আটক বাঙালি অফিসারের ভয়ঙ্কর প্রহরগুলো | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

আটক বাঙালি অফিসারের ভয়ঙ্কর প্রহরগুলো – ২৫ মার্চ রাতে, দবিরের বেশ মনে আছে, তিনি এবং ৫৩তম ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের অপর দুই বাঙালি অফিসার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তাঁরা শুনতে পান ঘরের ভেতর তলব করা পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসারদের উদ্দেশে কমাণ্ডার বলছে:

‘তোমরা সবাই এখন কুমিল্লা যাবে এবং আমি দেখতে চাই সকালের মধ্যে গোটা কুমিল্লা লাশে ভরে গেছে। যদি কোনো অফিসার এ কাজ করতে ইতস্তত ভাব দেখায় তবে তার জন্য আমার অন্তরে করুণার লেশমাত্র থাকবে না।’

দবির জানিয়েছেন, পাঁচদিন গৃহবন্দী করে রাখার পর ৩০ মার্চ শেষ বিকেলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাঁকে ও দুই বাঙালি অফিসারকে হত্যা করার জন্য তাদের এক অফিসারকে পাঠায়। আহত দবির মৃত্যুর ভাণ করে পড়ে থেকে পরে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিনি এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন।

 

আটক বাঙালি অফিসারের ভয়ঙ্কর প্রহরগুলো | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

আটক বাঙালি অফিসারের ভয়ঙ্কর প্রহরগুলো

আপন সহকর্মীদের খুন

দবিরের অভিজ্ঞতা কোনো ব্যতিক্রমী কিছু নয়। পূর্ব পাকিস্তান-ত্যাগী বিদেশী ব্যক্তিবর্গ এবং বাঙালি সৈনিক ও উদ্বাস্তুদের মতে, গোটা পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা আন্দোলনকে সামরিক নেতৃত্বহারা করার লক্ষ্যে পাকবাহিনী ইউনিফর্ম পরিহিত তাদের বাঙালি সহকর্মীদের হত্যা করছে।

সৈনিক-আচরণবিধির এই লঙ্ঘন- যাদের সাথে মিলে একদা লড়াই করেছে আজ তাদেরই হত্যা করছে অফিসার ও জওয়ানরা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সংঘর্ষের আরেক মাত্রা, পাঞ্জাবি ও পাঠান পশ্চিম পাকিস্তানিরা ৭৫ মিলিয়ন পূর্ব পাকিস্তানির প্রতি যে তীব্র জাতিগত ঘৃণা অনুভব করে তার স্বরূপ।

বাঙালি সৈনিক নিধন শুরু হয়েছে সেই একই রাত্রিতে যখন স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে পাকবাহিনীর অভিযান শুরু হলো। দবির, ২০ বছর বয়স্ক অবিবাহিত হালকা-পাতলা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট, পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের এক ঘাঁটিতে বর্তমান সংবাদদাতার কাছে সেই রাত ও তাঁর পরবর্তী দিনগুলোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন। দবির তাঁর আসল নাম নয়—তিনি ছদ্মনাম গ্রহণ করেছেন এই বিবেচনা থেকে যে, তাঁর বাবা-মা, ভাই ও তিন বোন-ওরা হয়তো এখনো বেঁচে রয়েছে।

 

মৃদু নিরুত্তাপ কণ্ঠে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন:

পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসাররা কমান্ডারের দপ্তর থেকে বের হয়ে অস্ত্রাগারের দিকে চলে যায় তাদের অস্ত্রশস্ত্র বুঝে নিতে। নিরস্ত্র তিন বাঙালি অফিসারকে ডেকে নিয়ে কার্যত তাদের গৃহবন্দী করা হয়, যদিও কম্যান্ডার জানান, তাঁদের দাপ্তরিক কাজ দেওয়া হয়েছে। কম্যান্ডারের ঘরের পাশে আটক অবস্থায় সেই রাতে দবির কিছুতেই ঘুমুতে পারছিলেন না।

রাত একটার দিকে সামনের চত্বর থেকে সাত-আটটা গুলির শব্দ পাওয়া গেল। পরের তিনদিন দবির ও তাঁর দুই সঙ্গী, উভয়েই ক্যাপ্টেন, কড়া পাহারায় থেকে কাগজপত্র নাড়াচাড়া ও মাঝেমধ্যে টেলিফোনে জবাব দিয়ে কাটালেন। দূর থেকে ভেসে আসা মেশিনগান, হালকা অস্ত্র ও কামানের গোলার শব্দ তাঁরা পাচ্ছিলেন।

জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন রেজিমেন্টের ৬০ জন বাঙালি সৈন্যকে দু’হাত ওপরে তুলিয়ে একটি ভবনের পেছনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর শোনা গেল একটানা গুলির শব্দ, বোঝা গেল সব বাঙালিকেই মেরে ফেলা হয়েছে।

২৯ মার্চ সবরকম বাহানা ঝেড়ে ফেলে তিনজন অফিসারকে একটি ঘরে তালাবন্দী করা হলো। তাঁদের রাত কাটলো ভয়ে ভয়ে। ৩০ তারিখ বিকেলে এক পশ্চিম পাকিস্তানি অফিসার দরজার কাছে এসে সাব-মেশিনগানের বাঁট দিয়ে কাচ ভেঙে খানখান করলো। একজন বাঙালি অফিসার তার সামনে লুটিয়ে প্রাণভিক্ষা চাইলো। জবাব হিসেবে গুলি ছুটলো এক পশলা। পশ্চিম পাকিস্তানিটি এরপর অপর ক্যাপ্টেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালালো।

দবির নিজেকে দরজার পাশের দেয়ালে সেঁটে রেখেছিল। তালাবদ্ধ দরজা খুলতে ব্যর্থ হয়ে গালমন্দ করতে করতে চাবি আনতে ফিরে গেল পশ্চিম পাকিস্তানিটি। দবির লোহার খাটের নিচে শুয়ে দু’হাতে মাথা ঢেকে রাখলো। লোকটি আবার ফিরে এলো। দবির আমাকে জানালো, ‘আমি চিৎকার করে উঠলাম। লোকটি গুলি ছুঁড়লো। আমি বুঝতে পারলাম একটা বুলেট আমাকে আঘাত করেছে। আমি এমন শব্দ করলাম যেন মরে যাচ্ছি। আমি মরে গেছি মনে করে লোকটি গুলি ছোঁড়া বন্ধ করে চলে গেল।’

 

আটক বাঙালি অফিসারের ভয়ঙ্কর প্রহরগুলো | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

লাথি মেরে, খুঁচিয়ে

একটি বুলেট লেগেছিল দবিরের ডান কব্জিতে, আরেকটি চিবুক ঘষটে চলে গেছে, তৃতীয় একটি শার্টের পেছন দিক ফুটো করে গেছে। তিনজনই যে মারা গেছে সেটা নিশ্চিত বুঝে নিতে যখন অন্য অফিসাররা এলো, দবির তখন কজি বেয়ে-পড়া রক্ত সারা মুখে লেপ্টে দম বন্ধ করে মড়ার মতো পড়ে রইলো।

পশ্চিম পাকিস্তানিরা লাথি মেরে, খুঁচিয়ে সব দেখে নিশ্চিত হলো। পরের দু’আড়াই ঘণ্টা ধরে সৈন্যরা দলে দলে এই দৃশ্য দেখতে আসে। এক পাঞ্জাবি সার্জেন্ট এসে দুই ক্যাপ্টেনের দেহে সজোরে লাথি লাগায়। প্রতিবারই দবির মরণপণ করে দম আটকে রাখে। ‘সময় বয়ে চলে,’ দবির কাহিনী বর্ণনা করে যায়, ‘একসময় রক্ত শুকিয়ে আসে এবং ঘাড়ের ওপর মাছি ভনভন করতে থাকে। ঘরের ভেতর পচা দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।’

সাত ঘণ্টা পর দবির উঠে চারদিক দেখে জানালা দিয়ে চারফুট নিচে লাফিয়ে পড়ে। একজন সেন্ট্রি শব্দ পেয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। কিন্তু অন্ধকারে সঠিক নিশানা করা সম্ভব ছিল না। চত্বরের আশপাশের অন্যান্য সৈন্যও গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। কিন্তু দবির সন্তর্পণে শেষ পাহারা চৌকিটিও পার হয়ে গেল। ধানখেতের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে, একটা ছোট নদী সাঁতরে দবির পালাতে সক্ষম হলেন। পরদিন গ্রামের এক ডাক্তার কজির বুলেট বের করে ভালোভাবে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।

দবিরের চেহারা বালকসুলভ, ওজন মাত্র ১২০ পাউন্ড, কিন্তু এখন তাঁকে দেখলে মনে হবে পশ্চিম পাকিস্তানের কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে তাঁর ক্লাসে চতুর্থ হয়ে পাস করার তিন মাসের মধ্যেই তিনি পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি তাঁর ঘৃণা প্রবল হলেও অনিয়ন্ত্রিত নয়। তিনি বললেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই তারা আমাদের হত্যা করেছে, আমাদের বাধ্য করেছে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে।’

Leave a Comment