বৈরামের অভিভাবকত্ব – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “আকবর” বিষয়ের “নাবালক বাদশাহ” বিভাগের একটি পাঠ। কলানোরে চোদ্দ বছর বয়স্ক আকবরকে বাদশাহ ঘোষণা করে দেওয়া হয়, তবে তিনি ব্যস্ত থাকতেন ক্রীড়া-কৌতুকেই । মাথার উপর বৈরাম খাঁর মতো বিচক্ষণ মানুষ তাঁর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সাম্রাজ্যও তখন আগরা থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত সীমিত ছিল।
বৈরামের অভিভাবকত্ব
হুমায়ূন ও বাবরের রাজ্যের পুরনো প্রদেশগুলি তখনও হস্তগত হয়নি। বাংলায় পাঠানদের রমরমা ছিল, রাজস্থানে রাজপুত সামন্তরা স্বাধীন ছিলেন। মালওয়ায় মাডু সুলতান এবং গুজরাতে অন্য বাদশাহ ছিলেন। গোণ্ডওয়ানায় (মধ্যপ্রদেশ) রানী দুর্গাবতীর শৌর্য ছিল, জনরব রয়েছে—“তালের মধ্যে ভূপালতাল, আর সব ডোবা।
রানীর মধ্যে দুর্গাবতী, আর সব গর্দভী।” খানদেশ, বরার, বিদর, আহমদনগর, গোলকুণ্ডা, বিজাপুর — দিল্লী থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন সুলতানদের রাজ্য ছিল। এক সময় মালিক কাফুর রামেশ্বরমে আলাউদ্দীনের পতাকা তুলেছিলেন, তখন সেখানে বিজয়নগর হিন্দুরাজ্য, সিন্ধু, বালোচিস্তান— সবই দিল্লী থেকে স্বাধীন ছিল ।
আদলী বছরখানেকই দিল্লীর মসনদ দখলে রাখতে পেরেছিলেন। ইব্রাহিম খাঁ তাকে পূর্বদিকে বিতাড়িত করে দেন। তিনি চুনারে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিন বছর শাসনের পর ১৫৫৭ কিংবা ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার পাঠানেরা তাঁকে নিহত করে।
শেরশাহের আর এক ভ্রাতুষ্পুত্র সিকান্দার শূর ইব্রাহিম খাঁকে দিল্লী থেকে উৎখাত করেন। তিনি সেখান থেকে পূর্বদিকে পলায়ন করেন, বারো বছর পরে ওড়িশায় শেষ- নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় সিকান্দার শূরই ছিলেন তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ।
কিন্তু আদলীর সময় আকবরকে আরও এক প্রচণ্ড শত্রুর মোকাবিলা করতে হয়েছিল । তিনি হেমু (হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য), যাঁকে কিছু ঐতিহাসিক রেওয়াড়ির ধূসর বানিয়া (ভার্গব) বলেছেন। তবে তাঁর বিহারের রওনিয়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আজও হেমুর বিহারী বন্ধুরা তাঁদের উৎসবাদিতে তাঁদের বীরের গান গেয়ে থাকে।
আদলী হেমুর উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন, হেমু তা খুব যোগ্যতার সঙ্গেই পালন করেন ৷ তিনি বাইশটি যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি ইব্রাহিমকে পরাজিত করেন। হুমায়ূনের আগমনে আদলী স্বয়ং চুনার দুর্গে অবস্থান করতে থাকেন এবং হেমুকে পাঠান হুমায়ূনের সঙ্গে লড়াই করতে। তাঁর পৌঁছানোর পূর্বেই হুমায়ূনের মৃত্যু হয় ।
কলানোর আকবর সিংহাসনে বসার পর তর্দিবেগকে পাঁচহাজারী মনসব দিয়ে দিল্লীর রাজ্যপাল নিযুক্ত করা হয়। হেমু গওয়ালিয়র, আগরা হয়ে দিল্লী পৌঁছান এবং তর্দিকে পরাজিত করে এক শত ষাটটি হাতি, এক হাজার আরবি ঘোড়া এবং বহু ধনরত্ব হস্তগত করেন। তখন আগরা ও দিল্লী উভয় রাজধানীই হেমুর হাতে। তর্দিবেগ পলায়ন করে সরহিন্দে আকবরের নিকট পৌঁছান। বৈরাম খাঁ প্রথমাবধিই তর্দিবেগকে পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করান।
হুমায়ূনের পলায়নের সময় তর্দিবেগ তাঁর সঙ্গে ছিলেন, এ কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। এ কথাও বলেছি যে যখন হুমায়ূনের ঘোড়ার প্রয়োজন হয়েছিল, তর্দিবেগ তা দিতে অস্বীকার করেন। হুমায়ূন যখন কাবুলে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তর্দিবেগ ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাঁকে পুনরায় গ্রহণ করেন। তার মনোভাব কখনোই ভালো ছিলা না, অবশ্য বৈরাম খাঁ তাঁকে নিজের পথের কাঁটা ধরে নিয়েই বিনাশ করেন।
দিল্লী ও আগরা অধিকার করে হেমু দেখলেন, যাঁদের জন্য এই বিজয় অর্জন, তাঁদের মধ্যে কেউই যোগ্য নন, শেরশাহের বংশের সরলেই পরস্পরের গলা কাটতে উদ্গ্রীব। সমস্ত অধিকার নিজের হাতে নেওয়াই উচিত মনে করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পাঠানরাও, পূর্বদেশী পল্টনও।
হেমু বিক্রমাদিত্য নাম নিয়ে দিল্লীর সিংহাসনে অভিষিক্ত হলেন। সাড়ে তিন শত বছর পর একজন হিন্দু ভারতের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তবে সেটা আনন্দোৎসব পালনের সময় ছিল না। সে-সময় দিল্লী ও আগরা এলাকায় ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, সেই দুর্ভিক্ষ চলে টানা দু’বছর (১৫৫৫-৫৬ খ্রিঃ)। মানুষ এক মুঠো খাবারের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হেমু বায়ানায় (আগরা থেকে পঁচিশ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে) ছাউনি গেড়েছিলেন।
লোকে ‘হা অন্ন, হা অন্ন’ করে মরছিল। বদায়ূনীর বক্তব্য অনুসারে, “হেমু এক লক্ষ মানুষের প্রাণকে এক দানা যবের চেয়ে বেশি মূল্যবান ভাবেননি এবং নিজের পাঁচ শত হত্যাকারীকে চাল-চিনি-ঘি খাওয়াচ্ছিলেন। তাই দেখে সারা দুনিয়া ছিঃ ছিঃ করছিল ।”
দিল্লী ও আগরা হাতছাড়া হওয়ার পর সভাসদেরা পরামর্শ দিলেন, হেমু এদিকেও এগিয়ে আসতে পারে, সেজন্য সবচেয়ে ভালো, এখান থেকে কাবুলে চলে যাওয়া । কিন্তু তাঁদের পরামর্শ বৈরাম খাঁ ও আকররের মনঃপূত হল না।
তাঁরা সেনা নিয়ে পানিপতে পৌঁছলে সেখানে জুয়াখেলা হল, তিরিশ বছর পূর্বে যে-জুয়া খেলেছিলেন আকবরের পিতামহ। হেমুর সেনা সংখ্যা ও শক্তিতে অনেক বেশি ছিল। পর্তুগিজদের কাছে থেকে পাওয়া কামানের খুব গর্ব ছিল তাঁর । পনেরো শত ঐরাবতের কালো মেঘে ময়দান ছেয়ে গেল।
১৫ই নভেম্বর হেমু মোগল সৈন্যদের ছত্রভঙ্গ করে দিল, কিন্তু এই সময় একটা তীর এসে তাঁর চোখে লাগে, তীর চোখের অনেক গভীরে ঢুকে যায়, তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। নেতা-বিহীন হওয়ার ফলে সেনার মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ল ।
হেমুকে বন্দী করে বৈরাম খাঁ তাঁর প্রাণদণ্ড দেন, আমরা সে কথা আগেই বলেছি। কথিত আছে, নিজের হাতে শত্রুর মাথা কেটে গাজী হওয়ার জন্য আকবরকে অনুরোধ করেন বৈরাম খাঁ, কিন্তু আকবর তা করতে অস্বীকার করেন। আকবরের সে-সময় টেনে-টুনে চোদ্দ বছর। তাঁর এতটা বিবেকবোধ ছিল, কিছু কিছু ঐতিহাসিক তা
মানতে নারাজ। হিন্দু লক্ষ্যভ্রষ্ট হল, কিন্তু তারা হেমুর বদলে আকবরের মতো শাসক লাভ করেছিল, যিনি অর্ধ শতাব্দী ধরে ভেদাভেদের গভীর খাদটাকে ভরাট করার চেষ্টা করেছিলন। দিল্লী থেকে আকবর ডিসেম্বরে সরহিন্দে ফিরে যান, কেননা তখনও সিকান্দার শূর মাথা নত করেননি। ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে সিকান্দার মানকোটের (রামকোট, জম্মু) পার্বত্য দুর্গে বহুদিন অবরুদ্ধ হয়ে থাকার পর আত্মসমর্পণ করেন। বাদশাহ তাঁকে কিনে ফেলেন এবং তাঁকে বিহারের জেলা জায়গির দেন, সেখানে দু’বছর পর তাঁর মৃত্যু
হয় । কাবুল থেকে শাহী বেগমরাও মানকোটে এসে পৌছলেন। তাঁদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আকবর দুই মঞ্জিল এগিয়ে গিয়েছিলেন। মানকোট থেকে লাহৌর হয়ে জলন্ধর পৌছানোর পর বৈরাম খাঁ হুমায়ূনের ভাগিনেয়ী সলীমা বেগমকে বিবাহ করেন ।
কিন্তু এই বিবাহ খুব অল্পকালই স্থায়ী হয়েছিল, কেননা ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দের ৩১শে জানুয়ারি বৈরাম খাঁ নিহত হওয়ার পর আকবরের পিতৃাসা-কন্যা সলীমা আকবরের অত্যন্ত প্রভাবশালিনী পত্নী হয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যু হয় ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে ।
১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে আকবর দিল্লী থেকে সদল-বলে যমুনায় নৌযাত্রায় আগরা পৌছান। যদিও আগরা একটা নগণ্য শহর ছিল না, বাবর ও শূরী বাদশাহরা তার যথেষ্ট কদর করেছিলেন, তথাপি আকবরাবাদ হয়ে ওঠার পরই তার কপাল ফেরে।
বৈরাম খাঁর অভিভাবকত্বের শেষ বছরে সাম্রাজ্যের সীমা বহু বিস্তৃত হয়। ১৫৫৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে গওয়ালিয়র অধীনতা স্বীকার করে। এর ফলে দক্ষিণের পথ উন্মুক্ত হয় এবং গওয়ালিয়রের মতো সুদৃঢ় দুর্গ তথা সাংস্কৃতিক কেন্দ্ৰ আকবরের হস্তগত হয় ।
এই বছরই পূর্বে জৌনপুর পর্যন্ত মোগলের পতাকা উড়তে শুরু করে। রণথম্ভৌরের অজেয় দুর্গ অধিকার করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। মালওয়া হস্তগত করতেও বৈরাম খাঁ ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে অভিভাবকের কাছ থেকে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না। আকবরেরও তখন আঠারো বছর বয়স হয়ে গেছে, তিনিও আর বৈরাম খাঁর হাতের পুতুল হয়ে থাকতে ইচ্ছুক নন।
