অজ্ঞতা বিরোধী

অজ্ঞতা বিরোধী – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “আকবর” বিষয়ের “মহান দ্রষ্টা” বিভাগের একটি পাঠ। আমাদের দেশবাসী শত শত বছর ধরে কূপমণ্ডুক হয়েছিল । এতে কোনো সন্দেহ নেই যে হিন্দু যতটা কূপমণ্ডুক ছিল, মুসলমান তত ছিল না। তারা হজ করতে মক্কা যেত, ইরান- তুরান ইত্যাদি দেশও ভ্রমণ করে আসত । কিন্তু নিন্দনীয় ব্যাপার হলেও হিন্দু ব্যবসা- বাণিজ্য বা অন্য কোনো কার্যব্যপদেশে বাইরে যেত ঠিকই, কিন্তু সেই যাত্রাকে তারা আর কোনো কাজে ব্যবহার করত না।

অজ্ঞতা বিরোধী

 

আকবর দেখেছিলেন, ভারত ও ইসলামী দেশগুলির বাইরেও বিশাল জগৎ রয়েছে। কেবল চীন নয়, ইউরোপীয় দেশগুলির কথাও জানতেন তিনি। কত ইউরোপীয় দাস তখন ভারতের বাজারে বিক্রি হতো। আগে বলেছি, মাতার আপত্তি সত্ত্বেও আকবর অনেক রুশ দাস-দাসীকে মুক্ত করে পোর্তুগিজ পাদরীদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পোর্তুগিজ পাদরী ও অন্যান্য ইউরোপীয় পর্যটকদের তিনি তাঁদের দেশ সম্পর্কে নানা কথা জিজ্ঞেস করতেন। তিনি বিভিন্ন ইউরোপীয় রাজসভায় দূতমণ্ডলী প্রেরণ করার চেষ্টা করেছিলেন, সে-কথাও আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

উন্নয়নের পথের সকল কাঁটা দূর করে দিয়েছিলেন তিনি। তখন বিধি-বিধানের বন্ধন আর প্রতিবন্ধকতা যখন পথিকদের রওনা হওয়ার সময় এল, তখনই চোখ বন্ধ করলেন তিনি। তাঁর তৈরি করতে পারত না, প্রতিবন্ধকতা করতে পারত না রক্ষণশীলতাও। কিন্তু সেই পথে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কারো সে বুদ্ধি ও দূরদর্শিতা ছিল না যিনি আকবরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। জাহাঙ্গির সুরাসক্ত ছিলেন।

তিনি পিতার সাফল্যগুলিকে লিপে-মুছে দেন। শাহজাহানও মামুলি বাদশাহ ছিলেন, পিতামহকে অনুসরণ করার বদলে তিনি গতানুগতিকতাই পছন্দ করতেন। শাহজাহানের পুত্র দারাশিকোহ কেবল আকবরের হৃদয়ই লাভ করেছিলেন, মস্তিষ্ক নয়। তিনি সন্ত ও পণ্ডিত হতে পারতেন, শাসক নন।

যদি তিনি ঔরঙ্গজেবের প্রয়াস ব্যর্থ করে সিংহাসনে বসার সুযোগ লাভ করতেন, তাহলেও তিনি বড় জোর হিন্দুদের সন্তোষ বিধান ব্যতীত বেশি কিছু করতে পারতেন না, কেননা সঙ্কট মুহূর্তে কখনোই আকবরের মতো দৃঢ়তা দেখানোর সামর্থ্য ছিল না তাঁর। ঔরঙ্গজেব তো আকবরের সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যকেও ধ্বংস করেন, রাষ্ট্র নির্মাণে আকবরের সাফল্যের যেটুকু বা অবশেষে থেকে গিয়েছিল, তাও নিশ্চিহ্ন করে দেন তিনি ।

মীনাবাজার— মীনাবাজারের ব্যাপারেও আকবরের সদুদ্দেশ্যকে আক্রমণ করতে দ্বিধাবোধ করেনি রক্ষণশীল হিন্দু। ‘আইনে-আকবরী’ থেকে জানা যায়, প্রত্যেক মাসের তৃতীয় দিনে আগরা দুর্গে মহিলাদের জন্য একটি বাজার বসত, যাকে বলা হতো মীনাবাজার ।

আকবর চেয়েছিলেন, ফিরিঙ্গিদের মতো আমাদের দেশেও একজন পুরুষের একজনই পত্নী হোক । আইন প্রণয়ন করে বহুবিবাহ বন্ধ করা তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল । তিনি ফিরিঙ্গি নারীদের কথা শুনে ভেবেছিলেন, আমাদের নারীরাও স্বাধীন হোক ।

 

আর তাছাড়া নিজের শাসনকালে দুর্গাবতী ও চাঁদবিবির মতো বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে তাঁকে লড়তে হয়েছিল। সেজন্য সেই প্রচ্ছন্ন ও বিফল হয়ে যাওয়া শক্তিকে উপরে তুলে আনতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর অভিপ্রায় ছিল, অন্তঃপুর ও হারেমের ভিতর শ্বাসরূদ্ধ হয়ে থাকা মহিলারা কম-সে-কম মাসে একবার একটি জায়গায় খোলাখুলি মেলামেশা করুক।

মীনাবাজারে তাঁর নিজের প্রাসাদের বেগম-কন্যা-বধূরা, আমির ও রাজাদের পরিবারের মহিলারা আসতেন । মহিলাদের উপযোগী নানা ধরনের ভালো ভালো জিনিসপত্র বাজারে বিক্রি হতো। দোকানগুলো চালাত কেবল মহিলারাই। মহিলারাই পাহারাদারি করত। ফুল-বিক্রেতা মালী নয়, মালিনী থাকত । মহিলা-বাজারের দিনটিকে খুশরোজ (সুদিন) বলা হতো, যথার্থই তা খুশরোজ ছিল ।

বাদশাহ ও অন্যান্য আমিররাও কখনো কখনো এসে মীনাবাজারে ঘুরতেন । আর তাই নিয়েই পরে বলা শুরু হল যে তাঁরা লোকের বউ-ঝিদের দেখতে আসেন। অত্যন্ত তরুণ বয়স বাদ দিলে আকবর কখনও অসংযমের পরিচয় দেননি। তরুণ বয়সে সে-কারণে তাঁকে তীরবিদ্ধ হতে হয়েছিল। তার মানে এই নয় যে তাঁর হারেমে শথ শথ সুন্দরী ছিল না। কিন্তু সে-সময় তো সেই সুন্দরীরা বৈধ বলেই গণ্য হতো। ষোলো হাজার রানী রেখে হিন্দু রাজাও পরম ধর্মাত্মা বলে স্বীকৃত হতেন । আক-বরের হারেমে সুন্দরীদের সংখ্যা অত ছিল না।

নিজের বেগম, ভগ্নী, কন্যারা এসে পাশে বসলে আক-বর খুব খুশি হতেন। আমির-পত্নীরা এসে সালাম করতেন, উপহার দিতেন, তাঁদের শিশুদের তাঁর সামনে নিয়ে আসতেন । নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বিবাহ স্থির করার ব্যাপারেও আক-বর খুব আগ্রহ বোধ করতেন এবং তাকে খরচও করতেন। মীনাবাজরে যুবক-যুবতীরা কখনো কখনো প্রেমেও পড়ত। সেখানেই জৈন খাঁ কুকার কন্যার প্রেমে পড়েন সলীম। কন্যাটি অবিবাহিতা ছিল । আক-বর জানতে পেরে নিজে তাঁদের বিবাহ দিয়ে দেন।

আক-বর যার সূচনা করেছিলেন, সেটাকে আজ আমাদের দেশের শিক্ষিত তরুণ- তরুণীরা সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে প্রকাশ্যে তাদের ব্যবহারিক জীবনে স্বীকার করে নিচ্ছে। ধর্মের নামে মুসলিম মহিলাদের বোঝা-স্বরূপ পরদা প্রথা ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানেও ভেঙে পড়ছে। সেদিন যখন পাকিস্তানের সংসদে মুসলিম মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে করমর্দন করলেন, তখন মোল্লারা রাগে জ্বলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ইসলামী পাকিস্তান মোল্লাদের রাজ পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না, সে-দিন চলে গেছে।

 

আক-বর দাস-প্রথার বিরোধী ছিলেন । তিনি তাঁর দাসদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন, সে- কথা আমরা ইতিপূর্বে বলেছি। দাড়ির সঙ্গে রক্ষণশীলতা সেঁটে ছিল, সেজন্য তিনি দাড়ির শত্রু ছিলেন । নিজে এবং তাঁর শাহজাদারা দাড়ি রাখতেন না ।

জাহাঙ্গির সারা জীবনই দাড়ি রাখেননি । তবে হ্যাঁ, শাহজাহানের সময় ও তাঁর পরে দীর্ঘ শাশ্রু রাখার রেওয়াজ চালু হয়ে গিয়েছিল । আক-বরের দেখাদেখি হাজার হাজার লোক দাড়ি কামিয়ে ফেলে । প্রিয়জন বা আত্মীয়ের মৃত্যুতে মস্তক-মুণ্ডনের সময় শ্মশ্রু-মুণ্ডনও অপরিহার্য ছিল, আর এইরকম এক- একটিা মওকায় হাজার হাজার নতুন দাড়ি সাফ হয়ে যেত ।

 

 

Leave a Comment