আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় উদারনৈতিক নারীবাদ – যা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলার নারী |
উদারনৈতিক নারীবাদ

উদারনৈতিক চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী নারীবাদীরা ছিলেন তাদের সময়ের এবং সমাজের প্রগতিশীল ধ্যানধারণার অধিকারী বুদ্ধিজীবি শ্রেণির সদস্য। এরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, একমাত্র যুক্তিই পারবে মানবসমাজকে একটি উন্নততর সমাজব্যবস্থায় নিয়ে যেতে এবং সকল কুসংস্কার থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে যা মানবতার পথে একটি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।
২ উদারনৈতিক নারীবাদ অনুসারে সামাজিক রীতিনীতি ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত আইনব্যবস্থা নারীর পশ্চাদপদতার কারণ। পুরুষ নারীর চাইতে দৈহিক শক্তিতে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে সবল- সমাজের এই প্রচলিত বিশ্বাস নারীর যথাযথ বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং নারীকে জনজীবনে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
উদারনৈতক নারীবাদীরা সমাজের কল্যাণার্থে নারীর জন্যও পুরুষের সমান সুযোগ-সুবিধা দাবি করেন যাতে করে নারীরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে পুরুষের মতন যোগ্যতা ও সফলতা অর্জন করতে পারে। ২০ উদারনৈতিক নারীবাদীদের উত্থাপিত দাবির মধ্যে ছিল নারীর শিক্ষার অধিকার, নারীর ভোটাধিকার, আইনি অধিকার, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবার অধিকার।
উদারনৈতিক মতবাদের প্রধার বৈশিষ্ট্য হলো, দাবি বা অধিকার আদায়ে কোন বৈপ্লবিক পথের কথা এখানে বলা হয় নি, এখানে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে যুক্তি এবং শিক্ষাকে। তারা শিক্ষাকে মানবসমাজের সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখেছেন এবং গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষা এবং যুক্তির যথার্থ চর্চাই নারী-পুরুষ উভয়কেই প্রকৃতপক্ষে মুক্ত করতে পারে।
এই মতবাদে বিশ্বাসী নারীবাদীদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন মেরী ওলস্টোনক্রাফট, জন স্টুয়ার্ট মিল, ফ্রান্সিস রাইট, হেরিয়েট টেইলর, বেটি ফ্রায়ডান প্রমুখ। এই মতবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি বিদ্যমান সমাজকাঠামোর মধ্যেই নারীর সমান অধিকার দাবি করে। নারীর জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ এই মতবাদে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব লাভ করেছে।
মেরী ওলস্টোনক্রাফট প্রধানত নারীর সকল দুর্দশার জন্য নারী-পুরুষের অসম শিক্ষাব্যবস্থা এবং পুরুষ নিয়ন্ত্রিত অধস্তনতার শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। ২৫
তিনি নারীজাতির দুর্দশার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সমাজে নারী সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে।
তিনি বলেন নারীর গুণাবলী সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ধারণা ( Mistaken notations of female excellence) দ্বারা নারীরা প্রভাবিত হয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পরে। প্রচলিত সামাজিক ধ্যানধারণা নারীকে বিশ্বাস করতে সেখায় যে নারীর প্রকৃতি হচ্ছে কোমল, সে হবে ধৈর্যশীল, মমতায়ী। এসব গুণাবলীকে সমাজ নারীর জন্য নির্দিষ্ট করে দেয় এবং একজন নারীসমাজে আদর্শ নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য এসব গুণাবলী অর্জন করাই তার লক্ষ্য বলে মনে করে ।
মেরী নারীশিক্ষা প্রসঙ্গে রুশো যে মতামত দিয়েছে তার একান্ত বিরোধিতা করেছেন। রুশো নারী-পুরুষের বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। রুশোর যুক্তি ছিল নারী প্রকৃতি পুরুষের মত শিক্ষাগ্রহণের যোগ্য নয়।
নারী তার সমাজ নির্ধারিত গুণাবলী অর্জন করবে এবং তাতেই সে পুরুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, কেননা পুরুষ তার নিজ প্রকৃতির বিপরীত নারীকেই পছন্দ করে। মেরী রুশোর এই যুক্তি খণ্ডন করে বলেন যে, বৈষম্যমূলক শিক্ষা নারীকে কখনই পুরুষের উপযুক্ত সহধর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। এতে করে নারী সমাজের বোঝা হয়েই থাকে।
মেরী মনে করেন, মানবতাকে আরো মহৎ হতে হলে নারী-পুরুষ উভয়কে সমান অবস্থানে থেকে একই নীতিতে কাজ করতে হবে। এবং এটা কখনই সম্ভব হবে না যদি কেবল পুরুষদেরকে এ কাজের যোগ্য করে তোলা হয়। এজন্য নারীকে অবশ্যই শিক্ষার মাধ্যমে তাদের যথাযথ গুণাবলী অর্জনের অধিকার দিতে হবে।
মেরী নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনকে গুরুত্ব দিয়েছেন। নারীর অধিকার অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন তার আর্থিক সচ্ছলতা। মেরী নারীকে শুধু পারিবারিক দায়িত্বে আবদ্ধ না থেকে নাগরিক দায়িত্ব (civil duties) পালনে যত্নশীল হতে পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ এর মাধ্যমেই সে নিজেকে সমাজের জন্য অধিক যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে।
A Vindication of the Rights of Woman গ্রন্থের সমাপ্তি টানতে মেরী বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে, নারীকে যুক্তিবাদী প্রাণি এবং স্বাধীন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যাতে তারা আদর্শ মা এবং স্ত্রী হয়ে উঠতে পারে, আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন পুরুষ পিতা এবং স্বামী হিসেবে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।
২৬ মেরীর বক্তব্য বিশ্লেষণে তাঁর মতবাদের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা যায় তিনি সমাজে নারীর সনাতন ভূমিকা (মা এবং স্ত্রী হিসেবে) অস্বীকার করেন নি। বরং সমাজের কল্যাণের জন্য নারীকে তার ভূমিকা যথাযথ পালনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, এর জন্য নারীর সুশিক্ষাকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
মেরী ওলস্টোনক্রাফট তার A Vindication of the Rights of Woman গ্রন্থটি রচনা করেন ১৭৯২ সলে। পরবর্তী সময়ে ১৮৬৯ সালে তাঁর সমমতের একজন তাত্ত্বিকের নারীবাদী রচনা পাওয়া যায় যিনি পুরুষ হয়েও নারীর জন্য সমান অধিকার এবং বিশুদ্ধ সাম্য দাবি করেন। জন স্টুয়ার্ট মিল তার ‘দ্যা সাবজেকশন অব উইমেন’ গ্রন্থের শুরুতেই সমাজে প্রচলিত নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক নীতির বিরোধিতা করে বলেন,
“That the principle which regulates the existing social relations between the two sexes – the legal subordination of one sex to the another is wrong in itself, and now one of the chief hindrances to human improvement; and that it ought to be replaced by a principle of perfect equality, admitting no power or privilege on the one side, nor disability on the other.”
প্রথমেই মিল সামাজিক রীতিনীতির বিরোধিতা করেছেন, যার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যেহেতু নারীসমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ তাই নারীকে তার অধিকার ও স্বাধীনতা প্রদান করলে তা কেবল নারীর জন্যই কল্যাণকর হবে না বরং সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্যই কল্যাণকর হবে।
পুরুষতন্ত্র ঘোষণা করে যে নারীর ওপর পুরুষের যে আধিপত্য তা নারীরা স্বেচ্ছায় মেনে নেয় এবং এর বিরুদ্ধে খুব কম নারীই অভিযোগ করে থাকে। এই বক্ত্যবের বিপরীতে মিল যুক্তি দেন, এটি আপাতদৃষ্টিতে সত্য মনে হলেও প্রকৃত সত্য নয়। তিনি বলেন অনেক নারীই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের প্রকাশ্য বিরোধিতা করছেন তাদের লেখনির মাধ্যমে।
তিনি তার মতবাদে বলেন, কোনো পরাধীন শ্রেণীই দীর্ঘকাল যে শক্তির অধীনে থাকে সরাসরি সেই শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় না বরং প্রতিবাদ জানায় তার পীড়নের বিরুদ্ধে, যে কারণে নারীরা পুরুষতন্ত্রের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে না, প্রতিবাদ করে তাদের স্বামীদের পীড়নের বিরুদ্ধে। মিল একে বলেছেন প্রকৃতির রাজনৈতিক বিধান (political law of nature)।
প্রকৃতিগতভাবেই নারীরা দুর্বল ও পুরুষেরা সবল, কাজেই দুর্বল সবলের অধীন থাকবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম, পুরুষতন্ত্রের এ দাবীকে মিল পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন যে,নারী-পুরুষের যথার্থ প্রকৃতি জানবার মতো কোনো বিজ্ঞানসম্মত পন্থা যেহেতু নেই তাই লৈঙ্গিক ভিন্নতার কারণে জৈবিকভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে যে পার্থক্য করা হয় তা eminently artificial thing।
নারী-পুরুষের মধ্যে যে প্রকৃতিগত পার্থক্যের কথা বলা হয় তাও পুরুষতন্ত্রের সৃষ্টি এবং প্রথাভিত্তিক। মিলের মতে পুরুষতন্ত্র নারী ও পুরুষের জন্য দুটি পৃথক কর্মক্ষেত্র তৈরি করে এবং নারীর জন্য বরাদ্দ করে গৃহের অন্তঃপুর ও পুরুষের জন্য বাইরের বিশ্ব। বাইরের বিশ্বের কাজের জন্য নারী অযোগ্য নয় বরং পুরুষই তাকে সেই যোগত্যা প্রমাণের সুযোগ দেয় নি। যেহেতু তাদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দেয়া হয় নি তাই বলা যাবে না যে নারী অযোগ্য।
নারীকে পুরুষের সমান হবার জন্য সবধরনের পেশায় অংশগ্রহণ করা জরুরী। মিলের মতে, নারীমুক্তির লক্ষে নারীর জন্য শিক্ষা ও শিক্ষালাভের অধিকারের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মেরীর অনুরূপ মিল ও অভিমত প্রকাশ করেন যে, পুরুষতন্ত্র নিপীড়নের মাধ্যমে নয় বরং তার উদ্ভাবিত শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে নারীকে পুরুষের একান্ত অনুগত ও প্রিয় দাসী হিসেবে গড়ে তোলে।
শিশুকাল থেকেই নারীকে শেখানো হয় যে, তাদের প্রকৃতি পুরুষের বিপরীত; নারীরা নিয়ন্ত্রণ করবে না, তারা আত্মসমর্পণ করবে অন্যের নিয়ন্ত্রণের কাছে, তার থাকবে না নিজের কোনো ইচ্ছাশক্তি। এভাবেই নারী হয়ে ওঠে ভীরু এবং বশ্যতাপরায়ন। মিল পুরুষতন্ত্রের এরূপ শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান করেন। তিনি এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ করেছেন।
মা ও স্ত্রী হিসেবে নারীর সমাজ নির্ধারিত যে ভূমিকা রয়েছে মিল তাকে সর্বজনীন সত্য বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন কারণ হিসেবে তিনি বলেন নারী তার এই ভূমিকাকে সানন্দে মেনে নেয় কিনা তা বলা যায় না, কারণ নারীকে অন্য কোন পেশা বা ভূমিকা স্বাধীনভাবে বেছে নেবার সুযোগ দেয়া হয় না। তার সামনে একটিমাত্র পথ খোলা থাকে তা হচ্ছে বিয়ে।
তিনি বিয়েকে সাম্যের ভিত্তিতে (equal conditions) প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য দাবি জানিয়েছেন। যে সব নারীদের পক্ষে সম্ভব তাদেরকে মিল বিয়ে ব্যতীত অন্য যে কোনো পেশা বেছে নেবার পরামর্শ দিয়েছেন।
সম্ভাব্য ক্ষেত্রে তিনি নারীর বিবাহবিচ্ছেদ ও নারীর পুনর্বিবাহের অধিকার দাবী করেছেন।
নারীর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকারকে মিল সমর্থন করে বলেন বিয়ের পূর্বে পুরুষ ও নারী যে সম্পত্তির অধিকারী থাকে বিয়ের পরও সেই সম্পত্তি তারই থাকবে। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য মিল নারীকে সব ধরনের পেশা ও ভূমিকা প্রদানেরই সুপারিশ করেছেন।
নারীর রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে মিল সুস্পষ্টভাবে তার অভিমত প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন যে, যদি রাজনীতিতে অংশ নেবার জন্য যোগ্যতাকে মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয় তবে যোগ্য পুরুষের পাশাপাশি যোগ্য নারীকেও সেই সুযোগ দিতে হবে, একইভাবে অযোগ্য নারীর মত অযোগ্য পুরুষও এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
মিলের দৃষ্টিতে, যে যুক্তিতে পুরুষরা ভোটাধিকার পায়, একই যুক্তিতে নারীদেরও ভোটাধিকার থাকা উচিত ২ মিলের নারীবাদী চিন্তা বিশ্লেষণে দেখা যায় পরিবার ব্যবস্থাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবার থেকেই নারী নিপীড়নের সূত্রপাত ঘটে। মিল পরিবারপ্রথা পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছেন, তিনি পরিবারপ্রথা বিলুপ্তির পক্ষে মত দেন নি। এক্ষেত্রে মিলের চিন্তার স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়।
তিনি একদিকে নারীর স্বাধীনভাবে কোনো পেশা পছন্দ করার বিষয়ে মত দিয়েছেন আবার গৃহের মধ্যে নারীকে মাতৃত্বের গুণাবলীতে দেখতে চেয়েছেন, কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন, মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক পিতার চেয়েও গভীর এবং সন্তানের শিক্ষায় মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এভাবে কার্যত মিল শেষ পর্যন্ত নারীর সনাতন ভূমিকাকেই পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছেন।
তবে অবশ্যই তিনি নারীর অবস্থানের উন্নতি ও নারীর জন্য সাম্য ও সমঅধিকারের কামনা করেছেন। উদারনৈতিক নারীবাদী ফ্রান্সিস রাইট নারীদেরকে যুক্তি ও বাস্তবসম্মত চিন্তাধারা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন সামাজিক রীতিনীতি, ধ্যানধারণা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নারীকে অধস্তন করে রাখে। কেবল যুক্তি ও বাস্তব চিন্তার মাধ্যমেই নারী এসব বিষয়ের উর্দ্ধে উঠে কোন বিষয়কে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারবে।
অপর উদারনৈতিক নারীবাদী তাত্ত্বিক সারা গ্রিমকে নারীর অবস্থানকে চিহ্নিত করার জন্য ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তিনি বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখিত নারীর ভূমিকার প্রতি দৃষ্টিআকর্ষণ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে নারীরা সমাজে তার সৃষ্টিকর্তা নির্ধারিত ভূমিকা পালন করবে।
তিনি বলেন নারীরা সৃষ্টিকর্তা নির্ধারিত ভূমিকা পালন না করার ফলে বিশ্বে নানা ধরনের দ্বন্দ্বের উদ্ভব হচ্ছে।” তিনি পুরুষ কর্তৃক ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা করার বিরোধিতা করে বলেন, “My protest against the false translation of some passages by the men who did that work, and against the perverted interpretation by the men who undertook to write commentaries thereon.”
তিনি যুক্তি দেখান যিশু নারী-পুরুষ সবার জন্য একই পথ নির্দেশ করেছেন, এবং নারী-প্রকৃতি ও পুরুষ প্রকৃতি বলে যে পার্থক্য করা হয় তা পুরোপুরি অখৃষ্টীয় পুরুষতান্ত্রিক ঐতিহ্য। তিনি বলেন পুরুষের যুদ্ধ নারীর মেধা, মনন, এবং আত্মার বিরুদ্ধে এবং পুরুষ নারীর নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দেয়।” তিনি নৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে পুরুষ নারীর চাইতে দুর্বল পুরুষে এই যুক্তির বিরোধিতা করেন।
অন্যান্য উদারনৈতিক নারীবাদীর মতো গ্রিমকে নারীর শিক্ষার ওপর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বারোপ করেন এবং পুরুষতন্ত্র নির্ধারিত নারীশিক্ষার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন শিশুর নৈতিক এবং মানসিক বিকাশে নারীর প্রভাব বেশি দেখা যায়, একারণে উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে নারীকে তৈরি হতে হবে মা এবং বোন হিসেবে তাদের পবিত্র দায়িত্ব পালনের জন্য।
উনিশ শতকের অপর দুজন উদারনৈতিক চিন্তার নারীবাদী এলিজাবেথ কেডি স্টানটন এবং সুসান বি অ্যান্টনী তাদের মতাদর্শে শিক্ষার পাশাপাশি নারীর ভোটাধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এলিজাবেথ কেডি স্টানটন ভোটাধিকারহীন নারীর অবস্থাকে ” Taxation without Representation” হিসেবে বর্ণনা করেন। সুসান বি অ্যান্টনী মনে করেন, ভোটাধিকার হচ্ছে নারীর স্বাভাবিক অধিকার, যা নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব এবং পরিবারে নারীর দাসত্বের অবসান ঘটাবে।
উদারনৈতিক নারীবাদের দ্বিতীয় পর্যায়ে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বেটি ফ্রাইডান তার The Feminine Mystique (1963) এবং The Second Stage (1981) নামক দুটি গ্রন্থে নারীবাদী চিন্তা তুলে ধরেছেন।
ফ্রাইডান The Feminine Mystique গ্রন্থে নারী সংক্রান্ত যে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রদানের চেষ্টা করেছেন সেটি হলো: কেন নারীরা বিয়ে আর সন্তানধারণকে তাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করে ? তাঁর দৃষ্টিতে নারী হচ্ছে ক্ষমতাহীন সেক্স শ্রেণি এবং পুরুষকে ক্ষমতাবান সেক্স শ্রেণি। তিনি নারীদের নিজেদের চেষ্টা দ্বারা পুরুষের মতো ক্ষমতাবান সেক্স শ্রেণির পর্যায়ভুক্ত হতে পরামর্শ দেন।
ফ্রাইডান মনে করেন সনাতন ভূমিকা পালন থেকে মুক্ত হবার জন্য নারীকে গৃহের বাইরে কাজ করা উচিত। তিনি বলেন, নারীরা শিক্ষালাভ করে ঘরের বাইরে উৎপাদনী ক্ষেত্রে তাদের শ্রমকে যদি কাজে না লাগায় তাহলে তাদের মধ্যে মারাত্মক হতাশার সৃষ্টি হবে।
তিনি নারীর গৃহে দায়িত্ব পালনের সাথে বাইরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোন দ্বন্দ্ব খুজে পান নি। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন, “আপনার পরিচয় ক্ষমতা এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতার অর্থ এই নয় যে আপনি কোন পুরুষকে ভালবাসবেন না বা আপনাকে ভালবাসবে না কিংবা আপনার সন্তানদের যত্ন নেওয়া ছেড়ে দেবেন।
ফ্রাইডান ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনে নারী-পুরুষের দায়িত্ব বণ্টন ও পুরুষের অংশগ্রহণ দাবী করেছেন এবং শিশুর রক্ষণাবেক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেছেন
এই পর্যায়ের অন্য দুই নারীবাদী তাত্ত্বিক র্যাডক্লিফ রিচার্ডস ও সুসান মোলার ওকিন নারীর গুণাবলী বিকাশের জন্য সমান সুযোগ এবং পরিবারে নারী-পুরুষের সমান দায়িত্ব বণ্টনের কথা বলেছেন। নারীর জন্য শিক্ষার সুযোগ ও শিশুর রক্ষণাবেক্ষণে তাঁরাও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

উদারনৈতিক নারীবাদের তত্ত্ব বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রাথমিকভাবে এই মতবাদে বিশ্বাসী নারীবাদীরা প্রধানত নারীর জন্য সমানাধিকার দাবি করেন, বিশেষত নারীর জন্য শিক্ষার অধিকারের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বলাভ করেছে।
এই মতবাদ পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে না গিয়ে বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই নারীর অবস্থার পরিবর্তন চেয়েছে। পরবর্তীতে বেটি ফ্রাইডান, র্যাডক্লিফ রিচার্ডস ও সুসান মোলার প্রমুখ নারীবাদী শুধুমাত্র সমানাধিকার নয় বরং রাষ্ট্রের আনুকূল্যে নারীর জন্য সকল কল্যাণকর ব্যবস্থা এরা দাবি করেছেন।
