আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ রংপুর,হিলি,বগুড়া ও রাজশাহী সেক্টর। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
রংপুর,হিলি,বগুড়া ও রাজশাহী সেক্টর

রংপুর,হিলি,বগুড়া ও রাজশাহী সেক্টর
বাংলার উত্তরের এই এলাকা দেশের শস্য বহুল অঞ্চল বরাবর প্রসারিত। ভূমি অনেকটা পাঞ্জাবের মতো। ট্যাংক ও ভ্রাম্যমাণ যুদ্ধের জন্য উত্তম। জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এখানে ৩৩তম কোর মোতায়েন করেন। এই কোরে ছিল।
দুটি ডিভিশন, একটি স্বতন্ত্র ব্রিগেড, মুক্তিবাহিনীর আরো ৩টি ব্রিগেড, একটি সাঁজোয়া রেজিমেন্ট ও বেশ কয়েকটি বিএসএফ ব্যাটালিয়ন। জেনালের জগজিৎ সিং অরোরা হিলিতে বড়ো ধরনের হামলা করার পরিবর্তে দিনাজপুর-রংপুরে ৬ মাউন্টেন ডিভিশন মোতায়েন করেন। এখানে আমাদের একটি ব্রিগেড এ ডিভিশনকে আটকে রাখে।
জগজিৎ সিং অরোরা যেখানে একটি ডিভিশন মোতায়েন করেছিলেন সেখানে তিনি বিএসএফ ও মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় কয়েক ব্যাটালিয়ন সৈন্য মোতায়েন করলেই পারতেন। তিনি সাঁজোয়া বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ সমর্থনে আমাদের ২০৫তম ব্রিগেডের বিরুদ্ধে দুটি ডিভিশন নিয়ে ব্যাপক হামলা চালালে হিলিতে আমরা ১৯ দিন টিকে থাকতে পারতাম না।
আমি ৭ দিনের মাথায় সীমান্ত থেকে ৪০ মাইল দূরে বগুড়ায় সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বিবেচনা করেছিলাম। ২০৫তম ব্রিগেডের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করে উত্তরে শত্রুর ট্যাংক হামলা সাফল্যের সাথে প্রতিহত করা হয়।
১৬তম ডিভিশনের সৈন্যরা শত্রুর অথযাত্রায় বিলম্ব ঘটানোর প্রচেষ্টায় সফল হয় এবং যুদ্ধ শুরুর ২৫ দিন পর ১৫ই ডিসেম্বর শত্রুরা বগুড়ায় আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান অবধি পৌঁছতে সক্ষম হয়। ভারতের ৩৩তম কোরের অগ্রযাত্রার গড় হার ছিল দৈনিক দুই মাইলেরও কম।
ভারতীয়রা এটাকে ‘বজ্র অভিযান’ বলে আখ্যায়িত করছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না যে, সিরাজগঞ্জ ও বাহাদুরাবাদ ঘাট (ঢাকা পৌঁছার প্রধান ফেরি স্টেশন ও রেল জংশন) ভারতীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া সত্ত্বেও জগজিৎ সিং অরোরা অথবা থাপন কেন ঢাকা এগিয়ে এলেন না। তারা হিলি, বগুড়া, দিনাজপুর ও সৈয়দপুর দখল করে কি লক্ষ্য অর্জন করতে পারতেন?
তাদের তৎপরতার ফলে উত্তর দিকে ২০তম ডিভিশনের পার্শ্বদেশ উন্মোচিত হয়ে পড়ে এবং ততটুকু পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের যোগাযোগ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমি এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য ও সিএএফ-এর সাহায্যে ভারতের ৬ মাউন্টেন ডিভিশনকে বাধা দান ব্রিগেডের সাহায্যে হামলা চালানোর একটি পরিকল্পনা তৈরির জন্য আমার স্টাফকে নির্দেশ দিয়েছিলাম।
স্থির করা হয় যে, ১০৭তম ব্রিগেড ভারতের ২০তম ডিভিশনের পশ্চাৎভাগে হামলা চালাবে এবং সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করবে। আমি নিশ্চিত যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ৯ম ডিভিশন থেকে ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুরের ব্রিগেড এসে পৌঁছলে জেনারেল নজর ভারতের ২০তম ডিভিশনের এক বিরাট অংশ ধ্বংস করে দিতে পারতেন।
ভারতীয় পত্র-পত্রিকাগুলো জেনারেল থাপনের তীব্র সমালোচনা করেছে। তার পদোন্নতি ঘটার পরিবর্তে পদাবনতি ঘটে।অনুকূল ভূখণ্ড ও সকল লজিষ্টিক সহায়তা পেয়েও এই সেক্টরে ভারতীয় সেনাবাহিনী ব্যর্থ হয় । এ জন্য দায়ী তাদের ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা, অদক্ষ নেতৃত্ব, অদূরদর্শিতা, অনমনীয়তা ও সতর্ক পদক্ষেপ।
এতে তাদের অযোগ্যতা, কৌশলগত ও সামরিক জ্ঞানের অভাব এবং এগিয়ে না আসার ইচ্ছাই প্রমাণিত হচ্ছে। জগজিৎ সিং অরোরা তার সমরাস্ত্র ও ফেরিগুলো ব্যবহারে ব্যর্থ হন। তিনি ফেরিগুলোকে সিরাজগঞ্জ ঘাটে নিয়ে আসতে পারতেন। নদী ব্যাপক প্রশস্ত হওয়ায় সেতু নির্মাণ সম্ভব ছিল না।
বিমান বাহিনীতে শ্রেষ্ঠত্ব, বিমান অথবা হেলিকপ্টারে নদী পারাপারের সামর্থ্য এবং স্থানীয় জনগণের সমর্থন থাকায় ভারতীয়রা কয়েক দিনের মধ্যেই যমুনা নদী পার হতে পারতো। তারা আমাকে ময়মনসিংহ থেকে পিছু হটতে বাধ্য এবং ঢাকা সেক্টরে টাঙ্গাইল এবং রাজশাহী সেক্টরে বেড়া-পাবনা দখল করতে পারতো।
জেনারেল নজরের বাহিনীকে পরাজিত অথবা এড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টায় তারা তাদের শক্তি কেন্দ্রীভূত করলে ভারতীয়রা ঢাকার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করতে পারতো এবং ঢাকা অভিমুখী তাদের অগ্রযাত্রা নিষ্কণ্টক করতে নজরকে বেড়া পাবনা লাইনে অবস্থান গ্রহণে বাধ্য করতে পারতো।
জেনারেল নজরের সৈন্যরা সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও ভারতীয়দের অভিপ্রায় নস্যাৎ করে দেয় এবং তাদেরকে বিপর্যস্ত করতে সক্ষম হয়। একজন দক্ষ জেনারেল অবশ্যই আমাদের সৈন্যদের পর্যুদস্ত করে এগিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু জগজিৎ সিং অরোরা আমাদের হাতে নাস্তানাবুদ হওয়ার ভয়ে তিনি আমাদের দুর্গের মোকাবেলা করতে সাহস পান নি।

তার নিশ্চিত পরাজয়কে বিজয়ের শিরোপা পরিয়ে দেওয়ার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো, ইয়াহিয়া খান ও ভারতীয় অপপ্রচারের কাছে জগজিৎ সিং অরোরার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। নয়তো এ সেক্টরে তার বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে জগজিৎ সিং অরোরা ও থাপনের কার্যকলাপ খুবই নিম্নমানের।
