অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কার

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –  অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কার। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কার

 

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কার

 

১। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রতিবেদনেও ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের আবশ্যিকতা ঘোষিত হয়েছে। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে জনগণের এই দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে অন্তবর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান ও ঐ নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ চরিত্র নিশ্চিত করে তিনজোটের ঘোষণায় সুনির্দিষ্ট বিধান করা হয়।

নব্বইউত্তরকালে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্গঠনের যে দায়িত্ব ঐ ঘোষণায় বিধৃত ছিল তা পরিপূরণ না করে তৎকালীন বিএনপি সরকার বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার আরও ধ্বংস সাধন করে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে দুই জাতীয় সংসদের অন্তর্বর্তীকালীন সময় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়।

নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করার জন্য কালো টাকা, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করার জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিও সেই সময় উত্থাপিত হয়। ঐ দাবিকে উপেক্ষা করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদ ও সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা লাভে ব্যর্থ হলে বার দিনের স্থায়ী ঐ সংসদে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-এর বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২। দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে সক্ষম হলেও সংবিধানের উক্ত সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বল্পকালীন শাসন আমলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করায় নানাবিধ সংকট সমস্যা সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি দু’টি ক্ষেত্র ছাড়া সমূদয় কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন।

কিন্তু সংবিধানের ঐ বিধানে রাষ্ট্রপতিকে এমন কিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে যা সংসদীয় পদ্ধতির মূল চেতনার পরিপন্থী। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় দ্বৈত কাঠামো তৈরি হয়েছে যা একান্তরূপে অনভিপ্রেত ও অনাকাংখিত সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। রাষ্ট্রপতির হাতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ন্যস্ত থাকা এর অন্যতম। অন্যদিকে নির্দলীয় সরকারের রাষ্ট্রপতির নিকট দায়ী থাকার বিধানটিও সংবিধানের পরিপন্থী এবং ঐ সময়কালে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতার অধিকারী করে ।

৩। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতার বিবেচনায় স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য প্রধান বিচারপতিকে অন্তবর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান এবং তিনি না হলে সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত অন্যান্য প্রধান বিচারপতি অথবা আপীল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধান বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণের প্রবণতা সৃষ্টি করেছে।

 

শুধুমাত্র বিচারকদের চাকুরির ব্যয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭-তে আকস্মিকভাবে উন্নীত করা তারই সাক্ষ্য প্রদান করছে। এ যাবত বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ও তার স্বাধীনতা প্রদানের ক্ষেত্রে টালবাহানা, বিচারপতি নিয়োগে দলীয় বিবেচনা বিচার বিভাগ সম্পর্কেও প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

অনুপরি পদাধিকার বলে কাউকে কোন নিযুক্তি প্রদান অনেক সময় যুক্তিযুক্ত নাও হতে পারে। এই ব্যবস্থাকে আরও উপযুক্ত, দক্ষ ও কার্যকর করার জন্য প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রটি কেবল মাত্র বিচার বিভাগের পরিমণ্ডল থেকে বিস্তৃত করা প্রয়োজন।

৪। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী নির্দলীয় সরকারের দায়িত্ব অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসাবে সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন করা এবং ঐ প্রয়োজন ব্যতীত কোনভাবেই কোন নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা।

কিন্তু ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেবল নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তই গ্রহণ করে নাই, অধ্যাদেশ জারি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা পরিবর্তন ও তাদের বিচারিক ক্ষমতা পর্যন্ত প্রদান করে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

৫। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাগণ কোন রাজনৈতিক দল অথবা কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত কোন সংগঠনের সদস্য হবেন না। সর্বোপরি প্রধান উপদেষ্টাকে সকল রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন হতে হবে।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবিধানিক ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে সংবিধানের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয়। পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কার

 

জনগণের সেই দাবি অনুযায়ী-

(১) রাষ্ট্রপতি ক্রীয়াশীল সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা ও ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে আস্থাভাজন ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যদের নিয়োগ দান করবেন।

 (২) সংসদীয় সরকার ব্যবস্থাকে বিবেচনায় রেখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধানকালীন সময়েও রাষ্ট্রপতি সকল বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।

(৩) প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাবৃন্দ সংবিধান ও জনগণের নিকট দায়ী থাকিবেন। 

(৪) নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেয়াদকালীন সময় প্রতিরক্ষা বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ন্যস্ত হবে এবং তাহাদের দ্বারা পরিচালিত হবে। এবং

(৫) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যপরিধি সংবিধান অনুসারে কেবলমাত্র সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা প্রদানের মধ্যে সীমিত থাকবে।

Leave a Comment