কাবুল অধিকার – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “আকবর” বিষয়ের “পশ্চিমোত্তরের সংগ্রাম” বিভাগের একটি পাঠ। ইসলামের প্রতি আকবরের উপেক্ষা মোল্লাদের বিরুদ্ধাচারী করে তুলেছিল। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে জৌনপুরের কাজী মোল্লা মুহম্মদ ইয়াজদী আকবরের বিধর্মী হয়ে যাওয়ার ফতোয়া দেন, বাংলার কাজীও ভ্রাতাকে সমর্থন করেন। পূর্বদিকের সুবাগুলিতে কিভাবে বিদ্রোহ হয়েছিল, সে কথা আমরা পূর্বে বর্ণনা করেছি ।
কাবুল অধিকার
আক-বরের কথাবার্তা অতিরঞ্জিত হয়ে সমগ্র ইসলামী জগতে ছড়িয়ে পড়েছিল। তুরানের উজবেক খান আব্দুল্লা আক-বরের সঙ্গে চিঠিপত্র বন্ধ করে দেন। বহুকাল পর যদিও-বা পত্র লিখলেন তো স্পষ্ট বলে দিলেন: আপনি ইসলাম ত্যাগ করেছেন, আমিও আপনাকে ত্যাগ করেছি।
তুরান থেকেই বাবর এসেছিলেন, তুরান থেকেই দাস, খিলজী ও তুগলক বংশের প্রতিষ্ঠাতারাও এসেছিলেন। আক-বরের সেনার মধ্যেও তুরানী আমির ও সৈনিক যথেষ্ট সংখ্যার ছিল, সেজন্য এটা বিপদের কথা। এইসব কথাবার্তার প্রভাব কাবুল ও তার শাসক মির্জা মুহম্মদ হাকিমের উপর পড়া স্বাভাবিক ছিল। ইসলামের সকল সমর্থকেরই নজর ছিল আক-বরের এই সৎ-ভ্রাতার উপর।
যদিও বাংলা-বিহারের পরিস্থিতি সঙ্কটজনক ছিল, তথাপি আক-বর তার জন্য মজফ্ফর খাঁ, টোডরমল ইত্যাদিকে নিযুক্ত করেন এবং পশ্চিমোত্তরের সঙ্কট সবচেয়ে সঙিন মনে করে নিজে সেদিকে মনোযোগ দেন, এ কথা আগে বলা হয়েছে।
পূর্ব ও পশ্চিমোত্তরের বিদ্রোহ একটি থেকে অপরটি বহুদূরে সঙ্ঘটিত হচ্ছিল। জৌনপুরের সঙ্গে পেশাওয়ারের সম্পর্ক জুড়ে দেওয়া খুব কঠিন ছিল। মাসুম খাঁ কাবুলী পাটনার জায়গিরের সঙ্গে তাঁর স্বদেশভূমির সম্পর্ক জোড়ার অনেক চেষ্টা করেন, কিন্তু লেখালেখি ব্যতীত তিনি আর কি করতে পারেন? মাঝখানে মোল্লারা যদিও বিরূপ মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু তাদের তেমন প্রভাব ছিল না।
হুমায়ূনের পুত্র মুহম্মদ হাকিমের এমন কোনো যোগ্যতাও ছিল না যে তিনি মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করবেন। তিনি কেবল ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের খেলার পুতুল হতে পারেন। আক-বরের সহস্র চক্ষুর সম্মুখে এই ষড়যন্ত্র গোপন রইল না। তিনি জানতে পারলেন, কে কে এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত রয়েছে।
১৫৮০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে কাবুলের অফিসার নূরুদ্দীন পাঞ্জাব আক্রমণ করেন। তারপর দ্বিতীয় অফিসার শাদমানও, যুদ্ধে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মালপত্রের তল্লাশি নেওয়ার সময় শাহ মনসুর ও অনেক বড় বড় আমিরের পত্র হস্তগত হয়। দু’জন আমির ব্যর্থ হওয়ার পর পনেরো হাজার সৈন্য নিয়ে স্বয়ং হাকিম পাঞ্জাবের উপর চড়াও হন। বিহারের রোহতাসের নামে আরও একটি রোহতাস জেহলম জেলার শেরশাহ নির্মাণ করিয়েছিলেন।
আক-বরের দুর্গরক্ষক ইউসুফকে প্রলোভন দিয়ে দুর্গ সমর্পণের প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করেন। রোহতাস দখল না করেই মুহম্মদ হাকিম অগ্রসর হন। লাহৌরে গিয়ে দেখেন নগরদ্বার রুদ্ধ, তিনি বাইরের উদ্যানে অবস্থান করেন। ইতিমধ্যে আক-বরের আগমনের সংবাদ পেয়ে কাবুলে পলায়ন করতে হয় তাঁকে।
তাঁর মাতুল ফরিদ তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন— তোমার পা রাখাতে যা দেরি, সমস্ত মানুষ বিধর্মী আক-বরের বিরুদ্ধাচারী হয়ে তোমার সঙ্গে যোগ দেবে। কিন্তু সেকথা সত্য হয়নি। তবে সেই পরামর্শে অবশ্যই একটি লাভ হয়েছিল, লোকজনকে অসন্তুষ্ট না করার জন্য হাকিম হত্যা-লুণ্ঠন করেননি। তাড়াহুড়ো করে চেনাব পার হওয়ার সময় তাঁর চারশত লোকের সলিল-সমাধি হয়।
মির্জা হাকিমের নিকটে প্রেরিত পত্রগুলি ধরা পড়ার পর খাজা মনসুরকে কয়েদখানায় আটকে দেওয়া হয় এবং তাঁর জায়গায় শাহকুল্লিকে নিয়োগ করা হয়। খাজার ধরা-পড়া পত্রগুলির মধ্যে একখানি ছিল তাঁর আমিল (হাকিম) আশরফবেগ থাকারও, তাতে লেখা ছিল: আমি মির্জার মাতুল ফরিদুখার সঙ্গে দেখা করি, তিনি আমাকে মির্জার কাছে নিয়ে যান। যদিও পাঞ্জাবের সব পরগণায় তিনি তাঁর আমিল নিয়োগ করে দিয়েছেন, তবু আমাদের (খাজা মনসুরের) পরগণাকে বাদ দিয়েছেন।
কিছুদিন পর মনসুরকে পুনরায় তাঁর পদে বহাল করে দেওয়া হয়। মির্জা হাকিমের পুরনো । কর্মচারী ও দীওয়ান মালিকসানি ওয়াজির খাঁ অভিযানের শুরুতেই মির্জার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে আকবরের পক্ষে চলে আসেন। সোনিপতের ঠিকানায় আকবর তাকে কর্মচারী হিসেবে রেখে দেন।
আগে থেকে পরিচয় থাকার জন্য ওয়াজির খাঁ খাজা মনসুরের নিকটে যান। তার ফলে খাজার পরিবর্তিত অদৃষ্ট আবার বিপাকে পড়ে। লোকে বলতে শুরু করে, ওয়াজির খাঁ গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছিলেন। ওদিকে রাজা মানসিংহ আটক করা শাদমানের জিনিসপত্রের মধ্যে পাওয়া খাজার আরও তিনখানি পত্র পাঠিয়ে দেন। খাজা মনসুরের উপর সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। মোল্লা বদায়ূনী এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন— “তুমি সুলতানদের সেবা করে প্রাণধারণ করছ। সেটা এইরকম, সালাম করো, জবাব পেলেও জানবে অনেক কিছু, আর যদি রুষ্ট নেওয়াটা তেমন কোনো ব্যাপারই নয়।” হন, গর্দান
আকবর চেয়েছিলেন, তাঁর সেনাপতি যেন মুহম্মদ হাকিমের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাঁকে পলায়ন করতে বাধ্য না করে। তিনি স্বয়ং এসে তাঁকে ধরতে চান। সেই কারণেই মানসিংহ ও খানজাহান লাহৌরে গিয়ে দুর্গের মধ্যে বসে থাকেন।
আকবর পঞ্চাশ হাজার সওয়ার, পাঁচশত সঙ্গী হাতি ও বহুসংখ্যক পদাতিক সৈন্য নিয়ে রওনা হন। তিনি তাঁর সেনাকে আট মাসের বেতর অগ্রিম প্রদান করে ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দের ৮ই ফেব্রুয়ারি সিক্রী থেকে যাত্রা করেন। সঙ্গে সলীম ও মুরাদ দুই শাহজাদা ।
বারো বছর বয়স্ক সলীম সেনার কাজ কি আর বুঝবেন? মুরাদের অধ্যাপক সাধু মোনসেরেতও সঙ্গে ছিলেন, তিনি সেই অভিযানের বিষয়ে অনেক কথাই লিখেছেন। তা থেকে জানা যায়, আকবর রাজধানীর সুবন্দোবস্ত করেছিলেন, সুবা ও প্রধান নগরসমূহের জন্যও ভালো ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে অল্প সংখ্যক বেগম ছিলেন। যেখানে ছাউনি পড়ত, সেখানেই বাজার বসে যেত। মোনসেরেত দেখে অবাক হয়ে যেতেন যে এত বড় সেনাবাহিনীর জন্য বহু জিনিসপত্রের প্রয়োজন হলেও তা ছিল যথেষ্ট সুলভ ।
মথুরা, দিল্লী হয়ে সোনিপত পৌছলে মালিকসানি ওয়াজির খাঁ তাঁর মনিব মির্জা হাকিমের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হন, সেকথা আমরা একটু আগেই উল্লেখ করেছি। ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পানিপত ত্যাগ করে আকবর থানেসর, শাহাবাদ হয়ে আম্বালার দিকে অগ্রসর হন, সেই সময় কছওয়াহাকোটের নিকটে একটি গাছে শাহ মনুসরকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বদায়ূনীর মতো মোনসেরেতও লিখেছেন—
“সেনা শাহাবাদে এলে বাদশাহের আদেশে শাহ মনসুরকে একটা গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হল।… বাদশাহ জল্লাদ, রক্ষীদের এবং কয়েকজন আমিরকে হুকুম দিলেন উক্ত স্থানে শাহ মনসুরের সঙ্গে অবস্থান করতে। তারপর বাদশাহ বাল্যকাল থেকে এই ব্যক্তির প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, আবুল ফজলকে তা বলতে বললেন।
তদনুসারে আবুল ফজল মনসুরের কৃতঘ্নতার জন্য ভর্ৎসনা করলেন, তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানিয়ে সাব্যস্ত করলেন যে মুহম্মদ হাকিমের উদ্দেশে তাঁর স্বহস্তে লেখা চিঠিপত্রাদির সাক্ষ্য-সাবুদের উপর ভিত্তি করে শাহ মনসুরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এবং বাদশাহ তাঁর ফাঁসি উপযুক্ত শাস্তি মনে করেছেন।
শাহকে এ কথাও বলা হল যে অপরাধের উচিত দণ্ড দৃঢ়তার সঙ্গে সহ্য করার জন্য প্রস্তুত হও। লোকজনকেও বোঝানো হল যে বাদশাহ শাহ মনুসরের সঙ্গে কোনো অন্যায় করতে চাননি।… অপরাধীর মৃত্যুর পর লোকজন নিকটস্থ নিজের নিজের ডেরায় চলে গেল। আকবরের বিষণ্ন মুখচোখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে ওই ব্যক্তির দুর্ভাগ্যের জন্য তিনি অত্যন্ত মনঃকষ্ট ভোগ করেছেন।… (কিন্তু) সারা ছাউনির লোকজন এই শাস্তিতে খুব খুশি হয়েছিল। মুহম্মদ হাকিম যখন এই ঘটনার কথা জানতে পারেন, তখন তিনি সন্ধি করার কথা চিন্তাভাবনা করার জন্য অনুতাপ করতে থাকেন।”
সাধু মোনসেরেত ও আবুল ফজল উভয়ের মধ্যে কেউই মানতে রাজি নন যে শাহ মনসুরকে হত্যা করা অন্যায় ছিল এবং তার মধ্যে টোডরমলের চক্রান্তও ছিল। ‘তবকাত আকবরী’ (তারিখ নিজামী)-তে সমসামরিক ঐতিহাসিক খাজা নাজিমুদ্দীন আহমদ (মৃত্যু: অক্টোবর, ১৫৯৪) অবশ্য লিখেছেন—
“যখন আকবর কাবুলে ছিলেন, তখন তিনি মির্জা মুহম্মদ হাকিমের বিশ্বস্ত কর্মচারীদের নিকটে শাহ মনসুর কাণ্ডের তদন্ত করেন। জানা যায়, শাহবাজের ভ্রাতা করমুল্লা ওই জাল চিঠিপত্র তৈরি করেন, যেগুলির উপর ভিত্তি করে খাজা মনসুরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এটা জানার পর খাজার মৃত্যুর জন্য প্রায়ই বাদশাহের অনুশোচনা হতো।” তবকাত অনুসারে সোনিপতে ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দের শেষে পাওয়া পত্র জাল ছিল, অথচ সেইসব পত্রের জন্যই আকবর শাহ মনসুরকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বদায়ূনী তাঁর ইতিহাসে তবকাত থেকে অনেক সাহায্য নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন—
“শাহবাজ খাঁর ভ্রাতা করমুল্লা ও অন্য আমির এই জালিয়াতি ও ধাপ্পাবাজিতে যুক্ত ছিলেন। যে পত্রগুলির জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, সেগুলো আমিরদেরই জাল পত্র ছিল। সেজন্য শাহ মনসুরের হত্যার জন্য বাদশাহ অত্যন্ত মর্মাহত ছিলেন।”
ভিনসেন্ট স্মিথ প্রথম দিকের পত্রগুলিকে আসল মনে করেছেন এবং যেসব পত্র তৃতীয়বার (১৫৮১ খ্রিঃ) ধরা পড়ে, সেগুলোকে জাল বলেছেন— “আমি স্বীকার করি, ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ হাকিমকে ডেকে পাঠানোর পত্রগুলি লেখার জন্য শাহ মনসুর সত্য-সত্যই অপরাধী ছিলেন এবং মোনসেরেত যেরূপ লিখেছেন, তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের সর্দার ছিলেন।” প্রকৃতপক্ষে
আকবর গুণের কদর করতেন। গুণীর সাত খুন মাফ করার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। শাহ মনসুর অত্যন্ত দক্ষ অর্থমন্ত্রী ছিলেন। পরে তাঁর অভাব তিনি অনুভব করেছিলেন। কাসিম খাঁ খুব উঁচু শ্রেণীর ইঞ্জিনিয়র ছিলেন, তিনি আগরা দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনিও মির্জাকে আসার জন্য পত্র প্রেরণ করেছিলেন, কিন্তু এরূপ ব্যক্তিকে চিরকালের মতো হারানো আকবরের পছন্দ ছিল না ।
আম্বালা থেকে সরহিন্দ ও পরবর্তী মঞ্জিল পায়েলে পৌঁছতেই খবর এল, পাঞ্জাব ত্যাগ করে চলে গেছেন। আকবরের বুক থেকে যেন একটা ভারি পাথর নেমে হাকিম গেল। কিন্তু তিনি আগে থেকেই মনস্থির করেছিলেন কাবুলে যাবেন। নৌকোর সেতু নির্মাণ করে সতলুজ ও বিয়াস অতিক্রম করে পাহাড়ের ধারে ধারে অগ্রসর হয়ে নিজের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষ্যে তৈরি করানোর উদ্যানে শিবির স্থাপন করেন। নৌকোর সেতু দিয়ে সেনাবাহিনীকে রাবীও পার করানো হয়, কিন্তু চেনাবে গিয়ে সেরকম ব্যবস্থা করা সম্ভব হল না। অল্পই নৌকো ছিল।
সেনা পার করাতে তিন দিন লেগে গেল। রোহতাসে দুর্গরক্ষক ইউসুফ বাদশাহকে মনপ্রাণ খুলে স্বাগত জানালেন। রোহতাস থেকে আকবর সিন্ধুনদের দিকে অগ্রসর হন। এই অভিযানের সময়েও শাস্ত্রালোচনা ও ধর্মচর্চা চলছিল।
সাধু মোনসেরেত ফারসি ভাষায় লিখিত নিজের একখানি পুস্তক উপহার দেন, তার উপর বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হল। সিন্ধু এমনিতেই মহানদ, তার উপর বর্ষাকাল, নদী যেন সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। এ সময় নৌকোয় সেতুবন্ধন সম্ভব ছিল না, সেজন্য সমুদায় সেনাকে নৌকোয় নৌকোয় পার করানো হল। আকবরকে সিন্ধুতীরে পঞ্চাশ দিন আটকে থাকতে হয়েছিল, ইত্যবসরে মির্জা হাকিম সেনা-সহ নদী অতিক্রম করে পালিয়ে যেতে সফল হন।
সতলুজের তীরে সিকান্দরের সেনাপতিদের যে-অবস্থা হয়েছিল, আকবরের সেনাপতিদেরও সেই একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হল সিন্ধুর বাম তীরে। পরিষদের কয়েকটি বৈঠক হল। সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। আকবর সে-সময় শিকার করে বেড়াচ্ছিলেন। সাধু মোনসেরেতও আকবরকে পরামর্শ দিলেন, ভ্রাতার সঙ্গে বিবাদ চরম সীমায় নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
কিন্তু বাদশাহের সঙ্কল্প বজ্রের মতো সুদৃঢ় ছিল। তিনি শাহজাদা মুরাদের সঙ্গে কয়েক হাজার সওয়ার ও পাঁচ শত হাতি দিয়ে মানসিংহকে, সেই সঙ্গে অন্যান্য বিচক্ষণ অমাত্যকে নদী পার করিয়ে প্রেরণ করলেন। তার দুই দিন পর আকবর মোনসেরেতের সঙ্গে ভূগোল ও ধর্ম-বিষয়ক আলোচনা চালান, তার বর্ণনা জেস্যুইট সাধু কয়েক পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করেছেন।
১২ই জুলাইয়ের কাছাকাছি আকবরও সিন্ধু অতিক্রম করেন। সিন্ধুতটে ইঞ্জিনিয়র সেনাধ্যক্ষ কাসিম খাঁর নেতৃত্বে তিনি ভারি সাজ-সরঞ্জাম সহ একটি সেনাবাহিনী রেখে দিলেন যাতে পথে কোনো বিপদ না হয় এবং আশপাশের বিক্ষোভ-বিদ্রোহ দমন করা যায়। মানসিংহ অধ্যায়ে আমরা বলেছি, আফগানদের রসদ-সামগ্রী লুণ্ঠনের ব্যাপারকে কিরূপ ভয়ঙ্কর পরাজয়ের রূপ দেওয়া হয়েছিল।
সে-খবর আকবরের কাছেও পৌছেছিল, কিন্তু সেটা যে অসত্য তা শীঘ্রই প্রমাণিত হয়ে যায়। মুরাদের বয়স তখন এগারো বছর, তাঁকেও একটা বাহিনীর সেনা-অধিনায়ক করা হয়। বলা হয়েছে, ১লা আগস্টের যুদ্ধে তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েন এবং হাতে বর্শা নিয়ে বলেন: যাই হোক না কেন, আমি এখান থেকে এক ইঞ্চিও পিছু হঠবো না । নদী অতিক্রম করে আকবর কাবুল নদী ও সিন্ধুর সঙ্গমস্থলে শিবির স্থাপন করেন,
সে-সময় মিস্ত্রিখানার গিয়ে তিনি স্বয়ং কাজ করতেন। প্রথম পীতরের মতোই আকবরেরও স্বহস্তে কাজ করা— বিশেষ করে কল-কবজার কাজ খুব পছন্দ ছিল। বারুদের হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ তৈরি করার দিকে তীক্ষ্ণ মনোযোগ দিতেন। অবসর সময়ে সাধু মোনসেরেতের শাস্ত্রব্যাখ্যা শুনতেন। মির্জা হাকিম কাবুল প্রত্যাবর্তনের সময় পেশাওয়ার ভস্মীভূত করে দিয়েছিলেন— ঘরবাড়ি পোড়ানোর নীতি সমস্ত যুদ্ধেই কিছু না কিছু অনুসরণ করা হয়ে থাকে। কেউ চায় না পশ্চাদনুসরণকারী খাদ্য-পানীয় ও অন্যান্য বস্তুর সুযোগ-সুবিধে পাক। পেশাওয়ারে থাকার সময় আকবর গোর যোগী
(গোর খত্রী) দেখতে যান। এই সৌধটিতেই পূর্বে পেশাওয়ার তহসিলের কাছারি করা হয়েছিল। সলীম তাঁর পিতার আগে খয়বার গিরিপথে প্রবেশ করেন এবং আলী মসজিদে অবস্থান করার পর সুরক্ষিত জালালাবাদ গিয়ে উপস্থিত হন। তাঁর অনুজ মুরাদ মানসিংহের সঙ্গে ৩রা আগস্ট কাবুলে প্রবেশ করেন।
মির্জা হাকিম কাবুল ত্যাগ করে পাহাড়ে পালিয়ে যান। আকবর ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দের ৯ই আগস্ট (১০ই রজব, শুক্রবার) পিতামহের রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করতে করতে জনসাধারণের উদ্দেশে আশ্বাস-বাণী ঘোষণা করেন। তিনি সেখানে মাত্র সাত দিন থাকেন, কেননা কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল, এবং প্রত্যাবর্তনের সময় কাশ্মীরও অধিকার করে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেনা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল, সেজন্য তিনি সে-সঙ্কল্প স্থগিত করেন।
মোনসেরেতের বক্তব্য অনুসারে আকবর তাঁর ভগ্নীপতি বদশার শাসক খাজা হাসানকে কাবুলের বন্দোবস্তের ভার সমর্পণ করেন এবং তাঁর ভগ্নীকে বলে দেন— “আমি মুহম্মদ হাকিমের নামও শুনতে চাইনে। তোমাকে এই সুবা দিয়ে যাচ্ছি, যখন চাইব, তখনই নিয়ে নেব। মুহম্মদ হাকিম কাবুলে থাক আর না থাক, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না, কিন্তু তাকে সতর্ক করে দেবে, যদি সে পুনরায় এরকম করে, তাহলে তার প্রতি বিন্দুমাত্র দয়া-মায়া দেখানো হবে না।” কিন্তু ভগ্নী ভ্রাতার শাসনক্ষমতা হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপারে কোনো বাধা দেননি।
আলী মসজিদে ফিরে আকবর তিন হাজার দরিদ্রকে দান-খয়রাত করে কাবুল- বিজয় পালন করেন। আকবরের সঙ্গে সদা-সর্বদা সাদা তাঁবুর ভ্রাম্যমাণ মসজিদ থাকত, কিন্তু তিনি আলী মসজিদে সেটাকে স্থাপন করতে দেননি।
মোল্লারা তো তাঁকে বিধর্মী বলে ফতোয়া দিয়ে তাঁর যতখানি অনিষ্ট সাধন করা সম্ভব, তা করেই ফেলেছিলেন, তাহলে আর নিজেকে খাঁটি মুসলমান প্রতিপন্ন করার জন্য মসজিদ স্থাপন করে কি লাভ? অটকের নিকটে কাসিম খাঁ নির্মিত নৌকোর সেতু দিয়ে সিন্ধু অতিক্রম করেন। তারপর সম্মুখের পাঞ্জাবের নদীগুলি সেভাবেই পার হন, কেবল রাবীতে জল কম থাকায় বিনা সেতুতেই নদী পেরিয়ে যায় সেনা। কুমার মানসিংহকে সিন্ধুতীরের সুবার সিপাহসালার (রাজ্যপাল) নিযুক্ত করা হয় ।
১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে ১ লা ডিসেম্বর আকবর রাজধানীতে পৌছে কাবুল-বিজয় খুব ধুমধামের সঙ্গে পালন করেন। সমগ্র অভিযান মাত্র দশ মাসে সমাপ্ত হয়েছিল, নামমাত্র যুদ্ধ হয়েছিল, তবে এই অভিযান থেকে তাঁর বিপুল লাভ হয়, সে-কথা বলা অনাবশ্যক। অভিযানের শুরুতে চারদিকে ছিল সঙ্কট আর সঙ্কট।
পূর্বদিকে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ছিল। মির্জা হাকিম পাঞ্জাবের দিকে এগিয়ে আসছিলেন, মুসলমান আমিরদের মধ্যে খুব কমই ছিল, যাদের বিশ্বাস করা যেতে পারত, মোল্লারা মুসলমান জনসাধারণকে বিরূপ করে তুলেছিল।
আকবর কেবল হিন্দু সৈনিক-সেনাপতিদের উপরেই ভরসা করতে পারছিলেন এবং সন্দেহ নেই, তারা তাদের বাদশাহের জন্য নিজেদের প্রাণ দিতেও প্রস্তুত ছিল। বছরের শেষে তাঁর সমস্ত শত্রু শুকনো পাতার মতো উড়ে গেল, গুপ্ত শত্রুদেরও সাহস ভেঙে গেল। তাঁর উপর বিধর্মিতার ফতোয়া কিছুই করতে পারেনি। এবার থেকে ধর্মান্ধ মোল্লাদের ও তাদের অনুগামীদের প্রতি ভয় পাওয়ার কোনো আবশ্যকতাই রইল না। কাবুলে ।মজা মুহম্মদ হাকিম পুনরায় শাসন করতে শুরু করেছিলেন।
আকবর কারো অমঙ্গল চাইতেন না, সেজন্য মির্জাকে তিনি আর ভীতি প্রদর্শন করেননি । মোগল শাহজাদাদের মদ্যপানের বদভ্যাস ছিল। হাকিমও সুরাপানে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং সেই কারণেই মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে তাঁর মৃত্যু হয়। আকবর কাবুলের সীমান্তবর্তী সুবা নিজের হাতেই রাখতে চেয়েছিলেন, সেজন্য মানসিংহকে সেখানকার সিপাহসালার নিযুক্ত করেছিলেন। মানসিংহকে, কাবুলের কথা ভেবেই, সিন্ধুর নিকটস্থ প্রদেশে সিপাহসালার (সুবেদার) করা হয়েছিল ।
মির্জার মৃত্যুর পূর্বেই তুরানী আব্দুল্লা খাঁ উজবেক আকবরের ভগ্নীপতির হাত থেকে বদশা কেড়ে নিয়েছিলেন এবং তার ফলে কাবুলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। খানদের মধ্যে আব্দুল্লা খা উজবেক অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। এমন এক শত্রু সীমান্তে থাকলে আকবর কি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন? তিনি ২২শে আগস্ট পুনরায় রাজধানী সিক্রী ত্যাগ করলেন এবং তেরো বছর পর্যন্ত আর তিনি আগরা দেখেননি।
ডিসেম্বরের শুরুতে রাজমাতাও এসে গেলেন। এখানেই মানসিংহ ফরিদুনের সঙ্গে মির্জা হাকিমের পুত্রদের আগমনের সংবাদ দেন। তাঁর সঙ্গে আকবরের আগেকার দরবারের প্রসিদ্ধ চিত্রকর ফারুখবেগও ছিলেন। ফরিদুনকে বিশ্বাস করা সম্ভব ছিল না। কিছুদিন তাঁকে নজরবন্দি রেখে আকবর তাঁকে মক্কায় নির্বাসিত করে দেন।
পরবর্তী তেরো বছরের জন্য রাজধানী হয় লাহৌর। কাশ্মীরের সুলতান ইউসুফ খাঁকে কয়েকবার ডেকে পাঠানো সত্ত্বেও তিনি দরবারে আসা থেকে রেহাই পেতে চাইছিলেন। আকবরের অসন্তুষ্ট হওয়ার পক্ষে তা যথেষ্ট ছিল । এবার তিনি কাছাকাছি এসে যাওয়ায় ইউসুফ খাঁ শঙ্কিত হলেন, সেজন্য ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে তিনি তাঁর তৃতীয় পুত্র হায়দারকে দরবারে প্রেরণ করলেন। আকবর চাইছিলেন, সুলতান স্বয়ং এসে আনুগত্য স্বীকার করুন। বিপদাশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে দেখে তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ইয়াকুবকে পাঠালেন। সুলতানের এইসব চালাকি আকবরকে অজুহাতের সুযোগ করে দিলো ।
