পাশ্চাত্য ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রচলন

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় পাশ্চাত্য ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রচলন

পাশ্চাত্য ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রচলন

 

পাশ্চাত্য ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রচলন

 

পাশ্চাত্য ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রচলন

আঠার শতকের মাঝামাঝি থেকে উনিশ শতকের প্রথম দুই দশকের মধ্যে ভারতবর্ষের বেশির ভাগ অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সঙ্গে উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়, যার মধ্যে ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রচলন অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে । অবশ্য বণিক কোম্পানির আধিপত্য স্থাপিত হওয়ার পরপরই শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচিত হয়নি।

একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মুনাফা অর্জনই ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান উদ্দেশ্য, শিক্ষা বিস্তার নয়। কাজেই প্রথম পর্যায়ে শিক্ষার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতি সযত্নে অনুসৃত হয়। বরঞ্চ সরকারি উদ্যোগে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কোম্পানির প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮১ খ্রি. কলিকাতা মাদ্রাসা এবং ১৭৯২ খ্রি. বেনারস হিন্দু কলেজ স্থাপন করেন।

১৮০০ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। কোম্পানির কর্মচারীদেরকে এদেশীয় ভাষা-সংস্কৃতি ও রীতিনীতি শিক্ষা দেওয়া ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। তবে শিক্ষার ব্যাপারে পরিবর্তনের হাওয়া বইতেও বেশি সময় লাগেনি। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের চার্টার আইন এই পরিবর্তনের সূচনা করে। এই আইনের মাধ্যমে বৃটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতীয়দের শিক্ষার ব্যাপারে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেয়।

সে অনুসারে কোম্পানির কর্মকর্তাগণ শিক্ষাখাতে প্রথমবারের মতো ১০,০০০ পাউন্ড (প্রায় এক লক্ষ টাকা) ব্যয় বরাদ্দ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন এই টাকা অব্যবহৃত ছিল। কারণ শিক্ষার বিষয়বস্তু এবং কোন ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হবে সে প্রশ্নে কোম্পানির ভারতীয় কর্মকর্তাগণ মনস্থির করতে পারছিলেন না। এই বিষয়ে প্রধান দু’টো দল ছিল- প্রাচ্যবাদী (Orientalists) এবং পাশ্চাত্যবাদী (Anglicists)।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যখন শিক্ষা বিড়ারে সরকারি উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছিল তখন কলিকাতার কতিপয় গণ্যমান্য নাগরিক (হিন্দু ও খ্রিস্টান) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষা প্রচলনের ব্যবস্থা করেন। এটাই ১৮১৭ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজ যেখানে শুধুমাত্র হিন্দু ছাত্রদের প্রবেশাধিকার ছিল। একই সময়ে প্রধানত কলিকাতা শহরে বেশ কিছু ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় যার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ।

এভাবে বাংলায় অত্যন্ত সীমিত আকারে আধুনিক শিক্ষা চালু হয়। সরকারি মহলে Anglicist – Orientalist বিতর্কের অবসান হতে আরও অনেক বছর সময় লেগে যায়। ১৮২৮ খ্রি. উদারনীতির অনুসারী লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক বড়লাট হয়ে আসেন। অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো শিক্ষা সংস্কারেও তিনি মনোযোগ দেন। অনেক বিতর্কের পর তাঁর শাসনকালের শেষ পর্যায়ে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

১৮৩৫ খ্রি. Council-এর আইন বিষয়ক সদস্য টমাস বেবিংটন ম্যাকলে (Thomas Babington Macaulay) তাঁর বিখ্যাত স্মারক পেশ করেন। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে তিনি জোরালো মত প্রকাশ করেন যা বড়লাটের কাউন্সিল কর্তৃক গৃহীত হয়। এরপর এ ব্যাপারে আর কোন সংশয়ের অবকাশ থাকে না যে, সরকারি অর্থ এবং উদ্যোগ কেবলমাত্র ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিয়োজিত হবে।

সংগত কারণেই ম্যাকলের শিক্ষা বিষয়ক স্মারক ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা বিড়ারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে। প্রায় একই সময়ে শিক্ষা বিষয়ক কর্মকর্তা উইলিয়াম এডাম আরও ব্যাপকতর শিক্ষা বিস্তারের বিকল্প একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এডাম শিক্ষা বিস্তারের মূল ইউনিট হিসেবে গ্রামকে গণ্য করেন এবং নিম্নপর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের জন্য সরকারি বরাদ্দের সুপারিশ করেন।

মোট কথা তিনি শিক্ষার সার্বিক দায়- দায়িত্ব সরকার কর্তৃক গ্রহণ করার সুপারিশ করেন । কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এডামের সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণের পথে অগ্রসর হওয়ার পক্ষপাতি ছিল না। আর্থিক বিবেচনাই ছিল এ ব্যাপারে প্রধান বাধা। ফলে তথাকথিত Filtration তত্ত্বের ভিত্তিতে যে শিক্ষানীতি প্রচলিত হয় তা দীর্ঘদিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের নিগড়ে আবদ্ধ থাকে।

Filtration তত্ত্বের মূলকথা হচ্ছে, সমাজের উচ্চ শ্রেণীকে সরকারি প্রচেষ্টায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা হলে তারাই নিস্তর শ্রেণীসমূহের শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। কিন্তু বাস্তবে এই তত্ত্ব কার্যকরী হয়নি। পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে, ইংরেজি শিক্ষার নীতিগত লক্ষ্য ১৮৩৫ খ্রি. স্থিরীকৃত হয়ে যায়। অতপর ১৮৩৭ খ্রি. সরকারি কাজকর্মের ভাষা হিসেবে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি চালু হয়।

 

ইংরেজি রাষ্ট্রীয়ভাষা হিসেবে প্রচলিত হওয়ার আর্থ-সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। কারণ, এরপর থেকে এই ভাষায় পারদর্শিতা সমস্ত বৈষয়িক উন্নতির চাবিকাঠিতে পরিণত হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের উডের ডেসপাচ (Wood’s Despatch)। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের প্রেসিডেন্ট চার্লস উড এটা পাঠিয়েছিলেন।

প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার একটা বিস্তারিত রূপরেখা এতে সন্নিবেশিত হয়। নীতিগতভাবে শিক্ষা সম্প্রসারণের পক্ষে মত দিলেও এই স্মারক আর্থিক রক্ষণশীলতা থেকে মুক্ত ছিল না। সরকারি অনুদানের সাথে সাথে বেসরকারি উৎসের মাধ্যমে শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের উপর এতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অবশ্য, ভারতীয়দেরকে শিক্ষাদান কোম্পানির সরকারের একটি ‘পবিত্র দায়িত্ব একথা উডের ডেসপাচ কর্তৃক সর্বপ্রথম স্বীকৃত হয়।

তবুও বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার নীতি অব্যাহত থাকে । শিক্ষার বিস্তারের ক্ষেত্রে উল্লেখিত চিন্তা-ভাবনা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টার ফল স্বরূপ ভারতের অন্যান্য অঞ্চল অপেক্ষা বাংলায় নতুন শিক্ষার প্রচলন ব্যাপক ও দ্রুততর হয়। এর প্রধান কারণ কলিকাতাকে ঔপনিবেশিক শাসনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত ছিল। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের পর জেলা সদরে অনেক কলেজ স্থাপিত হয়।

তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঃ হুগলী কলেজ (১৮৩৬), ঢাকা কলেজ (১৮৪১), কৃষ্ণনগর কলেজ (১৮৪৫), বহরমপুর কলেজ (১৮৫৩), চট্টগ্রাম কলেজ (১৮৬৯), রাজশাহী কলেজ (১৮৭৩), জগন্নাথ কলেজ (১৮৮৪), ব্রজমোহন কলেজ (১৮৮৯), মুরারীচাঁদ কলেজ (১৮৯১), এডওয়ার্ড কলেজ (১৮৯৮), ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৯৯) ইত্যাদি। ভারতের প্রথম তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়- কলিকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ ১৮৫৭ খ্রি. স্থাপিত হয়।

প্রথম দিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ মূলত কলেজ পর্যায়ে শিক্ষাদানে তত্ত্বাবধানের কাজে নিয়োজিত ছিল। এইভাবে উনিশ শতকে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে আধুনিক শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয়। পরবর্তীকালে এর প্রসার ঘটে। আধুনিক শিক্ষার ফল হিসেবে বাংলায় এবং ভারতের অন্যত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। বাংলায় নবজাগরণের সূত্রপাত এবং একটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।

হিন্দু সম্প্রদায় এই নতুন শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ছিল বিধায় তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি সর্বাগ্রে সাধিত হয়। বিভিন্ন কারণে বাংলার মুসলিম সম্প্রদায় এই শিক্ষা গ্রহণের জন্য এগিয়ে আসতে দেরি করে। ফলে জীবনের সব ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে পড়ে।

ঔপনিবেশিক ভারতের প্রায় সর্বত্র এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার বৈষম্য তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণাকে প্রভাবিত করে। এইভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আর্থিক এবং সামাজিক ভিত্তি রচিত হয়।

সারসংক্ষেপ

ঔপনিবেশিক বাংলায় তথা ভারতবর্ষে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। প্রথম পর্যায়ে শিক্ষা বিস্তার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না; কারণ এটি ছিল মূলত একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের চার্টার আইন শিক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়ার জন্য কোম্পানিকে নির্দেশ দেয়। শিক্ষার মাধ্যম এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে দীর্ঘ বিতর্কের সূত্রপাত হয়।

অবশেষে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ম্যাকলের সুবিখ্যাত স্মারকের মাধ্যমে এই বিতর্কের অবসান হয়। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৮৩৭ খ্রি. ইংরেজি সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে। সরকার শিক্ষা বিস্তারের প্রশ্নে পুরো আর্থিক দায় গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে সচেষ্ট ছিল।

তথাপি উনিশ শতকের শেষার্ধে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উচ্চ শিক্ষা ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ভারতবর্ষে আধুনিক শিক্ষা প্রচলনের ফলে নবজাগরণ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ঘটেছিল ।

সহায়ক গ্ৰন্থপঞ্জী :

১। অমলেন্দু দে, বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, কলিকাতা, ১৯৮৭।

২। Sirajul Islam (ed.), History of Bangladesh, 1704-1971, Vol. III, Dhaka, 1992.

 

পাশ্চাত্য ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রচলন

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা বিস্তার প্রসঙ্গে প্রধান বিতর্কের বিষয় কি ছিল?

২। ম্যাকলের স্মারকলিপির তাৎপর্য কি?

৩। উড্-এর স্মারকের মূল বক্তব্য কি?

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। বাংলায় আধুনিক শিক্ষা প্রচলনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।

২। ভারতবর্ষে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পটভূমি ও ফলাফল সংক্ষেপে আলোচনা করুন।

Leave a Comment