নতুন গেরিলা কৌশল

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ নতুন গেরিলা কৌশল। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

নতুন গেরিলা কৌশল

 

নতুন গেরিলা কৌশল

 

নতুন গেরিলা কৌশল

ক. গেরিলাদের অনুপ্রবেশ

ভারতীয় সৈন্যদের তীব্র গোলা বর্ষণের আড়ালে সর্বদা গেরিলাদের অনুপ্রবেশ ঘটতো। গেরিলারা ‘রাইফেল গ্রুপ’ ও ‘বিস্ফোরক গ্রুপ’ নামে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অনুপ্রবেশ করতো। রাইফেল গ্রুপ বিস্ফোরক গ্রুপের অনুপ্রবেশ আড়াল এবং আগাম হুঁশিয়ারি এবং প্রতিরক্ষা প্রদানে এ গ্রুপের আগে আগে এগিয়ে আসতো।

এ ছাড়া রাইফেল গ্রুপ সৈন্যদের ব্যস্ত রাখার দায়িত্ব পালন করতো। এই ফাঁকে বিস্ফোরক গ্রুপ তাদের মিশন সম্পন্ন করে নিরাপদে সরে যেতো। প্রতিটি গ্রুপের জন্য স্থানীয় অপারেশন এলাকার অভিজ্ঞ গাইড ছিল।

খ. গেরিলা তৎপরতা

প্রতিটি থানা এলাকাকে একটি ‘সাব-সেক্টর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং প্রতিটি সাব-সেক্টরকে আবার ৪ ভাগে ভাগ করা হয়। একটি ভাগে মাত্র গেরিলা তৎপরতা চালানো হতো এবং বাকি তিনটি ভাগকে আশ্রয় কেন্দ্র ও গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

দেশের ভেতরে গেরিলা তৎপরতা চালানোর জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিদ্রোহী ছাত্রদের পাঠানো হতো। অন্যদিকে নিয়মিত বাহিনী, প্রাক্তন এবিআর এবং ইপিআরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকায় মোতায়েন করা হতো। বিদ্রোহীরা অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগে সরকারি কর্মকর্তা, কৃষক ও শ্রমিকদেরকে কাজে যোগদান থেকে বিরত রাখত।

১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষ নাগাদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর আওতায় বিদ্রোহীরা তাদের প্রশিক্ষণ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলে এবং তারা সুসজ্জিত হয়। কয়েকটি কমান্ড কাঠামোর ব্যবস্থা থাকায় তারা ভালোভাবে সংগঠিত হয়। তখন পর্যন্ত তারা অপ্রচলিত ও সীমিত লড়াই করার মতো অবস্থায় ছিল।

তাদের মূল দুর্বলতা নিহিত ছিল লজিষ্টিক ও ফায়ার সাপোর্টে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় এ ঘাটতি অনেকখানি পূরণ হয়। বিদ্রোহীদেরকে সীমান্ত চৌকি (বিওপি) দখলে পাঠানো হয় এবং সীমান্তের বাইরে থেকে তাদেরকে আর্টিলারি ফায়ার সাপোর্ট দেওয়া হয়।

অত্যন্ত শিক্ষিত ও রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের নিয়ে বিদ্রোহীদের মূল অংশ গঠিত হয়। সময়ের ব্যবধান এবং ভারতীয়দের সক্রিয় সমর্থনে বেড়ে যায়। তাদের মনোবল। ভারতীয় সাহায্যে মুক্তিবাহিনী দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। মুক্তিবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য একটি শ্রেষ্ঠতম সম্পদ। হিসেবে প্রমাণিত হয়। এ কারণে ভারত তাদেরকে যুদ্ধের সব ক্ষেত্রে মূল্যবান সহযোগিতা প্রদান করে।

 

গ. ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি সমর্থন

বাঙালি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য একটি বিরাট সুবিধা। এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বাঙালি জনগণ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে। বাঙালিদের কাছ থেকে এই ক্ষেত্রে সহযোগিতা না পেলে ভারতীয়দেরকে টহল দল পাঠিয়ে এবং প্রচুর রক্তের বিনিময়ে গোয়েন্দা তথ্য পেতে হতো।

মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে শ্রম ও বস্তুগত সহযোগিতা দিয়েছে এবং তারা তাদেরকে আমাদের অবস্থান চিনিয়ে দিয়েছে। তারা আমাদের সৈন্য। চলাচল সম্পর্কে শত্রুকে আগাম তথ্য সরবরাহ করেছে এবং আমাদের ওপর হামলা চালাতে তাদের সাহায্য করেছে।

স্থানীয় লোকজনের সক্রিয় সহযোগিতা। ও দিকনির্দেশনায় ভারতীয় কমান্ডাররা তাদের অপারেশন এলাকা পরিদর্শন এবং তাদের ওপর আবদ্ধ কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। স্থানীয়রা সেতু, কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণে শ্রম দেয়।

তারা ভারতীয় সৈন্য পারাপারে দেশি নৌকা, ইঞ্জিনচালিত নৌকা, গরুর গাড়ি, সাইকেল, রিকশা এমনকি কুলি পর্যন্ত সরবরাহ করে। তারা শত্রুর গতি ও চলাচল বৃদ্ধিতে সহায়তা দেয় । ‘লিবারেশন ওয়ার’-এ ভারতীয় লেখক বলেছেন যে সমগ্র জনগণ পক্ষে থাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দেশব্যাপী অভিযান চালাতে অথবা পাকিস্তানি সৈন্যদের সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পেতে মোটেও বেগ পেতে হয় নি।

স্থানীয় জনগণের সহায়তা না পেলে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সীমান্তে যুদ্ধ করতে হতো। ভারতীয় ও রুশরা সহায়তা না দিলে বাঙালিরা কখনো কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস পেতো না। বাঙালি ও রুশরা সহযোগিতা না দিলে ভারতীয়রা কখনো সীমান্ত অতিক্রম করার দুঃসাহস দেখাতে পারতো না।

আমাকে মার খাওয়া এবং পিছু হটা গেরিলাদের পশ্চাদ্ধাবনে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে এসব ঘটনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেতো। ভারত দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেতো, বাঙালিরা একটি উচিৎ শিক্ষা পেতো এবং পাকিস্তান ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারতো।

২৫শে মার্চের পর যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথমদিকে বিদ্রোহীদের সাফল্য সম্পর্কে ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে অতিরঞ্জিত ও বানোয়াট কাহিনি প্রচার করা হতে থাকে। কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে ভারতীয় প্রচার মাধ্যম মুক্তিবাহিনীর সফলতাকে খুব খাটো করার চেষ্টা করে।

এটা ছিল মুক্তিবাহিনীর ভূমিকাকে তুচ্ছ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে গৌরবান্বিত করা এবং ভারতীয় সৈন্যদেরকে কৃতিত্বের সকল ভাগ দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। মুক্তিবাহিনীর ছদ্মবেশে ভারতীয় সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু ভারত সরকার কখনো তা স্বীকার করতো না।

তবে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং কয়েকটি সেতু ধ্বংসের ঘটনায় ভারতীয় সৈন্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণিত হয়। আমি ভারতে যুদ্ধবন্দি হিসেবে থাকাকালে ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় এসব ঘটনা পড়েছি। এ ছাড়া কিছু বই-পুস্তকেও ভারতীয় সৈন্যদের অনুপ্রবেশের বিবরণ ছাপা হয়।

আমি সেগুলোও পড়েছি। কিছু কিছু ভারতীয় নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে অনুগত পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর হামলা, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, মাইন পোঁতা প্রভৃতিতে মুক্তিবাহিনীর ছদ্মাবরণে ভারতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যদের বিশাল অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছেন ।

পাকিস্তানের ভাঙনে প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাম্রাজ্যবাদী দুরভিসন্ধি ও নিকোলাই ম্যাকিয়াভেলীয় কৌশল অবলম্বনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য দিয়েছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই। মোরারজি দেশাই স্বীকার করেছেন যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ছিল মিসেস গান্ধীর ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিত।

তিনি আরো বলেছেন যে, মিসেস গান্ধী মুক্তিবাহিনীর ছদ্মবেশে সাদা পোশাকে হাজার হাজার ভারতীয় সৈন্যকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়েছিল এবং ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত লড়াইয়ে ৫ হাজার ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছে।

 

নতুন গেরিলা কৌশল

 

মোরারজি দেশাই আরো বলেছেন, অধিকাংশ মুক্তিবাহিনী ছিল মূলত ভারতীয় সৈন্য। এ জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল শ্যাম মানেকশ প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর কাছে গিয়ে বলতে বাধ্য হন, এটা হতে পারে না। এভাবে ভারতীয় সৈন্যদের মরতে দেওয়া যায় না। আপনি হয় তাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনুন, নয়তো পাকিস্তানের সাথে প্রকাশ্য যুদ্ধে তাদের লড়াই করতে দিন।

Leave a Comment