ভারতবর্ষের ইতিহাসে সম্রাট আকবর এক অসামান্য আলোচিত নাম— ক্ষমতার রাজনীতিকে যিনি নীতিতে রূপ দিয়েছিলেন, আর ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে রাষ্ট্রশাসনের ভিত্তিতে পরিণত করেছিলেন। তাঁর রাজসভা ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম জ্ঞানসভা, যেখানে পণ্ডিত, কবি, শিল্পী, দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের মিলন ঘটেছিল এক অনন্য মঞ্চে। সেই সভারই এক বিশিষ্ট কিন্তু বিতর্কিত সদস্য ছিলেন মোল্লা আবদুল কাদির বদায়নী— যিনি একদিকে আকবরের রাজসভায় ইতিহাস রচনার দায়িত্বে ছিলেন, অন্যদিকে সম্রাটের উদারনীতির প্রতি গভীর সংশয় ও সমালোচনার দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন।
আকবরের শাসনযুগে যে ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবতাবাদী চিন্তার উন্মেষ ঘটে, তার ভেতর দিয়েই উদ্ভূত হয় এক দ্বন্দ্ব— ঐতিহ্য বনাম নবচেতনা, শরিয়াভিত্তিক ধর্মতন্ত্র বনাম যুক্তিবাদী মানবতাবাদ। এই দ্বন্দ্বের এক প্রগাঢ় সাক্ষী এবং রচনাকার ছিলেন বদায়নী, যার “মুনতাখাব-উত-তাওয়ারিখ” কেবল একটি ইতিহাসগ্রন্থ নয়, বরং আকবরের যুগচেতনার অন্তর্লীন বিতর্কের দলিল।
এই প্রবন্ধে আমরা অনুসন্ধান করব— আকবরের চিন্তা ও শাসনদর্শনের প্রেক্ষাপটে মোল্লা বদায়নীর ভূমিকা, তাঁর সমালোচনার উৎস, এবং সেই বিতর্ক কীভাবে মুঘল ইতিহাসের বৌদ্ধিক রূপরেখাকে নির্ধারণ করেছিল।
মোল্লা বদায়নী ও মুঘল সম্রাট আকবর
আবুল ফজল ও ফৈজীর মতোই বদায়ূনী বলিষ্ঠ লেখনীর অধিকারী ছিলেন। তিনি বহু পুস্তক লিখেছেন অথবা অনুবাদ করেছেন, সেগুলোর অধিকাংশই এখনও পাওয়া যায়—
মোল্লা বদায়নীর অবদান
১. সিংহাসন বত্তীসী—
রাজা ভোজ কর্তৃক স্থাপিত সিংহাসন বিষয়ক বত্রিশটি কাহিনী সংস্কৃতে প্রসিদ্ধ। “১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে শাহানশাহ আমার প্রতি অত্যন্ত সদয় হয়ে প্রীতিভরে বললেন : ‘রাজা বিক্রমাদিত্য সম্পর্কে সিংহাসন বত্তীসীর যে বত্রিশটি কাহিনী আছে, সংস্কৃত থেকে ফারসিতে অনুবাদ করে ‘তৃতী-নামা’র আদলে গদ্য-পদ্যে রচনা করো, নমুনা হিসেবে এক পৃষ্ঠা আজকেই পেশ করো।’ সাহায্য করার জন্য একজন সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণকে সঙ্গে দিলেন। সেদিনই আমি গল্পের প্রথম পৃষ্ঠাটি অনুবাদ করে দেখালাম । তিনি তাঁর পছন্দের কথা জানালেন।”
অনুবাদের কাজ শেষ করে পুস্তকের নাম রেখেছিলেন ‘নামায়ে-খিরদ আজা’ (প্রজ্ঞাবর্ধিকা) । এই পুস্তক থেকেই মোল্লা বদায়ূনীর অনুবাদের কাজ শুরু হয়। ফৈজীর মতো তিনি সংস্কৃতজ্ঞ ছিলেন না, কিন্তু প্রত্যেক পুস্তক অনুবাদের জন্য পণ্ডিতের সাহায্য পেতেন। পণ্ডিতেরা সম্ভবত পুস্তক পাঠ করে নিজেদের ভাষায় অর্থ করতেন, মোল্লা তা ফারসিতে অনুবাদ করে যেতেন। আকবরের আমলে বহু সংস্কৃত পুস্তকের অনুবাদ এভাবেই করা হয় ।
২. অথর্বন বেদ—
১৫৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দে (৯৮৩ হিজরীতে) ‘অথর্ব বেদ’ অনুবাদের আদেশ হয়। দাক্ষিণাত্যের জনৈক শেখ বহাওয়ান, ব্রাহ্মণ থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান, বাদশাহের শাগরেদ-দলে সামিল হন। তিনি জানান, হিন্দুদের চতুর্থ বেদ ‘অথর্বে’র সঙ্গে ইসলামের কথার মিল আছে।
তাতে মুসলমানদের কলমা “লা-ইলাহা ইল্লাল্- লাহ্” (আল্লা ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো ঈশ্বর নেই)-এর মতো বহু ব্যাপার রয়েছে, এমনকি কিছু শর্তসাপেক্ষে গো-মাংস ভক্ষণও বৈধ বলা হয়েছে। শবদাহ ও সমাধিস্থ করার কথাও আছে। জানা যায়, মুসলমান হয়ে-যাওয়া কোনো পণ্ডিত কিংবা মুসলমান প্রভুদের তোষামোদের নিমিত্ত এরূপ নকল ‘অথর্ব বেদ’ রচনা করেন।
সম্ভবত এর অবশিষ্টাংশ ‘আল্লা উপনিষদ’ সকল উপনিষদের পুলিন্দা এক শত আট উপনিষদের মধ্যে এখনও বিদ্যমান। মোল্লা লিখেছেন, ওই গ্রন্থের বহু বাক্যেরই অর্থ সেই ব্রাহ্মণও বলতে পারেননি। প্রথমে ফৈজীকে, তারপর হাজী সরহিন্দীকে এই কাজ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের দিয়ে কাজ উদ্ধার না হওয়ায় মোল্লাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি সে-কাজ সম্পূর্ণ করেন ।
৩. তারিখ আলফী—
১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে (৯৯০ হিজরীতে) খেয়াল হয় যে হজরত মুহম্মদের হিজরতের এক হাজার বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময় এমন এক ইতিহাস লেখা যাক, যাতে এক হাজার বছরের মুসলমান বাদশাহদের ইতিহাস থাকবে। আরবিতে ‘আলিফ’ মানে হাজার— ‘আলিফ লয়লা’র অর্থ হাজার রাত্রি, ইতিহাসের নাম ‘তারিখ-আলফী’ রাখা ঠিক হয়।
এমন বৃহৎ গ্রন্থ এক ব্যক্তির পক্ষে লেখা সম্ভব নয়, সেজন্য এক-এক অংশ এক-একজনকে বণ্টন করে দেওয়া হয়। পয়গম্বরের মৃত্যুর পর এক-এক বছরের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় সাতজনকে। প্রথম বছর নকীব খাঁকে, দ্বিতীয় বছর শাহ ফতাহ্-উল্লাকে। এইভাবে হাকিম হুমাম, হাকিম আলী, হাজী ইব্রাহিম সরহিন্দী, মির্জা নিজামুদ্দীন আহমদ ও মোল্লা বদায়ূনী এক-একটি অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এইভাবে দ্বিতীয় সপ্তাহে আরও সাতজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পয়গম্বরের মৃত্যুর পর পঁয়ত্রিশ বছরের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। একদিন রাত্রে মোল্লা আকবরকে সপ্তম বছরের লিখিত বিবরণ পাঠ করে শোনাচ্ছিলেন। তাতে দ্বিতীয় খলীফা উমরের সময়ের কিছু প্রসঙ্গ ছিল, তাতে শিয়া-সুন্নীর মতভেদের উল্লেখ ছিল। নসিবীন মেসোপোতামিয়ার খুব সুন্দর শহর এবং বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র ছিল। সেখানে মুসলমানদের বিজয়ের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মোল্লা লিখেছিলেন : ইসলামী ফৌজ যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছায়, তখন মুরগির মতো বড় : বড় পিঁপড়ে বেরোতে দেখা যায় । তাই শুনে বাদশাহ বিরক্তি প্রকাশ করে মোল্লাকে প্রশ্ন করলেন— “একথা কেন লিখেছ?”
মোল্লা বললেন— “আমি বইপত্রে যা পেয়েছি তাই লিখেছি, এটা আমার মন-গড়া নয়।” মোল্লার বক্তব্য অনুযায়ী খাজানে (পুস্তকাগার) থেকে মূল বইপত্র আনিয়ে নকীব খাঁকে যাচাই করতে দেওয়া হলো। নকীব খাঁ যখন বললেন— সত্যি সত্যি বইপত্রে একথাই লেখা আছে— তখন শেখ বদায়ূনী হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন ।
মির্জা নিজামুদ্দীন আহমদ পাক্কা শিয়া ছিলেন। আকবরের আমলে ছাড় ছিল, সেজন্য তাঁর মনে যা এসেছিল, তাই লিখেছিলেন। চেঙ্গিস খাঁর সময় (ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম পাদ) পর্যন্ত তিনি দুই খণ্ড গ্রন্থ লিখে ফেলেছিলেন। লোকমুখে জানাজানি হয় যে ওই শিয়া সুন্নীদের এবং তাদের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের কুৎসা করেছেন, তখন মির্জা ফওলাদ বিরলস খুব ক্রুদ্ধ হয়। সে মির্জা আহমদের গৃহে যায় এবং দু’জনে একসঙ্গে গৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হন। পথিমধ্যে ফওলাদ মির্জাকে হত্যা করে। হত্যাকারীও তদনুরূপ দণ্ড পায়। তারপর হিজরী ৯৯০ (১৫৮২ খ্রিঃ) পর্যন্ত ইতিহাস লেখেন আসফ খাঁ।
১০০২ হিজরীতে (১৫৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দে) মোল্লা বদায়ূনীর প্রতি হুকুম হয় গোড়া থেকে ইতিহাস মিলিয়ে দেখতে এবং ঘটনাকাল আগে-পিছে হলে সংশোধন করতে। প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড বদায়ূনী সংশোধন করেন, তৃতীয় খণ্ডের দায়িত্ব আসফ খাঁর উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এইভাবে ‘তারিখ-আলফী’র কিছু অংশ মোল্লা বদায়ূনী নিজে লিখেছিলেন এবং তিন খণ্ডের মধ্যে দুই খণ্ডের সংশোধনের কাজও করেছিলেন।
৪. মহাভারত—
সে-বছরই (১৫৯৩-৯৪ খ্রিঃ) মহাভারত অনুবাদের কাজ শুরু হয়। আকবর সে-সময় ‘শাহনামা’ ও অন্যান্য পুস্তক-পাঠ শুনেছিলেন, কোনো- কোনোটা তো একাধিকবার। আকবরের মনে হলো, আমাদের ভারতেও নিশ্চয়ই এমন বইপত্র থাকতে পারে । তখন তাঁকে মহাভারতের কথা বলা হয়। এ কথাও জানানো হয় যে তাতে নানারকম উপাখ্যান, উপদেশ, নীতিবাক্য, জীব, ধর্ম, তত্ত্ব ও উপাসনার বিধি ইত্যাদি রয়েছে। ভারতের মানুষ এ গ্রন্থ পাঠ করা ও লেখাকে পরম উপাসনা বলে মনে করেন।
‘শাহনামা’ ও ‘আমির হামজার কথা’ পুস্তক দু’টিকে বাদশাহ সচিত্র করে লিখিয়েছিলেন। এবার তিনি ভারতের এই শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি দেখার জন্য এতই উৎসুক হয়ে উঠলেন যে পণ্ডিতদের সমবেত করে তাঁদের কাছে মহাভারতের কথা শুনতে থাকেন, নিজেই ফারসিতে তা নকীব খাকে বলে যান, আর নকীব খাঁ তা লিপিবদ্ধ করেন।
কিন্তু দেড় লক্ষ শ্লোকবিশিষ্ট মহাভারতের মতো বিশাল গ্রন্থ তাঁর পক্ষে নিজে অনুবাদ করা সম্ভব ছিল না, সেজন্য তৃতীয় রাত্রিতে তিনি মোল্লা বদায়ূনীকে ডেকে আদেশ করলেন— “নকীব খাঁর সঙ্গে মিলে তুমি এটা লেখো।” তিন-চার মাসে তিনি অষ্টাদশ পর্বের মধ্যে মাত্র দুই পর্বের অনুবাদ সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। একদিকে অনুবাদ হতে থাকত, রাত্রে আবার তা বাদশাহকে পাঠ করে শোনানো হতো।
বদায়ূনী কট্টর মোল্লা ছিলেন, বিধর্মীদের পুস্তক অনুবাদের কাজকেও তিনি মহাপাপ বলে ভাবতেন। ১৯৯ হিজরীতে (১৫৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দে) এই পাপ ক্ষালনের জন্য মোল্লা কুরান লিখে তাঁর পীর শেখ দাউদ জহনীর কবরে তা অর্পণ করেন এবং প্রার্থনা করেন, এর দ্বারা যেন তাঁর সমস্ত পাপ মুছে যায়। বাদশাহ তাঁর অনুবাদে গোঁড়ামির প্রতিফলন লক্ষ্য করেছিলেন এবং তাঁকে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন হারামখোর।
বাকি অনুবাদের কাজ মোল্লা শেরী ও নকীব খাঁকে দেওয়া হয়েছিল। হাজী সুলতান খানেসরীও কিছু কাজ করেছিলেন। ফৈজীকে গদ্য-পদ্যে রচনা করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুই পর্বের বেশি এগোয়নি। বাদশাহ মোল্লার ধূর্তামি থেকে অনুবাদকে রক্ষা করার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন— মক্ষিকার জায়গায় মক্ষিকা অনুবাদ করো। মোল্লা সাহেব এই বিধর্মীর গ্রন্থ অনুবাদের উপর নিজের সহজাত ঘৃণা প্রকাশ করে লিখেছেন— “অধিকাংশ অনুবাদক কৌরব ও পাণ্ডবদের কাছে পৌঁছে গেছেন। যাঁরা বাকি রয়েছেন, খোদা তাঁদের মুক্তি দিন এবং তাঁদের তোবা মঞ্জুর করুন।”
ফিরদৌসীর বিখ্যাত গ্রন্থের নাম ‘শাহনামা’ (রাজগ্রন্থ), তাতে কবি ইরানের বীরদের গাথা-কাহিনী বড় সুন্দর ভঙ্গিতে পদ্যবন্ধ করেছেন। বাদশাহ ভারতের বীরদের এই মহাগ্রন্থের নাম ‘রজম্নামা’ (যুদ্ধ-গ্রন্থ) রাখেন। আজকালকার মতো তখনও মহাভারতের অর্থ মহাযুদ্ধ বলেই গণ্য হতো।
এই গ্রন্থটিকে বাদশাহ দু’-দু’বার সচিত্র করে লিখিয়েছিলেন এবং আমিরদেরও হুকুম দিয়েছিলেন যে তাঁরাও যেন পুণ্যের কাজ ভেবেই এরূপ করেন। আবুল ফজল এ গ্রন্থের আট পৃষ্ঠার ভূমিকা লিখেছেন। একজন ঐতিহাসিক লিখেছেন : এই কাজের দরুন মোল্লা সাহেব এক শত পঞ্চাশ আশরফি এবং দশ হাজার টাকা ইনাম পেয়েছিলেন । মোল্লা অধর্মের রোজগার মনে করে এ কথা গোপন করার চেষ্টা করেছেন।
৫. রামায়ন—
৯৯২ হিজরীতে (১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে) বাদশাহ বাল্মীকি রামায়ণ অনুবাদের ভার দেন মোল্লা বদায়ূনীকে। পঁচিশ হাজার শ্লোক-বিশিষ্ট রামায়ণ মহাভারতের চেয়েও প্রাচীন। মোল্লা তাঁর ইতিহাসে মধুর দংশন করে বলেছেন— “একটা গল্প। রামচন্দ্র অযোধ্যার রাজা ছিলেন। তাঁকে রামও বলা হয়, ঈশ্বরের মহিমার প্রকাশ ভেবে লোকে তাঁর পুজো করে। তাঁর সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত এই : তাঁর রানী সীতার
প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে এক দশ মাথা-ওয়ালা দৈত্য (রাক্ষস) তাকে হরণ করে নিয়ে যান। তিনি লঙ্কা দ্বীপের রাজা ছিলেন। রামচন্দ্র তার ভ্রাতা লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে সেই দ্বীপে যান, অসংখ্য বানর ভল্লুক সৈন্য সংগ্রহ করেন।…
সমুদ্রের উপর চার শত ক্রোশ দীর্ঘ সাঁকো তৈরি করা হয়। কোনো কোনো বানর সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা লক্ষ প্রদান করে সমুদ্র পেরিয়ে গেল। কিছু পায়ে হেঁটে সাঁকো পেরুলো। এইরকম যুক্তিহীন বহু ব্যাপার, শুনলে মুখ দিয়ে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ কিছুই বেরোয় না। রামচন্দ্র কোনোরকমে বানরের কাঁধে চড়ে সাঁকো পেরুলেন।
এক সপ্তাহ ধুন্ধুমার যুদ্ধ হলো। রাবণ পুত্র-পৌত্র সহ নিহত হলেন। হাজার বছরের বংশ ধ্বংস করে দেওয়া হলো। রাবণের ভ্রাতাকে লঙ্কার সিংহাসনে বসিয়ে রামচন্দ্র ফিরে এলেন। হিন্দুদের বিশ্বাস, রামচন্দ্র পূর্ণ দশ হাজার বছর ভারতবর্ষ শাসন করে স্বস্থানে ফিরে গিয়েছিলেন। এসব কথা সত্য নয়, কেবল গল্প, কেবল কল্পনাবিলাস, যেমন শাহনামা ও আমির হামজার কিস্সা।” রামায়ণ- মহাভারতের কাহিনী মোল্লার নিকটে স্রেফ কিস্সা মনে হয়েছিল, কিন্তু নসিবীনের মুরগির সমান পিঁপড়ে তাঁর নিকটে সত্য বলে মনে হয়েছিল। লাহওয়ল ওয়ালা কুওয়াত।
৬. মু-অজমুল-বলদান—
একদিন হাকিম হুমাম দুই শত জুজ (চল্লিশ হাজার শ্লোকের সমান) বিশিষ্ট এই পুস্তকখানির প্রশংসা করেন বাদশাহের কাছে। বাদশাহ কয়েকজন অনুবাদককে কাজটার দায়িত্ব দেন। মোল্লার ভাগে পড়ে দশ জুজ, তিনি তা এক মাসের মধ্যে আরবি থেকে ফারসিতে অনুবাদ করে দেন। বাদশাহ মোল্লার ভাষা ও তৎপরতা দেখে খুশি হন ।
৭. নজাতুর্-রশীদ—
উপরোক্ত পুস্তক সমাপ্ত করার পর মোল্লা অসুস্থ হয়ে ছুটি নিয়ে খাজা নিজামুদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে নিজের জায়গির শামশাবাদ চলে যান। ঘরে গিয়ে খাজার কথায় মোল্লা এই পুস্তকখানি রচনা করেন। এতে মেহ্দী মতবাদের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি এমন চমৎকারভাবে বিষয়টির উপস্থাপনা করেছেন যে মোল্লার অপরিচিত কেউ পাঠ করলে মনে করতে পারে, মোল্লা বদায়ূনী স্বয়ং মেহ্দীপন্থী ছিলেন। কিন্তু মীর সৈয়দ মুহম্মদ জৌনপুরী মেহ্দীর উপর তাঁর যা কিছু কৃপা, তার কারণ অন্য ।
মুহম্মদ জৌনপুরীর জামাতা শেখ আবুল ফজল গুজরাতীর সঙ্গে মোল্লা বদায়ূনীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা ছিল। মেহ্দীপন্থী লোকজন কেবলমাত্র আর্থিক সাম্যেরই প্রচার করেনি, তাদের মধ্যে সন্ত-সুফীদের মতো ধ্যান-যোগও চলত। শরীয়তের বহুবিধ কর্তব্য-পালনে তারা অন্যান্য মুসলমানদের থেকে এক পা এগিয়ে থাকত। সেই কারণে মোল্লা বদায়ূনী মেহ্দীপন্থীদের সঙ্গে সুবিচার করার উদ্দেশ্যে তাদের মতের ধ্যান-উপাসনা শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে নিজের মতাবলম্বীদের সুপরিচিত করে, মেহ্দী মত ও পথের ধ্যান-উপাসনা শিক্ষা-দীক্ষার উপকারের ঋণ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন ।
সেই বছরই, মোল্লা যখন অসুস্থতাজনিত ছুটি নিয়ে বদায়ূনে রয়েছেন, তখন বাদশাহ ‘সিংহাসন বত্তীসী’ পুনরায় অনুবাদ করার জন্য বার কয়েক হুকুম পাঠান। প্রথম অনুবাদ পাঠাগারে নিখোঁজ হয়ে যায়। আকবরের বেগম সলীমা সুলতানের খুব পছন্দ ছিল পুস্তকখানি, তিনি বারবার বাদশাহকে তাগাদা দিচ্ছিলেন। মোল্লা বাদশাহের আদেশ উপেক্ষা করে বদায়ূনে পড়ে রইলেন। আকবর হুকুম দিলেন— ওর জায়গির বাতিল করে দাও। আর লোক পাঠাও, ওকে ধরে আনুক। শেখ আবুল ফজল বর্ম হয়ে মোল্লাকে রক্ষা করেন।
৮. জামে’অ-রশীদী—
এই আরবি ইতিহাস গ্রন্থটির প্রশংসা শুনে বাদশাহ সেটি অনুবাদ করতে মনস্থ করেন। মির্জা নিজামুদ্দীন আহমদ ইত্যাদি ব্যক্তিরা কাজটির ভার বদায়ূনীর উপর দেওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। মোল্লা এসে উপস্থিত হলে আল্লামী শেখ আবুল ফজলের পরামর্শানুক্রমে মোল্লার প্রতি অনুবাদের কাজ করার আদেশ হয় । এই গ্রন্থে বনী-উমাইয়া, আব্বাসিয়া, মিশরী খলীফাদের বিশদ বর্ণনা আছে। ইসলামের সেবাকর্ম, সেজন্য মোল্লা খুব আনন্দের সঙ্গে কাজটা করেছিলেন ।
৯. মুন্তখিবুত্-তওয়ারিখ—
মোল্লা বদায়ূনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক গ্রন্থ এটি। এ-গ্রন্থ তিনি টাকা-পয়সার জন্য লেখেননি, ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসার তাগিদেই লিখেছেন। যদিও উদারপন্থীদের তিনি সরাসরি দংশন করতে ছাড়েননি, তবুও ঐতিহাসিক-সুলভ দ্বিধাকৃত অভিমত প্রকাশের নমুনাও এতে রয়েছে। আকবরের আমলের শেষ বছরগুলি অতিক্রম করে জাহাঙ্গিরের শাসনকাল পর্যন্ত গ্রন্থটিকে বড় কষ্টে রক্ষা করতে হয়েছিল । জাহাঙ্গির যখন গ্রন্থটি সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তিনি সেটিকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ততদিনে সে-গ্রন্থ একখানা থেকে হাজারখানা হয়ে যায়, তখন তা আর বিনষ্ট করা সম্ভব ছিল না।
হুসেন খাঁ টুকড়িয়া যেমন নিজের তরোয়ালের অপপ্রয়োগ করেছিলেন, খানিকটা সেরকমই নিজের কলমের অপপ্রয়োগ করেছিলেন মোল্লা বদায়ূনী, তবে অপপ্রয়োগের বদলে প্রায়শই তিনি সত্য উদ্ঘাটনে সফল হয়েছেন ।
মোল্লা বদায়নী আগরায়
সম্ভল কিংবা বায়ানায় থেকে বেশি পড়াশোনা করা সম্ভব ছিল না, সেজন্য সাতান্ন বছর বয়সে পিতা, ১৫৫৮-৫৯ খ্রিস্টাব্দে (৯৬৬ হিজরীতে), পুত্র-সহ দেশ ছেড়ে আগরায় যান। সেখানে পুত্র মীর সৈয়দ মুহম্মদের টীকা ‘শমশিয়া’ অধ্যয়ন করেন।
মীর আলী হমদানীর পুত্র ছিলেন মীর সৈয়দ মুহম্মদ। কাশ্মীরকে মুসলমান করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল হমদানীর। সে-সময় নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত বুখারা- নিবাসী কাজী আবুল মুওয়ালী আগরায় থাকতেন। সমরকন্দ ও বুখারায় তখন দর্শন ও তর্কশাস্ত্রের খুব বাড়-বাড়ন্ত। লোকে ধার্মিক মুসলমানদের ঠাট্টা করে বলত—“গাধা, একদম গাধা।” কেউ বারণ করলে বলত— “আমরা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারি ।
দেখো, প্রত্যক্ষভাবেই গাধা পশু নয়। পশু সাধারণ, মানুষ বিশিষ্ট যেহেতু তার মধ্যে পশু-প্রবৃত্তি (সাধারণ) নেই। আবার ওদের মধ্যে বিশিষ্ট মনুষ্য-স্বভাবও নেই। তাহলে গাধা নয় তো কি?” এসব কথা এমন সীমা ছাড়িয়ে গেল যে সেখানকার শেখ-সুফীরা ফতোয়া লিখে খান আব্দুল্লার সম্মুখে পেশ করলেন এবং তর্কশাস্ত্র অধ্যয়ন-অধ্যাপনা অবৈধ ঘোষণা করে দিলেন।
এই সব কাণ্ডের জেরে কাজী আবুল মুওয়ালীকে এবং আরও অনেককে সেখান থেকে বহিষ্কার করা হয়। আব্দুল কাদির আবুল মুওয়ালীর নিকটেও পড়াশোনা করেছিলেন। সে-সময় নকীব খাঁ তাঁর সহপাঠী ছিলেন। এই পরিচয় তাঁর খুব কাজে এসেছিল, কেননা নকীব খাঁ পরে আকবরের পুস্তক-পাঠক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
সেকালে ফৈজী ও আবুল ফজলের পিতা শেখ মুবারকের বিদ্যাবত্তার খুবই সুখ্যাতি ছিল, যদিও মোল্লারা তাঁকে বিধর্মী বলতে কুণ্ঠিত হতেন না। এবার আব্দুল কাদির তাঁর শিষ্য হলেন। তিনি তাঁর গুরুর বিষয়ে লিখেছেন : “আমি যৌবনে কয়েক বছর তাঁর চরণাশ্রিত হয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার উপর তাঁর অধিকার যথেষ্ট।” ফৈজী ও আবুল ফজল তাঁর গুরু-পুত্র। যদি তাঁরা পুত্র হিসেবে মুবারকের বিদ্যা ও প্রতিভায় সমৃদ্ধ হন, তাহলে আব্দুল কাদির শিষ্য হিসেবে।
কিন্তু, যেখানে পুত্ররা পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর স্বতন্ত্র চিন্তা-ভাবনা লাভ করেন, সেখানে আব্দুল কাদির মোল্লা-কে-মোল্লাই থেকে যান, আর সেই কারণেই তিনি উন্নতি করতে পারেননি, যদিও তার ফলে আকবরের দরবারে তাঁর পৌছানোর পথ সুগম হয়েছিল আগরায় সর্দার মেহের আলী বেগ আব্দুল কাদির ও তাঁর পিতাকে নিজের কাছে খুব সমাদরে রেখেছিলেন । শেরশাহী আমলে আলী খানও ছিলেন, তাঁর কর্মচারী জামাল খাঁ চুনারগড়ের (জেলা মির্জাপুর) হাকিম ছিলেন।
তিনি স্বয়ং আকবরের দরবারে প্রার্থনা জানালেন যে যদি কোনো শাহী আমির আসেন, তাহলে তিনি তাঁর হাতে দুর্গ সমৰ্পণ করে দেবেন। বৈরাম খাঁ এ কাজের জন্য মেহের আলীকেই উপযুক্ত মনে করলেন । বেগ মোল্লা আব্দুল কাদিরকে বললেন—তুমিও চলো। তিনি স্বয়ং মোল্লা এবং মোল্লার পুত্র ছিলেন। চুনার গিয়ে আবার কি বিপদে জড়িয়ে পড়েন, তার চেয়ে আগরায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই ভালো মনে করলেন আব্দুল কাদির। বেগ মলুকশাহ ও শেখ মুবারককে নিরুপায় করার জন্য বললেন—যদি তিনি না যান, তাহলে আমিও যেতে অস্বীকার করব। শেষে আব্দুল কাদিরকে সম্মতি দিতে হলো। লিখেছেন—
“ভরপুর বর্ষাকাল । কিন্তু দুই গুরুজনের কথা মান্য করা উচিত মনে হলো। নতুন যাত্রা, পড়াশোনা শিকেয় তুলে পথ-পর্যটনের আশঙ্কা ও বিপদ মাথায় নিতে হলো। কনৌজ, লখনৌতী, জৌনপুর, বারাণসী (বেনারস) পাড়ি দিতে দিতে, পৃথিবীর বৈচিত্র্য দেখতে দেখতে, জায়গায় জায়গায় আলিম ও শেখদের সাহচর্য লাভ করতে করতে গেলাম।
আমরা চুনারে পৌছলাম, তো জামাল খাঁ খুব দেখনদারির সঙ্গে খাতির তোয়াজ করলেন। কিন্তু বুঝতে পারলাম, মনের মধ্যে মতলব আছে। মেহের আলী বেগ আমাকে সেখানেই রেখে, নিজে বাড়িঘর ঘুরে দেখার অজুহাতে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কাঁধের বোঝা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেলেন। জামাল খাঁ দুর্নামের ভয়ে ঘাবড়ে গেলেন। আমি বললাম— ‘কোনো ক্ষতি নেই, কেউ হয়তো ওঁর মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। ঠিক আছে, আমি নিজে গিয়ে ওঁকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে নিয়ে আসছি”।”
এই বাহানায় মোল্লাও সেখান থেকে চম্পট দিলেন। চুনার দুর্গ পাহাড়ের উপর, নিচে গঙ্গা সশব্দে বয়ে চলেছে। নৌকায় যাচ্ছিলেন। বর্ষার স্রোতোবেগ নৌকাটাকে টেনে নিয়ে চলল। এরপর মোল্লা তাঁর ভয়-আশঙ্কার কথা বর্ণনা করেছেন— “নৌকা খুব বিপজ্জনক ঘূর্ণিজলে গিয়ে পড়ল।
তরঙ্গাঘাতে দুর্গ-প্রাচীরের কাছে একটা পাহাড়ি খাঁজে আটকে গেল । বিরুদ্ধে এমন বাতাসও বইতে শুরু করল যে মাল্লারা কিছুই করে উঠতে পারছিল না। জঙ্গল ও নদীর ভগবান যদি না তখন কর্ণধার হতেন, তাহলে আশঙ্কা করছিলাম, নৌকা ওই আপদ ঘূর্ণিতে পড়ে সাক্ষাৎ-মৃত্যু পাহাড়ে গিয়ে ঠোক্কর খাবে।
নদী পেরিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। খবর পেলাম, গওয়ালিয়রের সন্ত শেখ মুহম্মদ গওস পাহাড়ের ধারে এই জঙ্গলে তপস্যা করতেন। তাঁর এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হলো । তিনি একটি গুহা দেখিয়ে বললেন— ‘এখানেই শেখ মুহম্মদ গওস গাছের পাতা খেয়ে বারো বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন’।”
আগরায় তিন বছর ছিলেন, এমন সময় ১৫৬১-৬২ খ্রিস্টাব্দে (৯৬৯ হিজরীতে) পিতার মৃত্যু হয়। তাঁর শবদেহ বিসাওয়রে নিয়ে গিয়ে কবরস্থ করা হয়। পরের বছর মোল্লা সম্ভলে (মুরাদাবাদ) সহসওয়ান এলাকায় ছিলেন। সেখানে চিঠি পেলেন, মাতামহ মখদুম আশরফও বিসাওয়রে প্রাণত্যাগ করেছেন।
দু’বছরের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও সহৃদয় পিতা ও মাতামহের বিয়োগ-ব্যথা তাঁকে সহ্য করতে হয়। তখন সংসার যেন তেড়ে আসছে তাঁকে দংশন করতে। “দুই বিষাদ, দুই শোক, আর আমি একা। একটি মাথা, দুইটি খোয়ারি ঝেড়ে ফেলার শক্তি কোথায় পাব? একটি বুক, দুইটি বোঝা কি করে বইব?”
মোল্লা বদায়নীর বাল্যকাল
মোল্লা আব্দুল কাদির বদায়ূনী সমসাময়িক কালে একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ও বলিষ্ঠ লেখনী শক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি প্রচুর লিখেছেন, এবং সেই লেখাগুলি এমন যে, যে- কোনো পাঠাগারের পক্ষে তা মহামূল্যবান রত্ন হিসেবে পরিগণিত হতে পারে।
শামশুল-উমা মুহম্মদ হুসেন আজাদ বদায়ূনীর মোল্লাপনা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কঠোর বিরোধী ছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর যোগ্যতা স্বীকার করে লিখেছেন— “রাজ্যের সাধারণ যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সেনা-অভিযান সম্পর্কে যে-কোনো ব্যক্তিই পরিচিত হতে পারে, কিন্তু রাজ্যের অধিপতি ও রাজ্যের স্তম্ভ-সমুদয় থেকে শুরু করে প্রত্যেকের চাল-চলন, তাদের গোপন ও প্রকাশ্য ব্যাপার-স্যাপার সম্পর্কে বদায়ূনী যতটা পরিচিত ছিলেন, সম্ভবত অন্য কেউ ততটা নয়।
তার কারণ, নিজের গ্রন্থ ও শিক্ষা বিষয়ক অভিজ্ঞতা, সমাজ-সচেতনতা ইত্যাদি গুণাবলী তাঁর মধ্যে ছিল। আকবরের নিভৃত বাস-গৃহে ও দরবারে সর্বদা বাদশাহের সন্নিকটে তিনি স্থান পেতেন, কথা বলার সুন্দর ভঙ্গিতে বন্ধুত্ব-সুলভ আলাপ-আলোচনায় দরবার মাতিয়ে দিতেন। সেই সঙ্গে আলিম, সন্ত, শেখ-রা তো তাঁর বাড়িরই লোকজন। যেটি প্রশংসার যোগ্য তা হলো, তিনি তাঁদের মধ্যেই থাকতেন, অথচ তাঁদের দোষ-ত্রুটির সঙ্গে কখনও নিজেকে জড়াতেন না ।
দূর থেকে দেখতেন, সেজন্য তাঁদের দোষ-গুণ ভালোভাবে তাঁর দৃষ্টিগোচর হতো। উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতেন, সেজন্য প্রত্যেকটি জায়গার খবর এবং সেই খবরের তাৎপর্য তাঁর অবগত হতো। তিনি আকবর, আবুল ফজল, ফৈজী, মখদুমুল্-মুক্ ও সদরের (নবীর) প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাই যা-কিছু ঘটেছিল, সমস্ত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করেন। আসল কথা হলো, একটা স্বতন্ত্র লিখন-শৈলী ছিল তাঁর।
তাঁর লেখনী-মুখে সেই গুণ ছিল ভগবদ্দত্ত। তাঁর ইতিহাসে কিছু ঘাটতি আছে ঠিকই, তাতে বিভিন্ন অভিযান ও বিজয়ের বিবরণ পাওয়া যায় না, ঘটনার পারম্পর্যও রক্ষা করেননি, কিন্তু তাঁর গুণের প্রশংসা কোন কলমে লিখি? তাঁর ইতিহাস আকবরের আমলের এক প্রতিচ্ছবি। … তাঁরই সৌজন্যে আমরা সমগ্র আকবরী যুগটাকে দেখতে পাই ।
এতসব বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও যে দুর্ভাগ্য তাঁর উন্নতির প্রতিবন্ধকতার মূলে, তা হলো, যুগের সঙ্গে তিনি তাঁর মানসিকতাকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। যে ব্যাপার তিনি খারাপ মনে করতেন, তিনি চাইতেন, সেটা তাঁর নিজের মনোমতো হোক।… যেমন তাঁর মনে উদ্দীপনা ছিল, তেমনি তাঁর রসনায় জোর ছিল। সেজন্য তিনি যে কোনো উপলক্ষ্যে কোনো দরবারে ও বৈঠকে কথা না বলে থাকতে পারতেন না। আর এই স্বভাবটাই
আকবর তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল।… “অসাফল্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু কলম ও কাগজের উপর তো তার আধিপত্য, যেই সুযোগ পেতেন, কলমে খসখস করে মোক্ষম চোট দিয়ে বসতেন । এমন চোট যে কেয়ামত পর্যন্ত সারবার নয়। ”
“মোল্লা বদায়নী শরীয়তের বিধি-নিষেধের ব্যাপারে কট্টর মোল্লাদের চেয়েও কয়েক পা বেশি এগিয়ে থাকতে চাইতেন, গাইতেন বাজাতেন, বীণার তারে সুর তুলতেন, দু-চার হাত দাবাও খেলে নিতেন— যাকে বলা হয় সর্ববিদ্যাবিশারদ। তিনি তাঁর পুস্তকে প্রত্যেকটি ঘটনা প্রত্যেকটি কথা খুব সুন্দরভাবে বলেছেন, এমন চিত্রাঙ্কন করেছেন যে কিছুই বাদ পড়েনি। তাঁর ইতিহাসের (“মুন্তখিবুত্-তওয়ারিখ”-এর) প্রত্যেকটি শব্দ চুটকি, প্রত্যেকটি বাক্যই পরিহাস (রূপক)। তাঁর লেখনীর ছিদ্রে রয়েছে হাজার হাজার বাণ ও ছোরা ।
তাঁর লেখায় বাক্য সুবিন্যস্ত করার কোনো প্রয়াস নেই। তিনি অনেক বিষয়ই এলোপাথাড়ি লিখে যান। তাই দিয়ে তিনি যেদিকে খুশি সুচ বেঁধান, যেদিকে চান শলাকা, যেদিকে ইচ্ছে ছুরি চালিয়ে দেন। দরকার মনে করলে একহাত তরোয়ালের কোপও ঝাড়েন। এসব এমন চমৎকারভাবে করেন যে, যারা দেখে তাদের কথা ছেড়েই দিন, আহত ব্যক্তিরও মন ভরে যায়। নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা- তামাশা করতেও ইতস্তত করতেন না। সবচেয়ে প্রশংসনীয় যে, আসল ঘটনা উদ্ঘাটনে তিনি বন্ধু ও শত্রুর মধ্যে কোনো ভেদ রাখতেন না ।”
মোল্লা বদায়ূনীর “মুন্তখিবুত্-তওয়ারিখ” (ইতিহাস-সংগ্রহ) আকবরের আমলে লোকচক্ষুর অন্তরালে লেখা হয়েছিল। যদি তার ছ্যাঁকা আকবর ও তাঁর সভাসদদের লাগত, তাহলে মোল্লার রেহাই থাকত না। তিনি এটি খুব সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আকবরের আমলে কেউ সন্ধান পায়নি। জাহাঙ্গিরের আমলে তা জানা যায়। তিনি গ্রন্থখানি দেখেছিলেনও। হুকুম দিয়েছিলেন, মোল্লা আমার পিতার বদনাম করেছেন, ওঁর পুত্রকে কয়েদ করো, বাড়ি লুটপাট করো। বদায়ূনীর উত্তরাধিকারীদের গ্রেপ্তার করে আনা হলো।
তাঁরা বললেন— “আমরা তো সে-সময় শিশু ছিলাম, কিছুই জানতাম না আমরা।” তাঁরা মুচলেকা দিলেন যে তাঁদের কাছ থেকে যদি কোনো পুস্তক উদ্ধার হয়, তাহলে যে-কোনো শাস্তি তিনি দিতে পারেন। পুস্তক-বিক্রেতাদের কাছ থেকেও মুচলেকা নেওয়া হলো যে তারা ওই ইতিহাস কিনবে না, বিক্রীও করবে না। খাফী খাঁ শাহজাহানের আমল থেকে মুহম্মদশাহের আমল পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী কাটিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন যে যাবতীয় কড়াকড়ি সত্ত্বেও রাজধানীতে পুস্তক- বিক্রেতাদের দোকানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন বদায়ূনী ।
মোল্লা বদায়ূনী শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন, আজাদের কয়েকটি লাইন থেকে তা বোঝা যাবে। যদিও ফৈজীর মতো তিনি সংস্কৃতজ্ঞ ছিলেন না, তথাপি অপরাপর পণ্ডিতদের সাহায্য নিয়ে তিনি ‘বত্রিশ সিংহাসন’, ‘মহাভারত’, ‘রামায়ণে’র মতো সংস্কৃত গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন । এ থেকে এটাও বোঝা যায় যে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল বহুমুখী ।
মোল্লা আব্দুল কাদির বদায়ূনী গর্বভরে বলতেন যে তাঁর জন্ম হয়েছিল বাদশাহ শেরশাহের আমলে । তিনি আকবরের বিধর্মী ঠাটবাটে বিরক্ত ছিলেন। শেরশাহকে মনে করতেন খাটি ধর্মপরায়ণ সম্রাট। অথচ অনেক অবাঞ্ছিত কথাবার্তা শুরু করেছিলেন শেরশাহ নিজেই। মোল্লাকে বলা হয় বদায়ূনী, তাতে এরকম ধারণা হতে পারে যে তিনি বদাŽতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তা নয়। বস্তুত, হয় আগরা থেকে আজমের যাওয়ার পথে পঞ্চশ ছাউনি বিসাওয়রের কাছে অবস্থিত টোণ্ডা নামক গ্রামে, তাকে টোণ্ডাভীমও বলা হতো। সে সময় তা আগরা সরকারের (জেলার) অন্তর্ভুক্ত, আবার কখনও তা আজমের সুবায় পড়ত। তাঁর মাতুলালয় ছিল বায়ানা, যেখানে সাম্যবাদের শহীদ শেখ আল্লাঈ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মোল্লা খলীফা উমরের বংশের ফারুকী শেখ ছিলেন। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষের সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দেননি। বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না।
তবে হ্যাঁ, মাতুলালয় ও পিত্রালয় উভয়ই শিক্ষা ও ধর্ম বিষয়ে দীনহীন ছিল না। তাঁর পিত, হামিদশাহের পুত্র মলুকশাহ, সম্ভলের সন্ত শেখ মঞ্জুর শিষ্য ছিলেন। পিতা মামুলি আরবি-ফারসি বইপত্র পড়েছিলেন। তাঁর মাতামহ মখদুম আশরফ ইসলামশাহের এক পাঁচহাজারী সর্দারের সেনাবাহিনীতে ফৌজী অফিসার ছিলেন এবং সেই সূত্রে আগরার ছোট শহর বায়ানার কাছে বিজওয়াড়ায় থাকতেন। ১৫৪৫ থেকে ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দ (৯৫৩-৯৬১ হিঃ) পর্যন্ত শেখ আব্দুল কাদির পিতা মলুকশাহের কাছে ছিলেন।
সম্ভলে থেকে পাঁচ বছর বয়সে তিনি কুরান ইত্যাদি পাঠ করেন। তারপর মাতামহ তাঁকে নিজের কাছে ডেকে নেন এবং ব্যাকরণ ইত্যাদি বহু বইপত্র নিজে পড়ান। দুটি বংশেরই লোকজন ধর্মে অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর পীর (দীক্ষাগুরু) সৈয়দ মুহম্মদ মখদুম সেখানেই থাকতেন ।
তিনি খুব ভালো কুরান পাঠক ছিলেন। তিনি আব্দুল কাদিরকে মধুর স্বরে কুরান পাঠ করা শেখান। তখন ৯৬০ হিজরী (১৫৫২-৫৩ খ্রিঃ), ইসলামশাহ শূরীর শাসনকাল। প্রসিদ্ধ কুরান পাঠকের শিষ্য হওয়াটা তাঁর কাছে খুব লাভজনক হয়েছিল। আর এই কারণেই আকবরের দরবারে গিয়ে তিনি বাদশাহ কর্তৃক সাত দিনে সাত ইমামের একজন হয়ে ‘ইমাম-আকবরশাহ’ পদবি লাভ করেন । তাঁর জন্ম
তিনি লিখেছেন : “বারো বছর বয়স। পিতা সম্ভলে এসে মিয়া হাতিম সম্ভলীর আতিথ্য গ্রহণ করেন। ১৫৫৩-৫৪ খ্রিস্টাব্দে (৯৬১ হিজরীতে) মিয়া সম্ভলীর খানকাহে (মঠে) পৌছে তিনি বহু ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করেন এবং তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন।
মিয়া একদিন পিতাকে বললেন যে তিনি তাঁর গুরু মিয়া শেখ আজীজুল্লা সাহেবের পক্ষ থেকে আব্দুল কাদিরকে টুপি-চাদর পুরস্কার দেবের যাতে বাইরের লোকজনের কাছেও তাঁর বিদ্যা স্বীকৃতি লাভ করে। এর ফল হলো, বদায়ূনী ফিকা (ধর্মশাস্ত্র) অত্যন্ত অনুশীলন করেছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে ভাগ্য তাঁকে অন্য দিকে চালিত করেছিল, কিন্তু মুসলিম ধর্মশাস্ত্র তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল বরাবর । শেখ সাদুল্লা নহবী একজন ব্যাকরণের বিচক্ষণ আচার্য ছিলেন। তিনি বায়ানায় থাকতেন। মাতামহের গৃহে এসে আব্দুল কাদির তাঁর কাছে ‘কাফিয়া’ পুস্তক পাঠ
করেন। যখন হেমুর সৈন্যরা লুঠপাট করতে করতে বিসাওয়রে পৌছায়, তখন আব্দুল কাদির সম্ভলে ছিলেন। লুঠপাটে বিসাওয়র বরবাদ হয়ে যায়। বড় দুঃখ করে তিনি লিখেছেন : “পিতার পাঠাগারও লুঠ হয়ে গিয়েছিল। পরের বছর দুর্ভিক্ষ। মানুষের করুণ অবস্থা চোখে দেখা যায় না। হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। মানুষ মানুষকে খাচ্ছে।”
টুকড়িয়ার সেবায় মোল্লা বদায়নী
হুসেন খাঁ টুকড়িয়া হুমায়ূনের সময় থেকেই একজন খুব বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে কাজ করে এসেছিলেন। তাঁর অতীতের রাজসেবা ও আত্মত্যাগের কথা ভেবে আকবর তাঁর উপর অত্যন্ত সদয় ছিলেন। কিন্তু টুকড়িয়া ছিলেন ধর্মান্ধ, ঔরঙ্গজেবের আমলে তাঁর জন্মগহণ করা উচিত ছিল।
আকবর যখন হিন্দু-মুসলমানকে এক করার উদ্যোগ নিয়েছেন, স্বয়ং আধা-হিন্দু হয়ে উঠেছেন, তখনও টুকড়িয়া কুমায়ূন-গাড়ওয়ালের মন্দিরসমূহ লুঠপাট করছেন, ধ্বংস করছেন, তরোয়ালের আঘাতে মানুষের প্রাণ সংহার করছেন। মোল্লা বদায়ূনীর কাছে তিনি একজন আদর্শ পুরুষ ছিলেন।
হিজরী ৯৭৩ থেকে ৯৮১ সন (১৫৬৫-৭৩ খ্রিঃ) পর্যন্ত আট বছর তিনি টুকড়িয়ার সঙ্গে কাটান। ‘এটা’ জেলার পাটিয়ালী গ্রামে মহাকবি আমির খুসরোর জন্ম হয়। সেই পাটিয়ালী এলাকা হুসেন খাঁ জায়গির লাভ করেছিলেন। ১৫৬৫-৬৬ খ্রিস্টাব্দে (৯৭৩ হিজরীতে) মোল্লা সাহেব টুকড়িয়ার সঙ্গে যোগ দেন।
আকবরের দরবারেরও আকর্ষণ ছিল, কিন্তু সেই ধর্মান্ধ পাঠানই তাঁর বেশি মনঃপূত হলো । হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের রক্তে রক্তাক্ত যাঁর হাত, সেই নৃশংস ব্যক্তিটিকে বদায়ূনী “সদাচারী সন্ত-স্বভাব, দাতা, পবিত্র আত্মা, ধর্মভীরু, বিদ্যোৎসাহী” ইত্যাদি বিশেষণে বিভূষিত করেছেন। মোল্লা তাঁর কাছেই এক অজ্ঞাত অখ্যাত ব্যক্তির মতো জীবন কাটাতে থাকেন।
তাঁর মতে, ‘টুকড়িয়া ভালোমানুষদের তত্ত্বাবধান করেন, সাহায্য করেন।’ মোল্লা সাহেব টুকড়িয়ার প্রশংসা করতে করতে কলম ভেঙে ফেলেছেন। আজাদের ভাষায়— “(মোল্লা সাহেব টুকড়িয়াকে) পয়গম্বরদের আসন পর্যন্ত না হোক, পয়গম্বরের বন্ধু আওলিয়াদের নিকট পর্যন্ত অবশ্যই পৌছিয়ে দিয়েছেন।”
টুকড়িয়া আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দ্বাবিংশ রাজ্যবর্ষ (১১ মার্চ, ১৫৭৭–১০ মার্চ, ১৫৭৮ খ্রিঃ) পর্যন্ত অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং তিনহাজারীর পদ লাভ করেছিলেন। এরূপ ধর্মান্ধ রক্ষণশীলের মোল্লা আব্দুল কাদিরের মতো লোককে প্রয়োজন ছিল ।
“কেমন ফুলসাজে একলা রয়েছে, আমি যাব। দু’জন পাগল একসাথে মিলে বেশ কাটাব।” আট বছর পর্যন্ত মোল্লা বদায়ূনী তাঁর সঙ্গে থেকে, ‘কালল্-লাহু, কালর্-রসূলু” (আল্লা তাঁর শ্রীমুখ দিয়ে এই বলেছেন, রসুল তাঁর শ্রীমুখ দিয়ে এই বলেছেন) করতে করতে নিজের ও টুকড়িয়ার মনে আনন্দ জুগিয়েছেন, সেই সঙ্গে টুকড়িয়ার জায়গিরের কাজকর্মে সাহায্য করেছেন।
এইভাবে টুকড়িয়ার সঙ্গে তিনি চব্বিশ থেকে বত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত অতিবাহিত করেন। এটা এমন এক বয়স, যখন যে-কোনো রঙের ছাপ পড়লেই তা পাকা রঙ হয়ে যায়, তাই এটা কোনো আশ্চর্যের কথা নয়— যদি মোল্লার কলম বিধর্মীদের গলা কাটতে টুকড়িয়ার তরোয়ালের সঙ্গে পাল্লা দেয়। বসায়ূন— সন্ ১৫৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দে (৯৭৫ হিজরীতে) মালিকের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে মোল্লা সাহেব বদায়ূন যান এবং সেখানে দ্বিতীয় বিবাহের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন ।
এই বিবাহের বর্ণনা তিনি স্রেফ দেড় পঙ্ক্তিতে শেষ করেছেন। তবে তা থেকেই বোঝা যায়, স্ত্রী সুন্দরী ছিলেন, তাঁর খুব পছন্দ হয়েছিল। বলেছেন— “এ বছর বর্তমান লেখকের দ্বিতীয় বিবাহ হলো এবং বিল্ আখির তো খায়রূন্ লকা মিনাল্-উলা’ (প্রথম অপেক্ষা আন্তম তোমার জন্য উত্তম)” এই বাক্য অনুসারে শুভ হয়েছিল। জানা যায় যে প্রথম স্ত্রী শুভ প্রতিপন্ন হননি। কিছুকাল পরে নববধূর এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয় । মোল্লা পুনরায় তাঁর মালিকের কাছে যান।
টুকড়িয়া তখন জায়গির পেয়েছিলেন লখনৌতে। কিছুদিন সেখানে ঘোরাঘুরি করেন। জায়গির পরিবর্তন করার জন্য টুকড়িয়া বাদশাহের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি কুমায়ূনের পাহাড়-পর্বতে তরোয়ালে আগুনে আল্লার বান্দাদের হত্যা করে জেহাদের পূণ্য অর্জন করতে গেলেন।
তিনি শুনেছিলেন, সেই সব পাহাড়ে সোনা-রূপোর মন্দির রয়েছে। রথ দেখা কলা বেচা : ধন-সম্পদ লুঠপাট ও ইসলামের প্রচার। সে-সময় টুকড়িয়ার সঙ্গে থাকা পছন্দ হয়নি মোল্লার। তরোয়ালের সাহায্যে ইসলামের প্রচারকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করতেন না, তবে তাঁর নিজের বাহুতে তেমন শক্তি ছিল না। এই সময় তাঁর অনুজের মৃত্যু হয় এবং তাঁর শিশুপুত্রও হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে কবরে রওনা হয়। ভ্রাতৃ- বিয়োগের পর তিনি অত্যন্ত ভাবাবেগের সঙ্গে মর্সিয়া (শোক-গাথা) লিখেছেন, তার দু’টি পক্তি হলো—
হালে দিল হেচ ন দানম্ ব-কে গোয়াম চি কুনম্ । চারএ-দর্দে-দিলে-খুদ’জ কে জোয়াম্ চি কুনম্ । (মনের অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছিনে। কাকে বলব, কী করব? নিজের মনঃপীড়ার ওষুধ কার কাছে খুঁজব, কী করব?) মোল্লা আব্দুল কাদির সমস্ত ডিম এক ঝুড়িতে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি
পা রাখতেন কয়েকটা নৌকায়। তবে হ্যাঁ, ইসলামের চৌহদ্দির মধ্যেই। শরীয়ত ও ইসলামের পদাঙ্ক অনুসরণের কথা তিনি গর্বভরে স্বীকার করতেন, আবার সেই সঙ্গে সন্ত-ফকিরদের অলৌকিক ক্ষমতার সাহায্য নিতেও কসুর করতেন না। হিজরী ৯৭৯ সনের (১৫৭১-৭২ খ্রিস্টাব্দের) ঘটনা।
মোল্লার বয়স তখন তিরিশ বছর অতিক্রম করেছে। হুসেন খাঁ কাঁটগোলা (জেলা মুরাদাবাদ) জায়গির নিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল হিমালয়ে হামলা চালানো। মোল্লা সাহেবও তাঁর প্রভুর সঙ্গে সেখানে যান। ফকিরদের যত্ন-আত্তির ভার দেওয়া হয় মোল্লা সাহেবের উপর। সেখানে তিনি জানতে পারেন, কনৌজ এলাকায় মকনপুরে (জেলা কানপুর) শেখ বদীউদ্দীন মাদারের পবিত্র কবর রয়েছে, দর্শন করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়।
মোল্লা সাহেবের ‘জ্ঞানচক্ষু’ পরদায় ঢাকা পড়ল। তিনি সেখানে গিয়ে হাজির হলেন। দরগায় কিছু একটা ‘ভারি বেয়াদবি’ করে বসেন, তৎক্ষণাৎ সেখানেই তাঁর শাস্তিও পেয়ে যান। শত্রু তরোয়াল কোষমুক্ত করে তাঁর দিকে তেড়ে আসে, একের পর এক, ন’বার আঘাত করে।
হাত ও কাঁধের ক্ষত অগভীর, কিন্তু মাথায় গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল। তরোয়াল মাথার খুলি ভেদ করে ইবাদতখানায় (প্রার্থনা-মন্দিরে) তখন শাস্ত্রালোচনা চলছে, বদায়ূনীর সহপাঠী ফৈজী ও আবুল ফজল তাঁদের যুক্তি ও বিদ্যাবুদ্ধির কেরামতি দেখাচ্ছেন। ইবাদতখানায় (প্রার্থনা-মন্দিরে) তখন শাস্ত্রালোচনা চলছে, বদানীর সহপাঠী ফৈজী ও আবুল ফজল তাঁদের যুক্তি ও বিদ্যাবুদ্ধির কেরামতি দেখাচ্ছেন।
মোল্লা বদায়নী দরবার
মার্চ (১৫৭৪ খ্রিঃ) মাসে বদানী আগরায় এসে পৌঁছান। জামাল খাঁ কুচীর সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ হয়। তিনি আকবরের বিশিষ্ট দরবারীদের অন্যতম। যদিও মাত্র পাঁচ- শতকী মনসবদার ছিলেন, কিন্তু বাদশাহের নিকটে পৌছানোর এখতিয়ার ছিল তাঁর। তিনি দানশীল ছিলেন, খেতে ও খাওয়াতে ভালোবাসতেন। পরের বছর তাঁর মৃত্যু হয় । “ইহলোকে সুনাম ছিল, পরলোকে গেলেন পুণ্য সঙ্গে নিয়ে।”
জামাল খাঁ মোল্লার পিছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়লেন, তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণ শুনলেন, খুব খুশি হলেন। তিনি তাঁকে আকবরের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন— “হুজুরের জন্য নামাজের ইমাম নিয়ে এলাম।” মোল্লা তাঁর “মুন্তখিবুত্-তওয়ারিখ” গ্রন্থে স্বয়ং লিখেছেন— “তদবিরের পায়ে তকদিরের শিকল পড়ল।
৯৮১ হিজরীতে (১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে) হুসেন খাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে আগরায় এলাম। জামাল খাঁ কুর্চী ও হাকিম অয়নুল্-মুকের সাহায্যে রাজানুগ্রহ লাভ হলো। তখনকার দিনে শাস্ত্র-সভার খুব চল হয়েছিল। পৌঁছতেই সদস্যদের মধ্যে স্থান হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত এমন হলো যে, যে-আলিম কাউকে পাত্তা দিতেন না, তাঁর সঙ্গেও বাদশাহ লড়িয়ে দিলেন। খোদার মেহেরবানি, বুদ্ধির ক্ষমতা, প্রতিভার তেজ এবং মনের জোরে অনেককেই পরাজিত করলাম।
প্রথম অনুগ্রহ দান করেই বাদশাহ জানালেন, এই বদায়ূনী হাজী ইব্রাহিম সরহিন্দীর সঙ্গে তর্কে জয়লাভ করুক। তিনি চাইছিলেন, যেভাবেই হোক, তাঁর যেন পরাজয় হয়। আমি তাঁকেও ভালোরকম পর্যুদস্ত করলাম। বাদশাহ খুব খুশি হলেন। সদরুস্-সদর শেখ আব্দুন্ নবী মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তাঁকে না জানিয়ে কেন এ লোকটা আচমকা দরবারে ঢুকে পড়ল। এখন আমার শাস্ত্রানুশীলন- সভায় ভিড়তে দেখলেই তাঁর সেই প্রবাদ-বাক্যের কথা স্মরণ হয়— একে তো সাপে কেটেছে, তার উপর খেয়েছে আফিম। যাই হোক, শেষে ধীরে ধীরে সদরের ক্রোধ স্নেহে পরিবর্তিত । হয়েছিল।”
মোল্লা বদায়ূনী দরবারে নবাগত। চারদিক থেকে প্রশংসা শুনে তাঁর দেমাক আকাশে চড়েছে। তাঁর খেয়াল ছিল না, আমিও ওইরকম এক মোল্লা, যেমন ওঁরা, যাঁদের আমি পরাস্ত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছি। মোল্লা তখন আবুল ফজলের ভীষণ গুণগ্রাহী, সেই সঙ্গে আকবরের গুণগ্রাহিতায় মুগ্ধ। মোল্লাদের মধ্যে তর্কযুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার শখ তো আকবরের ছিলই, এখন তার জন্য বদায়ূনীকে সঙ্গে রাখেন।
এই সময় পাটনার দিকে বিদ্রোহ দেখা দেয়। শেরশাহের বংশের মাধ্যমে পাঠানরা দেশ-শাসনের স্বাদ পেয়েছিল। তারা সামান্য সুযোগ পেলেই বিদ্রোহের ঝাণ্ডা হাতে তুলে নেয়। বাদশাহের সেনাপতি মুনায়ম পাঠানদের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির এতই অবনতি হয় যে স্বয়ং আকবরের সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আগরা থেকে সেনাবাহিনীকে স্থলপথে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে সমস্ত বেগম, করেন। মোল্লা লিখেছেন— “অজস্র নৌকায় নদীর জল চোখে পড়ে না। নানা রকমের নৌকা, তাতে আশমানী রঙের পাল খাটানো।
কোনো নৌকার নাম ‘নিহঙ্গসরে, কোনোটার নাম ‘শেরসর’, ইত্যাদি ইত্যাদি। রঙ-বেরঙের পতাকা উড়ছে। নদীর উপর কোলাহল, প্রবল হাওয়া, জলের ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ। নৌবহরের নৌকা চলেছে, মাল্লারা নিজের নিজের ভাষায় গান জুড়েছে। বিচিত্র দৃশ্য, মনে হয়, খুব শীঘ্রই বাতাসে পাখি ও জলে মাছ নাচানাচি করবে।
যাত্রার কি বর্ণনা দেবো? যেখানে খুশি, নেমে পড়ছেন মৃগয়ার জন্য । যখন খুশি, উঠে পড়ছেন যাওয়ার জন্য। কোথাও বা রাতে নোঙর ফেলা হচ্ছে, সেখানেই শাস্ত্রানুশীলন এবং শের ও শায়েরীর আসর বসে যাচ্ছে। সঙ্গে ফৈজীও রয়েছে। নৌবহরের নৌকা সাধারণ যাতায়াতের নৌকা নয় ।
এই নৌবহরে তোপখানা, হাতিয়ার-ঘর, কোষাগার, নাকাড়াখানা, তোশাখানা, ফরাশখানা, বাবর্চিখানা, ঘোড়ার আস্তাবল— সমস্ত রয়েছে। হাতির জন্য বড় বড় নৌকা। একটায় সওয়ার হয়েছে দুই হস্তিনীর সঙ্গে প্রসিদ্ধ হাতি বালসুন্দর। আর একটায় রয়েছে সমনপাল, সঙ্গে দুই হস্তিনী ।
শিবির ও সৈন্যঘাঁটি যেভাবে সাজানো হয়, নৌবহরও তেমনি। তাতে আলাদা আলাদা কামরা, কামরাগুলোতে রয়েছে বেদি, সুন্দর সুন্দর তাক । নৌকাগুলো দোতলা- তেতলা । উপরে-নিচে ওঠা-নাম করতে হয় সিঁড়ি দিয়ে। হাওয়া-বাতাসের জন্য রয়েছে জানালা, আলোর জন্য রয়েছে লণ্ঠন। তুর্কি, চীনা, বিলেতি মখমল ও বনাতের পরদা এবং অত্যন্ত দামী গালচেতে সুসজ্জিত করা হয়েছে। নৌবহরের মধ্যিখানে চলেছে বাদশাহের জাঁকজমকপূর্ণ নৌকা ।”
দুটি বছর খোশ-মেজাজেই কেটেছিল। তারপর, ৯৮৩ হিজরীতে (১৫৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দে) পৌছতে না-পৌছতেই দরবারের কীর্তি-কলাপ মোল্লা বদায়ূনীর অপছন্দ হতে থাকে। অমনি তাঁর লেখনীর গতিভঙ্গি বদলায়। স্পষ্ট মনে হয়, লেখনী থেকে অক্ষর এবং চোখ থেকে অশ্রু সমানে বইছে।
বাদশাহের সাতজন ইমাম ছিলেন। সপ্তাহের এক-একদিন এক-একজন ইমাম পালা করে নামাজ পড়াতেন। মোল্লা বদায়ূনী সঙ্গীতেও আসক্ত ছিলেন। বড় মধুর কণ্ঠস্বর ছিল তাঁর। তাঁর মুখে ফারসি শের কিংবা আরবি আয় বড় মধুর শোনাত। লিখেছেন— “মধুর কণ্ঠের জন্য যেমন তোতাপাখিকে খাঁচায় পুরে দেয়া হয়, তেমনি আমাকে ওই সবার (ইমামতির) মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বুধবারের ইমামতির কাজ দেওয়া হল।” হাজিরা দেখার কাজের ভার ছিল খোজা (হিজড়া) দৌলত নাজিরের উপর। খুব কড়া মেজাজের লোক ছিল, লোকজনকে বিস্তর জ্বালাতন করত। এভাবেই মোল্লা সাহেব “ইমাম আকবরশাহ” হন।
বাদশাহ এ বছরই তাঁকে বীসতী (বিংশতিক) মনসব ও কিছু পুরস্কার দেন। আবুল ফজলও সেই মনসব পেয়েছিলেন। মনসবদারদের হাজারী, দু-হাজারী, পাঁচ হাজারী মনসব দেওয়া হতো। কিন্তু তারা না মনসব অনুসারে ঘোড়া রাখত, না লোকজন, সরকারী অর্থ আত্মসাৎ করত তারা। এসব নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন ফরমান জারি করা হলো এবং ঘোড়ার গায়ে ছাপ (দাগ) মারা শুরু হলো। সেজন্য এই নিয়মকে ‘দাগানো ও বলা হয়। মোল্লা মনসব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ‘দাগানো’র জন্য ঘোড়া হাজির করতে বলা হলো।
আবুল ফজল ও মোল্লা আব্দুল কাদির একই চাটুর দুই রুটি। আবুল ফজল দ্রুত হুকুম অনুসারে কাজ করলেন এবং এমন ভালোভাবে করলেন যে তিনি দু-হাজারী মনসবদার ও ওয়াজির হয়ে গেলেন, তাঁর বাৎসরিক আয় চোদ্দ হাজার। মোল্লা নিজের সম্বন্ধে লিখেছেন— “অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং আত্মভোলা হওয়ার জন্য আমি তো আমার কম্বলখানাই সামলাতে পারিনে।
তখন ভাবতাম, সন্তোষ-লাভই বড় সম্পদ। একটু জায়গির আছে, বাদশাহ-ও কিছু পুরস্কার- টুরস্কার দেবেন, তাই যথেষ্ট।” দু’বছর তিনি দরবারে রয়েছেন। ৯৮৩ হিজরীতে (১৫৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দে) ছুটি নিয়ে কিছুদিন স্বাধীনভাবে কাটানোর ইচ্ছে হলো । বাদশাহ ছুটি দেওয়ার সময় একটা ঘোড়া ও কিছু টাকা, সেই সঙ্গে এক হাজার বিঘে জমিও দিয়ে বললেন, সামরিক বিভাগ থেকে তাঁর নাম কেটে দিচ্ছেন ।
পরের বছর (১৫৭৬-৭৭ খ্রিঃ) আকবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আজমেরে ছিলেন । মোল্লা সাহেবও সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা হয়েছে। রাজা মানসিংহের নেতৃত্বে বিশাল পল্টন কুম্ভলনেরের দিকে যাচ্ছে। আজমেরে তিন ক্রোশ ব্যাপী আমিরদের তাঁবু খাটানো হয়েছে। মোল্লাও গাজীদের তালিকায় নাম তোলার জন্য গেছেন। সেই সময় মনের মধ্যে গাজী (ধর্মবীর) হওয়ার খুব শখ হয়েছিল তাঁর।
ফিরে এসে সোজা আব্দুন্ নবীর (সদর, শেখুল্-ইসলাম) কাছে গিয়ে বললেন : আপনি হুজুরকে বলে ছুটি পাইয়ে দিয়ে আমাকে এই যুদ্ধে পাঠিয়ে দিন। কিন্তু সদরকে দিয়ে কাজ হলো না। বাদশাহের পুস্তক-পাঠক ছিলেন নকীব খাঁ, তিনি তো তাঁর সহপাঠীই ছিলেন, তাঁকে বললেন। তিনি জানালেন— “সেনাপতি হিন্দু (মানসিংহ) না হলে আমিই তো সবার আগে যুদ্ধে নাম লেখাতাম।” মোল্লা তাঁকে বোঝালেন— “আমি আমার সেনাপতি হজরতের বান্দাদের জানি, মানসিংহ ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামাব কেন।
উদ্দেশ্য ঠিক থাকা চাই।” আকবর একটা উঁচু চবুতরায় পা ঝুলিয়ে মির্জা মুবারকের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে ছিলেন। নকীব খাঁ মোল্লা বদায়ূনীকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে প্রার্থনা জানালেন। বাদশাহ তো প্রথমেই জানিয়ে দিলেন— “ওঁর জায়গা তো ধর্মকর্মে, উনি যাবেন কি করে?” নকীব খাঁ বললেন— “গাজী হওয়ার ইচ্ছে।” মোল্লাকে ডেকে আকবর জিজ্ঞাসা করলেন— “খুব ইচ্ছে করছে?”- “খুব।”— “কারণ কি?” – “এভাবেই কালো দাড়ি লাল করতে চাই।”
কারে তু ব-খাতির’স্ত্ খওয়াহম্ ।
ইয়া সুর্খ খুনম্ রূয়ে জ-তু ইয়া গৰ্দন ।
(তোমার কাজের কথা রয়েছে আমার মনে। সে-কাজ করতে চাই, তোমার জন্য লাল করব মুখমণ্ডল, নয় তো গ্রীবা।) বাদশাহ বললেন— “ঈশ্বর করুন, জয়লাভের খবর নিয়ে এসো।” তিনি পা উপরে টেনে নিলেন। দীওয়ানখানা থেকে যখন বেরুচ্ছি, তিনি আবার “আমি (মোল্লা) চবুতরার নিচে হাত বাড়ালাম তাঁর পা স্পর্শ করার জন্য, অমনি ডাকলেন। একমুঠো আশরফি দিয়ে বললেন— ‘খোদা হাফিজ।’ গুনে দেখি, পঁয়ষট্টি আশরফি ।”
মোল্লা তরোয়াল চালাতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর কলম চলত বেশি সাফল্যের সঙ্গে। লিখেছেন— “জয় হলো। রানা পালিয়ে গেছেন। আমিরেরা বসলেন পরামর্শ করতে । এলাকার বন্দোবস্ত শুরু হলো। রামপ্রসাদ নামক একটা বড় লড়াকু হাতি ছিল রানার। বাদশাহ কয়েকবার সেটা চেয়েছিলেন, কিন্তু রানা দেননি। লুঠের মালের মধ্যে সেটাও ছিল। আমিরেরা পরামর্শ করে ঠিক করলেন, বিজয়পত্রের সঙ্গে সেটাকেও হুজুরের কাছে পাঠানো উচিত। আসিফ খাঁ আমার নাম করলেন— “উনি কেবল পুণ্যলাভের জন্য এসেছেন, ওঁর সঙ্গেই ওটাকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক।’
“মানসিংহ বললেন— ‘এখন তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এখানে এই যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের সামনে ইমামের কাজ করবেন কে?’ “আমি বললাম— ‘এখানে ইমামের কাজ করার লোক আরও অনেক আছেন। আমি এবার চললাম। এখন আমার কাজ হজরতের কর্মচারীদের সামনে ইমামের কর্তব্য পালন।’
“মানসিংহ এ-কথায় খুশি হলেন। সতর্কতার জন্য তিন শত সওয়ারি হাতি দিলেন সঙ্গে। তারপর সুপারিশ-পত্র লিখে দিয়ে বিদায় করলেন। থানা বসানোর অজুহাতে মৃগয়া করতে করতে পৌছিয়ে দিলেন মোহনা পর্যন্ত, সেটা প্রায় কুড়ি ক্রোশ পথ। আমি ভাখোর ও মাঁডলগড় হয়ে আমের পৌছলাম। আমের মানসিংহের জন্মভূমি। পথে জায়গায় জায়গায় যুদ্ধের কথা, মানসিংহের জয়লাভের কথা শোনাতে শোনাতে ফিরছিলাম । লোকজন শুনে অবাক হচ্ছিল।
“আমের থেকে পাঁচ ক্রোশ দূরে দলদল-ভূমিতে হাতি আটকে গেল। যতই সে সামনে এগোনোর চেষ্টা করে, ততই তার পা বসে যায়।” মোল্লা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। লোকজন এসে জানাল : গতবারও এখানে একটা বাদশাহী হাতি আটকে গিয়েছিল। হাতি ওঠানোর একটাই উপায় কলসিতে মশকে জল এনে এনে ঢালতে হবে, তবেই হাতি উঠতে পারবে। ভিস্তীদের ডাকা হলো, তারা প্রচুর জল ঢালল।
লিখেছেন— “অনেক কষ্টে হাতি উঠল। আমরা আমের পৌছলাম। সেখানকার লোকজন আনন্দে আত্মহারা।… আমাদের রাজা যুদ্ধ করে এই বিজয় লাভ করেছেন, বংশের দুশমনের ঘাড় ভেঙে দিয়েছেন, তাঁর হাতি কেড়ে নিয়েছেন! টোণ্ডার উপর দিয়ে যাচ্ছি। এখানেই আমার জন্ম হয়েছিল। তারপর বিসাওয়র।
এখানকার মাটি আমি প্রথম গায়ে মেখেছিলাম।” মোল্লা বদায়ূনে জন্মগ্রহণ করেননি। বিসাওয়র ননিহাল ও পার্শ্ববর্তী টোণ্ডা তাঁর পিতৃগৃহ ছিল। হতে পারে, ননিহালে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তারপর কয়েক বছর সেখানেই থাকেন। সেজন্য বিসাওয়রের উপর তাঁর বিশেষ ভালোবাসা ছিল। এখন তিনি একজন বিজেতা হিসেবে রানার হাতি নিয়ে এখান দিয়ে চলেছেন। গ্রামের লোকেরা এক-এক করে দেখতে আসছে। তারা মনে করছে, রানাকে পরাজিত করেছেন তাদের গ্রামের আব্দুল কাদির-ই, সেজন্য সকলে তারা গর্ববোধ করছে। জন্মভূমিতে এমন প্রশংসা ও সম্মান লাভ করে মোল্লা বদায়ূনীর যদি গর্বে বুক ফুলে ওঠে, তাতে আশ্চর্য কি?
অবশেষে ফতেহপুর-সিক্রী পৌঁছলেন। বিজয়-পত্র ও হাতি বাদশাহের সামনে পেশ করা হলো। প্রশ্নের উত্তরে মোল্লা বললেন, হাতির নাম রামপ্রসাদ। আকবর জানালেন : সবই পীরের কৃপায়, তাই এর নাম পীরপ্রসাদ। তারপর তিনি মোল্লাকে বললেন— “পত্রে তোমারও খুব প্রশংসা করে লিখেছে। সত্যি কথা বলো, তুমি কোন বাহিনীতে ছিলে, কি কি কাজ করেছ?” মোল্লা সবিনয়ে সমস্ত বিবরণ দিলেন। বাদশাহ মোল্লাকে তো চিনতেনই, সেজন্য জিজ্ঞাসা করলেন— “যুদ্ধের পোশাক পরে গিয়েছিলে, না এমনিই?”
“জিরাবর (বর্ম) ছিল।”
“কোথায় পেয়েছিলে?”
“সৈয়দ আব্দুল্লা খাঁর কাছ থেকে।”
বাদশাহ খুব খুশি হলেন। মোহরের তোড়ায় হাত ভরে এক আঁজলা আশরফি ইনাম দিলেন । গুনে দেখা গেল ছিয়ানব্বইটি । ১৯৮৫ হিজরীতে (১৫৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে) মোল্লা ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সুস্থ হলে দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। মালওয়ার দীপালপুরে তখন শাহী শিবির স্থাপন করা হয়েছিল।
আকবরের রাজ্যলাভের দ্বাবিংশপূর্তি উৎসবের ধুমধাম চলছিল। মোল্লা সাহেব সেই বছরই হুসেন খাঁ টুকড়িয়ার মৃত্যু-সংবাদ পান। উভয়েরই মত এক, বিশ্বাস এক। তিনি বন্ধু ছিলেন, মনিবও ছিলেন। যদিও কোনো কারণে দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে, তবুও মোল্লার কাছে তিনি অতি সৎ ও খাঁটি ধর্মবীর ছিলেন, কেননা শেষ দিন পর্যন্ত বিধর্মীদের গলা কাটার জন্য তাঁর তরোয়াল উদ্যত ছিল ।
৯৮৫ হিজরীতে মোল্লার বয়স ছিল ছত্রিশ বছর। হজের তীব্র লোভ ছিল। সে- বছর আজমের থেকে বাদশা আবু-তুরাবকে মীর-হাজ (হাজীদের দলপতি) নিযুক্ত করে হাজীদের সঙ্গে প্রেরণ করেন। উপঢৌকনের জন্য বহু জিনিসপত্র দিয়ে নির্দেশ দিলেন, যার ইচ্ছে সেই হজে যেতে পারে। মোল্লা শেখ আব্দুন নবীর কাছে প্রার্থনা জানালেন – আমারও ছুটি মঞ্জুর করিয়ে দিন যাতে আমিও হজে যেতে পারি। শেখ জিজ্ঞাসা করলেন— “মা বেঁচে আছেন?”
মোল্লা জবাব দিলেন— “হ্যাঁ।” “ভাইদের মধ্যে এমন কেউ আছে যে তাঁর সেবাযত্ন করবে?”
“না, শেষ সম্বল বলতে তো আমিই।”
“মায়ের অনুমতি নাও । অনুমতি দিলে ঠিক আছে।”
কিন্তু বৃদ্ধা মাতা কিভাবে এতে সম্মতি দিতে পারেন! ফলে তাঁর হজে যাওয়া হলো না । অন্যান্য মানুষের মতো মোল্লারও পরস্পর-বিরোধী গুণ ছিল। একদিকে টুকড়িয়া ও গোড়া মোল্লাদের তিনি আদর্শ ধর্মবীর বলে মনে করতেন, অন্য দিকে তাঁদের বিরোধী আকবরকেও তাঁর পছন্দ ছিল।
সে-বছর পর্যন্ত তিনি আকবরের নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী হয়ে ওঠেননি, তখনও তিনি আকবরকে আল্লার প্রতিচ্ছায়া এবং রসুলের দূত মনে করতেন। লিখেছেন— “আমি তখন লশকরদের সঙ্গে রেওয়াড়ী জেলায় ছিলাম। বাড়ি থেকে খবর এল, এক দাসীর পুত্র-সন্তান হয়েছে। দীর্ঘকাল প্রতীক্ষার পরে এই সন্তানের জন্ম। খুশি হয়ে আশরফি উপঢৌকন দিলাম এবং পুত্রের নামকরণের জন্য প্রার্থনা করলাম । বাদশাহ প্রশ্ন করলেন— ‘তোমার পিতা-পিতামহের নাম কি?’ “উত্তর দিলাম— পিতার নাম মলুকশাহ, পিতামহের নাম হামিদশাহ ।’
“তখনকার দিনে ‘ইয়া হাদী’ (হে শিক্ষক)-এর খুব জপ চলছিল। বাদশাহ বললেন— ‘ওর নাম রাখো আব্দুল হাদী।’ হাফিজ মুহম্মদ ইবন্ খতিব আমাকে অনেক করে বললেন— ‘নাম রাখার ভরসায় থেকো না। হাফিজদেরও ডাকো, পুত্রের দীর্ঘায়ুর জন্য কুরান পাঠ করাও।’ আমি তাঁর কথায় কান দিইনি, শেষে ছয় মাসের শিশু মারা গেল।”
সেখান থেকেই পাঁচ মাসের ছুটি নিয়ে মোল্লা বিসাওয়র যান। কিন্তু ছুটি শেষ হলেও ফিরলেন না। মজহরী নামের একটি দাসী তাঁর চোখে ধরে যায়। লিখেছেন— “সে ছিল পরমেশ্বরের মহিমা প্রকাশের এক নমুনা। আমি তার প্রেমে পড়ে গেলাম। তার প্রেমে এমন মজে গেলাম যে বছরভর বিসাওয়রে পড়ে রইলাম।”
তখন মোল্লার বয়স চল্লিশ বছর। এই বয়সে বিসাওয়রে তাঁর এক পুত্র মুহিউদ্দীনের জন্ম হয়। দাসী ও স্ত্রীর সংখ্যা কত জানা যায় না। গোনার প্রয়োজনই বা কি, যেখানে নয় থেকে আঠারোজন পর্যন্ত বিবাহিত স্ত্রী শরীয়ত অনুসারে রাখা যেতে পারে । তখন দাস-প্রথার আমল ছিল। পয়সা চাই, যত খুশি দাসী কিনে নিতে পারো। দাস-প্রথা আকবরের পছন্দ ছিল না । তিনি নিজের দাসীদের মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তবে দাস-দাসীর মূল্য হিসেবে লোকজনের কোটি কোটি টাকার সম্পদ আটকে ছিল। তাদের সেই সম্পদ ধূলিসাৎ করে দিয়ে তিনি কি বিপদের সম্মুখীন হতে পারতেন।
দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থেকে ৯৮৯ হিজরীতে (১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে) তিনি ফতেহপুর- সিক্রীর দরবারে হাজির হলেন। দীওয়ানে-খাসে বসে বসে কথাবার্তা চলছিল। আবুল ফজল বললেন— “ইসলাম ধর্মের সমস্ত লেখকদের কাছে দুটি বিষয়ে আমার অভিযোগ রয়েছে— ১. তাঁরা যেভাবে পয়গম্বরের (মুহম্মদের) কথা বর্ষানুক্রমিক লিখেছেন, সেভাবে অন্য পরগম্বরদের কথা লেখেননি।”
মোল্লা বললেন— “কাসাসুল আম্বিয়া’য় নবীদের কাহিনী আছে।” “সে তো হ-য-ব-র-ল, বিশদভাবে লেখা উচিত ছিল।” “প্রাচীনকালের ব্যাপার। ঐতিহাসিক ও ভাষ্যকারেরা হয়তো অতটাই যাচাই করতে পেরেছেন, তাছাড়া আর কোনো তথ্য-প্রমাণ যোগাড় করতে পারেননি।” “এটা উত্তর হলো না। দ্বিতীয় অভিযোগ, এমন কোনো সাধারণ পেশার লোক নেই যার কথা বর্ণনা করা হয়নি।
কিন্তু পয়গম্বরের নিজের পরিবার এমন কি পাপ করেছিল যে তাদের কথা বলা হয়নি?” মোল্লা কিছু সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কি জবাব হতে পারে? পয়গম্বরের কন্যা জামাতা ইত্যাদিকে বঞ্চিত করে, তাঁদের অনেককেই লোপাট করে দিয়ে, অন্যরা ইসলামী বিজয়ের মজা লুটেছে।
পয়গম্বরের রক্ত-সম্পর্কিত যাঁরা, তাঁরাই তো তাঁর আশঙ্কার কারণ ছিল, তাহলে ‘আয় ষাঁড়, আমাকে গুঁতো’ বলতে যাবেন কেন? সেজন্য তাঁদের বিবরণ কখনোই ছাপিয়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। মোল্লা আবুল ফজলকে জিজ্ঞাসা করলেন— “প্রসিদ্ধ ধর্মগুলির মধ্যে কোনটা তোমার বেশি পছন্দ?” আবুল ফজল বললেন— “আমার ইচ্ছে, কিছুদিন লা-মজহবীর (ধর্মহীনতার) জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই।”
সম্ভবত মোল্লার এতখানি কট্টর হওয়ার প্রয়োজন হতো না, যদি তিনিও আমোদ- প্রমোদে মশগুল হয়ে পড়তেন। ফৈজী ও আবুল ফজলকে আশমানে চড়তে এবং নিজেকে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁর মনে যে অসন্তোষের সৃষ্টি হতো, তা সহজেই বোঝা যায়। যেখানে লোকে হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ টাকার জায়গির লাভ করেছে, বড় বড় এলাকা জুড়ে তাদের জমিদারী গড়ে উঠছে, সেখানে বেচারা মোল্লা হাজারখানেক বিঘে জমিও সহজে লাভ করতে সমর্থ হননি ।
১১৮৯ হিজরীতে (১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে) বাদশাহ কাবুল থেকে ফতেহপুর-সিক্রী প্রত্যাবর্তন করেন। মোল্লাও বছরখানেক পর দরবারে উপস্থিত হন। এমন নয় যে বাদশাহ সেটা জানতেন না । হাজার হলেও তর্ক-বিতর্কে অবশ্যই তাঁর কথা মনে পড়ে থাকবে। তাঁকে দেখে বাদশাহ আবুল ফজলকে জিজ্ঞাসা করলেন— “আমাদের যাত্রায় উনি থাকেননি কেন?” কাবুলের কাছেও তিনি মোল্লার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। যাই হোক, আবুল ফজল কিছু একটা বলে প্রসঙ্গ চাপা দিলেন ।
ফকিরীর মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকার কথা মোল্লা সাহেব আগে যা বলতেন, এখন তিনি সেটা মেনে নিতে পারছিলেন না । ৯৯৩ হিজরীতে (১৫৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দে) হাজার বিঘে জমি পেয়েছিলেন, সেজন্য তাঁকে হাজারী বলা যেতে পারত। কিন্তু বারো বছর রাজসেবা করেও তিনি নিজেকে যে অবস্থায় দেখতেন, তাতে তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং অন্য কোথাও ঠাঁই খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। আব্দুর রহমান খানখানা তাঁর সাহিত্য ও বিদ্যোৎসাহিতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি তখন গুজরাতের রাজ্যপাল।
মোল্লা বদায়ূনীর সঙ্গে তাঁর মোসাহেব মির্জা নিজামুদ্দীনের যথেষ্ট পরিচয় ছিল। তিনি এ ব্যাপারে চেষ্টা করলে খানখানা বলছিলেন— “দেখি, এবার হুজুরের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে মোল্লাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসব।” তিনি সিক্রী এলে দীওয়ানখানার পাঠাগারে— যেখানে অনুবাদকেরা বসতেন— খানখানার সঙ্গে মোল্লার সাক্ষাৎ হয়, কিন্তু তাঁকে খুব তাড়াতাড়ি গুজরাত ফিরে যেতে হয়, ভাগ্য মোল্লাকে সহায়তা করেনি।
মোল্লা বদায়নীর মৃত্যু
৯৯৯ হিজরীতে (১৫৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দে) মোল্লা অসুস্থ হয়ে বদায়ূন গেলেন। বিসাওয়র থেকে পরিবারকেও সেখানে নিয়ে এলেন। দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য হুকুম আসতে লাগল। আকবর তখন কাশ্মীরের উদ্দেশে যাত্রাকালে ভিনওয়ারে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই হাজির হলেন তিনি। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন— “কতদিন পরে এলেন?” মোল্লা জবাব দিলেন— “পাচ মাস পরে।” জানতেন, খুব থাকবেন, তাই বদায়ূনের অমাত্যদের ও হাকিম অয়নুল-মুকের প্রমাণপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। আকবর সমস্ত পাঠ করালেন, তবু বললেন— “পাঁচ মাস ধরে অসুখ হয় না।” মোল্লা কুর্নিশ জানানোর অনুমতি পেলেন না ।
ফৈজীও সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন, অন্য বন্ধু-বান্ধবও চেষ্টা করেছিলেন। পাঁচ মাস বাদে বাদশাহ কাশ্মীর থেকে লাহৌরে প্রত্যাবর্তন করার পরই মোল্লার প্রতি সদয় হলেন । মোল্লার বন্ধুরা একের পর এক ইহলোক ত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন। সেজন্য তাঁর মনে দারুণ দুঃখ ছিলই । লিখেছেন—
ইয়ারা হমাঁ রান্দ্ ওয়া দরে-কাবা গিরতাদ ।
মা সু-কদম বর্-দরে-খুমার ব-মাঁদীম্ । আজ নুকতয়ে-মকসূদ্ ন শুদ্ ফাহমে-হাদীসে ।
লা দীন ওয়া লা-দুনিয়া বেকার ব-মাঁদীম্।
(সকল বন্ধু চলে গেল, তারা গিয়ে কাবার দরজা স্পর্শ করেছে। আমি অশক্ত পায়ে শরাবখানার দরজায় পড়ে রয়েছি। হাদীস-তত্ত্বের কোনো কথাই শিখিনি। ধর্মহীন সংসারহীন আমি অনর্থক পড়ে রয়েছি।) দরবারে অধর্মের ধুম চলছিল। লোকে ঝপাঝপ ‘দীন-ইলাহী’-তে ঢুকে পড়ছিল, দাড়ি-টাড়ি সাফ হয়ে যাচ্ছিল। তাঁদের মধ্যে আবার কয়েকজন আলিম ছিলেন, যাঁরা নিজেদের অদ্বিতীয় পণ্ডিত মনে করতেন। অভিজাত শেখদের চোগা-চাপকান পরা কয়েকজন বলতেন : আমরা হজরত গওসের পুত্র।
আমাদের শেখ হুকুম দিয়েছেন, ভারতবর্ষের বাদশাহের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে, তোমরা গিয়ে তাঁকে রক্ষা করো। এখানে এসেই তাঁরা দাড়ি মুড়িয়ে ফেললেন। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই অক্টোবর ফৈজী দেহত্যাগ করেন। তাঁর উপর আঘাত হানতে মোল্লার কলম কখনও ক্লান্ত হয়নি। পরদিন হাকিম হামামও চলে যান।
১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি মোল্লা তাঁর ‘মুন্তখিবুত্-তওয়ারিখ’ লেখার কাজ সম্পন্ন করেন। পূর্বেই যা উল্লেখ করেছি, আকবর ও তাঁর সহমত-পোষণকারীদের বিরুদ্ধে মোল্লা নির্মম লেখনী তুলে নিয়েছিলেন হাতে, সেই কারণে গ্রন্থটি যাতে সম্ভাব্য সঙ্কটের মধ্যে না পড়ে এবং সুরক্ষিত অবস্থায় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে গিয়ে পৌছায়, তার বন্দোবস্ত করেছিলেন।
সাতান্ন বছর বয়সে বদায়ূনে মোল্লার মৃত্যু হয়। সন্নিকটস্থ আতাপুরের আম্রকাননে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। হতে পারে, তখনকার দিনে আতাপুর শহরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে দূরে সরে গেছে। আজাদ লিখেছেন— “সেখানে একটি ক্ষেতে তিন-চারটি কবর আছে, তার উপর তিন-চারটি আমের গাছ আছে।
সেটাকে মোল্লার বাগান বলা হয়। লোকে বলে, ওই কবরগুলোর মধ্যে মোল্লা সাহেবেরও কবর আছে । আতাপুর ও বাগে-অম্বার (আম্রকাননের) কেউ নামও জানে না। যে-মহল্লায় তাঁর বাসভবন ছিল, সেখানে এখনও তিনি লোকের মুখে মুখে রয়েছেন। বলা হয় পতঙ্গী- টিলা, সৈয়দওয়াড়ায়।” লোকজনের মুখে শোনা যায়, তাঁর সন্তানদের মধ্যে এক কন্যা জীবিত ছিলেন,
বর্তমানে তাঁর সন্তান-সন্ততি রয়েছে সীতাপুর জেলার খয়রাবাদে। ৯৯৯ হিজরীতে (১৫৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দে) মোল্লা অসুস্থ হয়ে বদায়ূন গেলেন। বিসাওয়র থেকে পরিবারকেও সেখানে নিয়ে এলেন। দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য হুকুম আসতে লাগল। আকবর তখন কাশ্মীরের উদ্দেশে যাত্রাকালে ভিনওয়ারে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই হাজির হলেন তিনি।
বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন— “কতদিন পরে এলেন?” মোল্লা জবাব দিলেন— “পাচ মাস পরে।” জানতেন, খুব থাকবেন, তাই বদায়ূনের অমাত্যদের ও হাকিম অয়নুল-মুকের প্রমাণপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। আকবর সমস্ত পাঠ করালেন, তবু বললেন— “পাঁচ মাস ধরে অসুখ হয় না।” মোল্লা কুর্নিশ জানানোর অনুমতি পেলেন না ।
ফৈজীও সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন, অন্য বন্ধু-বান্ধবও চেষ্টা করেছিলেন। পাঁচ মাস বাদে বাদশাহ কাশ্মীর থেকে লাহৌরে প্রত্যাবর্তন করার পরই মোল্লার প্রতি সদয় হলেন । মোল্লার বন্ধুরা একের পর এক ইহলোক ত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন। সেজন্য তাঁর মনে দারুণ দুঃখ ছিলই । লিখেছেন—
(সকল বন্ধু চলে গেল, তারা গিয়ে কাবার দরজা স্পর্শ করেছে। আমি অশক্ত পায়ে শরাবখানার দরজায় পড়ে রয়েছি। হাদীস-তত্ত্বের কোনো কথাই শিখিনি। ধর্মহীন সংসারহীন আমি অনর্থক পড়ে রয়েছি।) দরবারে অধর্মের ধুম চলছিল। লোকে ঝপাঝপ ‘দীন-ইলাহী’-তে ঢুকে পড়ছিল, দাড়ি-টাড়ি সাফ হয়ে যাচ্ছিল।
তাঁদের মধ্যে আবার কয়েকজন আলিম ছিলেন, যাঁরা নিজেদের অদ্বিতীয় পণ্ডিত মনে করতেন। অভিজাত শেখদের চোগা-চাপকান পরা কয়েকজন বলতেন : আমরা হজরত গওসের পুত্র। আমাদের শেখ হুকুম দিয়েছেন, ভারতবর্ষের বাদশাহের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে, তোমরা গিয়ে তাঁকে রক্ষা করো। এখানে এসেই তাঁরা দাড়ি মুড়িয়ে ফেললেন। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই অক্টোবর ফৈজী দেহত্যাগ করেন। তাঁর উপর আঘাত হানতে মোল্লার কলম কখনও ক্লান্ত হয়নি। পরদিন হাকিম হামামও চলে যান।
১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি মোল্লা তাঁর ‘মুন্তখিবুত্-তওয়ারিখ’ লেখার কাজ সম্পন্ন করেন। পূর্বেই যা উল্লেখ করেছি, আকবর ও তাঁর সহমত-পোষণকারীদের বিরুদ্ধে মোল্লা নির্মম লেখনী তুলে নিয়েছিলেন হাতে, সেই কারণে গ্রন্থটি যাতে সম্ভাব্য সঙ্কটের মধ্যে না পড়ে এবং সুরক্ষিত অবস্থায় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে গিয়ে পৌছায়, তার বন্দোবস্ত করেছিলেন।
সাতান্ন বছর বয়সে বদায়ূনে মোল্লার মৃত্যু হয়। সন্নিকটস্থ আতাপুরের আম্রকাননে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। হতে পারে, তখনকার দিনে আতাপুর শহরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে দূরে সরে গেছে। আজাদ লিখেছেন— “সেখানে একটি ক্ষেতে তিন-চারটি কবর আছে, তার উপর তিন-চারটি আমের গাছ আছে।
সেটাকে মোল্লার বাগান বলা হয়। লোকে বলে, ওই কবরগুলোর মধ্যে মোল্লা সাহেবেরও কবর আছে । আতাপুর ও বাগে-অম্বার (আম্রকাননের) কেউ নামও জানে না। যে-মহল্লায় তাঁর বাসভবন ছিল, সেখানে এখনও তিনি লোকের মুখে মুখে রয়েছেন। বলা হয় পতঙ্গী- টিলা, সৈয়দওয়াড়ায়।” লোকজনের মুখে শোনা যায়, তাঁর সন্তানদের মধ্যে এক কন্যা জীবিত ছিলেন,
বর্তমানে তাঁর সন্তান-সন্ততি রয়েছে সীতাপুর জেলার খয়রাবাদে। ৯৯৯ হিজরীতে (১৫৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দে) মোল্লা অসুস্থ হয়ে বদায়ূন গেলেন। বিসাওয়র থেকে পরিবারকেও সেখানে নিয়ে এলেন। দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য হুকুম আসতে লাগল। আকবর তখন কাশ্মীরের উদ্দেশে যাত্রাকালে ভিনওয়ারে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই হাজির হলেন তিনি। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন— “কতদিন পরে এলেন?” মোল্লা জবাব দিলেন— “পাচ মাস পরে।” জানতেন, খুব থাকবেন, তাই বদায়ূনের অমাত্যদের ও হাকিম অয়নুল-মুকের প্রমাণপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। আকবর সমস্ত পাঠ করালেন, তবু বললেন— “পাঁচ মাস ধরে অসুখ হয় না।” মোল্লা কুর্নিশ জানানোর অনুমতি পেলেন না ।
(সকল বন্ধু চলে গেল, তারা গিয়ে কাবার দরজা স্পর্শ করেছে। আমি অশক্ত পায়ে শরাবখানার দরজায় পড়ে রয়েছি। হাদীস-তত্ত্বের কোনো কথাই শিখিনি। ধর্মহীন সংসারহীন আমি অনর্থক পড়ে রয়েছি।) দরবারে অধর্মের ধুম চলছিল। লোকে ঝপাঝপ ‘দীন-ইলাহী’-তে ঢুকে পড়ছিল, দাড়ি-টাড়ি সাফ হয়ে যাচ্ছিল। তাঁদের মধ্যে আবার কয়েকজন আলিম ছিলেন, যাঁরা নিজেদের অদ্বিতীয় পণ্ডিত মনে করতেন। অভিজাত শেখদের চোগা-চাপকান পরা কয়েকজন বলতেন : আমরা হজরত গওসের পুত্র। আমাদের শেখ হুকুম দিয়েছেন, ভারতবর্ষের বাদশাহের দুর্বলতা দেখা দিয়েছে, তোমরা গিয়ে তাঁকে রক্ষা করো। এখানে এসেই তাঁরা দাড়ি মুড়িয়ে ফেললেন।
১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই অক্টোবর ফৈজী দেহত্যাগ করেন। তাঁর উপর আঘাত হানতে মোল্লার কলম কখনও ক্লান্ত হয়নি। পরদিন হাকিম হামামও চলে যান। ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি মোল্লা তাঁর ‘মুন্তখিবুত্-তওয়ারিখ’ লেখার কাজ সম্পন্ন করেন। পূর্বেই যা উল্লেখ করেছি, আকবর ও তাঁর সহমত-পোষণকারীদের বিরুদ্ধে মোল্লা নির্মম লেখনী তুলে নিয়েছিলেন হাতে, সেই কারণে গ্রন্থটি যাতে সম্ভাব্য সঙ্কটের মধ্যে না পড়ে এবং সুরক্ষিত অবস্থায় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে গিয়ে পৌছায়, তার বন্দোবস্ত করেছিলেন।
সাতান্ন বছর বয়সে বদায়ূনে মোল্লার মৃত্যু হয়। সন্নিকটস্থ আতাপুরের আম্রকাননে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। হতে পারে, তখনকার দিনে আতাপুর শহরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে দূরে সরে গেছে। আজাদ লিখেছেন— “সেখানে একটি ক্ষেতে তিন-চারটি কবর আছে, তার উপর তিন-চারটি আমের গাছ আছে। সেটাকে মোল্লার বাগান বলা হয়। লোকে বলে, ওই কবরগুলোর মধ্যে মোল্লা সাহেবেরও কবর আছে । আতাপুর ও বাগে-অম্বার (আম্রকাননের) কেউ নামও জানে না। যে-মহল্লায় তাঁর বাসভবন ছিল, সেখানে এখনও তিনি লোকের মুখে মুখে রয়েছেন। বলা হয় পতঙ্গী- টিলা, সৈয়দওয়াড়ায়।”
