী শহর ছিল ইপিআর সেক্টর সদর দপ্তর। ২৬ মার্চ থেকে সেক্টর সদর দপ্তরের সকল বাঙালি বন্দি হয়ে যান। কেউ কেউ পালিয়ে বেসামরিক পোশাকে জনতার সঙ্গে মিশে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৭ মার্চ সুসজ্জিত পাকবাহিনী রাজশাহী শহর দখল করে। ২৭ মার্চ রাজশাহীর বাঙালি ইপিআর সদস্যরা নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইপিআরদের সঙ্গে যোগ দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

 

অবশ্য রাজশাহীতে এপ্রিলের ৬ তারিখে ক্যাপ্টেন গিয়াসের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। ৪ ঘন্টা স্থায়ী যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে উপশহরে সামরিক ছাউনিতে আশ্রয় নেয়। ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত রাজশাহী শহর মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে থাকে।

১১ এপ্রিল থেকে আবার তুমুল যুদ্ধ হয় এবং ১৪ এপ্রিল পাকবাহিনীর সর্বাত্মক আক্রমণে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা চাঁপাইনবাবগঞ্জে সরে যান। রাজশাহী শহর পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়।

নওগাঁ: ২৬ মার্চ নওগাঁর ইপিআর উইং-এর বাঙালি সৈন্যরা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ঐ রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী উইং আক্রমণ করলে তাঁরা অস্ত্রাগার খুলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এছাড়া ক্যাপ্টেন গিয়াস ও মেজর নাজমুল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিলে প্রতিরোধ শক্তিশালী হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ: ২৭ মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ইপিআর উইং-এর বাঙালি সৈন্যরা অবাঙালি ইপিআরদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

এসময় বাঙালি ইপিআর সদস্যরা অস্ত্রাগার খুলে দিলে জনতা-ইপিআর যৌথভাবে আক্রমণ চালায়। অবশেষে অবাঙালি ইপিআর সদস্যরা আত্মসমর্পণ করে। যদিও এপ্রিলের শুরু থেকে আবার পাকবাহিনী শক্তি সঞ্চয় করে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়।

১৭ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর বিমানের গুলিবর্ষণের কারণে ক্যাপ্টেন গিয়াস তাঁর বাহিনীসহ ভারতে আশ্রয় নেন। যদিও এতোদিনের প্রতিরোধ যুদ্ধে জয়ী হয়ে তাঁর বাহিনী ৩০০০ রাইফেল, স্টেনগান ও এল.এম.জি. লাভ করে যা ভারতে নিয়ে যান।

দিনাজপুর: দিনাজপুর ইপিআর বাহিনীর সেক্টর হেড কোয়ার্টার ছিল। আক্রমণের আশংকায় ২৮ মার্চ হাবিলদার আবু সাঈদ বাঙালি সৈনিকদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণ করে প্রস্তুত থাকেন। রাত তিনটায় পাকবাহিনী সেক্টর আক্রমণ করলে পাল্টা গুলিবর্ষণ করা হয়। ঐদিনের প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি ইপিআররা পাকিস্তানি দের পিছু হটিয়ে দেন। অবশ্য ৩১ মার্চ পর্যন্ত যুদ্ধ চলে।

ঐদিনই বাঙালি প্রতিরোধকারীদের হাতে দিনাজপুর শহরের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে। পাকিস্তানি বাহিনীর সকলে সৈয়দপুর পালিয়ে যায়। মূলত আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর, জনতার সহযোগিতায় এই সাফল্য বয়ে আসে। ১৬ এপ্রিল পাকবাহিনী দিনাজপুর দখলের আগে পর্যন্ত তা মুক্তিবাহিনীর দখলে ছিল।

ঠাকুরগাঁ: ২৮ মার্চ ইপিআর বাহিনীর ঠাকুরগাঁ উইং-এ বাঙালি ও অবাঙালি ইপিআর-এর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং ২৯ মার্চ সারা দিন যুদ্ধ চলে । স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র-জনতা বাঙালি ইপিআরদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। বাঙালি ইপিআররা উইং-এর কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেন। ১০৪ জন পাকিস্তানি ইপিআর সহ মোট ১১৫ জন নিহত হয়। জীবিত অবাঙালি ইপিআরদের বন্দি করা হয়।

রংপুর: রংপুর ছিল ইপিআর বাহিনীর ১০ নম্বর উইং সদর দপ্তর। এছাড়া রংপুরে সেনানিবাসও ছিল। ২৫ মার্চ রাত ১২টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী রংপুরে বাঙালি ইপিআরদের ওপর আক্রমণ চালায়। ইপিআরদের আগেই নিরস্ত্র করায় তারা তেমন প্রতিরোধ করতে পারেননি। অনেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ২৯ মার্চ জয়মনিরহাটে পলায়নরত ৮ জন অবাঙালি ইপিআরের সঙ্গে বাঙালি ইপিআরদের সংঘর্ষে ৮ জনই নিহত হয়।

১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবেলায় বাঙালি ইপিআর বাহিনী আরো সাফল্য লাভ করে। ঐদিন তিস্তা ব্রিজের যুদ্ধে একজন পাক মেজর সহ ১৫ জন পাক সেনা নিহত হয়। এরপর ৪, ৭ ও ৮ এপ্রিল পর্যন্ত কালিগঞ্জ থানা, লালমনিরহাটে বাঙালি ইপিআর বাহিনীর সঙ্গে পাকবাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধ হয়।

পুলিশ বাহিনীর প্রতিরোধ

১৯৭১ সালের প্রথম থেকেই পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশ বাঙালি জাতির স্বাধীনতার প্রতি একাতা ঘোষণা করে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংগ্রাম কমিটি ও স্থানীয় ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এ পর্যায়ে পুলিশ বাহিনী অনেক জায়গায় সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে, ট্রেনিং ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে।

কোন কোন স্থানে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে সরবরাহকৃত পুলিশের অস্ত্র দিয়ে ট্রেনিং চালানো হয়। অন্যদিকে ট্রেনিং-এর সংবাদ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন রেখেও পুলিশ সহযোগিতা করে। বিভাগ, জেলা পর্যায়ে সামরিক জান্তার নির্দেশ অমান্য করে অস্ত্র জমা না দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পুলিশ বাহিনী প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়।

পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে পুলিশের এই প্রস্তুতি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ২৫-২৭ মার্চের মধ্যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, ময়মনসিং, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর ও রংপুর সহ বিভিন্ন পুলিশ ব্যারাক, থানা ও উল্লেখযোগ্য পুলিশ এলাকায় আক্রমণ চালিয়ে বহু পুলিশকে হত্যা করে।

পুলিশ বাহিনী এসব এলাকায় শুধু ৩০৩ রাইফেল সম্বল করে সুসজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রচনা করে এবং বহু পাকিস্তানি সৈন্যকে হতাহত করে। যদিও প্রাথমিক প্রতিরোধের সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী। শুধু মনোবল সম্বল করে যুদ্ধে পুলিশ সে সময় বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। পুলিশ বাহিনী এরপর বিভিন্ন রণাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে যুদ্ধে কৃতিত্ব প্রদর্শন করে।

স্থানীয় ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে ট্রেনিং প্রদান, রণাঙ্গনে এবং মুজিবনগর প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডে পুলিশ বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ বাহিনীর ১৫১ জন অফিসার বিভিন্ন সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধ করেন।
রাজারবাগ পুলিশ লাইন: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাকবাহিনী গণহত্যা চালায়।

গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে তারা সে রাতে প্রথমেই রাজারবাগ সহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশ ব্যারাক ও পুলিশের লক্ষবস্তুতে আক্রমণ চালায়। রাত বারোটার মধ্যেই ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রথম আক্রমণ চালায়। পুলিশের প্রতিরোধের মুখে প্রথমে হামলাকারীরা সুবিধা না করতে পারলেও পরে ভারী অস্ত্র সহ আক্রমণ করলে অনেক পুলিশ শহীদ হন।

প্রতিরোধ রচনা এবং আক্রমণে সে রাতে শহীদ হন ৩৯ জন বীর পুলিশ, আহত ও গ্রেফতার হন আরো অনেকে। রমনা থানায় ডিএসপি জিয়াউল হক লোদী তাঁর পুলিশ ফোর্স নিয়ে প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এ সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ নিহত ও বন্দি হন। জিয়াউল হক লোদী স্বাধীনতার পরপর মিরপুরে বিহারিদের সঙ্গে সংঘর্ষে শহীদ হন।

পাকবাহিনী ২৫ মার্চ রাতেই শাখারিবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ চালিয়ে কয়েকজন পুলিশকে হত্যা করে। সে রাতেই পুলিশ মিরপুর ও বংশালে প্রতিরোধ রচনা করে। যদিও শেষপর্যন্ত টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়। সূত্রাপুর, ফরিদাবাদ সহ ঢাকার সকল পুলিশ ফাঁড়ি ও থানা ২৫ মার্চেই পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

দামপাড়া, চট্টগ্রাম: ঢাকার পরই সবচেয়ে বেশি গণহত্যা সংঘটিত হয় চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ ব্যারাক। ২৫ মার্চ রাতেই পাকবাহিনী দামপাড়া পুলিশ ব্যারাকে আক্রমণ চালায়। চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত এই বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে বহু পুলিশ প্রাণ হারান। ২৯ মার্চ পর্যন্ত চলে পাকবাহিনীর তান্ডব। একদিনেই পাকবাহিনী পুলিশসহ ৮১ জনকে হত্যা করে।

দামপাড়া ছাড়া চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের কাছে পাকবাহিনী বাধার সম্মুখীন হয়। চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং-এর সামনে কোতোয়ালী থানার তৎকালীন ওসি আবদুল খালেকের নেতৃত্বে পুলিশের সঙ্গে পাকবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। ওসি খালেক পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।

তাঁকে জীপের পেছনে বেঁধে রাস্তায় ছেঁচড়িয়ে নিয়ে যায় এবং নির্যাতন শেষে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অপরাধে চট্টগ্রামের এসপি শামসুল হক এবং আরআই আকরাম খানকে পাকবাহিনী হত্যা করে ।

ফেনী: ফেনীতেও পুলিশ বাহিনী প্রথম থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২৯ মার্চ ফেনীতে পুলিশের প্রথম প্রতিরোধ সফল হয়। পুলিশ-জনতার যৌথ আক্রমণে সেদিন পাকবাহিনীর ৯ জন সদস্য মারা যায়। ফেনীর মহকুমা পুলিশ অফিসার মোহাম্মদ আলী ফেনীতে রক্ষিত পুলিশের যাবতীয় অস্ত্র স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন। ফেনী ত্যাগের আগে প্রায় ১০০ জন পুলিশ ক্যাপ্টেন রবের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন।

বরিশাল: বরিশালে পুলিশ বাহিনীর সাব-ইন্সপেক্টর মুহাম্মদ বাদশা মিয়া, সুবেদার আকবর মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং-এ ভূমিকা রাখেন। বরিশালের এসপি ফখরুদ্দিন, অতিরিক্ত এসপি গোলাম হোসেন (শহীদ) মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখেন। পুলিশের ৫০০ রাইফেল মার্চ মাসেই স্থানীয় এমসিএ নূরুল ইসলাম মঞ্জুরকে দেয়া হয়।

গোলাম হোসেন এপ্রিলে পাক সেনার হাতে ধরা পড়েন এবং নিখোঁজ হন। পিরোজপুরের মহকুমা পুলিশ অফিসার ফয়জুর রহমান আহমদ এবং দূর্নীতি দমন বিভাগের কর্মকর্তা হীরেন্দ্র মহাজনকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অপরাধে পাক সৈন্যরা হত্যা করে।

সারসংক্ষেপ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে সশস্ত্র পাকবাহিনী বাঙালি নিধনযজ্ঞে নামার সাথে সাথে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, দিনাজপুরে প্রতিরোধ বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠলেও সবগুলো ঘটনার মূল উৎস ছিল ইপিআর হেডকোয়ার্টার পিলখানা ও পুলিশ সদর দপ্তর রাজারবাগ। পাকিস্তানিদের পিলখানা ও রাজারবাগ আক্রমণের খবর সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বাঙালি সশস্ত্র ব্যক্তিরা অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসে।

প্রাথমিক পর্যায়ে সমগ্র বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা লক্ষ করা গেছে তাহলো সবাই কেবল আত্মরক্ষার তাগিদেই অস্ত্র হাতে অগ্রসর হয়েছেন। এ প্রতিরোধ ছিল বিচ্ছিন্ন। সশস্ত্র প্রতিরোধ বা যুদ্ধের জন্য যে প্রস্তুতি থাকার প্রয়োজন তা ছিল না। তাই প্রতিরোধ সহজেই ভেঙ্গে যায় এপ্রিল মাসে। অবশ্য মে মাসে সেক্টরগুলো ক্রিয়াশীল হলে পরিকল্পিত যুদ্ধ শুরু হয়।

 

সৈনিক ও পুলিশের প্রতিরোধ

 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, পঞ্চম খন্ড, ঢাকা, তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮৪ ৷

২। রফিকুল ইসলাম পিএসসি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রতিরোধের প্রথম প্রহর, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯১।

৩। বাংলাদেশ রাইফেলস, মুক্তিযুদ্ধ ও রাইফেলস, ঢাকা, ১৯৭৭।

৪। আবু মো:দেলোয়ার হোসেন, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৫।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ

১। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে অবস্থানরত বাঙালি সৈন্য, ইপিআর ও পুলিশের অবস্থান ও সংখ্যা সম্পর্কে লিখুন ।

২। ইপিআর পিলখানা ও চট্টগ্রামে কিভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।

৩। কুষ্টিয়ায় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ইপিআর-এর প্রতিরোধ সম্পর্কে টীকা লিখুন।

৪। রাজারবাগ ও চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনে পুলিশের প্রতিরোধ সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা দিন ।

রচনামূলক প্রশ্নঃ

১। ১৯৭১ সালের মার্চ-মে মাস পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সৈনিক ও পুলিশের প্রতিরোধ সংক্ষেপে বর্ণনা করুন ।

Leave a Comment