৯ এপ্রিল ১৯৭১ | টিক্কা খানের শপথ,লড়াই অব্যাহত | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস। স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত চেষ্টা এবং অজস্র ঘটনা। এখানে রইল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্তেকটি দিনের বিবরণ।
৯ এপ্রিল ১৯৭১
টিক্কা খানের শপথ,লড়াই অব্যাহত
অবরুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ৯ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে ঢাকায় শপথ নেন। শপথ পরিচালনা করেন ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী। পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান মার্চের প্রথম দিকেই টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। তাঁর শপথ নেওয়ার দিন ধার্য ছিল ৬ মার্চ। গণ-আন্দোলনের তীব্রতা দেখে বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী তখন শপথ পড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
দেশের শহরাঞ্চলগুলোতে পাকিস্তান ধীরে ধীরে তাদের সামরিক কর্তৃত্ব কায়েম করছিল। আবার স্থানে স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ওপর ঝটিকা গেরিলা আক্রমণও পরিচালনা করে যাচ্ছিলেন। ঢাকার রাস্তা ছিল পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের সাঁজোয়া যানের দখলে। কার্যত ঢাকা পরিণত হয়েছিল একটি অবরুদ্ধ শহরে।
জাহানারা ইমাম তাঁর ৯ এপ্রিলের দিনলিপিতে লিখেছেন, ‘কারফিউয়ের মেয়াদ ধীরে ধীরে কমছে। পাঁচ তারিখে ছ’টা-ছ’টা ছিল। ছয় তারিখ থেকে সাড়ে সাতটা-পাঁচটা দিয়েছিল। গতকাল থেকে আরও কমিয়ে ৯টা-৫টা করেছে।…(ধানমন্ডি) তিন নম্বর রোডে ওয়াহিদের বাসার কাছাকাছি মিলিটারিদের চলাফেরা খুব বেড়ে গেছে।’
পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানায়, চট্টগ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিতাড়িত করা হয়েছে। তবে কালুরঘাটের কৃষি ভবনে ভিন্ন ঘটনা ঘটছিল। ৮ এপ্রিল সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা হটে গিয়েছিলেন। এই দিন সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল কৃষি ভবনে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটিতে আক্রমণ করে। এ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তারা কৃষি ভবন ছেড়ে শহরের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
যশোরের বেনাপোল সীমান্তেও মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে সারা দিন ধরে সংঘর্ষ চলে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিলেট শহর দখল করে সিলেট মেডিকেল কলেজে অভিযান চালায়। তারা হাসপাতালে ঢুকে ডা. শামসুদ্দীন আহমেদকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
সরকারি ও স্বাধীনতাবিরোধীদের তৎপরতা
সন্দেহজনক লোকজনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে ইয়াহিয়া খান ৭৮ নম্বর নতুন সামরিক বিধি জারি করেন। তাতে বলা হয়, প্রধান আইন প্রশাসক বা সামরিক আইন প্রশাসক অথবা ক্ষমতাপ্রাপ্ত উপসামরিক আইন প্রশাসক পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার স্বার্থে বা শৃঙ্খলা অক্ষুণ্ন রাখতে যে কারও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
ঢাকায় খাজা খায়েরউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১৪০ সদস্যের নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের প্রতি একাত্মতা জানিয়ে আলাদা আলাদা বিবৃতি দেন পাকিস্তান মুসলিম লীগের (কাইয়ুম) প্রধান সংগঠক কাজী আবদুল কাদের, খেলাফত রব্বানী পার্টির চেয়ারম্যান এ এস এম মোফাখ্খার, প্রাদেশিক মুসলিম লীগের (কাইয়ুম) যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল হক দোলন, পাকিস্তান পার্টির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী সরকার এবং ঢাকা জেলা বারের ৫১ জন আইনজীবী।
চট্টগ্রামের (উপ) সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে ফজলুল কাদের চৌধুরী, মৌলভি ফরিদ আহমদসহ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
