আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ময়মনসিংহ ও জামালপুর সেক্টর। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
ময়মনসিংহ ও জামালপুর সেক্টর

ময়মনসিংহ-জামালপুর
ময়মনসিংহ ও জামালপুর সেক্টর ছিল ৩৬তম এডহক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জামশেদের কমান্ডে। ব্রিগেডিয়ার কাদির নিয়াজীর নেতৃত্বাধীন ১৩তম এডহক ব্রিগেড ছিল এ সেক্টর রক্ষার দায়িত্বে। ৯৩তম এডহক ব্রিগেড়ে দুটি ব্যাটালিয়ন ছিল। ব্রিগেডিয়ার কাদির নিয়াজী ছিলেন একজন সাহসী কমান্ডার। তার অনুপম নেতত্বের ফলে তার অন্যতম কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন।
এভাবে ভারতের ৯৫তম ও ১৬৭তম মাউন্টেন ব্রিগেডের অগ্রযাত্রা ২২ দিন বিলম্বিত হয়। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা অভিমুখী রুটে নদ-নদীর প্রতিবন্ধকতা ছিল খুবই কম এবং এটাই ছিল ঢাকা পৌঁছার সংক্ষিপ্ততম পথ। ব্রিগেডিয়ার কাদির নিয়াজী ব্যর্থতার পরিচয় দিলে শত্রুরা অনেক আগেই ঢাকার প্রতিরক্ষা লাইনে পৌঁছে যেত।
এ ব্রিগেড মুক্তিবাহিনীর এলাকায় প্রচণ্ড লড়াই করেছে। সেই এলাকায় জনগণ ছিল চরমভাবে বৈরি । প্রতিটি সৈনিকই বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ লড়াই চালায়। দুটি নিয়মিত ব্যাটালিয়ন নিয়ে ৯৩তম এডহক ব্রিগেড গঠন করা হয়। এর একটি ছিল ৩১তম বালুচ এবং অন্যটি ৩৩তম পাঞ্জাব। ৩৩তম পাঞ্জাব ছিল। একটি আধা সামরিক রেজিমেন্ট। এ ব্রিগেডে একটি মর্টার ব্যাটারিও ছিল।
ব্রিগেডিয়ার কাদির প্রায় এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য নিয়ে জামালপুরে ব্রহ্মপুত্রের পেছনে এবং ময়মনসিংহে প্রধান প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তোলেন । তিনি নদীর অপর পাড়ে হাতিবান্দা, শেরপুর ও জামালপুর মেরুতে শত্রুর অগ্রযাত্রা বিলম্বিত এবং তাদের ওপর নজরদারি করার জন্য চৌকি প্রতিষ্ঠা করেন।
মুক্তিবাহিনী এ এলাকায় অত্যন্ত তৎপর ছিল। তারা প্রায়ই জামালপুর ও হাতিবান্দায় আমাদের চৌকির ওপর হামলা চালাতো। লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতানের নেতৃত্বাধীন ৩১তম বালুচ ছিল এ মেরুর নিরাপত্তার দায়িত্বে। অন্যদিকে, কর্নেল রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন ৩৩তম পাঞ্জাব ময়মনসিংহ মেরুর প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়।
হালুয়াঘাট, ফুলপুর, গোবড়াকুড়া, সরিষাপুর, দুর্গাপুর, বিরিসিরি ও পূর্বধলায় শত্রুকে বাধা দানের জন্য অবস্থান তৈরি করা হয়। তবে মূল শক্তি নিয়োগ করা হালুঘাটে। এই এডহক ব্রিগেডে কোনো ট্যাংক, ফিল্ড গান অথবা মাঝারি আর্টিলারিও ছিল না।
আগ্নেয়াস্ত্রের অভাবে প্রতিরক্ষা সম্ভাবনা। উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। উপরোক্ত অবস্থানগুলোর দায়িত্ব ছিল যতক্ষণ সম্ভব ততোক্ষণ শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখা এবং এরপর ঢাকা দুর্গে প্রধান প্রতিরক্ষা লাইনে পিছু হটে আসা ।
ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের লজিস্টিক এরিয়া ১০১ কমিউনিকেশন জোন নিয়ে হামলা চালায়। এ কমিউনিকেশন জোনে ছিল দুটি মাউন্টেন ব্রিগেডের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন এবং মুক্তিবাহিনীর আরেকটি ব্রিগেড।
এ জোনকে ঢাকা দখলে সহায়তা করার লক্ষ্যে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সেক্টরে মোতায়েন আমাদের সৈন্যদের ওপর হামলা করার দায়িত্বও দেওয়া হয়। মেজর জেনারেল গুরবক্স সিং ছিলেন এ কমিউনিকেশন জোনের কমান্ডার।
২১ই নবেম্বর যুদ্ধ শুরু হলে মেজর জেনারেল গুরু সিং ব্যক্তিগতভাবে কামালপুর চৌকি অবরোধে অংশ নেন। কামালপুর চৌকিতে আমাদের এক প্লাটুন নিয়মিত সৈন্য এবং আরো কিছু মুজাহিদ ছিল। এ চৌকির কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের বিপরীতে ছিল মুক্তিবাহিনীর একটি ব্রিগেড | মুক্তিবাহিনীর এ ব্রিগেড আমাদের অবস্থানের ওপর বিরামহীন হামলা চালিয়েছে। একজন ভারতীয় জেনারেলের বিরুদ্ধে আমাদের তরুণ ক্যাপ্টেন আহসান মালিক। লড়াই করেছেন।
৪ঠা ডিসেম্বর প্রত্যুষে কামালপুর পোস্টে পাকিস্তানি কমান্ডার ও তার ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের মধ্যে ওয়ারলেস বার্তা বিনিময় হয় এবং এ বার্তা ভারতীয়দের গোচরীভূত হয়। পোস্ট কমান্ডার সৈন্য প্রত্যাহার করার জন্য অনুমতি চাইছিলেন।
কিন্তু ব্যাটালিয়ন কমান্ডার তার এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। গুরুবক্স সিং এ পোস্টে মনস্তাত্ত্বিক রণকৌশল প্রয়োগ করেন। পাকিস্তানি পোস্টের কাছাকাছি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ‘মিগ-২১’ সাত বার এ চৌকিতে রকেট নিক্ষেপ করে। একই দিন আরো দুই বার বিমান হামলা হয়।
প্রথম হামলার পর গুরুবক্স সিং মুক্তিবাহিনীর একজন বাহকের মাধ্যমে পোস্ট কমান্ডারের কাছে একটি চিরকুট পাঠান। এতে তিনি বলেন, ‘আপনি বিগত কয়েকদিন ধরে সরবরাহ ও গোলা-বারুদ আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। এবং আপনি তাতে সফল হন নি। এসব সরবরাহ আমাদের হাতে পড়েছে।
আপনার পোষ্টের সময় ফুরিয়ে গেছে এবং আপনি যে সিদ্ধান্তই নিন, আমরা কামালপুর চৌকি দখলে বদ্ধপরিকর। অপ্রয়োজনীয় প্রাণহানি এড়ানোর জন্য আপনার কাছে এ বার্তা পাঠানো হচ্ছে। গতকাল থেকে পাকিস্তানের সাথে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমরা আশা করি আপনি অবগত আছেন যে, এ মুহূর্তে আমাদের সৈন্যরা আপনার দক্ষিণে কয়েক মাইল দূরে তৎপরতা চালাচ্ছে।’
পোষ্ট কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান কোনো জবাব দেন নি। মেশিনগান চালিয়ে তিনি যুদ্ধ অব্যাহত রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জেনারেল গুরুবক্স সিং দ্বিতীয়বার বিমান হামলার নির্দেশ দেন। আবার দ্বিপ্রহরে এ পোস্টে বিমান হামলা হয়। গুরুবক্স সিং এবার দ্বিতীয় একটি বার্তা পাঠান। এ বার্তায় তিনি বলেন, ‘আপনি প্রথম বার্তার কোনো জবাব দেন নি।
একটু আগে আপনি আমাদের ওষুধের স্বাদ গ্রহণ করেছেন (পোস্টের ওপর বিমান হামলার প্রতি লক্ষ্য করে এ কথা বলা হয়)। আপনি আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিলে আমি আপনাকে এ নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, একজন সাহসী শত্রুর প্রাপ্য সম্মান আপনাকে দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় বার্তারও কোনো জবাব দেওয়া হয় নি। শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সংকেত হিসেবে বাংকার থেকে মেশিনগান গর্জে ওঠে। এরপর পোস্ট কমান্ডার ও তার কমান্ডিং অফিসারের মধ্যে ওয়ারলেসে আবার কথা হয়। কমান্ডিং অফিসার অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর এবং প্রতিশোধমূলক বিমান হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কোনোটাই বাস্তবায়িত হয় নি।
জেনারেল গুরুবক্স সিং অধৈর্য হয়ে ওঠেন। তিনি বিকেলে আবার এ পোস্টের ওপর বিমান হামলার নির্দেশ দেন। অবশেষে তিনি চূড়ান্ত বার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি বলেন, ‘আপনি আত্মসমর্পণ করবেন কিনা তা অবশ্যই বিকেল ৪টার মধ্যে জানাতে হবে। আমি আপনাকে আর সময় দিতে পারছি না। আপনি আমার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য একজন বার্তাবাহক নিয়ে এলে খুবই ভালো হয়। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে, আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।’
পোর্ট কমান্ডার এ বার্তারও কোনো জবাব দেন নি। তিনি পোস্টে মোতায়েন সকল অস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেন। এতে গুরুবক্স সিং আরো হতাশ হন। তিনি নৈশকালীন হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। এমন সময় পোষ্ট কমান্ডার ক্যাপ্টেন আহসান রাত ৭টায় একটি সাদা পতাকা হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসেন এবং তার সৈন্যসহ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন।
তবে তিনি বলেন যে, তার (গুরুবক্স সিং) চরমপত্রে সাড়া দিয়ে নয়, বরং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তিনি আত্মসমর্পণ করছেন। ক্যাপ্টেন আহসান অবরুদ্ধ অবস্থায় অত্যন্ত সাহসের সাথে লড়াই করেছেন এবং ৭৫ জন নিয়মিত সৈন্য ও মুজাহিদ নিয়ে ২১ দিন পোস্ট অবরোধকারী একটি ব্রিগেডকে মোকাবেলা করার পর আত্মসমর্পণ করেন। ভারতের অব্যাহত গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা সত্ত্বেও এ পোস্টে প্রাণহানির সংখ্যা খুবই নগণ্য।
প্রতিপক্ষরাও এ বালুচ ক্যাপ্টেনের বীরত্বের প্রশংসা করেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শ্যাম মানেকশ তার অনমনীয় ভূমিকার প্রশংসা করে ক্যাপ্টেন আহসানের কাছে ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কামালপুর যুদ্ধবন্দিদের সাহসী সৈনিক হিসেবে প্রাপ্য যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য তিনি ফরমেশন কমান্ডারকে নির্দেশ দেন।’
– বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : সুখবন্ত সিং ভারতীয় ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ক্লার জামালপুরে ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের ওপর হামলা করতে এসে চরমভাবে হতাশ হন। ব্রিগেডিয়ার ক্লারের অধীনে মুক্তিবাহিনীর একটি ব্রিগেড এবং বিএসএফ-এর কয়েকটি ব্যাটালিয়নও ছিল।
তিনি বহু হামলা চালিয়েও আমাদের কোনো একটি অবস্থানের পতন ঘটাতে পারেন নি। ব্রিগেডিয়ার ক্লার ঢাকার দিকে এক ইঞ্চিও অগ্রসর হতে পারেন নি। জামালপুরে ৩১তম বালুচের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল। সুলতান আহমদ ও তার মধ্যেও বার্তা বিনিময়ের চমৎকার ঘটনা ঘটে। সুখৰন্ত সিংয়ের বই থেকে আরেকটি উদ্ধৃতি দেওয়া হলো :
*৯ ডিসেম্বর বিকেল ৫টায় ক্লার জামালপুরে ৩১তম বালুচের কমান্ডিং অফিসারের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিয়ে মুক্তিবাহিনীর একজন কুরিয়ারের মাধ্যমে তার কাছে একটি চিরকুট পাঠান। এ কমান্ডিং অফিসারের সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখলে তার ওপর আরো প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করা হতো।
সন্ধ্যায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান মাহমুদ (আহমদ) এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জবাব দেন। তিনি একটি খামে একটি চীনা বুলেট ভরে পাঠিয়ে দেন। এতে তিনি বলেন, আশা করি আপনি সুস্থ আছেন। চিঠির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আমরা জামালপুরে লড়াই শুরু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। তবে এখনো লড়াই শুরু হয় নি। সুতরাং আলোচনা না করে চলুন আমরা লড়াই শুরু করি। ৪০ বার বিমান হামলা যথেষ্ট নয়। আরো বিমান। হামলা চালাতে বলুন । আপনার কলমে ধার আছে। আশা করি পরবর্তী সময়ে কলমের পরিবর্তে আপনার হাতে একটি স্টেনগান দেখবো।
৯ই ডিসেম্বর মেজর জেনারেল আনসারী আমাকে জানালেন যে, শত্রুর প্যারা ব্রিগেডকে স্থল অভিযান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ছত্রীসেনা। কোথায় অবতরণ করতে পারে, আমি এ নিয়ে দ্রুত চিন্তা করতে লাগলাম।। টাঙ্গাইল ও টঙ্গীকে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বলে মনে হলো। এ দুটি জায়গা। থেকে শত্রু ময়মনসিংহ থেকে ৯৩তম ব্রিগেড প্রত্যাহারের পথ অবরোধ করতে পারে।
টঙ্গী ঢাকার খুব সন্নিকটে হওয়ায় পাকিস্তানি সৈন্যরা এখানে ছত্রীসেনা। অবতরণে বাধা দিতে পারবে। তাই টাঙ্গাইলকে ছত্রীসেনা অবতরণের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য স্থান বলে মনে হতে লাগলো। তাই আমি মেজর জেনারেল জামশেদকে ময়মনসিংহ থেকে ৯৩তম ব্রিগেড প্রত্যাহারের নির্দেশ দিই। আমি অন্যান্য ডিভিশনের কমান্ডারদেরও তাদের মূল অবস্থানে পিছু হটার নির্দেশ দিই। ১০ই ডিসেম্বর বিকেলে টাঙ্গাইলে শত্রুর ছত্রী সৈন্য অবতরণ করেন।
৯/১০ই ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে ব্রিগেডিয়ার কাদিরকে ঢাকায় পিছু হটার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। ৩১তম বালুচ জামালপুর ও কামালপুরে ২১ দিন শত্রুর অগ্রযাত্রা সাফল্যের সাথে প্রতিহত করে। তারা ছিল অবরুদ্ধ। কিন্তু তারা বেয়নেট চার্জ করে শত্রুর অবরোধ ভেঙে তাদের পথ বের করে নেয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাজ্জাকের নেতৃত্বে ৩৩তম পাঞ্জাব বীরত্বের সাথে লড়াই করে এবং এ সেক্টরে শত্রুকে কোণঠাসা করে রাখে। তারা ভয়াবহ লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করা হয়। তা থেকেও তারা রক্ষা পেয়েছে। তারা অত্যন্ত সফলতার সাথে পিছু হটে আসে।
মেজর জেনারেল গুরবক্স সিং আহত হন এবং ১০১ কমিউনিকেশন জোনের কমান্ডার হিসেবে মেজর জেনারেল নাগরা তার স্থলাভিষিক্ত হন। গুরবক্স সিং ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও বাস্তববাদী জেনারেল। অন্যদিকে, নাগরা ছিলেন।
দাম্ভিক ও একজন ড্রয়িংরুম কৌশলবিদ। আমাদের পিছু হটার সময় নাগরার প্রতিটি হামলা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার কাদির প্রতিটি বিলম্বিতকরণ অবস্থানে ভারতীয়দের ২৪ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখেন। কোনো অবস্থায় এবং কখনো ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনী আমাদের ফাঁদে ফেলতে পারে নি।
আমাদের সৈন্যরা প্রতিটি ঘটনায় নিজেদেরকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে এবং শত্রুকে সাবধানে পা ফেলতে বাধ্য করেছে। শত্রুদেরকে ঢাকা এগিয়ে আসার সময়। বিশৃঙ্খল ও নির্জীব হয়ে পড়তে দেখা গেছে।
৯৩তম ব্রিগেড ভালোভাবে ঢাকা পৌঁছে। কিন্তু এর ব্রিগেড সদর দপ্তর ও রক্ষীদল কালুয়ারকারে শত্রুর ছত্রী সেনাদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে যায়।ব্রিগেডিয়ার কাদিরের নেতৃত্বাধীন এই ক্ষুদ্র বাহিনী শত্রুর অগ্রযাত্রা ৪ দিন বিলম্বিত করে। এরপর তারা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে। তাদের কোনো বিশ্রাম ছিল না। গোলাগুলিও ফুরিয়ে যায়। এ অবস্থায় ব্রিগেডিয়ার কাদির যুদ্ধবন্দি হন।
১১ই ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিং তার সৈন্যদের হেলিকপ্টারে করে মেঘনা নদী পার করান। ময়মনসিংহ থেকে পিছু হটা সৈন্যদের পথ রোধ করে দাড়ানোই ছিল সেখানে হেলিকপ্টারে সৈন্য নামানোর লক্ষ্য। এ ছাড়া, ভৈরব সেতুর পশ্চিমাংশ দখল করাও ছিল আরেকটি উদ্দেশ্য।
ভারতীয় সৈন্যরা এসে পৌঁছানোর আগেই ব্রিগেডিয়ার সাদউল্লাহর ব্রিগেড আশুগঞ্জ থেকে ভৈরব বাজারে এসে পৌঁছে এবং অবস্থান গ্রহণ করে। হেলিকপ্টারে করে সৈন্য পরিবহনের সামর্থ্য ছিল জগজিৎ সিং অরোরার তুরুপের ভাস। ময়মনসিংহ থেকে ৯৩তম ব্রিগেডের ঢাকা এবং আশুগঞ্জ থেকে সাদউল্লাহর ব্রিগেড ভৈরব বাজারে পৌঁছার ঘটনায় শত্রুর কৌশল ব্যর্থ হয়ে যায়। শত্রু এ দুটি ব্রিগেডের পথ রোধ করতে ব্যর্থ হয় ।।
ঢাকার আশপাশে মোতায়েন জগজিৎ সিং অরোরার অধিকাংশ সৈন্যই ছিল পদাতিক। তাদের ভারী ট্যাংক ও দূরপাল্লার কামানের ঘাটতি ছিল। তবে ঢাকা দখলে ব্যর্থতার জন্য এটাই একমাত্র কারণ ছিল না। ১২ই ডিসেম্বর জগজিৎ সিং অরোরা ঢাকার আশপাশে মোতায়েন সকল সৈন্যকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংহের কমান্ডে ন্যস্ত করেন।
তাকে ঢাকা দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৯ই ডিসেম্বর জগজিৎ সিং অরোরার এ কাজ করা উচিত ছিল। ছত্রী সেনাদের তিনি তার ব্যক্তিগত কমান্ডে রেখে দেন। নাগরা ছিলেন একটি ডিভিশনের কমান্ডে। তবে হেলিকপ্টারবাহিত সৈন্য ছিল সগৎ সিংয়ের নেতৃত্বে।
একই উদ্দেশ্যে একাধিক কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এভাবে সার্বিক কমান্ডে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। এ জন্য এ অভিযান ইন্সিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। জেনারেল সগৎ প্রস্তুতি গ্রহণ, রেকি এবং সৈন্য ও সম্পদ সংগ্রহে ৭ দিন সময় চান।
মেজর জেনারেল খুশবন্ত সিংয়ের ভাষায় : এ সময় যুদ্ধে ভারতীয়রা আর্টিলারি ও সাঁজোয়া বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট ৪টির বেশি দুর্বল ব্রিগেড প্রস্তুতে সক্ষম ছিল না। ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যূহে আঘাত হানার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সমরসজ্জা গড়ে তোলার জন্য আরো কয়েকদিন লাগতো।
ঢাকার ভেতরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়। অভিজ্ঞ অফিসারদের কমান্ডে পোড় খাওয়া সৈন্যদের এসব প্রতিরক্ষা ব্যূহে মোতায়েন করা হয়। অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে আসা হয় এবং তাদেরকে ঢাকার প্রতিরক্ষা আরো সংহত করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
ভৈরব বাজার, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ- এ তিনটি দুর্গ নিয়ে ঢাকা প্রতিরক্ষা কমপ্লেক্স গঠিত হয়। নারায়ণগঞ্জ দুর্গ ঢাকার পশ্চাৎভাগ রক্ষা করছিল। ঢাকা থেকে দূরে হলেও ভৈরব বাজার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সড়ক রক্ষা করতো। ভারতের চতুর্থ কোরের ঢাকা এগিয়ে আসার সেটাই ছিল মূল পথ। ফরিদপুরের জন্য কুষ্টিয়ার অবস্থানের যে গুরুত্ব ছিল ঢাকার জন্য ভৈরব বাজারের অবস্থান ছিল একই রকম।
বিচ্ছিন্নভাবে এ তিনটি অবস্থানে হামলা করা যেত না। একযোগে হামলা চালাতে হতো। একটি দুর্গে হামলা করা হলে অপর দুটি দুর্গও মোকাবেলা করতে হতো। ঢাকা তখন বিচ্ছিন্ন ছিল না। ঢাকা কমপ্লেক্সকে মোকাবেলা করার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য সংগ্রহ করা জগজিৎ সিং অরোরার পক্ষে দুরূহ হয়ে উঠত।
কামালপুরে একটি মিশ্র কোম্পানি ২১ দিন শত্রুর দুই ব্রিগেড সৈন্যকে আটকে রেখেছিল। হিলিতে আমাদের মাত্র একটি ব্যাটালিয়ন ভারতের ৫টি পদাতিক ও একটি ট্যাংক ব্রিগেড নিয়ে গঠিত একটি পুরো ডিভিশনকে ঠেকিয়ে রেখেছিল।
বিপুল পরিমাণ গোলা-বারুদ সত্ত্বেও ভারতীয়রা হিলি দখল করতে পারে নি আমাদের সৈন্যরা ১৯ দিন হিলি দখলে রেখেছিল এবং ভারতীয় অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে এসেছিল। জামালপুর, আশুগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও দৌলতপুরেও একই ঘটনা ঘটেছিল। ঢাকা দুর্গে আমাদের সৈন্য ছিল ৩১ হাজারের বেশি। বিরাজিত পরিস্থিতিতে ঢাকা প্রতিরক্ষা কমপ্লেক্স ছিল দুর্ভেদ্য।
ভারতীয়দের নিজেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১২টি ডিভিশনের মধ্যে মাত্র তাদের ৪টি দুর্বল ব্রিগেড ঢাকা আক্রমণের জন্য তখন প্রস্তুত ছিল। ঢাকার মতো একটি সুরক্ষিত এলাকা যেখানে আমার ৩১ হাজার সৈন্য ছিল এবং ব্যক্তিগতভাবে যেখানে আমি সৈন্য পরিচালনা করছিলাম, সেখানে ঐ পরিমাণ শক্তি নিয়ে তারা কি ঢাকা দখল করতে পারতো? না, কখনো না। সামরিক বিবেচনায় আমরা ভারতের ১২টি ডিভিশনকে মোকাবেলা এবং এসব ডিভিশনকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে সক্ষম হই।
যশোর ও ময়মনসিংহ (যেখান থেকে আমরা সৈন্য প্রত্যাহার করেছিলাম) এ ছাড়া সকল বড়ো শহর এবং চট্টগ্রাম ও চালনাসহ সকল সমুদ্র বন্দর ও বিমানক্ষেত্র ছিল তখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু একটি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পাকিস্তান ভেঙে দেওয়া হয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গৌরব ধূলিস্যাৎ ও ইন্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার ও সৈন্যদের পরিত্যাগ করা হয়। আমাদেরকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে অসম্মানিত করা হয়। আমরা পরাজিত হই নি। আমাদেরকে পরিত্যাগ এবং আমাদের সাথে প্রতারণা করা হয়।
পাকিস্তানের সংহতি রক্ষায় যারা শহিদ হয়েছেন তাদের রক্তের জন্য দায়ী কে? আমরা আমানত হিসেবে শহিদদের দাফন করেছি। তাদের দেহাবশেষ পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনা উচিত। স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে সম্মান প্রদর্শন করা উচিত ঐসব শহিদদের প্রতি; যারা পাকিস্তান ভেঙেছে তাদের প্রতি নয়।
আমেরিকানরা যদি ভিয়েতনামে তাদের সৈন্যদের লাশ খুঁজে দেশে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে আমাদের সরকারের পক্ষেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে আমাদের সৈন্যদের লাশ নিয়ে আসা সম্ভব। কারণ, পাকিস্তান সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের ভালো সম্পর্ক রয়েছে।
কোনো সৈন্যের বীরত্বে মুগ্ধ হলে শত্রুর যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ সৈন্য অংশগ্রহণ করেছিল এবং এবং এ যুদ্ধ ৬ বছর স্থায়ী হয়। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে শত্রুপক্ষের সৈন্যকে সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করার ঘটনা ঘটেছে মাত্র একটি।
এ ভাগ্যবান ব্যক্তি হচ্ছেন একজন ব্রিটিশ সার্জেন্ট। এ সার্জেন্টকে ওয়েস্টার্ন ডেজার্টে জার্মান সৈন্যাধ্যক্ষ ফিল্ড মার্শাল রোমেলকে হত্যা করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি এতো চমৎকারভাবে এবং এতো সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছিলেন যে, রোমেল স্বয়ং তাকে সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করার নির্দেশ দেন।
- অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানে আমার অধীনে ছিল মাত্র ৪৫ হাজার নিয়মিত ও আধা-সামরিক সৈন্য। পূর্ব পাকিস্তানে ২৬ দিনের প্রকাশ্য যুদ্ধকালে ভারতীয়রা ৪ জন পাকিস্তানি সৈনাকে সামরিক মর্যাদায় দাফন করেছিল। আমার মতে, আর কোনো সেনাবাহিনী এ ধরনের সম্মান পায় নি। নিম্নোক্ত সৈন্যদের সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়:
- ১৬তম ডিভিশনে বগুড়া সেক্টরে ২৪তম ক্যাভালরির নায়েক সারোয়ার। একজন ভারতীয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্রিগেডিয়ার তাজাম্মুল হোসেনের সামনে মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহর কাছে নায়েক সারোয়ারের বীরত্বের কাহিনী ব্যক্ত করেন। ওই ভারতীয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল বগুড়া সেক্টরে একটি গার্ড ব্যাটালিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
- এবং (৩) ৩১তম বালুচের মেজর আইউব এবং পশ্চিম পাকিস্তানি রেঞ্জার্সের নায়েক আবদুল সাত্তারকে ময়মনসিংহ সেক্টরে ভারতীয়রা সামরিক মর্যাদায় দাফন করে। ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার ক্লার (পরে মেজর জেনারেল) ব্রিগেডিয়ার কাদির নিয়াজীর কাছে কর্তব্যের প্রতি তাদের নিষ্ঠা ও সাহসিকতার বর্ণনা দেন। ১০১তম কমিউনিকেশন জোনের জিওসি মেজর জেনারেল নাগরাও এ ঘটনা স্বীকার করেছেন।
- মাসলিয়ায় এক হামলায় ৩৮তম এফ এফ (১০৭তম ব্রিগেড, ৯ম ডিভিশন)। এর মেজর আনিস নিহত হন। ভারতীয় ৯ম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল দলবীর সিং মেজর আনিসকে সামরিক মর্যাদায় দাফন করেন। এবং তিনি নিজে ফাতেহা পাঠ করেন।”

হুকাম দাদের বীরত্বের উপাখ্যান এর আগে বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকে ‘নিশান-ই-হায়দার’ পদক পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তাদেরকে এ সম্মান দেওয়া হয় নি। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব ও আত্মত্যাগ বলতে কী বুঝায়, তা অনেকেই জানে না। আমাদের ভাগ্য ঐসব সুবিধাবাদীদের কাছে জিম্মি ছিল যারা ক্ষমতা দখল অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার তীব্র লড়াইয়ে জড়িত ছিল।
