প্রতাপ আশমানে | মোল্লা আব্দুল্লা সুলতানপুরী | আকবর

প্রতাপ আশমানে, আব্দুল্লা সুলতানপুরী হুমায়ূনের প্রথম রাজত্বকালে দরবারে যোগদান করেন। শেরশাহ, ইসলামশাহের আমলে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বৃদ্ধি পায়। হুমায়ূন দ্বিতীয় বার সিংহাসন দখল করে পুনরায় তাঁকে সেই সম্মান ও অধিকার দান করেন। যতদিন না আকবর তাঁর নীতির গুরুতর পরিবর্তন করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, ততদিন ধর্মীয় বিষয়ে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। তাঁর ফতোয়ার ভয়ে লোকে শিহরিত হতো। না-জাতি কত নিরপরাধ ব্যক্তিকে তিনি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন, কতজনকে সর্বস্বান্ত করেছেন।

প্রতাপ আশমানে | মোল্লা আব্দুল্লা সুলতানপুরী | আকবর

 

তিনি আনসারি ছিলেন। আনসারি হলো, ইসলাম ধর্মের পয়গম্বর মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় গমন করলে যারা তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে সর্বতোভাবে তাঁকে সাহায্য করেছিল, তাদের বংশধর। প্রথমে আব্দুল্লার পূর্বপুরুষ মুলতানে এসে বসতি স্থাপন করেন, তারপর সুলতানপুরের (পাঞ্জাব) স্থায়ী বাসিন্দা হন।

সেজন্য তাঁর নামের সঙ্গে সুলতানপুরী যোগ করা হয়। পণ্ডিত-বংশের মানুষ। আরবি সাহিত্য ও ধর্মশাস্ত্র তাঁর বংশগত উত্তরাধিকার। এ বিষয়ে তিনি অসাধারণ যোগ্যতা অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলে আব্দুল কাদির সরহদী। কুরানের আয়সমূহ এবং পয়গম্বরের বাণী (হাদিস)’ ছিল জিভের ডগায়। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি।

হুমায়ূন (১৫৩০-৪০ খ্রিঃ) মুসলিম আলিমদের অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করতেন মোল্লা আব্দুল্লা তাঁর দরবারে উপস্থিত হলে হুমায়ূন তাঁকে মখদুমুল্-মুল্‌ক্ (দেশপূজ্য উপাধি প্রদান করেন। মখ্দুম্ নামেই তিনি বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন। কেউ কেউ বলেন হুমায়ূন তাঁকে “শেখুল ইসলাম” (ইসলাম ধর্মের রাজা) পদবিও দিয়েছিলেন। আবা কারো কারো মতে, শেরশাহ প্রদত্ত পদ ও মর্যাদা দুইবার রাজ-পরিবর্তনের পরে অক্ষুণ্ণ রাখা তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল।

যখন হুমায়ূন ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহের কা পরাজিত হয়ে ইরানের দিকে পলায়ন করেন, তখন তিনি শেরশাহের প্রতি ত ভক্তিশ্রদ্ধা পরিবর্তন করেছিলেন। শেরশাহের পুত্র ইসলামশাহের আমলে তো ধ সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। মেহ্দী পন্থী (সাম্যবাদী) আল্লাঈকে তিনিই ফতোয়া জারি করে হত্যা করান। তিনি যে কট্টর মৌলবাদী ছিলেন, সেকথা বলাই বাহুল্য ।

ইসলামশাহের আমলে লাহৌর এলাকার জহনি গ্রামে এক সুফি সন্ত শেখ দাউদ জহনী থাকতেন। তাঁর জ্ঞান-সাধনার সুখ্যাতি ছিল এবং তাঁর খানক্বাহ্ (গুরুদওয়ারা)- তে শিষ্য-শিষ্যাদের বেশ ভিড় হতো। মোল্লা সুলতানপুরীর কাছে তা বিধর্মিতা বলেই প্রতীয়মান হলো । সে-সময় ইসলামশাহ গওয়ালিয়রে ছিলেন। মখ্‌দুম তাঁকে দিয়ে শেখ দাউদ জহনীকে ডেকে পাঠানোর ফরমান জারি করালেন। শেখ দুজন অনুচর-সহ রওনা দিলেন। গওয়ালিয়রের বাইরে মোল্লা সুলতানপুরীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় । 

শেখ জিজ্ঞেস করেন— “ফকিরকে ডেকে পাঠানোর কারণ কি?” সুলতানপুরী বললেন—“শুনেছি, তোমার শিষ্যরা ‘ইয়া দাউদ, ইয়া দাউদ’ বলে জপ-কীর্তন করে।” জহনী উত্তর দিলেন— “শুনতে হয়তো ভুল হয়েছে। ‘ইয়া দাউদ’ নয়, তারা বলে “ইয়া ওদুদ’।” ‘ওদুদ’ আল্লার এক নাম, তাতে আপত্তির কি থাকতে পারে? সেখানে এক রাত কাটান তিনি। তাঁর সৎসঙ্গের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে সুলতানপুরীর উপর, তিনি দাউদ জহনীকে যথোচিত সম্মানের সঙ্গে বিদায় করে দেন।

শাহ আরিফ হুসেনীকে একজন বড় সিদ্ধ সন্ত বলে গণ্য করা হতো। গুজরাতের আহমদাবাদ থেকে তিনি লাহৌরে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি তাঁর সভা-সমাবেশে গুজরাত থেকে শীতকালীন ফল আনিয়ে লোকজনকে খাওয়ালেন। সুফি সন্তদের সঙ্গে মোল্লার প্রায়শই সঙ্ঘাত হতো। তাঁদের ছিল আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা, সেখানে মোল্লা মানুষের কাছে কেবল ফতোয়া এবং শরীয়তের রুক্ষ-শুষ্ক বক্তৃতা দিতেই সমর্থ ছিলেন।

শাহ হুসেনী সুদূর গুজরাতের কাথিয়াওয়াড়ের ফল এনে লাহৌরে লোকজনকে ভক্ষণ করিয়েছেন, এমন বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনার বিরুদ্ধে মোল্লা সুলতানপুরী কিই-বা বলতে পারেন? তিনি অন্য পথ ধরলেন—“তাহলে তো সেই ফল অপরের বাগান থেকে পেড়ে আনা হয়েছিল। বাগান-মালিকদের বিনা অনুমতিতে ফল এনে বিতরণ করা হারাম, সেই ফল ভক্ষণ করাও হারাম।” কিন্তু এ ব্যাপারে মোল্লা সুলতানপুরী কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন কি, তার আগেই শাহ হুসেনী কাশ্মীর চলে যান ।

 ইসলামশাহ মোল্লা সুলতানপুরীকে কত সমাদর করতেন, একটি দৃষ্টান্ত থেকেই তা বোঝা যাবে। একবার মোল্লাকে বিদায় জানাবার জন্য তিনি ফরাশ থেকে নেমে এসেছিলেন, নিজের হাতে তাঁর জুতো তাঁর সামনে সোজা করে পেতে দিলেন। অথচ সেটা ছিল লোক-দেখানো।

 

তিনি মনে করতেন, জনসাধারণের মধ্যে মোল্লার খুব প্রতিপত্তি, এরূপ ব্যবহারে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে। একবার পাঞ্জাব যাত্রার সময় সহচরদের সঙ্গে বসে ছিলেন তিনি, দূরে মোল্লা সুলতানপুরীকে আসতে দেখে বললেন— “হেচ্ মী দানীদ্ কি ঈ কি আয়দ্” (ওই যিনি আসছেন, কেউ জানেন কি তিনি কে)? একজন সহচর অনুমতি চাইলেন—“ বা-ফর্মায়নন্দ্” (বলতে আজ্ঞা করুন)।

 ইসলামশাহ বললেন— “বাবর বাদশাহরা পঞ্জ পিসার বুদ। চাহার পিসার জ্-হিন্দুস্তান রক্তন্দ, একে মান্দা” (বাদশাহ্ বাবরের পাঁচ পুত্র ছিল, চারজন ভারত থেকে চলে গেছে, একজন রয়েছে)। সঙ্গী জিজ্ঞেস করলেন—“আঁ কীরাৎ” (সে কে)? ইসলামশাহ জবাব দিলেন—“ঈ মুল্লা কি মীআয়দ্ (ওই মোল্লা, যে আসছে)।” কিন্তু মোল্লা যখন কাছে এসে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি তাঁকে রাজাসনেই বসালেন এবং মুক্তোর তসবি (জপমালা) ভেট দিলেন। তখন তার মূল্য কুড়ি হাজার টাকা ।

মোল্লা সুলতানপুরীর উপর ইসলামশাহের যে সন্দেহ ছিল তা অকারণে নয় । যখন হুমায়ূন ইরান থেকে প্রত্যাবর্তন করে কাবুল অধিকার করেন, তখন মোল্লা, হাজী… পরাচা নামক এক বণিকের মাধ্যমে এক জোড়া মোজা ও একটি চাবুক উপঢৌকন স্বরূপ প্রেরণ করেন, তার অর্থ হলো— পায়ে মোজা পরে চাবুক হাতে অশ্বারোহণ করে ভারতে চলে এস, মাঠ পরিষ্কার। হুমায়ূন ভারতের সিংহাসন করায়ত্ত করেন। তখন মোল্লা সুলতানপুরী ধর্ম বিষয়ে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হন ।

আবার, যখন আকবার রাজ্য ও জীবন পণ করে সংগ্রাম করছেন, তখন সিকান্দার খাঁ আফগান— যিনি তাঁর দলবল নিয়ে কাংলা গিরি-উপত্যকায় আত্মগোপন করেছিলেন— বেরিয়ে এসে মোগল এলাকায় রাজস্ব আদায় করতে শুরু করেন ।

লাহৌরের শাসনকর্তা হাজী মুহম্মদ খাঁ সিস্তানী জানতে পারেন, এর পিছনে মোল্লা সুলতানপুরীর হাত আছে। মোল্লা সুলতানপুরী লুটপাট করে প্রচুর ধনসম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন। এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ পেয়ে যান হাজী। তাঁকে বন্দী করে এনে তাঁর অর্ধেক শরীর মাটিতে পুঁতে দেন এবং তাঁর যাবতীয় ধনসম্পদ আত্মসাৎ করেন।

 বৈরাম খাঁ খানখানা কেবল একজন দক্ষ সৈন্যই ছিলেন না, একজন ধুরন্ধর কূটনীতিকও ছিলেন। জয়লাভের পর ঘটনাটি তাঁর কর্ণগোচর হলে তিনি খুব অসন্তুষ্ট হন। আকবরের সঙ্গে তিনি লাহৌর পৌঁছলে হাজী সিস্তানীর মন্ত্রীকে মোল্লা সুলতানপুরীর গৃহে গিয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বললেন এবং তাঁকে মানকোট এলাকায় এক লক্ষ বিঘার জায়গির দিলেন। অল্পকালের মধ্যেই মোল্লার ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হলো ।

 

মোল্লা সুলতানপুরীর প্রতাপ তখন মধ্য-গগনের দিকে ছুটছে। বাদশাহ্ তখনও শিশু। তাঁর যে-স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার পথে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মোল্লা সুলতানপুরী, সেই স্বপ্ন তখনও তাঁর চোখের সামনে প্রতিভাত হয়নি, আর সেজন্য মোল্লার প্রতিপত্তি যে পূর্বাপেক্ষাও অধিকতর হবে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। আদম খাঁ ঝেলম অঞ্চলে জঙ্গী ধক্করদের সর্দার ছিলেন, তিনি মোগলদের সামনে মাথা নত করতে রাজি ছিলেন না। মোল্লা সুলতানপুরীর মধ্যস্থতায় আদম খাঁ বৈরাম খাঁ খানখানানের নিকট আসেন এবং আদম খাঁর সঙ্গে ভ্রাতৃ সম্পর্ক স্থাপন উপলক্ষে পরস্পর পাগড়ি বদল করেন। 

বৈরাম খাঁ যখন আকবরের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যান, তখনও মোল্লা সুলতানপুরী দুজনের মনোমালিন্য দূর করার জন্য প্রভূত প্রয়াস চালিয়েছিলেন, এবং যাঁরা বৈরাম খাঁকে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলেন, মোল্লা তাঁদের অন্যতম। এই রকমই আকবরের অন্য এক সেনাপতি মুনায়ম খাঁ খানখানা বাদশাহের ক্ষমা লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন মোল্লার বিপুল প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণেই ।

 

Leave a Comment