আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ শত্রুর প্রতি আক্রমণ। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
শত্রুর প্রতি আক্রমণ

শত্রুর প্রতি আক্রমণ
১৬তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ জানান যে, ভারতীয়রা পূর্ণ শক্তি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ হামলা চলছে। তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি কীভাবে জানলেন যে এটি পূর্ণাঙ্গ হামলা এবং ভারতীয়রা এতোদিন যে ধরনের হামলা চালিয়ে এসেছে এটি সে ধরনের হামলা নয়?
নজর বললেন যে, অগ্রবর্তী অবস্থানে তিনি নিজে গিয়ে দেখে এসেছেন। তিনি বললেন, ‘প্রচুর গোলাগুলি চলছে। এটা যেন লাহোরে হর্স শো’তে আমাদের আতশবাজির মতো। গোটা সীমান্ত জুড়েই প্রতিটি ফ্রন্টে ভারতীয়দের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এটা কোনো একটি নির্দিষ্ট সেক্টরে সীমাবদ্ধ নয়।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনো নির্দিষ্ট রুট অথবা সেক্টর বরাবর কোনো বহর এগিয়ে আসার খবর পাওয়া গেছে কি-না?’
তিনি আমার প্রশ্নের ‘না’ সুচক জবাব দেন। ‘মনে হচ্ছে তারা বুঝতে। পেরেছে যে, এঁটে উঠতে পারবে না তারা। প্রধান প্রধান রুটে আমাদের চৌকিগুলো তাদেরকে শক্ত জবাব দিচ্ছে এবং শত্রুর প্রচুর ক্ষতিসাধন করছে। স্যার, ভারতীয়দের চরিত্র হচ্ছে যুদ্ধের চেয়ে কোলাহল বেশি— বর্ষণের চেয়ে গর্জন বেশি।’
অন্যান্য সেক্টর থেকেও খবর পাওয়া যাচ্ছিল যে, ভারতীয়রা সবদিক থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর সর্বাত্মক হামলা শুরু করেছে। ভারতীয়রা ঢাকার মতো গভীর অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুতে নয়, কেবল সীমান্তের ৮ থেকে ১০ মাইলের মধ্যে তাদের জঙ্গিবিমান ব্যবহার করে। তাদের নৌবাহিনীও আমাদের বন্দর অথব সমুদ্র অবরোধে এগিয়ে আসে নি। তারা এমন করছিল আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নয়।
কারণ, তারা কখনো আন্তর্জাতিক মতামতের তোয়াক্কা করে নি বরং একটা ভুল ধারণা থেকেই তারা এমন করছিল। ভারতীয়রা ধারণা করতো যে, পাকিস্তান ইন্টার্ন কমান্ড সীমান্তের কাছে একটি সরু রেড লাইনে ছড়িয়ে রয়েছে। এবং তারা আকস্মিক হামলায় তা শুঁড়িয়ে দিতে পারবে। ভারতীয় কৌশলবিদগণ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরেকটি ভুল করে। তাদের এ ভুল ছিল প্রথমটির চেয়ে বড়ো। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে তারা প্রথম ভুল করে বসে।
ভারতীয়রা তখন ভেবেছিল যে, আমি আমার পূর্বসূরী টিক্কার মতো বড়ো বড়ো শহর ও ক্যান্টনমেন্টের আশপাশে লড়াই করবো এবং একটি ক্ষুদ্র, অর্ধ- সজ্জিত ও অবরুদ্ধ বাহিনী নিয়ে অগ্রাভিযান শুরু করার সামর্থ্য আমার নেই।
কিন্তু আমি তাদের ধারণা ভেঙে দিয়ে হামলা শুরু করি এবং দুই মাসেরও কম সময়ের ভেতর এক তরিত অভিযানে পূর্ব পাকিস্তানের মাটি থেকে গেরিলাদের উচ্ছেদ করি। দ্বিতীয় বার আমরা ভারতীয়দের বোকা বানাই। সেটা ছিল আমাদের সৈন্য মোতায়েন সম্পর্কে।
আমি ভারতীয়দের এটা বুঝতে দিই যে, আমার মিশনের প্রকৃতি অনুযায়ী আমাকে আমার সকল সৈন্য সীমান্তে মোতায়েন করতে হয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে আমার হাতে কোনো সৈন্য নেই। মানচিত্রে আমরা দেখাই যে, সকল সৈন্য একটি সরু রেখায় সীমান্তে মোতায়েন করা হয়েছে।
সীমান্তে মোতায়েন সৈন্যদের অবস্থান বড়ো করে বৃত্ত এঁকে দেখানো হয় । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সীমান্তে খুব সামান্য সৈন্যই ছিল, অধিকাংশ সৈন্য মোতায়েন করা হয় সীমান্ত থেকে অনেক দূরে।
আমরা মানচিত্রে সৈন্য মোতায়েন যেভাবে চিহ্নিত করে দেখিয়েছিলাম তাতে ভারতীয় এবং আমাদের হাই কমান্ড উভয়েই সন্তুষ্ট হয়েছিল। আমাদের হাই কমান্ডের অভিপ্রায় ছিল ভারতীয় ও বাঙালিদের চেয়েও জঘন্য । আমার হাই কমান্ড আমাকে ভারতের প্রথম হামলায়ই ধরাশায়ী দেখতে চেয়েছিল। এ জন্য আমাকে ভূখণ্ড না হারানোর যথাযথ নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ নির্দেশ পালনে সীমান্ত বন্ধ এবং সীমান্ত বরাবর সৈন্য মোতায়েন করা অপরিহার্য ছিল। আমাকে ভারতীয়দের সহজ শিকারে পরিণত করার জন্যই এ রকম নির্দেশ দেওয়া হয়। আমি আমার পরিকল্পনায় সামান্য সমন্বয় করি। তবে আমি সৈন্য সমাবেশ করা পরিত্যাগ করি না।
আমাকে পরাজিত করার জন্য ভারতীয়দের যথেষ্ট সময় ও সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ইয়াহিয়া খান আমাদের সার্বিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু অথবা ভারতীয় হামলার বিষয়টি জাতিসংঘে নিয়ে যায় নি।
পূর্ব পাকিস্তানকে সরকারবিহীন অবস্থায় পরিত্যাগে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু করা হয় নি এবং বিষয়টি তৎক্ষণাৎ জাতিসংঘে নিয়ে যাওয়া হয় নি। আমি পরাজিত হলেই পূর্ব পাকিস্তান পরিত্যাগে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর পরিকল্পনা সফল হতো।
অতঃপর নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা হয়ে যায় ইয়াহিয়ার অংশগ্রহণ। ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর আমি আমার সৈন্যদের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা পাঠাই “বিদ্রোহ, চোরাগুপ্তা হামলা, ক্ষয়-ক্ষতি সাধন ও পরোক্ষ যুদ্ধের কৌশল অবলম্বনে পূর্ব পাকিস্তান গ্যারিসনকে বিকল এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মিশন ব্যর্থ হওয়ায় ভারতীয়রা ২০/২১ নভেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা করেছে।
পাকিস্তানের বীর সেনারা গোটা ফ্রন্ট বরাবর তাদের হামলা প্রতিহত করেছে। তাদেরকে তাদের থাবা বিস্তার করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। আলবদর ও আলশামস যোদ্ধাদের ভারতের গভীর অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তুতে পাঠাও। ভারতীয়দের ট্যাংক সংরক্ষণাগার, গান এরিয়া ও তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় হামলার জন্য স্থানীয় গেরিলা ও নিজস্ব কমান্ডোদের ব্যবহার কর ।
রাতে তাদের ভীতি প্রদর্শন করো। তাদের যান্ত্রিক পরিবহন (এমটি), ট্যাংক ও জঙ্গিবিমানের কোনো অভাব নেই। পেট্রোলেরও ঘাটতি নেই কোনো। তাদেরকে ভ্রাম্যমাণ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ দিও না। নদী, খাল-বিল, হ্রদ ও হাওরগুলোকে বিচক্ষণতার সাথে ব্যবহার করো এবং যান্ত্রিক পরিবহনকে রাস্তায় উঠতে বাধ্য করার জন্য কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করো এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের অধিকাংশ সৈন্যকে নির্ধারিত পথ ধরে চলতে বাধ্য করো। তোমাদের যঙ্গল হোক। আল্লাহ তোমাদের সাথে রয়েছেন।
সব দিক থেকে হামলা চালিয়ে জায়গায় জায়গায় আমাদের অবস্থান ঘেরাও এবং পরিশেষে ঢাকা দখল করাই ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় হামলার মূল লক্ষ্য। তারা তিনটি কোর ও ডিভিশনাল সদর দপ্তর হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী একটি কমিউনিকেশন জোন নিয়ে আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ডিভিশনের শক্তিসম্পন্ন কিলো ফোর্স ব্যবহার করা হয়। তারা ১৭ স্কোয়াড্রন আধুনিক জঙ্গিবিমান ব্যবহার করে। এ ছাড়া ১২৫টি হেলিকপ্টারও তারা ব্যবহার করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের চারদিকে তাদের বিমানঘাঁটি ছিল। তাদের নৌবাহিনীতে ছিল ১২টি বৃহদাকার যুদ্ধ জাহাজ ও ‘বিক্রম’ নামে একটি বিমানবাহী রণতরী। এ রণতরীটি একটি ভ্রাম্যমাণ বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যেতো।
২১শে নভেম্বর আমার চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার বাকির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে ভাইস চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল কোরেশীর কাছে টেলিফোন করেন এবং ভারতীয় হামলা সম্পর্কে একটি লিখিত সংকেত পাঠান। আমি চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসানের সাথে কথা কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তার সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হই। তিনি ঈদ উদযাপনের জন্য লাহোর চলে গিয়েছিলেন।
২১শে নভেম্বর ভারত পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালাবে, এ কথা ভালোভাবে অবগত হয়েও তিনি লাহোর যান। আমি এরপর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। তাকেও পাওয়া যায় নি। পরে জানতে পেরেছি যে, জেনারেল হামিদ ও প্রেসিডেন্ট পাখি শিকারের জন্য শিয়ালকোট গিয়েছিলেন। কিন্তু বলা হয়েছিল যে, তারা সৈন্যদের সাথে দেখা করার জন্য সেখানে গিয়েছেন। কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের সি-ইন-সি ঈদের দিনে। সৈন্যদের সাথে দেখা করতে যেতে পারেন না।
সেনাবাহিনীর এ তিন শীর্ষ কর্মকর্তার এ নিষ্ঠুর আচরণ এটাই প্রমাণ করে। যে, পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলিতে এবং পাকিস্তানের সংহতি রক্ষায় তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। ঢাকা যখন পুড়ছিল তারা তখন সম্রাট নিরোর মতো। বাঁশি বাজাচ্ছিলেন।
তাদের কার্যকলাপে আমি মোটেও হতাশ হই নি। কারণ, আমি তাদের দুরভিসন্ধি আঁচ করতে পেরেছিলাম। আমার চিফ অব স্টাফ আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন যে, তারা পূর্ব পাকিস্তান ও আমাদের পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিষয়টিকে জাতিসংঘ অথবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া অথবা একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো অথবা কোনো রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো কারো তরফেই কোনো প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয় নি।
“পশ্চিম রণাঙ্গনে হামলা শুরু না করে ইয়াহিয়া খান ইস্টার্ন গ্যারিসনের অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব করে তোলেন …। এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের হামলাই সম্ভবত একমাত্র নজির যেখানে জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আরেকটি সদস্য রাষ্ট্রের সশস্ত্র আগ্রাসন সত্ত্বেও আক্রান্ত দেশটি তৎক্ষণাৎ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করেনি।
(ফজল মুকিম: পাকিস্তান’স ক্রাইসিস ইন লিডারশিপ, ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশন, ইসলামাবাদ, ১৯৭৩), ভারতীয়রা তাদের রুশ প্রভুদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা এক সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১২ দিনে ঢাকা দখল করবে এবং এ প্রক্রিয়ায় পূর্ব পাকিস্তান গ্যারিসন ধ্বংস করে দেবে।

কিন্তু শুরুতেই তাদের হামলা প্রতিহত করা হয়। ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ দিন ভারতীয় বাহিনীকে সীমান্তে ঠেকিয়ে রাখা হয়। এ লজ্জা ঢাকা দেওয়ার জন্য ভারতীয়রা ২১শে নভেম্বর যুদ্ধ। শুরু হওয়ার তারিখ অস্বীকার করছে এবং বলছে যে, ৩রা ডিসেম্বর হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন।
