মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

Table of Contents

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

 

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

 

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

ভৌগোলিক দিক দিয়ে চীনের মত সোভিয়েত ইউনিয়নও দক্ষিণ এশিয়ার নিকটবর্তী একটি পরাশক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হতেই ইউরোপীয় পরিমন্ডল ছাড়িয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং একটি নতুন পরাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। মধ্য ষাটের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেকে একই সঙ্গে ইউরোপীয় ও এশীয় শক্তি হিসেবে দাবী করে।

তবে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম দক্ষিণ এশীয় ভূ-খন্ডে বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই কূটনৈতিক প্রয়াসের পেছনে মৌল ভিত্তিই হলো এই যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বাইরের পৃথিবীকে জানাতে চেয়েছিল যে, ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত এলাকা।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, ষাটের দশকে আমেরিকা যতই ভিয়েতনাম সমস্যায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ততই দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাবশালী হয়ে উঠছিল। কিন্তু সত্তর দশকের শুরুতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন- এ দু’পরাশক্তির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা যেমন হ্রাস পেতে থাকে, তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যে সম্পর্কেরও চরম অবনতি ঘটে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির এমনি প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং চীন, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশাপাশি আমেরিকাও এ যুদ্ধের গতি প্রকৃতি নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল। তবে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রথম বাঙালি গণহত্যাকে নিন্দা জানায়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই মনে করা হয় যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আগাগোড়াই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল?

সোভিয়েত ইউনিয়ন কেন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল তা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই রুশ-ভারত মিত্রতা ও মার্কিন-পাকিস্তান মিত্রতা এবং রুশ-চীন ও ভারত-চীন বৈরীতার বিষয়টি স্মরণ রাখা দরকার। ষাটের দশকে পাকিস্তান চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সমানভাবে উন্নত সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিল।

কিন্তু রুশ-চীন বিবাদের ফলে তা সম্ভব হয়নি। ১৯৬৯-এর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন দক্ষিণ এশিয়া নিরাপত্তা জোটে সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু এই জোটটি চীন বিরোধী হওয়ায় পাকিস্তান জোটে যোগদানে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের সহানুভূতি হারায়। অন্যদিকে পাকিস্তানের মাধ্যমেই চীন-আমেরিকা সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ায় পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরাগভাজন হয়।

সুতরাং ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন মস্কো-ইসলামাবাদ সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটেছিল। তবে তার মানে এই নয় যে, মস্কো পাকিস্তানকে মিত্ররাষ্ট্র হিসেবে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছিল। তার প্রমাণ ১৯৭০ সালেও দু’দেশের মধ্যে পাঁচশালা বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

আর এমনই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমে সতর্কতামূলক এবং পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থনমূলক ভূমিকা পালন করেছিল। যাহোক, সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থনের পিছনে নিলিখিত কারণ সমূহকে চিহ্নিত করা যায়-

আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন:

সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় লক্ষ কোন সময়ই পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় সত্তার বিরোধী ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানি সামরিক শাসকবর্গ ছিলেন অতিমাত্রায় ভারত বিরোধী ও চীন ঘেষা। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভারত ও মস্কো ঘেষা আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসাতে তৎপর হয়।

কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের ধারণা ছিল যে, পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পাকিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। কিন্তু ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান কর্তৃক সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোয় শুরু হয় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। তাই এ যুদ্ধকে সমর্থন করা ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন বিকল্প ছিল না।

ভারতের পূর্ব প্রান্তে বিপ্লবী চেতনার প্রসার রোধ করা:

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্রমে তা গণযুদ্ধে রূপ নেয়ার সম্ভাবনা ছিল। আর তা হলে আসাম সহ ভারতের পূর্ব প্রান্ত বিপ্লবী চেতনা ও বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ হতো- যা ভারতের জন্য হতো বিরাট বিপদের কারণ।

তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের লক্ষ ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের অবসান এবং সম্ভব হলে অখন্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে স্থাপন করে সমস্যার সমাধান। আর এজন্যই পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৎপর হয়ে উঠেছিল।

রুশ-চীন বিরোধ:

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থন করার অন্যতম কারণ হচ্ছে রুশ- চীন বিরোধ। সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক ছিল চরম বৈরীতার। অবস্থাটা এমন ছিল যে, কোন একটি দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র হলে সে দেশটি চীনের শত্রুতে পরিণত হবে।

আর এ কারণেই পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় তা সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন মনেপ্রাণে চাচ্ছিল পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রাখতে। কিন্তু চীন- পাকিস্তান মৈত্রী সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বেকায়দায় পড়ে যায় এবং বাধ্য হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করতে।

সুতরাং দেখা যায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন বাঙালির প্রতি মমত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়, বরং নিজস্ব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট চিন্তা-ভাবনা ও প্রভাব বলয় সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির বিভিন্ন পর্যায়

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতি সব সময় একই গতিতে প্রবাহিত হয়নি। সময় ও বাস্তবতার সাথে সাথে বিভিন্ন সময় সোভিয়েত নীতিতে নানা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

সোভিয়েত নীতির প্রথম পর্যায় (মার্চ-জুন):

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির প্রথম পর্যায়ে সতর্কতা ও সুবিধাবাদ লক্ষ করা যায়। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ কমিউনিস্ট পার্টির ২৪তম কংগ্রেসে ব্রেজনেভ যে ভাষণ দেন সেখানে জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের ভিত্তিতে সব এশীয় সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ আছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের এশীয় নীতি ছিল খুবই সতর্কতার নীতি।

তারা জনগণের অধিকার সমুন্নত রেখে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষপাতী ছিলেন। তাই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ক্রেমলিন নেতৃবৃন্দকে প্রাথমিক পর্যায়ে একটু দ্বিধান্বিত করেছিল। তারা চাননি যে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাক কিংবা বাংলাদেশের মত যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশের জন্ম হোক। কারণ এমনি দরিদ্র দেশ অনতিকালের মধ্যেই পূঁজিবাদী শক্তিসমূহের কুক্ষিগত হবে।

আর এ বিবেচনা থেকেই প্রেসিডেন্ট পদগর্নি ২ এপ্রিল ইয়াহিয়াকে একটি পত্র লিখেন এবং জরুরী ভিত্তিতে রক্তপাত ও নির্যাতন বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করার জন্য পাকিস্তানকে আহবান জানান।

পত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, এমন একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা উচিত যেন পূর্ব পাকিস্তানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, পদগর্নির পত্রে, বাঙালি বা বাংলাদেশ’ শব্দ ব্যবহৃত হয়নি; বরং ‘পূর্ব পাকিস্তান’ ও ‘পাকিস্তানের আপামর জনগণ’ শব্দসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের এই যে নীতি, এটা ছিল সতর্কতা ও সুবিধাবাদের নীতি।

আর এই সুবিধাবাদী নীতির কারণে ১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে আগস্ট পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানকে প্রচুর পরিমাণ আর্থিক ও কারিগরি সাহায্য দিয়েছে এবং এই সময়েই পাকিস্তানে প্রথম স্টীল কারখানা ও পারমানবিক শক্তি উন্নয়ন সংক্রান্ত সোভিয়েত সাহায্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু সুপরিকল্পিতভাবে ভারসাম্য সৃষ্টিকারী সোভিয়েত নীতি ভারতের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করলেও ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নীতিতে অটল থাকে।

সোভিয়েত নীতির দ্বিতীয় পর্যায় (জুলাই-আগস্ট):

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির দ্বিতীয় পর্যায়কে অধিক সতর্কতার নীতি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের এশীয় নীতির ক্রান্তিকাল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। জুলাই মাসে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফর করার পরই প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রস্তাবিত চীন সফরের সংবাদ প্রচারিত হয়- যা সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য ছিল বিব্রতকর।

অন্যদিকে পিকিং থেকে ফিরেই হেনরি কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে ভারতের রাষ্ট্রদূতকে বলেন যে, ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করলে চীন হস্তক্ষেপ করবে এবং আমেরিকা ভারতের সাহায্যে নাও এগিয়ে আসতে পারে। এর ফলে ভারতীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষভাবে চিন্তিত ও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সোভিয়েত ইউনিয়নও এ বিষয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।

ফলে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পারস্পরিক নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট স্বাক্ষরিত হল ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি। কিন্তু এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারত জোটনিরপেক্ষ নীতি বিসর্জন দিয়েছে বলে সমালোচনা হলে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, “India will continue to follow its policy of non-alignment as before.” তবে বাস্তব সত্য হচ্ছে যে, চীন-মার্কিন আঁতাতের জবাবেই মূলত এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

কিন্তু ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরিপূর্ণভাবে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকে এবং বাংলাদেশ প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নিজস্ব বিবেচনার দ্বারাই প্রধানত পরিচালিত হতে থাকে। আর এ কারণেই মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরের এক সপ্তাহ পরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘোষণা করে যে, পাকিস্তানের জন্য তাদের আর্থিক ও কারিগরি সাহায্য অব্যাহত থাকবে।

তবে সোভিয়েত নীতির দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আর তা’হলো বাঙালি বিরোধী কোন আন্তর্জাতিক সমাধানের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নও তৎপর হয়ে ওঠে। অবশ্য এ সহমর্মিতার কারণ হচ্ছে- ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই চেয়েছিল মস্কো ও দিল্লি ঘেষা আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোক।

তবে ভারত চেয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার আর সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্দেশ্য ছিল অখন্ড পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সরকার। আর এ কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন অক্টোবরে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল যেন ভারত স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা না করে ।

 

সোভিয়েত নীতির তৃতীয় পর্যায়ে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর):

সোভিয়েত নীতির তৃতীয় পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায় সেপ্টেম্বর হতে নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে। এসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতিতে তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়; যথা-

১. সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের এই নীতি গ্রহণ করে যে, বাংলাদেশ সমস্যার মধ্যে যেহেতু আন্তর্জাতিক সংকটের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান নেই। কাজেই বিষয়টি জাতিসংঘের এখতিয়ারভুক্ত নয়।

২. ভারত সরকারের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন চেষ্টা করে যে, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের আদর্শ যেন হয় মস্কো ঘেষা। আর এ নীতির কারণেই সেপ্টেম্বর মাসে মস্কোপন্থী আওয়ামী লীগ সদস্যদের নিয়ে একটি মুক্তিসংগ্রাম উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়।

একই সময়ে জাতিসংঘে প্রেরিতব্য বাংলাদেশী মিশনের সদস্য রদবদল করার জন্য অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে মিশন থেকে ড. এ.আর. মল্লিক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর ও খন্দকার মোশতাককে বাদ দিয়ে মস্কোপন্থী অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

৩. সোভিয়েত ইউনিয়ন তার সুবিধাবাদী নীতি অব্যাহত রেখেই চেষ্টা করে যেন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না বাঁধে। তৃতীয় বৈশিষ্ট্যকে অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করেছিল। কিন্তু পাক-ভারত যুদ্ধ শুরুর মধ্য দিয়ে এ ধরনের কূটনীতির ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়।

সোভিয়েত নীতির শেষ পর্যায় (৩ ডিসেম্বর-স্বাধীনতা পর্যন্ত):

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির শেষ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে ৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরুর সময় হতে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত সময়কালকে। এ সময়ে তিন পরাশক্তির বিভিন্নমুখী তৎপরতা সারা বিশ্বে সংবাদ শিরোনাম হয়। পাকিস্তান ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণভাবে বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টিতে এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হলো শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিকট রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বা চীন উত্থাপিত যে কোন যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিতে শুরু করে।

ভেটো দেয়ার সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বক্তব্য ছিল যে, যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব গ্রহণের সময়ে এটাও নীতিগতভাবে মেনে নিতে হবে যে, বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে বাঙালিদের মতামতই চূড়ান্ত। অবশ্য ৬ ও ৭ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটো প্রস্তাব উত্থাপন করে যেখানে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলা হয়েছিল।

এটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সুবিধাবাদী নীতিরই অংশ। কিন্তু আমেরিকা ও চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের এ প্রস্তাবকে দূরভিসন্ধিমূলক বিবেচনা করায় শেষপর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধবিরতি বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে- যেন ভারতীয় বাহিনী সামরিক বিজয়ের প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পায়।

পরিস্থিতিগত কারণে এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ ভারতীয় বিজয়ের মধ্যদিয়েই তাদের লক্ষ অর্জিত হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; ফলে যুদ্ধবিরতির যে কোন আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে প্রতিহত করা সোভিয়েত নীতির লক্ষে পরিণত হয়। তাই নিরাপত্তা পরিষদের পরিবর্তে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৭ ডিসেম্বর একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উত্থাপিত হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয়বারের মত ভেটো প্রয়োগ করে।

ভারতীয় বাহিনী ঢাকা দখল করার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত যে কোন প্রকার যুদ্ধবিরতির পদক্ষেপকে বানচাল করাই ছিল এ ভেটো দানের উদ্দেশ্য। আর তাই ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর ভেটো প্রয়োগ না করায় শেষপর্যন্ত ২১ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গৃহীত হয়।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ঢাকার পতন যখন আসন্ন হয়ে উঠছিল ঠিক তখনই ১২ ডিসেম্বর দিল্লি সফরে আসেন সোভিয়েত ইউনিয়নের উপ-প্রধানমন্ত্রী ভাসিলি কাজনেতসভ। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি দিল্লি অবস্থান করেন। এ সফরে তার উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত দু’টি, যথা-

১. বাংলাদেশ সরকারের প্রকৃতি যেন মস্কোপন্থী হয়, সেজন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ভারতকে সাহায্য করা এবং

২. পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তে চূড়ান্ত আঘাত করা থেকে ভারতকে বিরত রাখা। এক্ষেত্রে অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্য দু’টি পরাশক্তির সঙ্গে একত্রে ভূমিকা পালন করেছিল।

সুতরাং দেখা যায় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পরাশক্তির যে দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছিল সে দ্বন্দ্বে দক্ষিণ এশীয় ভূ-খন্ডে সোভিয়েত ইউনিয়নের কৌশল ও কূটনীতির জয় হয়েছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতির মূল্যায়ন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির বাস্তব ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন খুবই কঠিন। কারণ ভারতীয় লেখক ও গবেষকগণ যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি মহানুভব শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তেমনি জি.ডব্লিউ. চৌধুরী সহ পাকিস্তানপন্থী ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধী লেখকগণ অনাবশ্যকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার অবমূল্যায়ন করেছেন।

তবে এসব সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে বিবেচনা করা যায়। যথা-

১. মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়েও সোভিয়েত কূটনীতিতে সুবিধাবাদের নীতি বিদ্যমান ছিল।

২. সোভিয়েত নীতি প্রণয়নে মতাদর্শের চেয়ে জাতীয় স্বার্থই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।

৩. ভারত মহাসাগরের তীর ঘেষে বিস্তৃত উপমহাদেশের বিশাল উপকূল ভূমি সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য ছিল বিশেষভাবে লোভনীয়। তাই এখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রয়োজন ছিল নৌ-বন্দর ও নৌ- ঘাঁটির। আর এ কারণেই উপমহাদেশের প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রহ ছিল এবং এজন্যই সে ভারত ও পাকিস্তান উভয় শক্তির সাথেই সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী ছিল।

এজন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনই খোলাখুলি সমর্থন করেনি বা খোলাখুলি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেনি।

৪. রুশ নীতি আগাগোড়া সুবিধাবাদের ওপর গড়ে উঠলেও মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধুমাত্র কৌশলগত কারণে বাংলাদেশপন্থী নীতি গ্রহণ করে ।

সারসংক্ষেপ

পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম বাঙালি গণহত্যাকে নিন্দা করে। এজন্য মনে করা হয়। যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আগাগোড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। সোভিয়েত নীতির পটভূমিতে বিদ্যমান ছিল সোভিয়েত-চীন বিবাদের অভিজ্ঞতা। ১৯৬৯ সালের মার্চে উসুরী নদী বরাবর সোভিয়েত- চীন সীমান্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত-চীন বিবাদ চরম পর্যায়ে পৌঁছে।

আর তখন থেকেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনকে প্রতিহত করতে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে পরিকল্পনা করে তারই অংশ হিসেবে চীন সমর্থিত পাকিস্তানের বিপক্ষ শক্তি ভারতকে সোভিয়েত ইউনিয়ন অধিক নির্ভরশীল মিত্র হিসেবে গ্রহণ করে। আর ভারতের আকাঙ্ক্ষার দিকে লক্ষ রেখেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অনেকটা শেষপর্যায়ে এসে সমর্থন করে।

কিন্তু এ সমর্থন সত্ত্বেও বলা যায় যে, সোভিয়েত নীতি ছিল আগাগোড়াই সুবিধাবাদী এবং অখন্ড পাকিস্তান নীতির সমর্থক। আর এ কারণেই ৬ ও ৭ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন যে দু’টি প্রস্তাব উত্থাপন করে সেখানে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সমাধানের কথাই বলা হয়েছিল- যা ছিল চীন ও আমেরিকারও দাবি। কিন্তু তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের মনোভাব বুঝতে পারেনি বলেই হয়তো প্রস্তাব দু’টির বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

আসলে কোন পরাশক্তিই বাঙালির প্রতি মমত্ববোধ কিংবা বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়ে ভূমিকা পালন করেনি। প্রত্যেকের ভূমিকার পিছনেই ছিল নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট চিন্তা-ভাবনা ও পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

আদর্শিক ব্যাপারটি মুখ্য হলে কৃষক-শ্রমিক তথা সর্বস্তরের বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থন করত। তবে একথাও সত্য যে, সোভিয়েত নীতি আগাগোড়া সুবিধাবাদী হলেও মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সোভিয়েত নীতি ছিল পুরোপুরিই বাংলাদেশপন্থী।

বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদে তিনবার ভেটো প্রয়োগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বাধাহীন করে তুলতে, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং স্বাধীনতা লাভের পরপরই সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ভূমিকা পালন করেছিল তা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাশক্তির ভূমিকা ।

২। প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহমদ, মোনায়েম সরকার ও ড. নুরুল ইসলাম মঞ্জুর সম্পাদিত, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৭১)।

৩। মেজর রফিকুল ইসলাম পি.এস.সি, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, বিরোধী শক্তি ও বৃহৎশক্তির প্রতিক্রিয়া ।

৪। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি।

৫। এ.এস.এম. সামছুল আরেফিন সম্পাদিত, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান।

৬। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, ত্রয়োদশ খন্ড।

 

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করুন।

২। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির তৃতীয় পর্যায়ের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করুন ।

৩। সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন সমর্থন করেছিল?

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির বিভিন্ন পর্যায় আলোচনা করুন।

২। সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিল কেন? মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত নীতির মূল্যায়ন করুন।

Leave a Comment