আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় উত্তরাধুনিক নারীবাদ – যা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলার নারী |
উত্তরাধুনিক নারীবাদ

উত্তরাধুনিক নারীবাদীরা আধুনিকতার বিপরীতে অবস্থান করেন, কেননা তারা আধুনিকতা এবং পিতৃতন্ত্রকে পারস্পরিক সম্পৃক্ত বলে মনে করেন। উত্তরাধুনিক নারীবাদীরা আধুনিকতার উচ্ছেদের মাধ্যমে পিতৃতন্ত্রের অবসান চেয়েছেন। উত্তরাধুনিক নারীবাদীদের মতে নারীর জন্য শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক সমতা অর্জন নারী- পুরুষের বৈষম্য দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ নারী-পুরুষের বৈষম্য কেবল এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর মূল নিহিত রয়েছে চিন্তা কাঠামোর মধ্যে।
এই ধারার তাত্ত্বিকেরা বলেন, চিন্তা কতকগুলি আবশ্যিক বিধি মেনে চলে এবং এর মাধ্যমেই সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য অনিবার্য হয়ে ওঠে, এই বিধি মানুষের চিন্তার বৈষম্যকেও অস্বীকার করে। উত্তরাধুনিক নারীবাদীরা নারীকে এই চিন্তার পরাধীনতা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। মুক্ত করার মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিয়েছেন সাহিত্য এবং ব্যবহৃত ভাষাকে।
উত্তরাধুনিক নারীবাদী হেলেন সিসু -র মতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে পুরুষের লেখা মেয়েলি লেখার ওপর আধিপত্য করে। তিনি পুরুষালি লেখার বিরোধিতা করে বলেন, পুরুষরা তাদের লেখায় এমনভাবে দুটি বিপরীতধর্মী জোড় তৈরি করেন, যার একটি অন্যটির উপর প্রভূত্বকারী। এই বিপরীতধর্মী জোড়-এর উদাহরণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন : সক্রিয়তা/নিষ্ক্রিয়তা, সূর্য/চন্দ্র, সংস্কৃতি/ প্রকৃতি, দিন/রাত, বলা/লেখা, উঁচু/নিচু প্রভৃতি জোড়কে।
তিনি মনে করেছেন পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে পুরুষের জন্য সক্রিয়, সাংস্কৃতিক, আলো এসব ইতিবাচক গুণ নির্ধারণ করা হয় আর বিপরীত নেতিবাচক গুণাবলী নির্ধারিত থাকে নারীর জন্য। তিনি নারীকে পুরুষ কর্তৃক নির্ধারিত জগৎ-এর বাইরে এসে নিজ লেখনী সৃষ্টির আহ্বান জানান। তিনি আশা করেন যে, নারীরা সমাজমানসে পরিবর্তন আনতে সক্ষম এমন লেখা লিখবেন। সিক্সু নারী সমাজের মুক্তির জন্য যুক্তির পরিবর্তে ইচ্ছাশক্তিকে অপরিহার্য মনে করেন।
অপর উত্তরাধুনিক নারীবাদী তাত্ত্বিক লুস ইরিগারের মতানুসারে, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-কাঠামোতে নারীকে প্রকৃত অর্থে জানা অসম্ভব। তিনি নারীর বন্দিত্ব ও নারীমুক্তির কৌশলের উপর গুরুত্বারোপ করেছন। নারীমুক্তির কৌশল হিসেবে তিনি তিনটি পন্থা নির্দেশ করেছেন:
১) ভাষার প্রকৃতির ওপর মনোযোগ : তিনি বলেন অধিকাংশ শব্দই পুরুষকেন্দ্রিক, একইসাথে প্রচলিত ভাষায় নারী অনুপস্থিত। ইরিগারে নারীসমাজকে তাদের মুক্তির জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হতে পরামর্শ দিয়েছেন।
২) ইরিগারে মনে করেন নারীরা তাদের মুক্তির জন্য দৈহিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারে এবং তাদের কথা বলা ও চিন্তা করা শিখতে হবে।
৩) পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নারীরা মুকাভিনয়ের কৌশল অবলম্বন করতে পারে। তিনি মনে করেন নারীর উচিত নারীর প্রতিকৃতিকে পুরুষের সামনে বড় করে তুলে ধরা । এভাবে নারীরা একটি শক্তি হিসেবে বিকাশিত হতে পারে।
দার্শনিক ও তাত্ত্বিক জুলিয়া ক্রিস্টিভা পুরুষালি ও মেয়েলি বলে যে পার্থক্য করা হয় তাকে জৈবিকতার মধ্যে সীমিত করেন নি বরং এর বিরোধিতা করেছেন। তিনি মনে করেন নারী প্রত্যয়টি ভুল, নারী বলতে কিছু নেই। নারী – মেয়েলি এসব প্রত্যয়ের বিরোধিতা করে বলেন, “একজন নারী ( one is a women) এই বিশ্বাসটি ‘একজন পুরুষ’ (one is a man) এই বিশ্বাসটির মত প্রায় একই রকম হাস্যকর ও অস্পষ্ট।
আমি প্রায় কথাটি বলছি এজন্য যে, আজো নারীরা অনেক কিছু করতে পারে : গর্ভপাত ও জন্মশাসনের স্বাধীনতা, সন্তানদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার, কর্মের সমতা ইত্যাদি। কাজেই ‘আমরা নারী’ (We are women) কথাটি আমাদের দাবির জন্য বিজ্ঞাপন বা স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করি। কাজেই গভীরতর অর্থে, একজন নারী হতে (be) পারে না; এমনকি হওয়ার প্রক্রিয়াতেও (being) থাকে না।”
সময় বিবর্তনের সাথে সাথে মানবসমাজে এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে, ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিবর্তন ঘটেছে নারী সংক্রান্ত ধ্যানধারণার। বিভিন্ন পার্থক্য সত্ত্বেও প্রতিটি নারীবাদী তত্ত্বেই দেখা যায় নারীর অবস্থান পরিবর্তনের প্রচেষ্টা এবং সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য সুযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টা। ভারতবর্ষে অবিভক্ত বাংলায় দেখা যায় প্রাচীন আমল থেকে নারী তার সনাতন ভূমিকা পালনেই সন্তুষ্ট ছিল।
পরবর্তী সময়ে উপনিবেশিক শাসনামলে বিদেশী শাসনের ফলে বাংলার এই চিরায়ত সমাজকাঠামোতে ভাঙ্গন ধরে। সমাজ-মানসে পরিবর্তন আসে। এর সাথে সাথে দেখা যায় বাঙালি নারীর চিরন্তন ভূমিকা ও নারীর উপর বিধিবদ্ধ নিয়মনীতি নিয়ে সংশয় ও প্রশ্ন তৈরি হয়। কাজেই দেখা যায় ইউরোপ ও আমেরিকায় যখন বিভিন্ন নারীবাদী তত্ত্ব প্রচার হচ্ছে তখন বাংলায় চলছে বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলন।
এই সংস্কার আন্দোলনের বড় অংশই ছিল নারী সংক্রান্ত। তাই ১৮৬৯ সালে জন স্টুয়ার্ট মিল যখন দ্য সাবজেকশন অব উইমেন গ্রন্থটি রচনা করেন তখন অবিভক্ত বাংলায় রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদে সফল হয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর প্রচেষ্টায় বিধবা বিবাহ আইনগত ভিত্তি পায়, বহু বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে আন্দোলন।

দেখা যায় বাঙলায় এই নারীবাদীদের কার্যক্রম উদারনৈতিক নারীবাদের পর্যায়ভুক্ত ছিল। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত নারীরাও উদারনৈতিক নারীবাদী চিন্তাচেতনা বহন করতেন। চল্লিশের দশকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রসারের ফলে বাংলায় নারীদের মধ্যে মার্ক্সীয় চেতনা বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী অধ্যায়সমূহে উনিশ শতকের নবজাগরণের ফলে বাংলায় নারীসমাজের অবস্থানগত পরিবর্তন এবং রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়সমূহ আলোচিত হবে।
