আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ও বিকাশে সংবাদ-সাময়িকপত্রের ভূমিকা : ১৯০৬-৪৭ সূচিপত্র। আঠার শতকের শেষ নাগাদ মুসলমান শাসনের পতনের পর হতে মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে বিপর্যয় শুরু হয়েছিল, পরবর্তীফালে ইংরেজ শাসন ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণে অনীহার ফলে তা মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করেছিল।
বাংলার মুসলমান সাংবাদিকগণ স্বসমাজের দুর্দশা পত্রিকাগুলিতে প্রকাশের মাধ্যমে সমাজের উন্নতি আনয়নের লক্ষে সংবাদপত্র প্রকাশনার কাজে এগিয়ে আসে। সমাজের ধর্ম, শিক্ষা, অর্থনীতি, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে নিয়মিত লেখা প্রকাশিত করে এ ব্যাপারে অধঃপতিত সমাজকে উজ্জীবিত করতে প্রয়াসী হন। সংবাদপত্রকে তাঁরা সমাজসেবার জাতিয়ার মনে করেছিলেন।
বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ও বিকাশে সংবাদ-সাময়িকপত্রের ভূমিকা : ১৯০৬-৪৭ সূচিপত্র

প্রথম অধ্যায়
- বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ : ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ পর্ব – ১
- বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ : ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ পর্ব – ২
দ্বিতীয় অধ্যায়
- সাংবাদিকতায় বাঙালি মুসলমান পর্ব – ১
- সাংবাদিকতায় বাঙালি মুসলমান পর্ব – ২
তৃতীয় অধ্যায়
- মুসলমান সাংবাদিকদের সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা পর্ব – ১
- মুসলমান সাংবাদিকদের সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা পর্ব – ২
চতুর্থ অধ্যায়
- রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টিতে সংবাদপত্রের ভূমিকা : ১৯০৬-৪০ খৃঃ পর্যন্ত
পঞ্চম অধ্যায়
- পাকিস্তান আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা : ১৯৪০-৪৭ খৃঃ পর্যন্ত

ষষ্ঠ অধ্যায় : উপসংহার
মুসলিম সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য সম্পর্কে একজন গবেষকের মত, বৃটিশ আমলে সাংবাদি জীবন যাপনের জন্য একটি পেশা ছিল না। বৃটিশ আমলে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজকে আলোকিত করা ও প্রকাশ দেখে কারো কারো মনে হতে পারে যে ভাষা শুনে মুসলমান নেতাদের মধ্যে অনেকেই প্রগতিশীল ছিলেন। তাঁরা দেশের সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিজের সমাজের সমৃদ্ধির কথাও ভাবতেন ।
মুসলমান পত্র-পত্রিকার সম্পাদক ও লেখকগণ এই চতুর্থ শক্তির সাহায্যেই কিসে সমাজের ম সাধন হবে, সে সমস্যার সমাধানে তাঁরা নিজেদের সাধনায় নিয়োজিত রেখেছিলেন। যার প্রমাণ তাঁদের রচনাক মধ্যে পাওয়া যায়। এছাড়াও চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনের খবরাখবর নিয়মিত প্রকাশ ছাড়াও রাজনৈতিক সমস্যাবলীর বিশ্লেষণে পত্র পত্রিকার মাধ্যমে বিস্ময়কর ব্যস্ত তাঁরা রেখেছিলেন।
তাদের এসব রচনা থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায় তর জাতীয়তাবোধ এবং সংস্কৃতি চেতনায় তাঁরা কিরূপ উদ্বুদ্ধ ছিলেন। ফলে মুসলমানদের রাজনৈতিক জাগরণ আনয়নে পত্র-পত্রিকার প্রকাশিত তাদের প্রবন্ধসমূহ ও চিন্তাধারা বাণীরূপ লাভ করে সফল হয়েছিল।
ঝুড়ি শতাব্দের প্রথম থেকে মধ্যবর্তী সময়কালে বাঙালি মুসলমানের আত্মা উপলব্ধি থেকে আত্ম-উন্নতি সাধনের যারা তাদের সার্বিক জাগরণের যে বিশাল বিকাশ পরিলক্ষিত হয়েছিল এই সমস্ত ব্যক্তিবর্গের প্রজ্ঞাপ্রোজ্জ্বল অবলোকন, তাদের গ্রহণযোগ্যতা এবং সুচিন্তিত ও সুলিখিত অবদান যেখানে বিশিষ্ট ভূমিকা রেখেছে। সুতরাং, পত্র-পত্রিকাগুলির দল আয়ু, ক্ষীণ কলেবর হলেও একথা অস্বীকার করা যায় না যে, এ সব পত্র-পত্রিকার প্রকাশনার মধ্য দিয়েই উনিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে বাঙলার মুসলমানদের মধ্যে সাংবাদিকতার সূচনা হয়েছিল।
পরিশেষে, ডঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায় এর কথায় বলা যায় অন্তর স বলীয়ান হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক সৈন্য এবং পরিচালনাগত নানা এটি বিচ্যুতির ফলে এই সমস্ত পত্র-পত্রিকাগুলির অধিকাংশের ক্ষেত্রে দীর্ঘ বা লেও এর যে আবেদন তা তো নয় এর পূর্ণ রেখেছিল। পত্র-পত্রিকাগুলির পাতায় তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে, এইার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বাঙালি মুসলমানদেরর চিন্তাধারাকে বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে দেখা যায়।
এক্ষেত্রে মুসলমানের আত্মপরিচয় সম্পকে দুইটি ভিন্ন চেতনা লক্ষণীয় ধর্মীয় দিক থেকে তাদের পরিচয় যেমন মুসলমান’ তেমনি দেশজ লিফ থেকে তাদের পরিচয় বাঙালি। আত্মপরিচয়ের এ অনুসন্ধিৎসা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রাধান্য লাভ করেছে। বাঙালি প্রশ্নে হিন্দু-মুসলমান ধর্মীয় স্রোত এক খাবার প্রবাহিত হতে দেখা যায়।
যেমন শেখ রহমান সম্পাদিত ‘যঅনুর’ (১৯১৯) পত্রিকায় বলা হয়েছিলঃ “তুমি হিন্দু ২০ বা মুসলমান হও, ব্রাহ্মণ ২০ বা এই কি কাজে লাগিতে পার এই ক্ষয় আর ১৩২৯ সালে কাজী নজরুল ইসলাম ধূমকেতু পত্রিকা আমার ধর্ম” নামক প্র মানুষ হিসাবে বাঁচার জন্য জোর আহবান জানিয়ে নব্য করেছিলেনঃ “দেশে একটা কথা উঠেছে যে মুক্তি জানো যে আন্দোলন আমরা চালাচ্ছি আমাদের তা ধর্ম্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে নিতে হবে।
যাকে নিজের ঘরে পরে এসে অবহেলায় পশুর মত নেয়ে ফেলতে পারে, যার ভাইবোন বাপ মাকে মেরে ফেলে করবনা আশা নাই তার আনার ধর্ম কিছু
তারে আমার করুণ ওরে আমার লক্ষ্মীছাড়ার দল, তোরা আট, তোরা ছুটে আয়- আই ডঙানি থেকে চলে আয়। তোরা বল আমাদের আগে বাঁচতে হবে ।… তরে অধীন, ওরে শুভ তোর সাবায় ধর্ম কি? যাত্রা তোকে ধৰ্ম্ম শিখিয়েছে তারা কি শত্রু এলে যেন নিয়ে পড়ে থাকতো।
তারা কি সুগমন এলে কোরআন পড়তে ন্যস্ত থাকতো? তাদের রণ কোলাহলে বেদমন্ত্র ডুবে যেত, দুধমনের ভুনে তাদের মসজিদের ধাপ লাল হোয়ে যেত। তারা আগে বাঁচাতো” ” অন্যদিকে ১০৪০ সালে এক সম্পাদকীয়তে দেখা হয়েছিল। “কংগ্রেস ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সন্দেহ নাই। কিন্তু কংগ্রেসের সমস্ত ক্ষমতা অধিকার করিয়া রহিয়াছে, প্যাটেল, দেশাই, রাজেন্দ্র প্রসাদ, বা প্রকৃতি বিধর্মীর চর।
অন্যদিকে ধর্ম রক্ষার অজুহাতে হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লীগ প্রভৃতি যে সকল প্রতিষ্ঠান সম্প্রদায়িক কল্যাণের মত আওড়াইতেছেন, তাহাতেও ভাই পরমানন্দ, সাভার কর, মিঃ জিন্নাহ, মাহমুদাবাদের রাজা প্রভৃতি ধনী করিয়া রহিয়াছেন। মুষ্টিমেয়া বুদ্ধিজীবি বড়লোকের হাতে যত দিন এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান শাফিনে জনসাধারণের সম্পূর্ণ কল্যাণের আশা বাতুদের পক্ষেই সম্ভব।
সেনা সামন্ত গোলাবারুদ যথেষ্ট পরিমাণে থাকা সত্ত্বেও পলাশীর যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করিতে বাধা হইয়াছিল। কারণ সৈন্য চালনার ভার ছিল উপর। দেশ-কর্মীরা, দেশ সেবকেরা যত ভ্যাব্রতী হন না কেন, যে পর্যন্ত সময় পাতা হইতে এই শ্রেণীর নেতৃত্বের অবসান না হইবে ততদিন সুবিচারের আশা ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকায় এক অভিভাষণে হিন্দু এবং মুসলমানকে অসু ধর্মক্ষেত্র ছাড়া সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য বিষয়ে ভালোকে এক জাতি অতীয় বলে প্রতিপন্ন করতে শ্যামর্শ দেয়া হয়েছিল।
অধ্যাপক কাজী আবদুল এ পত্রিকার সম্পাদক আবদুল কাদের এর নিকট একটি চিটা লিখে মুসলমান সমাজ সম্পর্কে এই অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, মুসলমান সমাজে যে সকল সত্য ও কল্যাণছিলাসু বাজি জন্মগ্রহণ করাবেন তাঁরা দেশের ও সমসাময়িক জগত কর্মে আত্মনিয়োগ করবেন কাগজের বা দেশের এক সন্তান, মানুষের এক ভাই, এই হিসাবে যার মধ্যদিয়ে প্রাচীন মুসলমান সাধনার ভিতরে জগতের জন্য কল্যাণকর যদি কিছু থেকে থাকে তা ফুটে উঠবে।
তিনি বলেছিলেনঃ “ইসলাম মুসলমান কথাগুলো এখন আমাদের অভিধান থেকে মুছে ফেলা ভালো। … মুসলমান’ ‘হিন্দু’ এদের কথা বহু বলা হয়েছে। ও পালা এখন চুকিয়ে নাও। তার পরিবর্তে মুসলমান হিন্দু এইসব নামধারী মানুষের বিচার-বিশ্লেষণ ভালো ক’রে করো। সেই ই আমাদের এখনকার কাজ” ” অন্যদিকে, শিক্ষা (১৯২৭) পত্রিকার সম্পাদক আবুল হোসেন মুসলমান সাহিত্য সমাজের উদ্দেশ্যে আমাদের রাজনীতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেনঃ ভারতবর্ষ ও ভারতবাসী মিলে এক অন্য রাষ্ট্র গঠন করেছে।
ভারতবর্ণের কোলে জন্মলাভ করে বা আশ্রয় নিয়ে কি হিন্দু কি মুসলমান কি খৃষ্টান কেউই পৃথক পৃথক রাজনীতির দাবী করতে পারে না। বর্তমান আগতে মুসলমানের রাজনীতি বা হিন্দুর রাজনীতি বা মুসলমান রাষ্ট্র বা হিন্দু রাষ্ট্র বলে কোন কথা হতেই পারে না। অতএব আমাদের রাজনীতি বলতে বুঝতে হবে, ভারতের কোলে যাঁরা জন্মেছেন বা আশ্রয় নিয়েছেন তাদের ‘রাজনীতি’।” সত্যাগ্রহী’ পত্রিকায় বলা হয়েছিলঃ “আমরা বরাবর জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দুদের সহিত মিলিত হইতে সমবেত চেষ্টা দ্বারা স্বাধীনতালাভের পক্ষপাতী।
সুতরাং হিন্দুদের সহিত কোনরূপ বিরোধের সম্ভাবনাকে এড়াইয়া চলাই আমরা কবে বলিয়া মনে করি। উক্ত পত্র-পত্রিকায় অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে হিন্দু- মুসলমান ঐক্যের ভিত্তিতে ভারতীয় জাতীয়তাবান রক্ষার জন্য আহবান জানিয়ে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা লক্ষ কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানাবিধ ঐতিহাসিক কারণে অধিকাংশ মুসলমান তাদের দেশজ বাঙালি পরিচয়ে চেয়ে তাদের ধর্মীয় মুসলমান পরিচয়কেই অধিক প্রাধান্য দিতে না করেছিল যারফলে ১৯৪৭ সালে ধনভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।
সুতরাং, দেখা যায় যে, পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশিত বাঙালি মুসলিম জনমতের চরিত্রকে একটি বিশেষ ধারায় চিহ্নিত করা যায় না। পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে দেশজ ধর্ম নিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয় চেতনা পুনরায় জাগ্রত হতে লক্ষ করা যায় যা অব্যবহিত পরেই স্বাধীনতাধীন বাংলাদেশের অনা ঘটায়।
