আজকে আমদের আলোচনার বিষয় উল্লেখযোগ্য রণাঙ্গন
উল্লেখযোগ্য রণাঙ্গন

উল্লেখযোগ্য রণাঙ্গন
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে পাকবাহিনী বাঙালি জাতির ওপর নৃশংস গণহত্যা শুরু করলে শত্রুদের কার্যক্রম প্রতিহত করতে প্রথমই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি ছাত্র-যুবক-জনতা। পাশাপাশি এগিয়ে এসেছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর-এর বীর যোদ্ধা, আনসার, পুলিশ ও মুজাহিদ সদস্যরা।
প্রথমত, ২৬ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিরোধ এবং দ্বিতীয়ত, মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পরিকল্পিত যুদ্ধ চলে। তৃতীয়ত, ডিসেম্বরের প্রথম থেকে সর্বাত্মক ও চূড়ান্ত যুদ্ধে পাকবাহিনী পরাজিত হয়। বাংলাদেশ হয় শত্রুমুক্ত।
মুক্তিযুদ্ধের রণনীতি ও রণকৌশল
সর্বপ্রথম যুদ্ধ শুরু হয় নিয়মিত পদ্ধতিতে অর্থাৎ প্রথাগত পদ্ধতিতে। এ পদ্ধতিতে যুদ্ধ চলে মে মাস পর্যন্ত। শত্রুকে ছাউনিতে যথাসম্ভব আটকে রাখা এবং যোগাযোগের কেন্দ্রগুলো তাদের কব্জা করতে না দেয়ার জন্য নিয়মিত পদ্ধতিতে যুদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা কম হওয়ায় মে মাসের শেষ নাগাদ গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
নিয়মিত ও গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালানোর ফলে জুন মাস থেকে ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধ চালানো সম্ভব হয়। ভারতীয় বাহিনী ৩ ডিসেম্বর থেকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার পর গঠিত হয় যৌথবাহিনী। মিত্র ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে যুদ্ধের রণনীতি নির্ধারণ করে। ইতোমধ্যে মুক্তিবাহিনী যেসব এলাকা মুক্ত করেছিল সেখানে মুক্তিবাহিনী নিজস্ব পরিচালনায় কাজ করেছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় শত্রুর শক্তিশালী ঘাঁটিকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে সামনে ব্যস্ত রেখে পিছনে বা অন্য দিক দিয়ে ধ্বংস করার কৌশল গৃহীত হয়। আর যেখানে অধিক শক্তি ও অস্ত্র প্রয়োজন সেখানে যৌথবাহিনী যুদ্ধ করে। এক্ষেত্রে ভারতীয় বাহিনী শত্রুর শক্তিশালী জায়গায় চাপ প্রয়োগ করতো ও মুক্তিবাহিনী পার্শ্ববর্তী বা পিছন দিক থেকে আক্রমণ করতো।
এভাবে যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকবাহিনীকে আটকে রেখে কিংবা ঘাঁটি থেকে বের করে এনে ধ্বংস কিংবা আত্মসমর্পণ করানো হয়।
১১টি সেক্টরের উল্লেখযোগ্য রণাঙ্গন ও যুদ্ধ
১ নম্বর সেক্টরের রণাঙ্গন ও যুদ্ধ
এই সেক্টরের উল্লেখযোগ্য রণাঙ্গন হচ্ছে কুমিরা যুদ্ধ ও মিরশ্বরাই যুদ্ধ।
কুমিরা যুদ্ধ: কুমিরা চট্টগ্রামের প্রবেশ দ্বার। ফেনী মিরশ্বরাই পার হয়ে এর অবস্থান। কুমিরায় শত্রুর বিরুদ্ধে ইপিআর সেনাদের যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম সরাসরি আক্রমণ। এই যুদ্ধের গুরুত্ব এতটা সুদূরপ্রসারী ছিল যে, এরপর পাকিস্তানি সৈন্যদের চট্টগ্রামে অবাধে কিছু করার মূল পরিকল্পনা ব্যাহত করে দেয়। কুমিরায় আগে থেকে প্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় পাকবাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়।
দু’ঘন্টা স্থায়ী যুদ্ধে পাকবাহিনী দু’টি ট্রাক রেখে পালিয়ে যায়। শত্রু বাহিনীর দু’জন অফিসারসহ মোট ১৫২ জন সৈনিক নিহত হয়। ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা এ যুদ্ধে শহীদ হন। এরপর যুদ্ধ আরো ৩ দিন চলে । ২৮ মার্চ আরো অধিক সৈন্য এনে তিন দিক থেকে পাকবাহিনী মুক্তিবাহিনীর অবস্থানে আক্রমণ চালায়। কুমিরা ২৮ মার্চ পাকিস্তান বাহিনীর দখলে চলে যায়।
কুমিরা পতনের পর হানাদার বাহিনী চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হয়। কুমিরা মুক্তিবাহিনী চূড়ান্তভাবে জয় করে ১৬ ডিসেম্বর।
মিরশ্বরাই থানা সদর প্রতিরোধ যুদ্ধ: মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও ইপিআর উইং সদর দপ্তরে পাকবাহিনীর আগমনের ফলে বাঙালি সৈনিকরা ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতৃত্বে মিরশ্বরাই থানা সদর আশ্রয় নেয় ও ঘাঁটি স্থাপন করেন।
২০ এপ্রিল অনেকগুলো ট্রাক, জীপ নিয়ে পাকবাহিনীর বিরাট একটি দল মুক্তিবাহিনীর অবস্থান আক্রমণ করে। কিন্তু আগে থেকে প্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধারা চার দিক থেকে তাদের আক্রমণ করে। সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা যুদ্ধ চলে। পাকবাহিনীর বেশ কয়েকজন সৈন্য এতে নিহত হয়। মুক্তিবাহিনীর দু’জন বীর যোদ্ধা শহীদ হন। ক্যাপ্টেন অলির ভাষায়, স্বাধীনতার শুরুর পর সম্ভবত এটিই ছিল মুখোমুখি লড়াইয়ে পাকিস্তানিদের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত ।
২ নম্বর সেক্টরের রণাঙ্গন ও যুদ্ধ
২ নম্বর সেক্টরে উল্লেখযোগ্য রণাঙ্গন হচ্ছে শালদা নদী কমপ্লেক্সের যুদ্ধ, বেলোনিয়া যুদ্ধ ও কসবা যুদ্ধ ।
শালদা নদী কমপ্লেক্স যুদ্ধ: ফেনীর শালদা নদী এলাকায় শত্রুদের ঘাঁটি ছিল খুবই শক্তিশালী। এই ঘাঁটির উত্তরে শালদা নদী, পূর্বে রেলওয়ে স্টেশন ও উঁচু রেল লাইন সম্মুখবর্তী এলাকা শত্রুর নিরাপত্তায় প্রাধান্য বিস্তার করে। এছাড়া পশ্চিমের গুদামঘরের উঁচু ভুমি তাদের শাক্তিশালী ঘাঁটি নিরাপত্তায় বেশ সহায়ক ছিল। নদীর তীরে তারা পরিখা খনন করে নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করে।
এমনি একটি কৌশলগত এলাকা পাকবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী উভয়ের জন্য জরুরি ছিল। তাই মুক্তিবাহিনী এ এলাকা দখলের জন্য বেশ কয়েকবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১০ জুন সংঘটিত বেলোনিয়ার যুদ্ধে ৩০০ পাক সেনা নিহত হয়। এর বদলা নিতে ১৯ জুলাই পাক সেনাদের একটি দল শালদা নদী দিয়ে পার হওয়ার সময় মুক্তিবাহিনী ব্যাপকভাবে আক্রমণ চালায়।
পাকবাহিনীর কর্নেল কাইয়ুম, কুমিল্লার ত্রাস ক্যাপ্টেন বোখারীসহ মোট ৬০/৭০ জন গুলিতে, কেউবা নদীতে ডুবে প্রাণ হারায়। এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মুক্তিবাহিনী মন্দভাগ ও শালদা নদীতে আরো শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে। পাক সেনারা জুলাই মাসের শেষের দিকে শালদা নদী পুনর্দখলের চেষ্টা করে। এবারের সংঘর্ষে ১২০ জন পাক সেনার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা লাভ করে।
বিক্ষিপ্তভাবে শালদা নদী এলাকায় যুদ্ধ সম্পূর্ণ জুলাই মাসে চলতে থাকে। এক পর্যায়ে বেলোনিয়া পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়। ক্যাপ্টেন গাফফার, ক্যাপ্টেন সালেকের বাহিনী শালদা নদীর শত্রু অবস্থান সম্পূর্ণ ঘিরে রেখেছিলেন। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে শালদা নদী রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ হয়। এই স্টেশনের সঙ্গে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ঢাকা ও সিলেটের রেলওয়ে যোগাযোগ ছিল।
দুই সপ্তাহ স্থায়ী এ যুদ্ধে শত্রু সেনার বহু ক্ষয়ক্ষতি করে ৮ অক্টোবর শালদা নদী মুক্তিযোদ্ধারা পুনঃদখল করে। নভেম্বর মাসে চূড়ান্ত যুদ্ধে শালদা নদী এলাকাসহ ফেনীর একটি এলাকা মুক্ত হয়। ক্যাপ্টেন গাফ্ফার ও সুবেদার বেলায়েত (শহীদ) এই যুদ্ধে অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন এবং স্বাধীনতার পর ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত হন। প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিবাহিনীর হস্তগত হয়।
শালদা নদী কমপ্লেক্সের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। এসব যুদ্ধে ৮০-৯০ জন শত্রু সেনা নিহত হয়।
কসবা যুদ্ধ: ২ নম্বর সেক্টরের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন কসবা। পাকবাহিনী কসবায় শক্তিশালী ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে। সামরিক দিক দিয়ে কসবা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ২২ অক্টোবর ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন কসবা আক্রমণ করেন। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ নিজে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে গুরুতর আহত হন খালেদ মোশাররফ। এরপর ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয়ী হয়। কসবা শত্রুমুক্ত হয়।
৩ নম্বর সেক্টরের রণাঙ্গন ও যুদ্ধ
এই সেক্টরের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ তেলিয়াপাড়া যুদ্ধ, আখাউড়া যুদ্ধ, আশুগঞ্জ যুদ্ধ।
তেলিয়াপাড়া যুদ্ধ: তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ৩ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টার ছিল। মে মাসেই পাকবাহিনী ৮/১০ বার এখানে হামলা চালালেও মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বরং মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে। ১৬ মে পাকবাহিনীর ৪০ জন সৈন্য নিহত হয়।
১৯ মে পুনরায় মুক্তিযোদ্ধারা লে. মোরশেদের নেতৃত্বে পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ করলে বহু পাক সেনা হতাহত হয়। যদিও এই পরাজয়ের পর আরো শক্তি সঞ্চয় করে পাকবাহিনী আক্রমণ করলে ২০ মে মুক্তিবাহিনী অবস্থান পরিবর্তন করে।
আখাউড়া যুদ্ধ : কৌশলগত কারণে বিশেষ করে রেলওয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আখাউড়া গুরুত্বপূর্ণ। ৩০ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আখাউড়ায় পাকবাহিনীর সঙ্গে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ কে ফোর্সের প্রধান লে. কর্নেল শফিউল্লাহ স্বয়ং পরিচালনা করেন। মেজর মঈনুলের নেতৃত্বে এ যুদ্ধ তিন দিন চলে। ১ ডিসেম্বর আজমপুর রেলওয়ে ষ্টেশনের উত্তরাংশ মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।
১-২ ডিসেম্বর পাক সেনারা পল্টন আক্রমণ করে। এরি মধ্যে ৩ ডিসেম্বর ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পরের দিন মিত্র বাহিনী আখাউড়ায় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে আখাউড়ার পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করে। আখাউড়া জয়ের ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া দখল সহজ হয়।
আশুগঞ্জ যুদ্ধ: ৩ নম্বর সেক্টরের অপর গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ আশুগঞ্জ যুদ্ধ। ৮ ডিসেম্বর মেজর ভূঁইয়া ও এস ফোর্সের একটি দল আশুগঞ্জ আসে। এখানে পাকবাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল। ১০ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী আশুগঞ্জ প্রবেশ করে। পাকবাহিনী নিশ্চিত পরাজয় জেনে আশুগঞ্জ ব্রিজ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়। যৌথ বাহিনী ঐদিনের মতো পিছু হটে।
অন্য দিকে পাকবাহিনী আশুগঞ্জ ছেড়ে ভৈরব আশ্রয় নেয়। ভারতীয় বিমান বহরও ভৈরব অবরোধ করে। মুক্তিবাহিনী এতে যোগ দেয়। এভাবে স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত পাকবাহিনী ভৈরবে অবরুদ্ধ থাকে ।
৪ নম্বর সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন ও যুদ্ধ
এই সেক্টরের উল্লেখযোগ্য রণাঙ্গন ছিল শেরপুর, শমসেরনগর, আটগ্রাম ও খাদিমনগর যুদ্ধ।
শমসেরনগর যুদ্ধ: শমসেরনগরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানে বিমানবন্দর থাকায় এর গুরুত্ব আরো বেশি ছিল। গোটা মৌলভীবাজার এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এর ভূমিকা রয়েছে। ২৬ মার্চ মুক্তিবাহিনী শমসেরনগরের দিকে অগ্রসর হয়। তবে ২৮ মার্চ সমবেত জনতার আক্রমণ জোরালো হয়।
উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধে ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলসহ ৯ জন পাক সেনা নিহত হয়। দু’টো সামরিক জীপসহ বিপুল অস্ত্র মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। মৌলভীবাজার থেকে পিছু হটে পাক সেনারা শেরপুর আশ্রয় নেয়। এই যুদ্ধের সাফল্য পরবর্তীকালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করে।
শেরপুর যুদ্ধ: একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর হিসাবেই নয়, বরং বৃহত্তর সিলেটের চারটি জেলার সংযোগস্থল হচ্ছে শেরপুর। তাই উভয় পক্ষের কাছেই শেরপুর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। শেরপুর ও সাদীপুরের ওপর ইতোমধ্যে পাকবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ৪ এপ্রিল তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে মুক্তিবাহিনী শেরপুর আক্রমণ করে। ৭ ঘন্টা স্থায়ী এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী জয়ী হয়।
মুক্তিবাহিনী শেরপুর দখল করে এবং অনেক অস্ত্র হস্তগত করে। এতে মৌলভীবাজার থেকে সিলেট পর্যন্ত বিশাল এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। পাকবাহিনী সিলেট শহর ও সালুটিকর বিমান বন্দরে তাদের কার্যক্রম সীমিত করে দেয়।
৫ নম্বর সেক্টরের রণাঙ্গন ও যুদ্ধ
এ সেক্টরের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হচ্ছে ছাতক যুদ্ধ, রাধানগর যুদ্ধ, রাধানগর কমপ্লেক্স যুদ্ধ ।
ছাতক যুদ্ধ: ছাতক মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে ১৩ অক্টোবর। ঐ রাতেই মুক্তিবাহিনী লড়াই গ্রাম ও সিমেন্ট ফ্যাক্টরি দখল করে নেয়। ১৪ অক্টোবর পাকিস্তানিদের একটি লঞ্চ ছাতক যাওয়ার সময় মুক্তিবাহিনী ডুবিয়ে দেয়। ৯ জন পাক সেনা এতে নিহত হয়। ১৪টি রাইফেল মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।
কিন্তু ঐ রাতেই পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে আক্রমণ করলে ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৪-১৯ অক্টোবর পর্যন্ত এখানে যুদ্ধ হয়। পাঁচ দিনের ভয়াবহ যুদ্ধে মোট চার শতাধিক পাকিস্তানি সৈন্য হতাহত হয়।
টেংরাটিলা যুদ্ধ: টেংরাটিলা পাকিস্তানিদের একটি বড় ঘাঁটি ছিল। ৩০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর একটি দল টেংরাটিলার অদূরে প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনা করে। ঐদিনই মুক্তিবাহিনী প্রথম গুলি ছুঁড়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হয়। ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী সেখানে পাকবাহিনীকে ঘেরাও করে রাখে। ৫ ডিসেম্বর টেংরাটিলা শত্রুমুক্ত হয়।
৬ নম্বর সেক্টরের রণাঙ্গন ও যুদ্ধ
এই সেক্টরের উল্লেখযোগ্য অপারেশন হল বড়বাড়ি ইউনিয়ন যুদ্ধ, পচাগড়া যুদ্ধ, ভুরুঙ্গামারী যুদ্ধ, রায়গঞ্জ যুদ্ধ ।
বড়বাড়ি ইউনিয়ন: লালমনিরহাট ও তিস্তাঘাটের মধ্যবর্তী বড়বাড়ি ইউনিয়নে পাকবাহিনীর ঘাঁটি ছিল। ১০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী সন্ধ্যায় এই ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। ক্যাপ্টেন দেলোয়ার নিজে ৬০ জন যোদ্ধাসহ এই অভিযান পরিচালনা করেন। এতে ৫ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং বাকিরা পালিয়ে যায়।
এরপর এই বাহিনী নিয়মিত তিস্তাঘাট ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ডিসেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত আক্রমণ চালায়। আক্রমণের মুখে টিকে থাকতে না পেরে পাকবাহিনী রংপুর সদর দপ্তরে কেন্দ্রীভূত হয়।
পচাগড়া যুদ্ধ: পচাগড়ে পাকবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি ছিল। এখানে পাকবাহিনীর তিন ব্যাটালিয়ন সৈন্য নিয়োজিত ছিল। ২৬ নভেম্বর মুক্তি ও ভারতীয় বাহিনী যৌথভাবে পচাগড়া আক্রমণ করে। কিন্তু পাকবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণে ১০০ জন ভারতীয় জোয়ান এবং ২২ জন মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়। ২৮ তারিখ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলে। ২৭ জন পাক সেনাকে জীবন্ত ধরা হয়। প্রচুর অস্ত্র ও ৮টি গাড়ি মুক্তিবাহিনী দখল করে। এই যুদ্ধ বাংলাদেশের ভিতরে যৌথবাহিনীর বৃহৎ যুদ্ধগুলোর মধ্য অন্যতম।
ভুরুঙ্গামারী যুদ্ধ: ১৩ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তান বাহিনীর ঘাঁটি ভুরুঙ্গমারী থানা আক্রমণ করে । এ যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্ব দেন ব্রিগেডিয়ার যোশী ও বাংলাদেশ বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার বাশার স্বয়ং। যৌথবাহিনী ভুরুঙ্গামারী মুক্ত করে। কোন পথেই পালাতে না পেরে বহু পাক সৈন্য নিহত হয় ।
রায়গঞ্জ যুদ্ধ: কুড়িগ্রাম মহকুমার রায়গঞ্জ পাকবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি ছিল। রায়গঞ্জ ব্রিজের সামনে ২০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান বাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। কমান্ডার লে. সামাদসহ ১৫/২০ জন শহীদ হন। পরের দিন পর্যন্ত তুমুল লড়াই চলে এবং পাকবাহিনী টিকতে না পেরে নাগেশ্বরীতে পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৩০০-৫০০ সৈন্য হতাহত হয়%A
