আকবরের সাহিত্য – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “আকবর” বিষয়ের “শিল্প ও সাহিত্য” বিভাগের একটি পাঠ। সুরদাস ও তুলসীদাস আকবরের কালেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যদিও এই দুই মহান কবি কখনও দরবারের আশ্রয় গ্রহণ করেননি । রহীম তুলসীদাসের পরিচিত ও বন্ধু ছিলেন, তথাপি তুলসীদাসের কৃতিত্ব কেন আকবরের গোচরীভূত হয়নি তা বোধগম্য হয় না। গোস্বামীজী আকবরের সমবয়স্ক ছিলেন এবং আকবরের মৃত্যুর পরেও সিকি শতাব্দী জীবিত ছিলেন ।
আকবরের সাহিত্য
তাঁর জন্য আকবরী দরবার কোনো কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না ঠিকই, তবে আকবরের আমলেই ভারতের এই মহান প্রতিভার উদ্ভব হয়েছিল, সে-কথা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কথিত আছে, আকবরের পুত্র দানিয়াল হিন্দীতে কবিতা রচনা করতেন, কিন্তু তাঁর কবিতার কোনো নিদর্শন আমাদের নিকটে নেই।
আকবরী দরবারের রহীমই এমন এক রত্ন, যাঁকে হিন্দীর শ্রেষ্ঠ কবি বলে স্বীকার করা হয় । তাঁর কবিতার কিছু নমুন আর আমরা পূর্বে পেশ করেছি। আকবর কখনো কখনো হিন্দীতে দ্বিপদী আওড়াতেন, কিন্তু প্রামাণ্য হিসেবে তার কোনো সংগ্রহ নেই। আকবরের উদ্যোগে মৌলিক ও অনুবাদ আকারে যেসব সাহিত্য রচিত হয়েছিল, সে-বিষয়ে আলোচনার আগে আরও একটি কথা উল্লেখ করতে চাই।
আকবরের জানা ছিল, টাইপ-ওয়ালা প্রেসে পুস্তক ছাপানো যেতে পারে। পোর্তুগিজ পাদরীরা সুন্দর ছাপানো পুস্তক বাইবেল আকবরকে উপহার দিয়েছিলেন । গোয়ায় টাইপ-ওয়ালা প্রেস স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল, তাতে পুস্তক ছাপানো হতো ।
এই সব টাইপ দেখে আরবি বা হিন্দী টাইপ ঢালাই করা কঠিন ছিল না, কিন্তু আমাদের এখনকার সময়ের মতো সে-সময় মুদ্রণশিল্পের কদর ছিল না। ভালো লিপিকরের লেখা পুস্তককে বেশি মর্যাদা দেওয়া হতো। প্রেস ব্যবহার করতে না চাওয়ার কারণ এই নয় যে মুদ্রণশিল্প ব্যবহারের ফলে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ত । যদি শিক্ষা সর্বজনীন হতো, তাহলে প্রেসের গুরুত্ব অবশ্যই উপলব্ধিতে আসত, কিন্তু তখনও সেই সময় আসতে অনেক বিলম্ব ছিল।
আকবরের উদ্যোগে রচিত ফৈজী ও আবুল ফজলের রচনাবলী মৌলিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতদ্ব্যতীত বহু সংস্কৃত পুস্তকের অনুবাদ করিয়েছিলেন আকবর। ভারতের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সম্পদকে তৎকালীন রাজভাষা ফারসিতে অনুবাদের ব্যবস্থা করে শিক্ষিত সমাজের কাছে সুলভ করে তোলা আকবরেরই কাজ ছিল। অনুবাদ করার জন্য চমৎকার পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল । সংস্কৃতের কোনো পণ্ডিতকে মূল পুস্তকের শব্দার্থ ও ভাবার্থ বলার জন্য নিযুক্ত করা হতো, ফারসির কোনো পণ্ডিত তা ফারসি ভাষায় লিখে যেতেন।
আকবর ‘মহাভারতে’র অনুবাদ নিজেই করতে চেয়েছিলেন, পূর্বে তা উল্লেখ করা হয়েছে। আকবর কেবল শোভা বাড়ানো বা নাম কেনার জন্য পুস্তক রচনা বা অনুবাদ করাতেন না, তিনি স্বয়ং খুব অধ্যয়নশীল ছিলেন। অত্যন্ত সঙ্কটের সময়েও তিনি তার জন্য সময় করে নিতেন। অক্ষরজ্ঞান অর্জন করবেন না বলে তিনি যেন পণ করে রেখেছিলেন, তার কোনো আবশ্যকতাও বোধ করেননি তিনি। কয়েকজন পুস্তক-পাঠক তাঁর কাছে থাকত ।
ফারসি তুর্কি সাহিত্য বুঝতে তাঁর কোনো অসুবিধে হতো না। আরবি ও সংস্কৃতের মতো অন্যান্য ভাষার পুস্তকের অনুবাদ তাঁকে শোনানো হতো। নিম্নলিখিত পুস্তকগুলির পাঠ তিনি অবশ্যই শুনেছিলেন এবং কোনো কোনোটি একাধিকবার। তাঁর আগ্রহ ও কৌতূহল নিবৃত্তির জন্য দু’রকমের পুস্তক লেখা হয়েছিল— প্রথমত, ফারসি ভাষায় মৌলিক রচনা; দ্বিতীয়ত, সংস্কৃত, আরবি অথবা তুর্কি থেকে অনুবাদ। তুর্কি থেকে একমাত্র ‘তুজুক বাবরী’ (বাবরনামা) গ্রন্থেরই অনুবাদ করা হয়েছিল।
