উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায় : প্রান্তিক ও শ্রমজীবি নারীর উন্মেষ : ১৯৪০-৪৮

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায় : প্রান্তিক ও শ্রমজীবি নারীর উন্মেষ : ১৯৪০-৪৮ |

উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায় : প্রান্তিক ও শ্রমজীবি নারীর উন্মেষ : ১৯৪০-৪৮

 

উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায় : প্রান্তিক ও শ্রমজীবি নারীর উন্মেষ : ১৯৪০-৪৮

 

১৯৩৯-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ভারতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তন করে। অবিভক্ত বাংলাতে এসময়ে কংগ্রেসের নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর মতবিরোধকে কেন্দ্র করে ভাঙন ধরে।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪১-এর জুনে হিটলার বাহিনী সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণ করলে সমাজতান্ত্রিক দল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে এবং কমিউনিষ্ট পার্টির এই ভূমিকার ফলে ১৯৪২-এ বৃটিশ সরকার কমিউনিষ্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে কমিউনিষ্ট দল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৪৭-এর আগস্টে উপনিবেশিক শাসনমুক্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত বাংলার রাজনীতিতে এই সমাজতান্ত্রিক দল এবং এর মহলিা সদস্যবৃন্দ বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

মূলত উপনিবেশিক শাসনমুক্ত হবার এই চূড়ান্ত পর্যায়টি কৃষক- শ্রমিকসহ শ্রমজীবিদের শোষণের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের পর্বও বলা যায়। এই শ্রমজীবি সমাজের অংশ হিসেবে নারীরাও শ্রেণি শোষণ এবং তাদের অধিকারের প্রতি সচেতন হয়ে ওঠে। সাম্যবাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে নারীমুক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত এ সময়ে হয়।

১৯৩৯-এর ৩ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ড জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। একই দিনে উপনিবেশিক প্রশাসন ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কোনরূপ আলোচনা না করেই যুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়।

মহাত্মা গান্ধী, নেহেরু এবং কংগ্রেসের সমমনা নেতৃবৃন্দ এই যুদ্ধে যোগদানের বিরোধিতা করেন। সেপ্টেম্বর-১৯৩৯-এ কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সভায় ঘোষণা করা হলো, “… the issue of war and peace for India must be decided by the Indian people. ” তবে নেতৃবৃন্দ অভিমত প্রকাশ করেন যে, ভারত বৃটেনকে যুদ্ধে সাহায্য করতে প্রস্তুত যদি বৃটিশ সরকার ভারতকে স্বাধীনতা প্রদান করার প্রতিজ্ঞা করে।

বৃটেন সরকার এ প্রস্তাবকে মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় গান্ধীজী ‘ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। অক্টোবর ১৯৪০ থেকে ডিসেম্বর ১৯৪১ পর্যন্ত এক বছরব্যাপী এই আন্দোলন চলার পর গান্ধীজী এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। ৮ আগস্ট ১৯৪২-এ কংগ্রেস-এর বোম্বে অধিবেশনে বৃটিশ সরকারকে ভারত ত্যাগের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব পাশ হয়।

অধিবেশনে গান্ধীজী তাঁর ভাষণ শেষ করেন এই বলে, “The Congress will do or die… I shall make every effort to see the Viceroy or address a letter to him and wait for his reply before starting the struggle. It may take a week or a fortnight or three weeks. * অধিবেশনের পরদিন গান্ধীজী গ্রেফতার হলে তাঁর ডু অর ডাই বাণীর ভিত্তিতে উপনিবেশবিরোধী ভারত ছাড় আন্দোলন বা আগস্ট বিপ্লব শুরু হয়।

অবিভক্ত বাংলায় ইতোমধ্যে কংগ্রেসে ভাঙন ধরে, যার সূত্রপাত হয় ১৯৩৯-এ। ঐবছর কংগ্রেসের ত্রিপুরা অধিবেশনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন গান্ধীজী প্রস্তাবিত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে। গান্ধীজী এতে অসন্তুষ্ট হলেন, ফলে সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করেন। ১৯৪০-এ এই মতবিরোধ চরমাকার ধারণ করে।

নেতাজী বৃটিশ সরকারকে ৬ মাসের সময় নির্দিষ্ট করে দিতে চাইলেন, এই সময়ের মধ্যে ভারতকে স্বাধীনতা না দিলে দেশব্যাপী গণসংগ্রাম আরম্ভ করার পক্ষে তিনি মতপ্রকাশ করেন। বিপরীতে গান্ধীবাদীদের দাবি ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রে দেশীয় রাজাদের সঙ্গে একত্রে ফেডারেশন গঠন।” সুভাষচন্দ্র তাঁর মতের পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকলে দলীয় শৃংখলা ভঙ্গের অপরাধে তাকে কংগ্রেস থেকে বহিস্কার করা হয়। সুভাষচন্দ্র যেহেতু ছিলেন বাংলার নেতা, স্বাভাবিকভাবেই বাংলায় কংগ্রেস ভেঙে গেল।

কেন্দ্র থেকে এডহক কংগ্রেস কমিটি গঠন করা হলেও তার পেছনে জনগণের সমর্থন ছিল কম। বাংলায় কংগ্রেসের বিভক্তির ফলে ভারত ছাড় আন্দোলনের প্রভাব অন্যান্য প্রদেশের চাইতে ছিল তুলনামূলক কম । মেদেনীপুর ও শান্তিনিকেতনে এর প্রভাব কিছু বেশি দেখা যায়। কলকাতাতে বীনা দাস, কমলা দাসগুপ্ত সহ অনেকে কারাবরণ করলেন, শান্তিনিকেতনে গ্রেফতার হলেন রানী চন্দ, নন্দিতা দেবী। তবে এক্ষেত্রে কংগ্রেস সম্পৃক্ত নারীদের ভূমিকা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে।

মেদেনীপুরের নারীদের একটি বিশেষ ব্যতিক্রমী ভূমিকা এখানে উল্লেখ করা যায়, ১৯৪৩ সালের ৯ জানুয়ারি মেদেনীপুরের মাশুরিয়া, ডিহিমাগুরিয়া ও চণ্ডীপুর গ্রামে ছয়শত সৈন্য প্রবেশ করে।

অন্যন্য নির্যাতনের পাশাপাশি তারা একদিনে ৪৬ জন নারীকে নির্যাতন করে, নারীরা তাদের সম্মান রক্ষার্থে ‘ভগিনী সেনা’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। এই সংঘের সদস্যাদের অনেকে নিজেদের সম্মান রক্ষা করার জন্য সাথে অস্ত্র রাখত, এদের মধ্যে দু’জনকে ছোরা রাখার অপরাধে অস্ত্র আইনে আটক করা হয়।

এই সংঘের সদস্যা কুমুদিনী ডাকুয়ার স্মৃতিচারণে জানা যায় আমাদের শপথ করানো হল। আমাদের উপর যতই অত্যাচার আসুক আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে তার মুকাবিলা করব সংগঠনের কোন কিছু প্রকাশ করব না। সেই সঙ্গে আমাদের ছোরা চালানো ও যুযুৎসুর প্যাঁচ শিক্ষা করতে বলা হল। .. আমাদের দুজনকে নিয়ে শিক্ষা শুরু হল এবং শেখা হলে আমরা অন্যদের শেখাব। বাঁশের বাতার ছোরা দিয়ে শিক্ষা শুরু হল।

সেই সঙ্গে সকলকে নিয়ে ক্লাস হতে লাগল কোন সময় ছোৱা চালাতে হবে বা যুযুৎসুর প্যাঁচ প্রয়োগ করতে হবে।… এরপর আমাদের দুজন করে গ্রামে গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হল মেয়েদের উপর অত্যাচার হতে পারে এই সম্ভাবনা সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে সঙ্গে সঙ্গে ছোয়া চালানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানাতে। তাতে ছোরার চাহিদা বাড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত দশহাজার ছোৱা বিলি করা সম্ভব হয়েছিল। প্রথমত কলিকাতা থেকে নিয়ে আসা হত পরে দেশীয় কামারদের দিয়ে ছোয়া তৈরী হত।

ছোরা দিতে না পারায় ফলে মেয়েদের নিজেদের অসহায় মনে হতে লাগল। তখন তাদের শিখিয়ে দেওয়া হল, যদি তারা জানতে পারে যে তাদের গ্রামে পুলিশ আসছে তাহলে শীর্ষ ৰাজিয়ে অথবা ডাকাডাকি করে তারা যাতে একত্রীত হতে পারে তার চেষ্টা করবে। সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে বঁটি, বঁটি, দা যা পাবে নিয়ে আসবে। উত্তর শিক্ষা যে কার্যকরী ফল নিয়েছিল তা পরে বলছি।

আক্রান্ত হয়ে বা আক্রান্ত না হবার উপায় হিসেবে সাধারণ গ্রাম্য নারীদের দ্বারা নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে এধরনের সংগঠন গড়ে তোলা ব্যতিক্রমী ঘটনা এবং সংগঠনটির কার্যক্রম দেখে বলা যায় যে, বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের পাশাপাশি এই নারীরা পুরুষের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের রক্ষা করবার মত মানসিক শক্তিও অর্জন করেছিল।

তবে ইতোমধ্যে বাংলায় দেখা যায় মেয়েরা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, কৃষক শ্রমিক সংগঠনের সদস্যপদ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে নেত্রীত্বও অর্জন করে নিয়েছিল। পাশাপাশি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত নারীরা প্রচারণার কাজে বিভিন্ন অঞ্চলে যাবার ফলে, প্রান্তিক নারীর জীবনচিত্র ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। দেশমুক্তির সাথে সাথে তাঁরা উপলব্ধি করলেন এই নারীদের জন্যও যুক্তি প্রয়োজন।

কমলা দাসগুপ্ত ১৯৪১ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির মহিলা বিভাগের সম্পাদিকা ছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন জেলায় কংগ্রেসের মহিলাদের সাব কমিটি গঠন করে তাদের সক্রিয় করে তোলা। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব। তিনি এই দায়িত্ব পালন করার সাথে সেখানকার নারীদের নিয়েও ভাবতে শিখলেন।

এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন ঘরোয়া বৈঠকে আমি বেশি সুবিধা পেতাম। গ্রামের মেয়েদের মধ্যে কাজ করতে করতে কত কথাই যে অনুভব করতে হয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যের সৈন্য এবং দারিদ্র্য তো সেখানে প্রতিনিয়তই জান্নাত হয়ে আছে… আমের মেয়েরা একে তো লেখাপড়া জানে না, তাদের মনের স্বাভাবিক গতিকে উর্ধ্বে টেনে তুলবার জন্য নেই শিক্ষা, নেই অনুকূল পরিবেশ, নেই কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা অথচ আছে সংস্কার, আছে সমাজের পীড়নের ভয়।…

এমনি করে যখনই গ্রামে গ্রামে ঘুরতে গিয়ে নানা সমস্যা জটিল হয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠেছে, তখনই স্বাধীন ভারতে সেগুলির প্রতিকারের অনিবার্যতা অনুভব করেছি এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা মন্ত তালিকা মনে মনে স্থির হয়ে গেছে।

কমলা দাশগুপ্তের ভাষ্যে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট, তা হলো, দীর্ঘদিন বৃটিশবিরোধী সংগ্রামে সম্পৃক্ত এই নারীদের কাছে এই পর্যায়ে এসে স্বাধীনতার অর্থ ছিল উপনিবেশিক শাসকদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা ও স্বাধীন দেশে নারীর জন্য সমঅধিকারের ভিত্তিতে নারীর মুক্তি। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী মহিলারাও ইতোমধ্যে সংগঠিত হন বন্দীমুক্তি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এবং নারীমুক্তি বিষয়টি তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। ১

৯৪২-এ হিটলার সোভিয়েত আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করলে সমাজতান্ত্রিক দল জার্মান ফ্যাসিবাদী বিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করে বৃটিশ যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সমর্থন করে, ফলে সমাজতান্ত্রিক দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া হয়। ১৯৪২-এ সমাজতান্ত্রিক পার্টি প্রকাশ্যে কাজ করতে শুরু করলে তাদের কর্মপরিধী বৃদ্ধি পায়। এসময়ে সাম্যবাদী নারীদের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা যায় তারা,
প্রথমত: কমিউনিষ্ট পার্টির আদর্শ ও নীতি প্রচার করতেন, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে। দ্বিতীয়ত: সেই সংকটাপন্ন যুগে নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের মোকাবেলায় নেমেছিলেন তাঁরা, সেও বিশেষত মেয়েদের সংকট মোচনের জন্যই।

তৃতীয়ত: তাঁদের কাজ ছিল মেয়েদের প্রগতিশীল কাজকর্মে আকৃষ্ট করা ও তাদের সংগঠিত করা। উদ্দেশ্যটা তাদের সব কাজের সঙ্গেই ছিল, আবার বিশেষ মনোনিবেশের বিষয়ও ছিল। এজন্য মেয়েদের নিজস্ব সমস্যাগুলি নিয়েও তাঁদের ভাবনা চিন্তা করতে হত।

জেলায় জেলায় গ্রামে গ্রামে মহিলা সমিতি গঠনই একটা বড় কাজ ছিল তাদের। সব কাজেই বিশেষ লক্ষ্য ছিল রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারের পশ্চাদপদ মেয়েরা ও নিতান্ত গরীব অশিক্ষিত ঘরের মেয়েরা
মহিলা নেত্রীদের একটি প্রধান কাজ ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রচারণা।

তাঁরা প্রচার করতেন যে ফ্যাসিদের দ্বারা স্বাধীনতা আসবে না, কেননা ফ্যাসিবাদ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের করালতম রূপ। ফ্যাসিবাদ জাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী এবং নিজেদের জাতিগত শ্রেষ্ঠতার অহম তাদের অস্থিমজ্জায়। তৎকালীন বার্মায় জাপানী আক্রমণের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের প্রাথমিক চিকিৎসা শিক্ষা দেয়া হতে লাগল।

মহিলা স্বয়ংসেবিকা বাহিনী গড়ে উঠল। বিমান আক্রমণ প্রতিরোধের মহড়াতেও মেয়েরা অংশ নিল। এই সময় মেয়েদের উজ্জীবিত করতে সভায় সভায় শোনানো হত নাৎসী বাহিনীর বিরুদ্ধে সোভিয়েত মেয়েদের বীরত্বগাথা। দেশরক্ষার ডাক নামে কনক মুখোপাধ্যায়ের রচিত একটি গণসংগীতের সংকলন এসময়ে প্রকাশিত হয়।

বিনয় রায় এই গানে সুর দেন। সভায় এই গান গাওয়া হত। ইতোপূর্বে অসহযোগ আন্দোলন এবং আইন অমান্য আন্দোলনে নারীরা সম্পৃক্ত হয়েছিলেন রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও সাম্যবাদী দলের প্রকাশ্য রাজনীতিতে অংশ নেবার ফলে এই পর্যায়ে নারীকেন্দ্রিক বা নারীদের সমস্যা সমাধান রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৪২-এর ১৩ এপ্রিল কলকাতায় কমিউনিষ্ট পার্টির মহিলা কর্মীদের উদ্যোগে, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট লাইব্রেরী হলে মহিলাদের একটি ফ্যাসিবিরোধী সভা ডাকা হয়। এই সভায় সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্যারা ছাড়াও বিভিন্ন দলমত ও নির্দলীয় প্রগতিশীল মহিলারা যোগদান করেন। এই সভা থেকে গঠিত হয় ‘কলকাতা মহিলা আত্মরক্ষা সংগঠন কমিটি।

এর আহ্বারিকা ছিলেন এলা রীড। কার্যকরী সমিতির অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, সাকিনা বেগম, রেনু চক্রবর্তী, সুধা রায়, মনিকুন্তলা সেন, নাজিমুন্নেসা আহমেদ, বিয়াট্রিস টেরান, অপর্ণা সেন, ফুলরেনু দত্ত (গুহ) সভায় প্রণতি সে বলেন, চীন ও সোভিয়েত দেশের মেয়েদের মতো ভারতের মেয়েদিগকেও দেশ ও গৃহরক্ষার জন্য পুরুষের পাশে যোগ্য স্থান গ্রহণ করিতে হইবে ।

” সভায় যে প্রস্তাবগুলি গৃহীত হয় তা হলো: ১) দেশের জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা জাগাইতে হইবে, ২) জনরক্ষার জন্য মেয়েদের শক্তিশালী সংগঠন গড়িয়া তুলিতে হইবে এবং প্রয়োজন উপস্থিত হইলে মেয়েদিগকে অফিস, কারখানা, এমনকি রণক্ষেত্রেও পুরুষের স্থান পূরণ করিতে হইবে, ৩) মেয়েদের আত্মরক্ষার কৌশল শিক্ষা নিতে হইবে, ৪) জনসাধারণের সহিত ভারতের সৈন্যদের সদ্ভাব স্থাপন করিতে হইবে।

” প্রস্তাবসমূহের মধ্যে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে কেবল মেয়েদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা তাদের সংগঠিত হবার কথা বলা হয় নি, মেয়েদের জন্য সবধরনের কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
এরপর থেকেই জেলায় জেলায় গ্রামে শহরে সবজায়গাতেই সুপরিকল্পিতভাবে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ার কাজ চলতে থাকে। বিভিন্ন জেলার সমিতিগুলোর মধ্যে সংহতি স্থাপন ও তাদের কার্যক্রমের সমন্বয়সাধনে এরপরে গঠন করা হয় কেন্দ্রীয় সংগঠন মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি। এসময়ে মহিলা ফ্রন্টের কর্মীদের রাজনৈতিক শিক্ষার জন্য স্টাডি ক্লাসের আয়োজন করা হয়।

পার্টির নেতারা এই ক্লাসগুলি নিতেন। কেন্দ্রীয়ভাবে মহিলা নেত্রীদের জন্য ১৯৪৩-এর ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় প্রাদেশিক শিক্ষ শিবিরের আয়োজন করা হয়। পার্টির প্রাদেশিক কমিটি ও প্রাদেশিক মহিলা ফ্রাকশন এই এই স্কুল পরিচালনা করেন। এই স্কুলে মোট ২৮ জন মহিলা শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা, পাবনা, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, হুগলী, নদীয়া এই ৯টি জেলা থেকে ১৪ জন এবং প্রাদেশিক কমিটিসহ কলকাতা থেকে ১৪ জন ছিলেন।

স্কুলের বিষয়বস্তু ছিল : ১) ক্লাসের উদ্দেশ্য, ২) পার্টি সংগঠন, ৩) যুদ্ধের বিভিন্ন স্তর, ৪ ) জাতীয় সংকট ও ঐক্যের আন্দোলন। ৫) নারীআন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গী, ৬) মহিলা ফ্রন্টের সাথে বিভিন্ন ফ্রন্টের সম্বন্ধ, ৭) ছাত্র ও ছাত্রীআন্দোলন ১৯৪৩-এর ৮ মার্চ যখন কলকাতার ওভারটুন হলে প্রথম রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তখন দেখা গেল, সম্মেলনে যোগদানকারীদের মধ্যে শহর নগর থেকে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের প্রায় অর্ধেক শ্রমিক শ্রেণির এবং শহরের দুর্বলতর শ্রেণির; বাকী অর্ধেক মধ্যবিত্ত শ্রেণির।

আর জেলা থেকে যারা আসেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির। এর মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে গেল যে নারীআন্দোলন এই পর্যায়ে আর শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণির মহিলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষক-শ্রমিক-বস্তিবাসী মহিলারা তা নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন।

এই পটভূমিকায় বাঙলায় দেখা দিল মনুষ্য সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নারীর জীবনে সর্বোচ্চ বিপর্যয় এবং নিপীড়ন নিয়ে আসে। দুর্ভিক্ষের সময়ই মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি সবচাইতে মূল্যবান ভূমিকা পালন করে।

একদিকে তারা দুর্ভিক্ষ পিড়ীত মানুষের জন্য লঙ্গরখানা বা ক্যান্টিন। চালু করে তাদের খাবার বিতরণের দায়িত্ব পালন করে, কন্ট্রোলের দোকানে নারীদের লাইন ধরে চাল নিতে সাহায্য করা, অসহায় মেয়েদের জন্য কুটিরশিল্প কেন্দ্র ও শিশুকেন্দ্র পরিচালনা করা, ন্যয্যমূল্যের দাবিতে ভূখা মিছিল পরিচালনা করার দায়িত্ব পালন করে।

১৯৪৩-এর ১৭ মার্চ কলকাতা ও শহরতলীর ৫০০০ মহিলা মিছিল করে বিধানসভা অবরোধ করে, বাধ্য হয়ে তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক লরি বোঝাই চাল এনে তাদের মধ্যে বিতরণ করেন। অন্যদিকে, দুর্ভিক্ষের কঠিন আঘাতে যখন অসংখ্য নারী সংসারহারা হয়ে পথে নামতে বাধ্য হয়, তখন তাদের জন্য ছিল আরেক দুঃখহ জীবন।

জাপানী বোমার আশংকা শুরু হতেই এদেশে নারীত্বের অবমাননা শুরু হয়ে যায়। এরপর জিনিষের দুর্মূল্যতা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানোই প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। চারিদিকে শুরু হয় মুনাফাখোরদের অবাধ রাজত্ব। দেখা যায় “এবার বিক্রয়ের পালা কেবল জোতজমির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মানুষের গোটা জীবনের ভিত-সুদ্ধ বিপর্যন্ত হইয়া পড়িয়াছিল। কত স্বামী তাহার স্ত্রীকে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন। পতিতালয়ের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিয়াছে।

কলিকাতায় যে ১ লক্ষ ২৫ হাজার নিঃস্ব নিরাশ্রয়ের ভীড় হইয়াছিল তম্মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার যুবতী স্ত্রীলোক কোনমতে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য গণিকালয়ে প্রবেশ করিয়াছেন । জেলা থেকে নারী কর্মীরা নারীজীবনের এই চরম বিপর্যয়ের সংবাদ কেন্দ্রে পাঠাতে লাগলেন। মেদিনীপুর জেলা থেকে ঊষা চক্রবর্তী জানান কোন কোন স্থানে সুস্থ্য মায়েরা সন্ধান বাঁচানোর জন্য দুর্নীতির আশ্রয় নিতেছে।

বি. এন. আর লাইনের স্টেশনে চালান নিবার জন্য যেসব চালের বড়া গাদা দেয়া আছে সেখান হইতে চাল চুরির জন্য বহু দুঃস্থ মেয়ে একা ট্রেনে ভ্রমণ করিত। চাল চুরি ও ভ্রমণের সুযোগ পাইবার জন্য রেলওয়ে কর্মচারীদের সাথে তাহারা অসঙ্গত ব্যবহার করিয়াছে। গ্রামের ভিতরে মিলিটারি ক্যাম্প থাকায় অনেক দুঃস্থ মেয়ে সেখানে খাওয়া পরার বদলে ইজ্জৎ নিয়াছে।

চট্টগ্রাম থেকে কল্পনা দত্ত আমিরাবাদে ২০/২১ বৎসরের একটি মেয়ে মাজাদা ইচ্ছৎ বাঁচাতে চেয়েছিল। গরীব চাষীর ঘরের বউ সে। স্বামী তার দুর্ভিক্ষের সংসার ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল ফেণীতে ফিরে যখন এল তখন বাত ও জুরে সে একেবারে পঙ্গু। লঙ্গরখানা, ওয়ার্ক হাউজ উঠে গিয়ে বেঁচে থাকার সমস্ত পথই যখন বন্ধ হল তখন শেষ পর্যন্ত মাজাদা বাধ্য হয়ে রাস্তায় লেবার কোরে কাজ নিল।

কিন্তু সেখানে গিয়ে মাজানা বুঝল মজুরি নিতে হবে ইজ্জতের বদলে। মাজাদা তো কাজ ছাড়াই, আরো ১০/১৫ জনকে সেই দুষিত আবহাওয়া থেকে মুক্ত করে আনল। তারা সবাই প্রতিজ্ঞা করল, কেউই আর লেবার কোরে জ্ঞান থাকতে যাবে না। তিন মাস পরে কয়েকদিন আগে আবার আমিরাবাসে গিয়েছিলাম, মাজার সঙ্গে দেখা হল, সে তখন মৃত্যুশয্যায়।

ছেলেটা আগেই মরেছে। মাজাদা ম্লান মুখে বলল, প্রতিজ্ঞা সে রাখতে পারে নি। পেটের দায়ে লেবার কোরে না গিয়ে পারে নি ফরিদপুর থেকে উমা ঘোষ লিখেছিলেন একটি গ্রামে একটি গৃহস্থ বধূ আজ অর্থ সংকটে নুন চিনি ইত্যাদি সন্ধা নামে যোগাড় করিয়া চোরাকারবার করিতেছে। তাহার সম্পর্কে চরিত্রহীনতার কথাও গ্রামের সকলে জানে।

বসিয়াতে ১৯টি মেয়ে সমাজ ছাড়িয়া গত সংকটে আত্মবিক্রয় করিয়াছে, প্রকাশ্য বাজারে বেশ্যাবৃত্তি করিতেছে। এই ১৯টির ভিতর ১ টিকে আমাদের সমিতির চেষ্টায় বিবাহ দেওয়া হইয়াছে। বালুচরা গ্রামে একটি ব্রাহ্মণের মেয়ে নাপিতকে বিবাহ করে। সে বলে, সমাজ তাকে খাইতে
দিবে না, তাই যে তাহাকে খাইতে দিবে তাহার কাছেই চলিয়া যাইবে । ” এই দুর্দিন আর দুর্যোগে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি নারীসমাজের কাছে ঘোষণা করল: –

  • তোমার আত্মসম্মান রক্ষার জন্য এক হও।
  • ঘরবাড়ি সন্তান-সন্ততি রক্ষার জন্য এক হও।
  • দেশ ও জাতিকে বাঁচাবার জন্য এক হও।
  • খান্য আদায়ের লড়াইয়ে এক হও।
  • কুটিরশিল্পের দ্বারা আত্মনির্ভরশীল হয়ে পরিবার, দেশ ও জাতিকে বাঁচাবার জন্য এক হও।

ত নারীর আত্মসম্মান রক্ষার জন্য সংগঠিত এবং পরিকল্পিত আন্দোলন বাঙলায় এই প্রথমবার দেখা গেল। অধঃপতিত জীবনের হাত থেকে হাজার হাজার মেয়েকে বাঁচানো মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ালো, ফলে বিভিন্ন স্থানে গড়া হতে লাগল মহিলা সমিতি। যার কাজ ছিল

১. আসন্ন দুর্ভিক্ষ সম্বন্ধে জন-সমাজকে সচেতন করা, দ্রব্যমূল্য কমানো ও রেশনিং ব্যবস্থা চালু করবার জন্য সরকারকে চাপ দেবার আন্দোলন, ভুখা মিছিল, বিক্ষোভ প্ৰদৰ্শন ইত্যাদি

২. মানুষকে মরতে দেখে নির্বিকার চোখে চেয়ে না থেকে, যে করে হোক লঙ্গরখানা নিজেরা খোলা এবং সরকারকে নিয়ে আরো অনেক লঙ্গরখানা খোলান, গোপন মজুদ আর কালোবাজারীকে খুঁজে বের করানো।

৩. নিরাশ্রয় নিরালম্ব, দুর্গত মেয়েগুলোকে আশ্রয় দেওয়া, অবলম্বন দেওয়া অর্থাৎ তাদের পুনর্বাসন। পতিতাবৃত্তির জন্য দালালদের হাতে পড়া থেকে মেয়েদের রক্ষা করার সংগ্রামও ছিল এই পুনর্বাসন প্রচেষ্টার অংশ। ২

১৯৪৫ সালের ৬ জানুয়ারি মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন, নারী সেবা সংঘ, ভিজিলেন্স এ্যাসোসিয়েশন এবং আরো দশটি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত একটি সভা হয় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে । সরোজিনী নাইডু তাঁর ভাষণে তরুণদের উদ্দেশে বলেন সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বাড়ীর মেয়েদের পবিত্রতার প্রতিমা বলে দেখি।

কিন্তু অন্য কোন মেয়ের পবিত্রতা যনি ধূলোয় লুটোয় আমাদের কখনও মনে হয় না যে সে মেয়ে এবং আমার বাড়ীর মেয়ের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। যতক্ষণ একটি মেয়েরও পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে, যতক্ষণ একটি মেয়েও পুরুষের লালসার কুক্ষিগত হচ্ছে, যতক্ষণ অধিকতর শক্তিমান পুরুষের লালসার পঞ্চর কবলিত হচ্ছে শয়ে শয়ে অসহায় নারী, ততক্ষণ কোন মেয়ের ইজ্জত নিরাপদ নয়।

যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত হাজারো গ্রামীণ নারীর জন্য মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এভাবে হয়ে উঠেছিল আশ্রয় স্বরূপ। দুর্ভিক্ষ পরবর্তী সময়ে ১৯৪৫ এর ১৮ নভেম্বর মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির তৃতীয় সম্মেলনে যে প্রস্তাবসমূহ পাশ হয় তার মধ্যে ছিল মেয়েদের প্রত্যক্ষ সমস্যা যেমন, সমাজজীবনে তাদের পুনর্বাসন, খাদ্য বস্ত্র, মধ্যবিত্ত মেয়েদের বেকারী, পুরুষের সঙ্গে সমানাধিকারের বিষয়, হিন্দু দেওয়ানী আইন সংশোধন, মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার, বাধ্যতামূলক এক-বিবাহ, গণিকাবৃত্তি নিরোধ।

পাশাপাশি আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব ছিল রাও বিলকে সমর্থন জানানো। রাও বিল মূলত ১৯৪১ সনের রাও কমিটির রিপোর্টের সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি হয়। এতে বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কিছু সংশোধনীর সুপারিশ করা হয়, পাশাপাশি পুত্র-কন্যার সমানাধিকারের কথা বলা হয় এবং স্ত্রী বা স্বামী জীবিত থাকতে আবার বিবাহ উভয়ের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়।

 

* এসময়ে বাঙলার নারী সংগঠনগুলো একসঙ্গে এই বিলের পক্ষে আন্দোলন শুরু করে। আইনসভার অভ্যন্তরে এই বিলের পক্ষে মত প্রকাশ করেন রেনুকা যায়। আবার রক্ষণশীল সমাজ ছিলেন এই বিলের বিপক্ষে। রক্ষণশীল সমাজের পক্ষে অনুরূপা দেবী এই বিলের বিরুদ্ধে যুক্তিসমূহ তুলে ধরেন। অনুরূপা দেবীর যুক্তি ছিল:

১. ছেলেরাই বংশের বাহক, মেয়েরা অন্য পরিবারে বা অন্য বংশে চলিয়া যায়; কাজেই ছেলেদের হাতে সম্পত্তি থাকিলে বংশের গৌরব ও মর্যাদা সংরক্ষিত হইবে এবং তাহা ভবিষ্যৎ উন্নতির সম্ভাবনা থাকিবে ।

২. সম্পত্তি ছেলেদের মধ্যেই বহু ভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে; আবার মেয়েদের মধ্যে বিভক্ত হইয়া পড়িলে খণ্ড খণ্ড হইয়া তাহা একেবারে নষ্ট হইয়া যাইবে।

৩. সম্পত্তি লইয়া ভ্রাতায় ভ্রাতায় মামলা মোকদ্দমার অবধি নাই; ইহার উপর নতুন ব্যবস্থার ফলে ভ্রাতা ভগিনীতে ঈর্ষা দ্বেষ বিসংবাদ শুরু হইবে।

৪. মেয়েরা দান বিক্রয়ের ক্ষমতা পাইলে অথবা সম্পত্তি হাতে পাইলে তাহা রক্ষা করিতে পারিবে কিনা সন্দেহ। এখনও পর্যন্ত তাহাদের আইন-জ্ঞান ও সম্পত্তি রক্ষার ক্ষমতা বিশেষ কিছুই নাই।

৫. মেয়েদের জন্য অভিভাবকদের অনেক খরচ করিতে হয় এবং উপরন্ত বিবাহের সময় টাকাও যৌতুক দিতে হয়। তাহার উপর তাহাদের সম্পত্তির ভাগ দিলে ভাইদের প্রতি অন্যায় ও অবিচার করা হইবে সরলাবালা সরকার ১৯৪৪-এর ২৯ অক্টোবর দৈনিক আনন্দবাজার-এ প্রকাশিত তাঁর লেখায় অনুরূপা দেবীর আপত্তিগুলি খণ্ডন করেন এমনসব যুক্তিতে

১. ছেলেরা বংশের বাহক হইয়া সম্পত্তি লাভ করিলেই যে বংশের গৌরব বাড়ে বা সম্পত্তির শ্রীবৃদ্ধি হয়। এমন কিছুই নাই। এপর্যন্ত ছেলেদের হাতে পড়িয়াও বহু সম্পত্তি নষ্ট হইয়াছে এবং নানা প্রকারে বংশের সম্মানহানি হইয়াছে

২. সম্পত্তি ছেলেদের মধ্যে বিষক্ত হইলে মেয়েদের মধ্যেও হইতে পারে। পরিবারে ছেলে মেয়ে হিসাব করিয়া আসে না। মেয়ে না হইয়া ছেলে হইলে ভাগ পাইবে। আর মেয়ে হইলেই ভাগ নিলে সম্পত্তি খণ্ড খণ্ড হইয়া যাইবে, এরূপ যুক্তির সারবত্তা খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।

৩. শ্রীযুক্তা অনুরূপা দেবী বলিয়াছেন যে, সম্পত্তির অংশলাভ আশা থাকিলে ভাই বোনের মধ্যে বাল্যকাল হইতে ঈর্ষার ভাব সঞ্চারিত হইবে। কিন্তু ইহা অদ্ভুত বলিয়া মনে হয়। বৈষম্যই ঈর্ষার মূল। সমানাধিকার লাভ করিলে ঈর্ষা কমিয়াই যাইবে। এতভিন্ন ভাতায় ভ্রাতায় ঈর্ষার যেরূপ সম্ভাবনা ভ্রাতাভগিনীর সেরূপ সম্ভাবনা কম।

৪. মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার নাই বলিয়াই তাহাদের আইন-জ্ঞান ও সম্পত্তি রক্ষার ক্ষমতা নাই। সম্পত্তি হাতে পাইলে তাহাদের জ্ঞান ও সামর্থ্য বৃদ্ধি পাইবে। অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে স্বাবলম্বনের ভাব আসিবে। মেয়েদের সম্পত্তি রক্ষার সামর্থ্য নাই একথাও বলা চলে না। আগে দীনমনি চৌধুরী প্রমুখ অনেক মহিলা-জমিলার যেভাবে সম্পত্তি চালাইয়াছেন সেরূপ অনেক পুরুষও পারেন নাই ।

৫. কন্যাপণ লইয়া হিন্দুসমাজ বিব্রত। বহু চেষ্টায়ও এই পণপ্রথা যাইতেছে না। মেয়েরা সম্পত্তিতে অধিকারলাভ করিলে টাকা যৌতুকের দাবি-দাওয়া উঠিয়া যাইবে। তা ছাড়া সম্পত্তির ভাগ বোনেরা যে পরিমাণ লইয়া যাইবে, বন্ধুরা আবার সেই পরিমাণ লইয়া আসিবে। সুতরাং কোন পক্ষেই অবিচারের সম্ভাবনা নাই।

বিবাহ-বিচ্ছেদ ব্যাপারেও অনুরূপা দেবী আপত্তি জানিয়েছেন এই বলে যে, এই ব্যবস্থার ফলে সমাজে স্বেচ্ছাচার প্রবেশ করবে, দলে দলে লোক বিবাহবন্ধন ছিন্ন করতে থাকবে।

কিন্তু এরও কোন বাস্তব কারণ নেই। কারণ এরূপ যদি ঘটেই তবে বুঝতে হবে যে আবহাওয়া আগে থেকেই পঙ্কিল হয়ে উঠেছিল। তবে উল্লেখ্য যে রাও বিলের পক্ষে আন্দোলনে সমর্থন দিলেও মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কাজ ছিল মূলত গ্রামের শিক্ষাহীন এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীদের মধ্যে, নিঃসন্দেহে তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে কাজটি কোনরকমেই সহজ ছিল না।

শহুরে শিক্ষিত মেয়েরা তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত এক গণ্ডির মেয়েদের কাছে পৌঁছেছেন, তাদের জীবন সম্পর্কে সচেতন করেছেন তাদের ভাষায়। এপ্রসঙ্গে মনিকুন্তলা সেন তাঁর স্মৃতিচারণে বলেন… উনুনে বরিশালের মুসুরি ফুটছিল। বৌ-এরা মুখ চেপে হাসতে লাগল। একটা পিঁড়ি টেনে বসে বললাম, আর আপনারা যদি ঘোমটা না খোলেন তাহলে ডাল-ভাতও খাব না। নিজেই গিয়ে ঘোমটা তুলে দিয়ে বললাম- ‘দেখুন তো আমি কি পুরুষ মানুষ?’ এবার বাঁধ ভাঙ্গলো। মুখ ফুটল। হাসাহাসির ধুম পড়ে গেল।

ওরা বললো, পুরুষ না অইলে কি অইল? আপনে কত বিধান, আপনের লগে আমরা কি কথা ? বললাম, ‘কেন, ডাইল-ভাতের কথা কইতে তো বিধান হওয়া লাগেনা। সমাজতন্ত্রের কথা নয়, সোভিয়েত মেয়েদের কথা নয়। কলকাতা ও বরিশাল এ দুটো শহরের নামই তাদের বিশ্ব সংসারে জানা। এখানকার গল্পই করলাম। মেয়েরা স্কুলে যায়, পাস করে, ডাক্তার হয়, বড় চাকরী করে—এই সব গল্প। শুনে ওদের চোখগুলো বড় হয়ে গেল।

বড় বড় নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘আমাদের কপালে কি আর ওসব আছে?’ হায় আমার দেশ। বরিশাল শহর থেকে এক রানের নৌকার পথ। বর্ধিষ্ণু গ্রাম বানরীপাড়া। আছে, ছেলেরা পড়ে। তাইতো আমাদের আসা। আর সেখানেই মেয়েদের এই অবস্থা? যারা এদেরও অনেক তলায়, তারা না জানি আরো কত তলায়।
ধীরে ধীরে ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে মেয়েদের সভায় নারীনেত্রীদের বক্তৃতার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা, মেয়েদের শিক্ষার জন্য সরকারী ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, তাছাড়া চলাফেরা ও ঘরে মেয়েদের অসম্মানজনক পর্দাপ্রথা সম্পর্কে বক্তব্য। এভাবে প্রান্তিক নারীর কাছে পৌঁছনো

ছিল একধরনের সমস্যা, আবার মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের কাছেও সমাজতান্ত্রিক দলের মেয়েরা ছিলেন অনেকটা অনাকাঙ্খিত। তাদের দৃষ্টিতে এই মেয়েরা ছিলেন বহির্মুখি এবং ‘অসতী’, কাজেই এইসব পরিবারের প্রধান পুরুষরা পছন্দ করতেন না যে তাদের বাড়ির মেয়েদের ওপর সাম্যবাদী নারীরা প্রভাব বিস্তার করুক।

মনিকুন্তলা সেন এক বাড়িতে গিয়ে সেই পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে গৃহকর্তা রাগ হয়ে বললেন, ‘কোন দরকার নেই, আপনারা যা বলবেন, তা আমার জানা আছে। আমি এম এ পাশ।

এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। আমার স্ত্রী আপনাদের সামনে বেরোবেন না। তাঁর স্মৃতিকথাতেই জানা যায় গ্রামে মফস্বলে কমিউনিষ্টদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন বাড়িতে গিয়ে উঠলেও বাড়ির পুরুষেরাই তাদের আপ্যায়ন করতেন।

মহিলারা সামনে আসতে সংকোচ বোধ করতেন। রেনু চক্রবর্তী বলেছেন, ‘আমরা ঘরে ঘরে যাই সকলের সঙ্গে বিনা সঙ্কোচে কথা বলি দেখে ওরা আমাদের আলাদা একটা জাত ভাবত সাম্যবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত মেয়েদের জন্য পারিবারিক ও সামাজিক বাধা ছিল অপর একটি সমস্যা। সমাজতান্ত্রিক দলের মেয়েদের অনেকেরই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে পরিবার ত্যাগ করতে হয়। রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য তাদের কঠিন পরীক্ষার মধ্যদিয়ে উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।

তাদের টিউশনী ও ছোটখাট কাজ করে জীবিকানির্বাহ করতে হয়েছে। পরে তাদের থাকবার জন্য পার্টি কমিউন তৈরি হয়েছে, সেখানেও মেয়েরা আর্থিক অনটনের মধ্য থেকে দলের কাজ করতেন। নিবেদিতা নাগ এদের প্রসঙ্গে বলেছেন পঙ্কজ আচার্য এসেছিল রাজশাহী থেকে। রাজশাহীতে আমাদের একজন ‘মা’ ছিলেন তাঁর নাম চারুবালা ভট্টাচার্য ।… এই মা সর্বতোভাবে পার্টির ছেলেমেয়েদের আগলে রাখতেন।

পঙ্কজ যখন ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে তখন বাড়ি থেকে প্রবল বাধা পেতে থাকে। মেয়েটির মধ্যে সম্ভাবনা আছে বুঝে মা তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। হাসিনা খাতুন শুধু রাজনীতি করার অপরাধে বাড়ি ছেড়ে আসে নি। তাঁর মা তাঁকে আমায় ঢাকার বাড়িতে পৌঁছে নিয়ে বলেন- আমি যখন যেখানে থাকি হাসিনাকে যেন সঙ্গে রাখি।

হাসিনার ভগ্নিপতি মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল হাসিনাকে বিয়ে করে তাঁর সব সম্পতি হস্তগত করতে। নিরুপমা (ব্যানার্জী) মামাবাড়ি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। রাজনীতি করার অপরাধে মামাবাড়ি থাকা সম্ভব হলো না। রানী দাসের অনুরূপ একটা সমস্যা ছিল। এই সব ‘বাপ তাড়ানো মা খেদানো’ পার্টি সভ্যদের নিয়ে আমাদের দাম্পত্য জীবন শুরু হয়েছিল।

ঊষা চক্রবর্তী ছিলেন ফরিদপুরের এক জমিদার পরিবারের মেয়ে। গরীব প্রজাদের উপর ঠাকুমার অন্যায় অত্যাচার ও পরিবারের মধ্যে নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থা সহ্য হয় নি বলে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বাড়ী থেকে পালিয়ে কলকাতায় কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন।

কমিউনিষ্ট পার্টি এই নারীদের শিক্ষার অধিকার, জীবিকার অধিকার, জীবনে স্বপ্রতিষ্ঠিত হওয়া, নিজের জীবনের সংজ্ঞা নিজেই খুঁজে নেবার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যেকারণে নিশ্চিন্ত পারিবারিক জীবনের আশ্রয় ত্যাগ করে এই মেয়েরা কমিউনিষ্ট দলের কমিউনে আশ্রয় নেয়।

এই মেয়েরা নিজেরাই যে কেবল নিজেদের জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে তা নয়, বরং দেখা যায় এদের সংস্পর্শে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাগ্যবিড়ম্বিত নারীর জীবন পাল্টে যায়। মনিকুন্তলা সেন এদের অনেকের কথা উল্লেখ করেছেন।

তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিমলা, মনিকুন্তলা সেন তাঁর প্রসঙ্গে বলেন
চলে আসবার ২/৩ দিন আগে ‘বাতানী’র মা আমাকে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে তো মেয়েটা খুব ঘুরছে। আমার বড় ভয়।’- ‘কেন?’ ‘ও যে বিধবা শুনলাম অনেক আগেই বিধবা হয়েছে। বয়স তো মাত্র ভেরো।

এই সেই শিশু- বিধবা-যা দেখিনি আগে। তবু ভাল, কৃষকদের ঘরে তত হিন্দুয়ানী নেই। বিমলাকে তার মা থেকে পরতে কষ্ট দেয় না। মনে মনে ভাবলাম বিমলা তো কর্মী হবে। এ তো চলতে পারে না। এই সংস্কার ভাঙতেই হবে। ভেঙেছিল, কমিউনিষ্ট পার্টি ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ দেখিয়েছিল। কে জানত সেদিনের সেই ছোট ফুরফুরে ‘বাতাসী’ একদিন কৃষকনেত্রী বিমলা মাজি হবে, আর স্বামী পুত্র সংসার পাবে?”

এমনই আরেকজন পাবনার মায়া ব্রাহ্মন পরিবারের এই মেয়েটি মনিকুন্তলা সেনের সঙ্গে প্রচারকাজে বের হত তার মায়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও। মনিকুন্তলা সেন প্রথমে ভেবেছেন অল্পবয়সী কুমারী মেয়ে, তাই মায়ের আপত্তি। কিন্তু খাবার সময় লক্ষ্য করলেন তার সঙ্গে খেতে বললে খায় না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন মেয়েটি বিধবা। নিজে থেকে বলল, ‘ আপনি এসেছেন তাই একটু বেরোতে পাই, নয়তো কোথাও যাই না।

এই ছাদে পর্যন্ত আমাকে মা আসতে দেয় না। একদিন এমনি সময়ে ছাদে এসে সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়েছিলাম, কখন মা উঠে এসেছেন জানতে পারি নি। আমার চুলের মুঠি ধরে এক চড় মারলেন। চুলটা খোলা ছিল তো! পরবর্তী সময়ে ভট্টাচার্য পরিবারের মেয়ে মায়া মৈত্র পদবী ধারণ করে কপালে সিঁদুরের টিপ পরে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কর্মীরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

এভাবে কমিউনিষ্ট আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকে নি বরং তা হয়ে উঠেছে সামাজিক আন্দোলন। উনিশ শতকের সমাজ সংস্কারকরা বাঙালি নারীকে বাঁচার অধিকার নিয়েছিল সতীদাহ প্রথা রদ, বিধাব বিবাহ প্রচলন, বাল্যবিবাহ ও বহু বিবাহ রদ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে, আর বিশ শতকের চল্লিশের দশকে সমাজতান্ত্রিক দল বাঙালি প্রান্তিক নারীকে শুধু বাঁচা নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের মতো বাচার শিক্ষা দেয়।

এই শিক্ষার কাজটা ছিল ভিন্ন প্রক্রিয়ায়, নেত্রীরা যখন ঘরোয়া সভায় পারিবারিক নির্যাতন বা স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে মারধোরের কথা বলতেন তখন দুটো ভাগ দেখা যেতো। বয়স্করা মারের পক্ষে, অল্পবয়স্করা এর বিপক্ষে। তখন নেত্রীরা বলার সুযোগ পেতেন আচ্ছা দেশে যদি একটা আইন হয়, কেউ বউকে মারতে পারবে না তাহলে কেমন হয়? মেয়েরা হাসত। কিন্তু দুটো বিয়েও কেউ করতে পারবে না, এমন আইন হলে? এতে সবাই খুশী। খুব ভাল হবে তাহলে।

আর যদি ছেলে-মেয়ে- বউ, বয়স্ক বয়স্কা সবাইকার জন্য স্কুল হয় লেখাপড়া শেখার জন্য? কথাটা কারো বিশ্বাস হতো না। ফাঁকা কথা হতো। শহরে মেয়েরা কেমন লেখাপড়া শেখে, স্কুলে যায়।

মেদিনীপুর শহরে, আরো কত শহরে এসব হচ্ছে। যখন বলতাম, ‘আসুন না, এই গায়ে মেয়েদের একটা স্কুল করে নিতে সরকারকে একটা চিঠি নি-ই তার বিশ্বাস করত না। বলতাম, ‘সবাই একজোট হলে কেন হবে না?’ তারপর দরখাস্ত লেখা হতো। টিপ নেয়া হতো মেয়েদের আঙুলের। সমিতির কথাটা তখনই উঠত।

সমিতি না হলে এসব কে করবে? কেই বা সবাইকে খবর দেবে এভাবে গ্রামীণ নারীসমাজ উপলব্ধি করতে পারলো যে, নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য তাদের নিজেদেরই সংগঠিত হতে হবে। এছাড়া সমাজতান্ত্রিক দলের আরেকটি সাফল্য ছিল সাধারণ মুসলিম পরিবারের মেয়েদের এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে তারা সফল হয়েছিল। কলকাতায় মুসলিম মহিলা আত্মরক্ষা কমিটির মাধ্যমে ৫০০ মুসলিম মহিলা শ্রমিক গান্ধীজীর মুক্তিআন্দোলনে শরিক হন।

নাজিমুন্নেসা আহমেদ এই কমিটির নেত্রী ছিলেন। ১৯৪৩ এর মার্চ মাসে পাবনার ৬০০ মহিলা ভুখা মিছিল করে ম্যাজিট্রেটের কাছে যান। এর মধ্যে ৫০০ জন ছিলেন মুসলিম মহিলা। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এদের কাছে ভুখা মিছিল সম্বন্ধে ব্যাপক প্রচার করার ফলে হিন্দু-মুসলিম মহিলারা সম্মিলিতভাবে ভুখা মিছিল করে।

একই বছর জুন মাসে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির উদ্যোগে মেদিনীপুর তমলুক থানার দুই নম্বর ইউনিয়নের দুই শ হিন্দু ও মুসলিম মহিলা কোলাঘাট, রূপনারায়ণপুর ধানকলে যান এবং ১০ টাকা মন দরে চাল বিক্রির দাবি জানান। ১৯৪৩-এর ৬ জুলাই খুলনার মুসলমান পাড়ায় হিন্দু-মুসলমান মহিলাদের একটি সভা হয়। এই অঞ্চলটিতে পর্দাপ্রথার কঠোর অনুশাসন সত্ত্বেও ৪৫ জন মুসলমান মহিলা সভায় আসেন।

দিনাজপুরে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৪-এর ২৬ মার্চ। সম্মেলনে মুসলিম মেয়েদের নেত্রী শাহজাদী বেগম ও শাহেদা খাতুনের নেত্রীত্বে বোরখা খুলে মুসলিম মহিলারা আসেন। মুসলিম লীগের আঞ্চলিক সম্পাদক সঞ্জীক উপস্থিত ছিলেন। এটাই প্রথম সম্মেলন যেখানে দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের মহিলারা উপস্থিত ছিল।

রাজশাহীতে ৮-৯ মে, ১৯৪৪ মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে মুসলিম মহিলারা উৎসাহিত হন। তাদের উদ্যোগে ১১ এপ্রিল স্থানীয় মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রায় ৩৫০ জন মুসলিম মহিলা উপস্থিত হন। কনক মুখার্জী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এর ফলে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি ও মুসলীম লীগের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। সাধারণ মুসলিম পরিবারের মেয়েদের প্রকাশ্য রাজপথে এত অধিক সংখ্যায় মিছিল করা ছিল সামাজিক সংস্কারের বিরুদ্ধে এক বড় প্রতিবাদ।

চল্লিশ দশকের মধ্যভাগ-এ অবিভক্ত বাংলায় কৃষক আন্দোলন শুরু হলে শ্রমজীবি নারীচেতনার জাগরণ এবং নারীমুক্তি এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। এবিষয়ে সমাজতান্ত্রিক নারী নেত্রী রেনু চক্রবতীর উপলব্ধি হলো, রামমোহন রায়ের নারী-মুক্তির সংগ্রাম শুধু শহরের মেয়েদের জন্যই ছিল এবং তা রইল রেনেসাঁ হয়ে।

কিন্তু তেভাগা আন্দোলন নিয়ে এল গাঁয়ের মেয়েদের নবজন্য এই প্রথমবার কৃষক আন্দোলনে মেয়েদের অংশগ্রণের চরিত্র বিশ্লেষণে মালেকা বেগম বলেন অত্যাচারী জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের স্পৃহাও ছিল তীব্র।

তারা দুভাবে জোতদারের হাতে নিগৃহীত হতো। প্রথমত চাষী পরিবারের একজন হিসেবে স্বামী সন্তানের পরিধামের ফসল অন্যের গোলায় উঠিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়ে অভাবে-দারিদ্র্যে সেও নির্যাতিত হতো, দ্বিতীয়ত নারী হিসেবে উচ্ছৃঙ্খল, স্বেচ্ছাচারী জোতদার- জমিদারের অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য হতো। গ্রামীণ কৃষক রমণীরা সরাসরি এইসব অত্যাচারের মোকাবেলা করতো।

শোষিত, নির্যাতিত স্বামীও তার স্ত্রীর উপর অকথ্য অত্যাচার চালাতো। একদিকে সে যেমন জোতদারের কাছে ছিল সম্পত্তির মতো বেচা-কেনার সামগ্রী, শোষণের বস্তু, অন্যদিকে স্বামীর কাছেও ছিল পণ্য স্বরূপ, ভারবাহী পশুর মতো মার খেত, নির্যাতিত হতো।

তাই গ্রামে গ্রামে কৃষক সংগঠন যখন গড়ে উঠল, তখন স্বাভাবিকভাবে তারাও এতে যোগ দিল। গড়ে তুললো তীব্র সাম। পাশাপাশি নারীর মর্যাদা লাভের জন্য পারিবারিক নির্যাতন বন্ধের দাবিতে তারা ক্রমশ মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতেও সংগঠিত হতে থাকে।

কাজেই তেভাগা বা কৃষক আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকল না, তা হয়ে উঠল প্রান্তিক নারীর জন্য মুক্তির বারতা। তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী রানী মিনার (দাশগুপ্ত) সূত্রে রেনু চক্রবর্তী উল্লেখ করেন কীভাবে কমিউনিষ্ট মেয়েরা গ্রামীণ কৃষক সমাজের কাছে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যাই নয় বরং সামাজিক সমস্যাও তুলে ধরে।

১৯৪৪-এ পশ্চিম ঠাকুরগাওয়ের আতোয়ারী গায়ে সমিতির সাধারণ সভায় সম্পাদক যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন স্থানীয় একজন কমরেডের স্ত্রী বক্তৃতার মাঝে বলে উঠেন, “কোন আইনে যৌগরে মারন যায়, কও দেখি কমরেড। আমার মরদ আমারে মরাব ক্যান ? আমি বিচার চাই।

” সভায় তাৎক্ষনিকভাবে প্রস্তাব পাশ হয় স্ত্রীদের গায়ে হাত তোলা নিষেধ বলে।” বীরগঞ্জে মহিলা নেত্রী ফুলেশ্বরীর বাড়িতে এক সভায় এক কৃষক গৃহিনী কিষাণ সভার এক সভ্যকে নিয়ে এসে লোকটির বিরুদ্ধে নালিশ জানায় যে সে তার স্ত্রীকে মারে।

লোকটি ক্ষমা চেয়ে এবং জরিমানা নিয়ে ছাড়া পায়। আরেক স্থানে কন্ঠমনি নামে এক মহিলা নালিশ জানালেন ‘বাড়ীর পিছ দুয়ারে যা তরকারী হয় আমরা বেচি; ছাগল গরুর দুধ বেচি; খালে বিলে মাছ ধরে বেচি, ছাগলও বেচি। এখন এ পয়সা কার? স্বামীর না বৌ এর? এই পয়সা সংসারের পেছনেই যায়। কিন্তু মরদরা আছে খালি এই পয়সা হাতাবার ভালে।” ঐ টাকা জীবন বলে কমিউনিষ্ট পার্টি রায় দেয়।

রংপুরে তেভাগা আন্দোলনের সময় মুসলিম মেয়েরা কঠিন পর্দাপ্রথা উপেক্ষা করে আন্দোলনে অংশ নেবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠেন। তাঁরা বিভিন্ন সভায় অংশ নেবার বিষয়েও আগ্রহী ছিলেন।

কিন্তু পর্নার প্রশ্ন কীভাবে সমাধান করা হবে? কৃষকরা এই সমস্যার সমাধানের জন্য সভা ডাকলেন। কারো অভিমত হলো মেয়েরা সভার যেদিকে থাকবে সেদিকে একটা পর্দার আড়াল নিয়ে দিলেই চলবে, কেউ বলল, মিটিংয়ে কী হয় না হয় তা তাদের পরে জানিয়ে নিলেই হবে। অধিকাংশ মুসলমান মত প্রকাশ করল, কী দরকার অত হ্যাঙ্গামার? এলই বা তারা মিটিং-এ।

অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় মিটিং হবে রাত্রি বেলা-মুসলমান মেয়েরা তাতে যোগ দিতে পারবে /* এভাবে কৃষক মেয়েরা অতি সহজে পুরুষের পাশে স্থান করে নেয় ধর্মীয় বিধি-নিষেধের গণ্ডি পার হয়ে। মুসলমান নারীদের বিদ্রোহী ভূমিকা অনেক স্থানেই দেখা যায়। মনি সিংহ ময়মনসিংহের মুসলমান নারীদের প্রসঙ্গে বলেছেন ভাগচাষী মুসলমান মেয়েরা গরীব হলেও পর্দানশীন।

তাহারা হাজং, রাজবংশী বা নমন্ত্র মেয়েদের মতো আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে না, পর্দার আড়ালে থাকেন। কাজেই ওদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আমরা ছিলাম সম্পূর্ণ অম্ল।… দুইজন সশস্ত্র পুলিশ খুব দাপাদাপি করিয়া একটি গরীব কৃষকের বাড়ির এক গাছতলায় বসিয়া বিশ্রাম করিতেছিল। এমন সময় দুইটি মুসলমান যুবতী বধূ দুইটি দা হাতে রণমূর্তির বেশে বাড়ি হইতে বাহির হইয়া আসিল।

তাহারা সামাজিক রীতিনীতি ভুলিয়া গেল, উচ্চস্বরে চিৎকার করিয়া নিজেদের ভাষায় বলিল-ওরে বান্দীর পুতরা, আমাগো নুকেরে মারছ কেন? এই নাও দিয়া করারে জব করিয়া ফ্যালবাম যুবতীদ্বয়ের পা আর রণমূর্তি দেখিয়া পুলিশষয় যে যেদিকে পারিল রাইফেল দুইটি ফেলিয়া ভো দৌড়ে পালাইয়া গেল।

তাহাদের আর পাত্তা পাওয়া গেল বস্তুতপক্ষে সংগঠিত হওয়া ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়ার পূর্বে কৃষক নারীরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্যতা, আত্মপরিচিতি ও অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনভাবেই সচেতন ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে কৃষকনেতা অমল সেন বলেন তেভাগা সংগ্রাম মহিলা সমিতিকে ঠেলে দিল বিস্ময়কর বিপ্লব এ সঙ্ঘামের ক্ষেত্রে। ধ্যানধারণা, আচার-আচর আর ব্যবহার রীতির মধ্যে যুগ-যুগারে াল বেটিয়ে পরিষ্কার করার কাজে নেমে পড়ল মহিলान।

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ব্যবহার, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আচরণরীতি, বিধবা বোনের প্রতি ভাইদের মনোভাব ও আচরণ। ছেলেমেয়ে পালন করার ধারা। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, খাদ্য ও বাসস্থানের স্বাস্থ্যবিধি, সংসারের পরস্পরের প্রতি, পড়শীর প্রতি, সাধারণ রামজীবি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার আর আপনজনের মত মানসিকতা ও ব্যবহাররীতি প্রতি ক্ষেত্রেই মহিলা সমিতির সংগ্রাম প্রসারিত হয়ে গেল। সমগ্র জীবনবোধ, সামাজিক সম্পর্ক, আর ব্যবহাররীতি, সব কিছুকেই সুন্দরভাবে বদলে দেবার অবিশ্বাস্য সব ঘটনা সংগঠিত হয়ে চললো।

অনেক দেশে বিপ্লব সমাধা হবার পর সাংস্কৃতিক বিপ্লব হচ্ছে বলে শুনি কিন্তু তেভাগা আন্দোলন আর মহিলা সমিতির এইদিককার সংগ্রাম তেভাগা অঞ্চলের কৃষকদের সমাজে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটিয়ে তুলেছিল। বললে খুব একটা বাড়িয়ে বলা হলো বলে আমার মনে হয়
উনিশটি জেলায় তেভাগার দাবিতে কৃষক সংগ্রাম হয়। এই জেলাগুলো হলো দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, হাওড়া, হুগলী, বীরভূম, বাঁকুড়া, মালদহ, নদীয়া, চব্বিশ পরগণা, মেদিনীপুর ও জলপাইগুড়ি।

প্রতিটি অঞ্চলেই তেভাগা আন্দোলনে নারীসমাজ ছিল সক্রিয় এবং বহু ক্ষেত্রেই তারা নেতৃত্বদানকারী ভূমিকায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। এবং অমল সেন-এর ভাষ্য অনুসারে প্রতিটি এলাকাতেই সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল। শ্রমজীবি নারীচেতনার উন্মেষ তেভাগা আন্দোলনের বড় প্রাপ্তি।

পরিশেষে বলা যায় চল্লিশের দশকে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হলে এর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নারীর বিশেষ অধিকারের জন্য আন্দোলনে সচেষ্ট হওয়া আর এজন্য সমাজের একেবারে উপরতলা বাদ দিয়ে অন্যসব শ্রেণির মেয়েদের ঐক্যবদ্ধ করার কার্যক্রম তারা গ্রহণ করে।

 

উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায় : প্রান্তিক ও শ্রমজীবি নারীর উন্মেষ : ১৯৪০-৪৮

 

এই দশকের দ্বিতীয়ার্ধে কৃষক আন্দোলনে কৃষক রমণী এবং কমিউনিষ্ট পার্টির নারীদের অংশগ্রহণ প্রান্তিক নারীকে আন্দোলনে সামিল করে তাদের অধিকার এবং বঞ্চনা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এই সচেতনতা সনাতন পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর প্রতি চ্যালেঞ্জমূলক হলেও এমন সমাজকাঠামোকে বদলে দেয়ার মতো সামর্থ্য তখনও নারীদের হয় নি (বলা চলে আজও হয় নি।)

তবে এটা স্বীকার্য যে, নারীর মনোজগতে সমাজের রূপান্তর উপযোগী এক শক্তিশালী পরিবর্তন অবয়ব ধারণ করেছিল; এবং যা এক কালের অন্তঃপুরের ঘেরাটোপে হারিয়ে যাওয়া নারীর নবজাগৃতী ও তার রাজনৈতিকায়নের তীক্ষ্ণ একটি সূচক ছিল। লক্ষণীয় সূচক-বিন্দুটির ক্রমে ক্রমে বৃত্ত হওয়া বা বৃত্তটির ক্রমপ্রসারমানতা আজও দৃশ্যমান ।

Leave a Comment