আজকে আমদের আলোচনার বিষয় মুহীউদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব
মুহীউদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব

মুহীউদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব
মুঘল সম্রাটদের মধ্যে মুহীউদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। কর্মদক্ষতা, ব্যক্তিত্ব এবং দক্ষতার দিক দিয়ে আওরঙ্গজেব মুঘল সম্রাটদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। একমাত্র মহান সম্রাট আকবর ছাড়া তাঁর মতো কোন কর্মদক্ষ সম্রাট মুঘল সিংহাসন আরোহণ করেননি। তিনি ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র।
উত্তরাধিকারী যুদ্ধে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ধর্মাট ও দ্বিতীয় সামুগড়ের যুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনি পিতাকে সিংহাসনচ্যুত করে গৃহবন্দি করেন। এরপর আগ্রা অধিকার করে সেখানে অভিষেক-ক্রিয়া সম্পন্ন করে নিজেকে ভবিষ্যত মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। অতপর খাজওয়া ও দেওয়াই যুদ্ধে দারাকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে পুনরায় অভিষেক- ক্রিয়া সম্পন্ন করে দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।
এসঙ্গে গ্রহণ করেন ‘আলমগীর বাদশাহ গাজী’ উপাধি। আওরঙ্গজেব প্রায় অর্ধশতাব্দী ভারতবর্ষ শাসন করেন। তাঁর শাসনকালকে দুভাগে বিভক্ত করা যায়- প্রথমার্ধে ১৬৫৮–১৬৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উত্তর ভারতে এবং দ্বিতীয়ার্ধে ১৬৮১-১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ ভারতে অবস্থান করেন।
প্রকৃতপক্ষে, আওরঙ্গজেবের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় দক্ষিণ ভারতে। ১৬৮২ খ্রিস্টাব্দের পর তিনি আর উত্তর ভারতে ফিরে আসেননি। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভারতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্য বিস্তার
উত্তর-পূর্ব ভারতে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ
মহামতি আকবর যে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করেছিলেন আওরঙ্গজেব তা তাঁর সময়ে অব্যাহত রাখেন। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে মূলত সাম্রাজ্যের সর্বাধিক সম্প্রসারণ ঘটে। তাঁর পূর্বে কোন শাসকই এত বড় সাম্রাজ্যের অধিকারী হতে পারেননি। উত্তর-পূর্ব ভারতের হিন্দুরাজ্য কুচবিহার ও অহোম রাজ্য অভিযান ছিল আওরঙ্গজেবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এই দু’টি রাজ্য প্রাকৃতিক দিক থেকে সুরক্ষিত হওয়ায় মুসলিম শাসকগণ এদের স্বাধীনতা হরণ করতে পারেননি। আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে বিহারের শাসনকর্তা দাউদ খাঁ পালামৌ মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। এ বৎসর বাংলার শাসনকর্তা মীর জুমলাকে অহোম, কোচ ও আরাকানী মগদের বিরুদ্ধে সম্রাটের নির্দেশ পেয়ে ১৬৬১ খ্রি: এক বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঢাকা থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে কুচবিহার অধিকার করেন।
অতপর মীর জুমলা সৈন্যবাহিনী নিয়ে পরের বৎসর মার্চ মাসে অহোমের রাজধানী গড়গাঁ গিয়ে উপস্থিত হন। অহোমরাজ জয়ধ্বজ রাজধানী থেকে পালিয়ে গিয়ে শত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেন। কিন্তু অচিরেই বর্ষা নামলে মুঘল সৈন্যরা আসামের জলবাহিত নানা প্রকার রোগে আক্রান্ত হয়ে এক বিব্রতকর অবস্থায় পতিত হয়। এই সুযোগে অহোমের রাজকীয় সৈন্যরা মুঘল সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে খন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
এতে মুঘল সৈন্যবাহিনী ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মুঘল সৈন্যবাহিনীর জয়লাভের কোন সম্ভাবনা না দেখে মীর জুমলা অহোমরাজের সঙ্গে এক সন্ধি স্থাপন করেন। সন্ধির শর্তানুযায়ী যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, বার্ষিক কর এবং দারাং প্রদেশের অর্ধেক মুঘলদের দিতে বাধ্য হয়। এই অভিযানে মুঘলদের বহু ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। আসামে অবস্থানকালে মীর জুমলা অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বন্যা ও বর্ষার প্রকোপে আসাম থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পথে ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে মীর জুমলা মৃত্যুবরণ করেন। মীর জুমলার মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেব তাঁর মাতুল শায়েস্তা খানকে (আসফ খাঁর পুত্র) দাক্ষিণাত্য থেকে সরিয়ে এনে বাংলার শাসনকর্তা (সুবাদার) পদে নিয়োগ দান করেন । শায়েস্তা খান দীর্ঘ ত্রিশ বছর এই পদে বহাল ছিলেন। তিনি পর্তুগিজ ও আরাকানী মগ জলদস্যুদের অত্যাচার ও লুণ্ঠন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বাংলার নৌশক্তি বৃদ্ধি করেন।
১৬৬৫ খ্রি. মগ জলদস্যুদের প্রধান ঘাঁটি সন্দ্বীপ দখল করেন। পরের বছর (১৬৬৬ খ্রি.) আরকান রাজ্যের হাত থেকে চট্টগ্রামকে অধিকার করে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার মানুষকে মগ ও পর্তুগিজদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেন ।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নীতি
ভারতবর্ষের ইতিহাসে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার সমস্যা চিরকালই ভারতের মধ্যে যুগের শাসকদের ব্যাপৃত করে রেখেছিল। শুধুমাত্র মুঘল যুগে নয়, সুলতানি যুগেও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত শাসকদের মাথা ব্যাথার কারণ ছিল। উল্লেখ্য যে, মুসলমানরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল। সেই কারণেই ঐ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম।
এই উপলব্ধি থেকেই সকল সময়েই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব সকল শাসককে গ্রহণ করতে হয়েছিল। আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণ করেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নীতিতে ‘অগ্রসর নীতি’ অবলম্বন করে সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা রক্ষার চেষ্টা করেন। ঐ অঞ্চলের আফগান উপজাতীয় লোকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে প্রায়ই উত্তর-পশ্চিম পাঞ্জাবে অত্যাচার ও লুটতরাজ করতো।
১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘ইউসুফজাই’ নামক এক উপজাতি ‘ভাগু’ নামে এক অধিনায়কের নেতৃত্বে দলবদ্ধ হয়ে আটক ও হাজারা জেলা আক্রমণ করে। সম্রাট তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। সম্রাট মুঘল সেনাপতি আমিন খাঁ ও কামিল খাঁকে ‘ইউসুফজাই’ উপজাতিদের দমনের জন্য প্রেরণ করেন। দুই সেনাপতি উপজাতীয় বিদ্রোহীদের কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষম হন এবং দলপতিদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন।
সম্রাট আওরঙ্গজেব মহারাজা যশোবন্ত সিংহকে জামরূদ দুর্গের অধিনায়ক পদে অভিষিক্ত করে এই অঞ্চলের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। ১৬৭২ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিদি ও খাটক নামক উপজাতির লোকেরা মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। আফ্রিদিদের নেতা আকমল খাঁ নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা দিয়ে খাটকদের মুঘলদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে আহ্বান জানান। তাঁদেরকে দমন করার জন্য সম্রাট সেনাপতি আমিন খাঁকে প্রেরণ করেন।
আমিন খাঁ আফ্রিদি নেতা আকমল খাঁর নিকট পরাজিত হলে সম্রাট আওরঙ্গজেব ক্ষুব্ধ হয়ে সেনাপতি মহব্বত খাঁকে সেখানে প্রেরণ করেন। কিন্তু মহব্বত খাঁ যুদ্ধের পরিবর্তে আপোষ নীতির মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা চালালে আওরঙ্গজেব সুজাত খাঁর নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী বিদ্রোহী আফ্রিদি উপজাতিদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। কিন্তু সুজাত খাঁ সহ বহু মুঘল সৈন্য বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন এবং অনেক সৈন্য বন্দি হয়।
আফ্রিদি উপজাতির এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে খাটক উপজাতীয় নেতা কবি খু হল খাঁ আফ্রিদি নেতা আকমল খাঁর সঙ্গে যোগদান করেন। তাঁরা আফগান ও পাঠান জাতিকে একত্রিত হয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে এক সার্বজনীন জাতীয় অভ্যুত্থানের আহ্বান জানান। এদের দমন করবার জন্য সম্রাট পরপর ফরিদ খাঁ ও মহব্বত্ খাঁকে প্রেরণ করে ব্যর্থ হন। মুঘল সৈন্য ও সেনাপতিগণ উপর্যুপরি ব্যর্থ হওয়ার ফলে সম্রাট নিজেই সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি সসৈন্যে পেশোয়ারের নিকটবর্তী হাসান আবদালে উপস্থিত হন। তিনি একই সঙ্গে কূটনীতি ও সামরিক নীতির দ্বারা বিদ্রোহী উপজাতিদের দমন করতে কৃতকার্য হন। তিনি বিদ্রোহীদের কয়েকটি জায়গীর, অর্থ ও উচ্চপদ উপহার দিয়ে তাঁদের বশীভূত করতে সক্ষম হন।
খাটক ও ইউসুফজাই উপজাতীয় নেতাদের পুত্রদ্বয় মুঘলদের পক্ষে যোগদান করে। বিদ্রোহীপন্থী অন্যান্যদের কঠোর হস্তে দমন করা হয়। এভাবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সমস্যার সমাধান করে ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেব রাজধানী দিল্লিতে ফিরে আসেন।
আওরঙ্গজেবের রাজপুতনীতি
সম্রাট আকবর ছিলেন প্রকৃত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শাসক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হলে রাজপুতদের সাহায্য ও সহযোগিতা একান্তভাবে প্রয়োজন। তিনি রাজপুতগণের সঙ্গে মিত্রতাসুলভ আচরণ করেন এবং তাঁদের সহায়তা লাভে সমর্থ হন। আকবরের রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্য যে গৌরবের শিখরে আরোহণ করে তা বহুলাংশে রাজপুতদের অকুণ্ঠ সহায়তা লাভেই সম্ভবপর হয়েছিল।
আকবরের বিচক্ষণ এবং সার্থক রাজপুতনীতির আমুল পরিবর্তন ঘটে তাঁর প্রপৌত্র আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে। রাজপুত বন্ধুত্বের ঐকান্তিক প্রয়োজনীয়তার কথা বিস্মৃত হয়ে আওরঙ্গজেব অত্যাচার ও উৎপীড়নের নীতি গ্রহণ করেন। ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে মাড়োয়ারের রাজা যশোবন্ত সিংহ মুঘল সেনাপতি হিসেবে আফগানিস্তান সীমান্তে যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে আওরঙ্গজেব মাড়োয়ার রাজ্য অধিকার করতে অগ্রসর হন।
মাড়োয়ার রাজ্যটি সামরিক এবং ব্যবসায়িক দিক থেকে রাজপুতনার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত ছিল। এসব কারণে আওরঙ্গজেব মাড়োয়ার অধিকার করতে চেয়েছিলেন। রাজা যশোবন্ত সিংহের আকস্মিক মৃত্যু আওরঙ্গজেবকে তাঁর উদ্দেশ্য কার্যে পরিণত করার সুযোগ এনে দেয়। আওরঙ্গজেব প্রথমে মাড়োয়ার রাজ্যটি খালিসার অন্তর্ভুক্ত করেন এবং পরে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করতে সচেষ্ট হন।
তিনি ৩৬ লক্ষ টাকা নজরানার বিনিময়ে যশোবন্ত সিংহের জনৈক আত্মীয় ইন্দ সিংহকে মাড়োয়ার সিংহাসনে বসান। কিন্তু এ সময়ে এক নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়। যশোবন্ত সিংহের মৃত্যুর ছয় মাস পর কাবুলে তাঁর দুই রাণীর গর্ভে দুই পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তন্মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়। এতে আওরঙ্গজেবের উদ্দেশ্য সাধনের পথে বাধার সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় মাড়োয়ারের রাণীদ্বয় নবজাত পুত্র অজিত সিংহকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে উপস্থিত হন।
এবং মাড়োয়ারের সিংহাসনে যশোবন্ত সিংহের পুত্রকে অধিষ্ঠিত করার দাবি জানালে আওরঙ্গজেব অজিত সিংহকে মুঘল হারেমে রেখে লালন-পালন করার শর্তারোপ করেন। কিন্তু দুর্গাদাস নামে এক অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন রাঠোর নেতা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তিনি কৌশলে যশোবন্ত সিংহের দুই রাণী ও শিশুপুত্র অজিত সিংহকে ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে মুঘল হারেম থেকে উদ্ধার করে নিরাপদে যৌধপুরে নিয়ে যান।
আওরঙ্গজেবের আচরণে রাঠোররা ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং দুর্গাদাসের নেতৃত্বে অজিত সিংহকে মাড়োয়ারের রাজা বলে ঘোষণা করে। তখন আওরঙ্গজেব নিজ পুত্র আকবরকে দুর্গাদাসের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। তিনি স্বয়ং আজমীরে গিয়ে মুঘল সৈন্যবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুঘল বাহিনী ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে যৌধপুর অধিকার করেন।
কিন্তু তাঁর এই আক্রমণাত্মক নীতিতে মাড়োয়ারের রাঠোরদের সঙ্গে মেবারের রাজা রাজসিংহ-এর ঐক্য স্থাপিত হয়। মেবারের রাজপরিবারের সঙ্গে মাড়োয়ার রাজপরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। মেবার বহুদিন মুঘলদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছিল। মেবারের রাজা রাজসিংহ আওরঙ্গজেব কর্তৃক জিজিয়া কর পুনপ্রবর্তনে বিরক্ত হয়েছিলেন। এরপর যখন আওরঙ্গজেব মাড়োয়ার রাজ্য আক্রমণ করেন তখন রাজসিংহ রাঠোরদের সাহায্যে অগ্রসর হন।
রাঠোর ও মেবারের রাজার এই ঐক্য রাজপুত ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই মিলিত শক্তির নিকট শাহজাদা আকবর সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হন।অতপর আওরঙ্গজেব তাঁর পুত্র আজমকে মুঘল সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে রাজপুতদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হন।
আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি
আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি পূর্ববর্তী মুঘল সম্রাটদের দাক্ষিণাত্যে রাজ্য সম্প্রসারণ নীতির অনুসরণ বলা যেতে পারে। সম্রাট আকবরের আমল থেকেই দাক্ষিণাত্যে মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রচেষ্টা চলে আসছিল। আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতিকে দুইভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করা যায় :
(১) পিতা শাহজাহানের রাজত্বকালে দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তারূপে আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি,
(২) সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি ।
শাহজাহানের শাসনকালে আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি
দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা হিসেবে আওরঙ্গজেব দুইবার নিযুক্ত হন এবং সেখানে আক্রমণাত্মক নীতি অনুসরণ করেন। প্রথমবার তিনি ১৬৩৬ খ্রি. থেকে ১৬৪৩ খ্রি. পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় তিনি দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। দাক্ষিণাত্যের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাকে সংগঠিত করে আওরঙ্গজেব গোলকুন্ডা ও বিজাপুরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন।
তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এই দুই শিয়া সুলতানি রাজ্যের স্বাধীনতা লুপ্ত করা। গোলকুন্ডার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এককালের মণিমুক্তা ব্যবসায়ী, প্রচুর অর্থের অধিকারী মীর জুমলা। তিনি স্বাধীন শাসনকর্তার ন্যায় আচার-আচরণ করতে থাকলে গোলকুন্ডার সুলতান কুতুব শাহ উদ্ধত প্রধানমন্ত্রীকে নিরস্ত্র করতে চেষ্টা করেন। মীর জুমলা নিজের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য এই সময় দাক্ষিণাত্যের মুঘল শাসনকর্তা আওরঙ্গজেবের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ আরম্ভ করেন।
গোলকুন্ডাকে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করাই ছিল আওরঙ্গজেবের একমাত্র লক্ষ্য। এই বিষয়ে তিনি মীর জুমলার সঙ্গে গোপনে ষড়যন্ত্র করেন। কিন্তু দারাশিকোহ এবং জাহানারার হস্তক্ষেপে তিনি গোলকুন্ডা জয় করতে পারেননি। সুলতান প্রচুর অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিয়ে নিজ রাজ্যের স্বাধীনতা রক্ষা করেন এবং নিজ কন্যার সঙ্গে আওরঙ্গজেবের পুত্র মুহাম্মদের বিবাহ দেন।
কুতুব শাহের মৃত্যুর পর গোলকুন্ডার শাসক হিসেবে মুহাম্মদ অধিষ্ঠিত হবেন এই প্রতিশ্রুতিও আওরঙ্গজেব কুতুব শাহ থেকে আদায় করেন।
সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি
আওরঙ্গজেব সিংহাসন লাভের পর তাঁর নীতি কার্যে পরিণত করার পরিপূর্ণ সুযোগ লাভ করেন। তাঁর শাসনকালের প্রথম যুগে মূলত উত্তর ভারতই তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্ষেত্র ছিল। এই সময়ে দক্ষিণ ভারতে মারাঠা বীর শিবাজীর অভ্যুদয় হয়। আওরঙ্গজেব যখন দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা তখন হতেই শিবাজী ধীরে ধীরে ক্ষমতা বিস্তার করছিলেন। সিংহাসন লাভের পর আওরঙ্গজেব নিজ মাতুল শায়েস্তা খানকে দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্তা নিয়োগ করেন।
শায়েস্তা খান প্রথম দিকে সাফল্য লাভ করলেও মারাঠা জাতীয় অভ্যুত্থানের নেতা শিবাজীকে প্রতিহত করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ব্যর্থ শায়েস্তা খান বাংলায় প্রেরিত হন। এরপর আওরঙ্গজেব তাঁর দুই খ্যাতনামা সেনাপতি দিলির খাঁ ও জয়সিংহকে শিবাজীর বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন । তাঁরা সাময়িকভাবে সাফল্য লাভ করলেও শিবাজীর ক্ষমতাকে দমন করতে পারেননি।
শিবাজী অপ্রতিহতভাবে নিজ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে থাকেন। উত্তর ভারতে নানা সমস্যায় ব্যস্ত সম্রাট দাক্ষিণাত্যে দৃষ্টি দিতে পারেননি । এর পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করলেন মারাঠা নেতা শিবাজী। শিবাজী নিজ দক্ষতার স্বাধীন মারাঠা রাজ্যের সূত্রপাত করেন।
অবশেষে ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে শিবাজীর মৃত্যুর পর বিদ্রোহী শাহজাদা আকবর যখন শিবাজীর পুত্র শম্ভূজীর সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন তখন আওরঙ্গজেব আর স্থির থাকতে পারলেন না। সেই সময়ে তিনি মেবারের সঙ্গে সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে রাজপুত যুদ্ধের অবসান ঘটান এবং ১৬৮১ খ্রি. স্বয়ং দাক্ষিণাত্য অভিমুখে যাত্রা করেন।
আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি
আওরঙ্গজেব ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সুন্নী মুসলমান। তাঁর ধর্মীয় নীতির লক্ষ্য ছিল, শরীয়ত অনুযায়ী ভারতে ইসলাম ধর্মকে এমন শক্তিশালী করা যার ফলে ভারত প্রকৃত ইসলামী রাষ্ট্র স্থাপিত হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি কাজকর্ম ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও আচার-অনুষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হবে। এই গোঁড়া ধর্মীয় নীতি তাঁর রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাহায্য করে।
দ্বিতীয়ত, ভ্রাতৃযুদ্ধের সময় আওরঙ্গজেব নিজেকে গোঁড়া সুন্নীদের প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লির সিংহাসনে তাঁর দাবি জানান। এবং একই সঙ্গে তিনি তাঁর উদার মতাবলম্বী অগ্রজ দারাকে অধার্মিক ও ইসলামবিরোধী বলে ঘোষণা করেন। এরফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নী সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানেরা তাঁকে সমর্থন জানায়। অতএব, আওরঙ্গজেবের শাসন নীতি তাঁর ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী বা পার্থিব লাভ-লোকসানের দ্বারা নির্ধারিত হয়নি।
নিষ্ঠাবান সুন্নী মুসলমান হিসেবে তিনি ইসলামী রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। এই রাজতন্ত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল যে, শাসক পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত নীতি অনুসারে রাজ্য শাসন করবেন। তাঁর রাজ্য শাসনের মূলনীতিই হবে পবিত্র কোরআনের নীতিগুলোকে শাসনের মাধ্যমে কার্যকর করা। এই নীতি কার্যকর করতে গিয়ে তিনি ইসলামের অনুশাসনগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে থাকেন।
ফলে তাঁর শাসনকালে মুঘল রাষ্ট্রের বহুল অংশ ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর ফলে ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলমান প্রজারা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার জন্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। সুন্নী মুসলমান প্রজাগণ আওরঙ্গজেবকে ‘জিন্দাপীর বলে মনে করতেন। তিনি সিংহাসনে আরোহণ করে ইসলাম শাস্ত্র বিরোধী আচার-আচরণ নিষিদ্ধ করেন। তিনি মুদ্রায় ‘কলেমা’ উৎকীর্ণ করা বন্ধ করেন।
কারণ তিনি মনে করতেন, অমুসলমানদের হাতে গেলে তা অপবিত্র হবে। তিনি ‘নওরোজ’ উৎসব বন্ধ করে দেন। যদিও তাঁর পূর্ববর্তী সম্রাটগণ এই উৎসব পালন করতেন। আওরঙ্গজেব এই উৎসবকে ইসলামবিরোধী বলে মনে করতেন। এছাড়া মুহতাসিব নামে একদল রাজকর্মচারী নিয়োগ করা হয়। যাদের কাজ ছিল কোরআন নির্দেশিত পথে জনসাধারণ আচরণ করছে কিনা তা দেখা।
কোরআনে অননুমোদিত আচার-অনুষ্ঠান কঠোর হস্তে দমন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সম্রাট তাঁর অনুশাসন কার্যকর করতে গিয়ে শিয়া-সুন্নী নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে শাস্তি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি শিয়াদের ‘মহরম’ উৎসব পালন নিষিদ্ধ করেন।
আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিত্ব ও কৃতিত্ব
মধ্যযুগে ভারতবর্ষের মুঘল ইতিহাসে আওরঙ্গজেব ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব। তাঁর দোষগুণের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বিচার অনেক ক্ষেত্রে করা হয়নি। তাঁর পিতা সম্রাট শাহজাহানকে নজরবন্দি করে রাখা এবং উত্তরাধিকার যুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী ভ্রাতাদের রক্তপাতের জন্য অধিকাংশ ঐতিহাসিক যুগধর্মকে ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনকে বিচার না করে আওরঙ্গজেবের চরিত্রকে কালিমা লিপ্ত করেছেন।
অথচ শাসক হিসেবে তাঁর যোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। আওরঙ্গজেব ছিলেন একজন সুদক্ষ শাসক, সমর নায়ক ও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন রাজনীতিবিদ। বিপদে তিনি কখনও সাহস ও ধৈর্য হারাননি। দাক্ষিণাত্যের শাসক হিসেবে তিনি দাক্ষিণাত্যের অভ্যন্তরীণ অবস্থা উন্নতি বিধানের চেষ্টা করেন। শাসনকার্যের খুঁটিনাটি বিষয়ও তাঁর দৃষ্টি এড়াতো না। আইন অমান্যকারীকে কঠোর হস্তে দমন করতেন।
শাসন ব্যাপারে তিনি নিজের সর্বাত্মক প্রাধান্যের পক্ষপাতি ছিলেন। আওরঙ্গজেবের নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা ও তাঁর নিয়মতান্ত্রিকতা প্রশংসার দাবি রাখে। কাফী খান বলেন, সাহস কষ্ট সহিষ্ণুতা এবং সুবিচারের ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেব অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। ইসলামী শাস্ত্রে তিনি প্রভুত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। ফারসি সাহিত্য, আরবিয় আইন-কানুন, নীতিশাস্ত্র প্রভৃতিতে তিনি পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন।
তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম আমলের সর্ববৃহৎ আইন সংকলন ‘ফতোয়া-ই-আলমগীরী, কাফী খানের ‘মুনতাখাব-আল-জেবুর’, ‘আলমগীরনামা’, মা’আসীর-ই- আলমগীরী, ‘খুলাসাত-আত-তাওয়ারীখ প্রভৃতি ঐতিহাসিক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ এবং অনাড়ম্বর।
পবিত্র কুরআনের অনুলিপি প্রস্তুত করে এবং নিজহস্তে টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মিতাহার, স্বল্পনিদ্রা, মাদক দ্রব্যাদিতে অনাসক্তি প্রভৃতি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
সারসংক্ষেপ
মুঘল সম্রাটদের মধ্যে আওরঙ্গজেব ছিলেন অন্যতম দক্ষ শাসক ও সমর নায়ক। তাঁর সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তৃতি ঘটে। তবে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটলেও সাম্রাজ্যে বিশৃক্মখলা দেখা দেয়। দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের উত্থান ঘটে। বিশাল সাম্রাজ্যের জটিল শাসনব্যবস্থার প্রতিটি সামান্য বিষয়েও ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করে কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তাঁর মতো এত সাধাসিধে সম্রাট দিল্লির সিংহাসনে বসেননি।
সহায়ক গ্ৰন্থপঞ্জী :
1. Ishwari Prasad, A Short History of Muslim Rule in India, Allahabad, 1970.
২. এ, কে, এম, আবদুল আলীম, ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস, ঢাকা, ১৯৭৩।
৩. আবদুল করিম, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, ঢাকা, ১৯৮৮।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
১। বাংলার শাসনকর্তা মীর জুমলা অহোম ও কুচবিহার অভিযান সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।
২। আওরঙ্গজেবের রাতপুত নীতির ফলাফল বর্ণনা করুন।
৩। দাক্ষিণাত্যেআওরঙ্গজেব কেন ব্যর্থহন?
৪। আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতামত ব্যক্ত করুন ।
৫। আওরঙ্গজেবের ধর্মীয়নীতির প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করুন ।
রচনামূলক প্রশ্ন :
১। আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্য বিস্তারনীতি সম্পর্কে যা জানেন লিখুন ।
২। আওরঙ্গজেবের রাজপুত নীতি পর্যালোচনা করুন।
৩। আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির বিবরণ দিন।
৪। আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতির বিশেষ উল্লেখপূর্বক তাঁর ব্যক্তিত্ব ও কৃতিত্ব বর্ণনা করুন ।
