আজকের আলোচনার বিযয় স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন শুরু হয়। তবে বাস্তবিকপক্ষে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এর সূচনা করেছিল ১৯৬৪ সালে এ দলের পুনরুজ্জীবনের পর থেকে আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার জন্য শান্তিপূর্ণ পন্থায় চূড়ান্ত প্রয়াস চালানোর লক্ষ্যে প্রদেশে এক ব্যাপকতর সমর্থনের বুনিয়াদ ব্যাপকতর করার জন্য। অবশ্য ছয়-দফা ফর্মুলাই সংশ্লিষ্ট দাবিগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে মনোযোগের পাদপ্রদীপের সামনে নিয়ে আসে ও জনমত সংগঠনকে দ্রুততর করে তোলে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যখন ছয়-দফা কর্মসূচির’ পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে নিজের উদ্যম ও শক্তিকে সংহত ও কেন্দ্রীভূত করছিল তখন সরকারও অতি উদ্বিগ্ন হয়ে পরিস্থিতি নিয়ে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা না করেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সাঁড়াশী আক্রমণ শুরু করে।
![স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 2 স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/03/আওয়ামী-লীগের-অভ্যুদয়-পটভূমি-1.jpg)
স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১
একদিকে, সরকার ছয়-দফার প্রবক্তাদেরকে “বিচ্ছিন্নতাবাদী” বলে পূর্ব পাকিস্তানীদেরকে এর পরিণতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ার করে দেয়—অন্যদিকে জনমত আরো সংগঠিত করা ঠেকাতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের ধরপাকড় শুরু করে এবং স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের জনপ্রিয়তা সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশ বন্ধ করার জন্য খবরের কাগজের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট যিনি কনভেনশন মুসলিম লীগেরও প্রধান ছিলেন তিনি তাঁর পূর্ব পাকিস্তান সফরকালে ধারাবাহিকভাবে প্রদত্ত বিভিন্ন ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানীদের এ রকম ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, ছয়-দফা সমর্থকরা বিচ্ছিন্নতাবাদী। তাদেরকে সমর্থন দিলে পূর্ব পাকিস্তানীরা শেষ পর্যন্ত ভারতের ফাঁদে পড়বে। তিনি ‘ছয়-দফাওয়ালাদের’ ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনে “অস্ত্রের ভাষা” প্রয়োগের হুমকি দেন।
কিন্তু এ সব সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সূচিত স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলনের প্রকৃতি দেখে বোঝা যায় যে, এর আগে যে সব কেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন হয়েছে সেগুলি থেকে এটি লক্ষণীয়ভাবেই ভিন্ন চরিত্রের। এ আন্দোলন আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে সীমিত থাকলো না। জীবনের সকল স্তরের মানুষ, রিক্সাওয়ালা, কলকারখানার শ্রমিক, ক্ষুদে দোকানদার, বাস-ট্যাক্সি-বেবিট্যাক্সি চালক, দিনমজুর সকলে এ আন্দোলনের বিক্ষোভে শরিক হয়।
শান্তি বজায় রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বারংবার আবেদন সত্ত্বেও বিক্ষোভে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এ স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে এক আক্রমণাত্মক, বেপরোয়া উপাদান যোগ করে। থানা, ব্যাংক, সরকারের প্রশাসনিক দপ্তরের ভবনাদি এবং সরকারপন্থী সংবাদপত্রগুলি মাঝে মাঝেই আক্রান্ত হতে থাকে কোনো সংগঠিত সহিংস আন্দোলনজনিত কারণে নয় বরং এ সব ঘটে প্রধানত সরকারের নিষ্ঠুর পুলিশী নির্যাতন-নিপীড়ন ও দমনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে, খোদ সরকার পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে কলঙ্কিত করার জন্য এ সব ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটায়।
আন্দোলনে জনসাধারণের অংশগ্রহণকে ঠেকাতে না পেরে সরকার মাত্র একটি অভিযানেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির ৩৭ সদস্যের প্রায় সকল সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অন্যান্য বিশিষ্ট নেতা, ছাত্রলীগ ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাকে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনের ৩২ বিধির আওতায় গ্রেপ্তার করে। ১৯৬৬ সালের ১৩ মে পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ এই সব ধরপাকড়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রতিবাদ দিবস পালন করে। ঐ একই দিনে অনুষ্ঠিত এক জনসভা ছয়-দফা কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে। যাঁরা সরকার গৃহীত ব্যবস্থাদির বিরুদ্ধে বলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন এনডিএফ-এর চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ও ঢাকার মৌলিক গণতন্ত্রীরা।
১৯৬৬ সালের ৩০ মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির এক বৈঠকের পর দলীয় সংগঠন বেশ পরিকল্পনামাফিক অগ্রসর হয়। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয় । পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী, এমএনএ (ও মূলত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক) সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে সকলের প্রতি এ হরতালকে সফল করার আহ্বান জানান।
পুলিশ একটি ছাপাখানা থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কিছু পোস্টার বাজেয়াপ্ত করায় এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের বেআইনি আটক রাখায় সরকারের সমালোচনা করে তিনি সরকারকে মনে করিয়ে দেন যে, পাকিস্তান যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জনসাধারণ সেগুলির ব্যত্যয় হতে দেবে না। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানও পাল্টা বিবৃতি দেন। তবে শিল্পশহর নারায়ণগঞ্জে এক জনসভায় মোনেম খানের ভাষণ দেওয়ার সময় এ বিষয়ে জনগণের মনোভাব কী তার বড়রকমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
ঐ সভায় জনতা স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের অনুকূলে শ্লোগান দেয় এবং এই আন্দোলনের সমালোচনার প্রতিবাদে তারা সভাস্থল ছেড়ে চলে যায়। এই জনসভায় আরো অনেকের মধ্যে ঢাকা নগর মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সভাপতি শামসুল হুদাও বক্তৃতা করেন। উভয় বক্তাই হরতাল পালন না করার আহ্বান জানান। এমনিভাবে পূর্ব পাকিস্তান। আওয়ামী লীগ আহুত হরতাল কায়েমি কর্তৃপক্ষের প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয় ৷
ঢাকায় ও অন্যত্র সভাসমিতি, পথসভা, ঘরোয়াসভা ও মিছিলের মাধ্যমে উক্ত হরতালকে সফল করে তোলার প্রস্তুতির জন্য যখন ছাত্র, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজন ও কর্মীরা সমবেতভাবে কাজ করছিল তখন মিজানুর রহমান চৌধুরী সংবাদপত্রে আরো এক বিবৃতিতে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন। আর প্রাদেশিক পরিষদের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নয়-সদস্য এক যৌথ বিবৃতিতে দমন-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কতদূর গড়াতে পারে সে ব্যাপারে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন।”
পরিকল্পিত হরতালের পূর্বাহ্ণে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী রাজনৈতিক দলমত ও সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে পূর্ব পাকিস্তানের সকল শ্রেণীর মানুষের প্রতি আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেন, “যা-ই ঘটুক না কেন, আমরা আমাদের লড়াই চালিয়ে যাবো।” পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামও ছয়-দফার জন্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সকল গণতান্ত্রিক সংগঠনের সহযোগিতা কামনা করেন।
দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) এ আন্দোলনে জনসাধারণের সাড়াকে উল্লিখিত উদ্দেশ্য অভিমুখে এক সম্মুখ পদক্ষেপের সুনিশ্চিত আভাস বলে বর্ণনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, “যদিও প্রতিক্রিয়াশীলরা অতীতের মতোই বিধিনিষেধ আরোপক ব্যবস্থাদির পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে এবং মাত্র একটিবারের জন্য হলেও ইতিহাসের পুরানো পাতায় দৃকপাত মাত্র না করেই ন্যায়সম্মত গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে তবু এবার জনগণ তাদের পূর্ণ অধিকার আদায়ে সংকল্পবদ্ধ।”
১৯৬৬ সালের ৭ জুনের হরতাল সম্পর্কে খবরের কাগজে একমাত্র সরকারি ভাষ্য ছাড়া কোনো কিছু ছাপার অনুমতি না দেওয়া হলেও, সবাই জানতো যে হরতাল সর্বাত্মক সফল হয়। কিন্তু সরকার পরিকল্পিত গুণ্ডামির আশ্রয় নেয় এবং কোনো কোনো জায়গায় গুলি চালানো হয়। এতে বেশ কিছু লোকের প্রাণহানি ঘটে। এ সব উস্কানির মুখে জনসাধারণের আক্রমণাত্মক মনোভাব বেপরোয়া পর্যায়ে চলে যায়।
তারা পুলিশের গাড়ি পোড়ানো, পুলিশ ফাঁড়ি ও সরকারি অফিস ইত্যাদিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপের মতো কিছুটা মাত্রায় সহিংসতার আশ্রয় নেয়।” অবশ্য সুদীর্ঘ সরকারি প্রেসনোটে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে সহিংস ঘটনার সূত্রপাত করার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের লেলিয়ে দেওয়া সমাজবিরোধীদের দায়ী করে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনাকে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা বলে বর্ণনা করা হয়।
তবে সরকারের এই প্রেসনোট জনচিত্তে তেমন কোনো রেখাপাত করতে সমর্থ হয়নি বলেই মনে হয়। পূর্ব পাকিস্তানে বিরোধীদলীয় সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন বাজেট অধিবেশনের তৃতীয় দিনে বিরোধীদলগুলির সকল সদস্য ও নির্দলীয় গ্রুপ প্রাদেশিক পরিষদ বর্জন করে। পাকিস্তানের সংসদীয় ইতিহাসে এ ধরনের পরিস্থিতি নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করা হয়।
বিধিনিষেধমূলক আদেশ-নির্দেশ সত্ত্বেও এ সব ঘটনা সম্পর্কে ঢাকায় কোনো কোনো খবরের কাগজে উল্লেখ করা হয়। তফাজ্জল হোসেন লেখেন, “ছয়-দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য গৃহীত নিষ্ঠুর ব্যবস্থাদির কারণে মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে একমাত্র সান্ত্বনার বিষয় হলো এই যে, জনসাধারণ ছয়-দফা আন্দোলন তথা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে তাদের নিজেদের আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করেছে।
একদা রক্তপাত যেমন ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের পথ রচনা করেছে, রক্তপাতে সূচিত স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনেও, তাঁর মতে, সাফল্য এখন সুনিশ্চিত।১৪ তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) যিনি ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের পাকিস্তান শাখার চেয়ারম্যান ছিলেন তাঁকে এ সব কথার জন্য মূল্য দিতে হয়। তাঁকে ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধির ৩২(১) ধারার আওতায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং ‘দ্য নিউনেশন প্রিন্টিং প্রেস’ নামে ছাপাখানা যেখান থেকে দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী প্রকাশিত হতো বাজেয়াপ্ত করা হয় ।
দ্য টাইমস (লন্ডন) পত্রিকা সঠিকভাবেই অনুমান করে যে, ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের হরতাল সরকারের সঙ্কটকে ঘনীভূত করবে, সরকারের হরতাল ভাঙার প্রয়াসে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে উঠবে আর তাতে যাদের প্রাণহানি ঘটবে হরতালকারী পক্ষ তাঁদেরকে তাঁদের “শহীদ” বলে গণ্য করতে কিংবা নিজ সাফাই দেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।১৬ পাকিস্তান সরকার তার স্বকীয় চরিত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ঐ হরতালের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাবার ঝুঁকি গায়ে না মেখে পারেনি।
তবে নিপীড়ন, হয়রানি সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এগিয়ে যেতেই থাকে। ১৯৬৬ সালের ১০ ও ১১ জুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের ওয়ার্কিং কমিটির এক জরুরি বৈঠকে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের প্রথম পর্যায় চলাকালে জনসাধারণের অনুকূল সাড়া লক্ষ্য করে সন্তোষ প্রকাশ করা হয় ও ১৬ আগস্ট ১৯৬৬ সালের মধ্যে ১৪৪ ধারার জরুরি অবস্থার মতো নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার, নাগরিক অধিকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার এবং বিনাবিচারে আটক রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া না হলে ঐ তারিখ থেকেই আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
ওয়ার্কিং কমিটির সভার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, ১৭, ১৮ ও ১৯ জুন—এই দিনগুলি নিপীড়ন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হবে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিটি ইউনিটকে বাড়ি বাড়ি কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণের কর্মসূচি সংগঠিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় । তাদের সভাসমিতি ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ আয়োজনের জন্যেও বলা হয়। ওয়ার্কিং কমিটি ছয়-দফা ফর্মুলার সপক্ষে প্রদেশব্যাপী।
স্বাক্ষর গ্রহণ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় এবং আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের সাফল্যের জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণ যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়েছেন সে জন্য তাঁদেরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। কমিটি এই আন্দোলনে সাফল্যের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করে। যারা আন্দোলন চলাকালে নিহত হয়েছেন তাঁদের পরিবারগুলিকে সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি তহবিল প্রবর্তনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আন্দোলনের প্রথম পর্যায় চলাকালে যারা বিভিন্ন আইনগত মামলায় পড়েছেন তাদের জন্য আইনগত সাহায্য-কমিটি গঠনের বিষয়টিকে ওয়ার্কিং কমিটি অভিনন্দিত করে। কমিটির সভায় গৃহীত ১৫টি প্রস্তাবের মধ্যে ছিল, তীব্র খাদ্য সঙ্কট প্রশমনের জন্য প্রদেশব্যাপী রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন, লেভি ব্যবস্থা বিলোপ, সকল সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, সিলেট ও রংপুর জেলার বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকাগুলির জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদির দাবি।১৭ আর কিছু প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি।
এগুলিতে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচির কিছু বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয় ছিল। এগুলির মধ্যে ছিল, সাধারণ ধর্মঘট, কলকারখানা ও অফিস-আদালতে বিভিন্ন সময়ে কর্মবিরতি, ভুখা মিছিল, জনসভা, জনপ্রতিনিধি দল প্রেরণ এবং অবস্থান ধর্মঘট বা ধরনা ইত্যাদি ।
হরতালের সাফল্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গৃহীত নীতি ও কর্মকৌশলের সাফল্যের স্পষ্ট প্রমাণ। ছয়-দফা ফর্মুলাকে স্পষ্টত একান্ত জনমনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসা না হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পক্ষে এত বিপুল অনুসারী পাওয়া হতো খুবই কঠিন কাজ । বিষয়টি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ‘৪০-এর দশকে গৃহীত কৌশলেরই অনুরূপ। ঐ সময় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাটি প্রচার করা হলে ভারতের বিভিন্ন পথ ও মতের মুসলমান মুসলিম লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয় ।
পূর্ব পাকিস্তান ১৯৬৬ সালের ১৭ জুন থেকে পরপর তিনদিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আহ্বানে প্রতিবাদ দিবস পালন করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে পার্লামেন্টারি সচিব এমএ জহির ৭ জুনের পুলিশের গুলিবর্ষণের পদক্ষেপের সমর্থন করে হরতালকারীদের নিন্দা জ্ঞাপন করেন । তাঁর ভাষায় ওরা ছিল গুণ্ডা-হাঙ্গামাকারী । তিনি দেশে নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য বিরোধীদলগুলি, বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করেন এবং ৭ জুন ১৯৬৬ সালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নৈরাজ্যের জন্য তাদেরকে দায়ী করেন।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক যিনি একজন এমএনএ-ও বটে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত অন্যতম এনডিএফ সদস্য মাহমুদ আলী বিষয়টি জাতীয় পরিষদে উত্থাপনের চেষ্টা করেন কিন্তু তাঁকে বিষয়টি উত্থাপন করতে দেওয়া হয়নি। আর সেই সাথে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারণা চলতে থাকে।
জুন বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি গৃহীত আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর সিদ্ধান্তটি ২৩ ও ২৪ জুলাই ১৯৬৬ সালে অনুষ্ঠিত কমিটির পরবর্তী বৈঠকে অনুমোদন করা হয় । কমিটির স্থির প্রত্যয় জন্মায় যে, জনগণ ছয়-দফাকে তাদের গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া পূরণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার এবং সেই সুবাদে পাকিস্তানের ঐক্য সংহতি অক্ষুণ্ণ রাখার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জেলা শাখাগুলিকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বার্তা প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে দিয়ে ছয়-দফা কর্মসূচি আদায়ে জনমত সৃষ্টির নির্দেশ দেওয়া হয়।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতাদের ব্যাপক ধরপাকড়ের পর কেবল জেলা পর্যায়ে কিছু দলীয় কর্মকর্তাই ছিলেন প্রাদেশিক সদরদপ্তরে সাংগঠনিক কাজ করার জন্য। ঐ সময় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ মহিলা শাখার সম্পাদিকা ছিলেন আমেনা বেগম। তাঁকেই নিরীক্ষামূলকভাবে দলের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক করা হয়। ২১ আমেনা বেগম ১৯৫৩ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে ছিলেন।
সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি সমাজকর্মের জন্যই মূলত রাজনীতিতে যোগ দেন। ২২ ১৯৬০ সালের মার্চে কাউন্সিল সভায় তাকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার সম্পাদক করা হয় আর সেই সুবাদে পদাধিকারবলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যও ছিলেন। দলে একজন মহিলা সম্পাদক নেওয়ার মূলে স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে নারীর অংশগ্রহণকে আরো জোরদার করে তোলা।
ঘটনাচক্রে তাঁকে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের দায়িত্বভার নিতে হয়। বাস্তবিকপক্ষে তাঁকেই স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় পরিচালনা করতে হয়। তাঁর অনভিজ্ঞতা সত্ত্বেও এই স্তরে জনগণকে সুসংগঠিত করার অভিযান ক্ষুণ্ণ হয়নি। বরং এ আন্দোলন অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলে আর সেই সাথে পূর্ব পাকিস্তানীদেরকে আরো আগামী ঘটনাবলি যেমন, ১৯৬৮-৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী বিক্ষোভের জন্য তৈরি করে।
ইতোমধ্যে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে আরো এক গুরুতর সাংগঠনিক সমস্যার মোকাবেলা করতে হয় যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের মর্যাদার প্রশ্নটিকে রীতিমতো হুমকির মুখে ফেলে। আমেনা বেগমও সঙ্কটসঙ্কুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে যথেষ্ট যোগ্যতার পরিচয় দেন।
অবশ্য স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থনকে সুসংগঠিত পথে এগিয়ে নিয়ে সে সমর্থনকে সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে অভিব্যক্ত করার প্রয়োজন ছিল । বিভিন্ন সংগঠিত মহলের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ভালো যোগাযোগ রয়েছে এ রকম সিনিয়র নেতার অভাব, জনপ্রিয়তার অধিকারী ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও ছাত্রনেতাদের কারাগারে প্রেরণ এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নিষ্ক্রিয়তা সুনিশ্চিতভাবেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কর্মসূচির এ অংশটিকে অনেকটাই মন্থর করে দেয় ।
স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা করার কথা ছিল ঢাকার আউটার স্টেডিয়ামে এক জনসভার মাধ্যমে। তবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে সেখানে সভা অনুষ্ঠানের অনুমতি না দিয়ে এই অনুমতি দেওয়া হয় কনভেনশন মুসলিম লীগকে। এ কারণে আমেনা বেগম শান্তিপূর্ণ ও শাসনতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় চালিয়ে যাওয়ার জন্য সকল জেলা, মহকুমা, শহর, থানা ও ইউনিয়ন স্তরের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কমিটিগুলিকে নির্দেশ দেন।
১৯৬৬ সালের ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামে দলের এক জনসভার আয়োজন সম্ভব হয়। ঐ জনসভায় আমেনা বেগম স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক সূচনার কথা ঘোষণা করতে সক্ষম হন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান ও দলের অন্যান্য কর্মীর মুক্তি দাবি করেন। তিনি ছয়-দফাকে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের বুনিয়াদ হিসেবে বর্ণনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন পাকিস্তান অর্জনে পূর্ব পাকিস্তানীদের অবদান অনেক বেশি। আর তাই তিনি পূর্ব পাকিস্তানীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করার নিন্দা জানান।
তিনি শান্তিপূর্ণ ও শাসনতান্ত্রিক উপায়ে এই আন্দোলন পরিচালনার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, যে কোনো আত্মত্যাগের বিনিময়ে তাঁর দল এ আন্দোলনকে সফল করবেই।
উল্লিখিত জনসভার পর দলের যে সব নেতাকে পাওয়া সম্ভব হয় তাঁদের সঙ্গে নিয়ে আমেনা বেগম বিভিন্ন জেলা সফর করেন। এ সফরে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর সাথে ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁদের বক্তৃতায় ছয়-দফা দাবির যৌক্তিকতা, বৈধতা ও ন্যায্যতার বিষয়গুলি (যা ব্যাপক জনসমর্থনের বুনিয়াদে ইতোমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত) ব্যাখ্যা করেন। তাঁরা বলেন, সরকারের কারণে জনগণের ভীত হওয়ার প্রয়োজন নেই, কেননা আওয়ামী লীগের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তাঁরা ছয়-দফা প্রশ্নে গণভোটের মাধ্যমে এ বিষয়ে জনমত যাচাইয়ের দাবি করেন।
তাঁদের এ সফরে অনুষ্ঠিত জনসভাগুলিতে গৃহীত বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্যে ছিল: ছয়-দফার জন্য একটানা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ, রাজবন্দীদের মুক্তি দাবি, সংবাদপত্রের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, জরুরি অবস্থা বাতিল, ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আন্দোলনে নিহতদের পরিবারদের জন্য পেনশন প্রদানের দাবি, নিউনেশন প্রিন্টিং প্রেসের আটকাদেশ প্রত্যাহার, বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্রুগ কমিশনের সুপারিশগুলির বাস্তবায়ন, পূর্ণ রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন, মূল্যবৃদ্ধি নিবারণমূলক ব্যবস্থা, জমি মালিকানার সিলিং ২৫ বিঘা পর্যন্ত নির্ধারণ, তাঁতীদের কাঁচামাল, সূতা ও রঙের মূল্য হ্রাস, বেকার বিড়ি শ্রমিকদের পুনর্বাসন, ছাত্র বেতন হ্রাস, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পুনরায় খোলা এবং ভিয়েতনামে মার্কিননীতির প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন ।
উল্লিখিত বক্তৃতা-ভাষণগুলির বক্তব্য ও বিষয়বস্তু মোটামুটি এক থাকলেও সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মেজাজ ও সুর চড়তে থাকে। গোড়ার দিকে ছয়-দফার পক্ষে যুক্তি প্রদান করতে বলা হতো সেগুলি পাকিস্তানের ঐক্য বিধায়ক বিষয়, আর ক্ষমতা গ্রাস কিংবা ক্ষমতার ভাগীদার হওয়ার কোনো উচ্চাভিলাষ ব্যতিরেকেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ সংগ্রাম পরিচালনায় দৃঢ় সংকল্প। পরবর্তীকালে দাবি করা হয়, ছয়-দফা হলো সমাজতান্ত্রিক-অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করার উপায় আর এর মধ্য দিয়েই শুধু পাকিস্তান উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। ২৬ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সংকল্প জোরদার হয়ে ওঠার বিষয়টি আমেনা বেগমের এ বক্তব্যে প্রতিফলিত:
আমি শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের মুক্তি আজ চাইব না, কেননা আজকে কেবল লাখো আওয়ামী লীগ কর্মীই নয় বরং গোটা জাতি ছয়-দফা আদায়ের লক্ষ্যে সর্বাধিক আত্মত্যাগের জন্য তৈরি। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এ দেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) গোটা অঞ্চল সফর করে জনমত যাচাই করেছি…. সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ ছয়-দফা আদায় না হওয়া পর্যন্ত সম্মিলিতভাবে (পূর্ব পাকিস্তান) আওয়ামী লীগের সাথে থাকৰে ।
নিঃসংশয়ে বলা যায় শীর্ষস্থানীয় নেতৃপর্যায়ে শক্তি কমে যাওয়া সত্ত্বেও এ সময় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার পতাকা সমুন্নত রাখে এবং দলটির প্রতি জনসমর্থন ক্রমেই বাড়তে থাকে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তেমন সাড়া মেলেইনি (যদিও এদের কয়েকটি সংগঠন নীতিগতভাবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল) বরং নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান ও আবু হোসেন সরকার প্রমুখের মতো পূর্ব পাকিস্তানী নেতারা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ও শাণিত উল্লেখ না করেই পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনের সংগ্রামে সম্মিলিত বিরোধী সংগঠন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেন।
আর পূর্ব পাকিস্তানে বামপন্থীদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মওলানা ভাসানী স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে দূরে থাকেন। অথচ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তনের প্রথম দিন থেকেই (মওলানা ভাসানী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) তাঁর স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে অঙ্গীকার ছিল ।
এখন তিনি তাঁর এ থেকে দূরে থাকার অজুহাত দিলেন এই বলে যে, স্বায়ত্তশাসনের এ আন্দোলনের নেপথ্যে বাইরের মদদ রয়েছে, পরিকল্পনাও তাদের মওলানা ভাসানীর দল ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক এমএইচ উসমানীর মাথায় এমনকি এমন ভাবনারও উদয় হয় যে, ছয়-দফা পরিকল্পনার আওতায় যে সব প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে চাওয়া হচ্ছে তা “দেশের সার্বভৌমত্ব” বিপন্ন করতে পারে।
তবে সে যা-ই হোক, ভাসানী স্বায়ত্তশাসনের কথা মাঝে মাঝে বলতে থাকলেও নিশ্চুপ রইলেন ছয়-দফার প্রশ্নে। একইভাবে ১৯৬৬ সালের ৫ জুন ঢাকায় ন্যাপের এক জনসভায় ৭ জুনের হরতাল সম্পর্কে কিছুই বলা হলো না যদিও আইয়ুব খানের “অস্ত্রের ভাষায় কথা বলার হুমকি”র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হলো।
অবশ্য এই দ্বিধান্বিত মনোভাব ছিলো ন্যাপের ভেতরে পরস্পরবিরোধী অভিমতেরই ফল। ৩২ ভাসানী এ বিষয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক অবস্থান সম্পর্কে উল্লেখ করে বলেন, ন্যাপ ছয়-দফা সমর্থন করছে না তবে তাঁর দল আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, ভাষাভিত্তিক প্রদেশ ও এক ইউনিট বিলোপের জন্য লড়ে যাবে । তিনি দীর্ঘসূত্রতার কৌশল অবলম্বনের বিপজ্জনক পরিণতির বিষয়ে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেন। তিনি ৩৩ অঞ্চল বহির্ভূত নানা ইস্যুকে কেন প্রাধান্য দিচ্ছিলেন তা বোধগম্য।
কিন্তু ‘সরকার কিছুটা পরিসরে আমাদের দাবি মেনে নিয়েছে’ বলে তিনি যে বিবৃতি দেন তা কিংবা “যদ্দিন সরকার সমাজতন্ত্রী দেশগুলির সাথে বন্ধুত্ব গড়ার অনুকূল পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন, আমরা সরকারকে তদ্দিন আমাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে যাবো” তাঁর ভাবমূর্তিকে আর যাই হোক উজ্জ্বলতর করেনি। কেবল তাই নয়, তাঁর এ প্রতিক্রিয়া সরকারের মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট কার্যব্যবস্থা কী হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় —এ ধরনের কথাবার্তা তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীদের জন্যও সহায়ক হয়নি।
আওয়ামী লীগ ও ছয়-দফা প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা বা অবস্থানটিও রীতিমতো হেঁয়ালিময়। ছয়-দফা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়—এটি ঘোষণা করতে গিয়ে তিনি এ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন যে, একদিন যারাতাঁর ‘আসসালামু আলায়কুম’ বলার জন্য তাঁর সমালোচনা করেছিলেন আজ তাঁরাই ৩৫ স্বায়ত্তশাসনের এক তেজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ন্যাপ রাজনৈতিক দল হিসেবে বন্যাত্রাণ, খাদ্য ঘাটতি, চড়া দ্রব্যমূল্য” ইত্যাদি বিষয়ক কার্যক্রমে মনোযোগী থাকলেও কোনো কোনো ন্যাপ নেতা ছয়-দফার সমর্থনেও মতপ্রকাশ করেন । ন্যাপ সহসভাপতি ও জনপ্রিয় কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশ এমনকি ছয়-দফাকে পূর্ব পাকিস্তানের “প্রাণের দাবি” বলেও উল্লেখ করেন।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনবাদীরা তাঁদের সংকল্পে অটল থাকলেও তখনকার অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তেমন দাগ কাটতে পারছিলেন না। একই ধরনের পরিস্থিতিতে ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনও একই ধরনের পরিণতি বরণ করে। অবশ্য স্বায়ত্তশাসনবাদীদের এই বন্ধ্যাদশা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে তথা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে জড়িত করা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের ঢেউ পূর্ব পাকিস্তানে এসে লাগার সাথে সাথে স্বায়ত্তশাসনবাদীরা এক দ্বিস্তরের আন্দোলন শুরু করে দেয়।
এর এক স্তরে ছিল, প্রচলিত শাসন ব্যবস্থা তথা আইয়ুবের নেতৃত্বাধীন শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন, অন্যস্তরে, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত দাবিদাওয়া। তবে ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্পর্কে স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে ফাটল দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের একটি উপদল ছয়-দফা বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট বা পিডিএম-এ যোগ দেয় । এই মেয়াদে পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলি তিনটি শিবিরে বিভক্ত ছিল :
১. কট্টর স্বায়ত্তশাসনবাদী: এদের বেশিরভাগ অংশ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের। আরেকটি অংশ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একাংশ। এদের সকলের কাছে এ অঞ্চলের পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের যে রূপরেখা ছয়-দফা কর্মসূচিতে দেওয়া হয়েছে তা গোটা দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মতোই ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২. মধ্যপন্থী: এনডিএফ, পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াত-ই-ইসলামী, নিজাম-এ-ইসলাম এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের হাতেগোনা কিছু নেতাসহ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একাংশ। এরা সকলে মিলে নুরুল আমিনের নেতৃত্বে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট নামে একটি মোর্চা গঠন করে । এই রাজনৈতিক দলগুলি সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করে । কেননা, তাঁদের বিশ্বাস ছিল, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বায়ত্তশাসন দাবির নেপথ্য ইস্যুগুলির যথা সুব্যবস্থা ও প্রতিকার রয়েছে।
৩. বিভিন্ন বামপন্থী গ্রুপ: মওলানা ভাসানীর ছত্রচ্ছায়ায় এরা সমাজের সামগ্রিক পুনর্নির্মাণ ও পুনর্গঠনে বিশ্বাসী ছিল বলেই মনে হয় যা তাঁদের মতে, ছয়-দফা ফর্মুলার বাস্তবায়ন বা পিডিএম-এর উদ্দেশ্য রূপায়ণের মাধ্যমে সম্ভব নয় । তাঁরা সন্দেহ করতেন স্বায়ত্তশাসনপন্থীরা সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নক আর বড়জোর পূর্ববঙ্গের উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি।
ন্যাপের অভ্যন্তরে উপদলীয় সংঘাত মূলত স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে দলের অবস্থান নিয়ে দেখা দেয় ও পরে তা থেকে আরো মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে ন্যাপ-আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্ট সম্পর্কে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। এ জল্পনা-কল্পনা আরো জোরদার হয়।
ন্যাপের এক সভার পর থেকে । এই সভায় দলের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সদস্য এই মর্মে অভিমত প্রকাশ করেন যে, সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যসমূহ, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদী বিরোধমূলক যে আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের প্রয়োজন তার দায়িত্ব কেবল ন্যাপ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগই নিতে পারে, কেননা এই দুই রাজনৈতিক দলের প্রতিই কেবল জনসাধারণের রয়েছে ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ সমর্থন ।
১৯৬৭ সালের অক্টোবরে পূর্ব পাকিস্তানের ৮ জন ন্যাপ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় । ব্যাপারটি “আন্তর্জাতিকতাবাদী” ও “জাতীয়তাবাদীদের” অন্তর্দলীয় সংঘাতের পরিণতি বলে বর্ণনা করা হয়।৪১ দলের আনুষ্ঠানিক ভাঙন ঘটে ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে। ইতোমধ্যে, নিখিল পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক এমএইচ উসমানী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে, ন্যাপের অন্তর্কলহে কোনো আদর্শিক প্রশ্নই সংশ্লিষ্ট ছিল না।
তবে সমস্যা ছিল সরকারের প্রতি ন্যাপের নীতি কী হবে সেটাই । তিনি আরো বলেন যে, ন্যাপ কোনো বিশেষ “শ্রেণীর” প্রতিনিধিত্ব করে না, এ দল বিশ্বাস করে যে, শুধুমাত্র সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমেই সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদকে প্রতিরোধ ও নির্মূল করা যেতে পারে।
এবডো বিধির কার্যকারিতার মেয়াদ শেষে পাকিস্তান স্টাডি সার্কেল আয়োজিত এক প্রাণবন্ত আলোচনায় পিডিএম-এর সূত্রপাত ঘটে। নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে এ সেমিনারে বিরোধী শিবিরে ঐক্যের সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় ।
আলোচনায় বক্তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল দৃষ্টত সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমবেত প্রয়াসের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাৎপর্যের বিষয় এই যে, আলোচনায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুটি আদৌ ওঠেনি। অবশ্য, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শাহ আজিজুর রহমানের অভিমত ছিল এই যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্য কারাবন্দী নেতাকে মুক্তি না দেওয়া হলে এ ধরনের ঐক্যের বিষয়ে ফলদায়কভাবে আলোচনা সম্ভব নয় ।
এ ছাড়া পিকিংপন্থী পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট (ইপিসিপিএমএল)-এর অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিত ন্যাপ নেতা আব্দুল হক বলেন যে, প্রস্তাবিত ন্যূনতম কর্মসূচিতে বিরোধীদলগুলির সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকার পরিচয় এবং তাতে কৃষক শ্রমিকদের দাবিদাওয়া অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
পিডিএম-এর কর্মসূচিতে কিছুটা পরিমাণে ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়নের কথা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পিডিএম নেতাদের সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে যে বক্তা পাওয়া যায় তা একান্তই শূন্যগর্ভ ও অস্পষ্ট। বরং তাঁদেরকে একটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের মধ্যপন্থী কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলেই একান্ত আগ্রহী বলে লক্ষ্য করা যায় যা কায়েমি কর্তৃপক্ষ ও তাদের ভবিষ্যৎ সমর্থক গোষ্ঠীগুলি—উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
এই পর্যায়ে তারা যদি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে তাদের কর্মসূচি পরিত্যাগ কিংবা কর্মসূচির মেজাজ কিছুটা হাল্কা করে তাদের কাতারে যোগ দিতে সম্মত করানোর কাজে সফল হতো তাহলে তাদের মূল উদ্দেশ্যসাধন অনেকখানি সহজ হয়ে যেতো। আর তাহলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের, বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে যে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল সেটিও যুগপৎ হরণ করা হতো । এ জন্যে আওয়ামী লীগারদেরকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন থেকে দূরে সরানোর জন্য নানা প্রলোভনের টোপ ফেলা হয় ।
মধ্যপন্থী ও ক্ষমতাসীনচক্র উভয়েই আওয়ামী লীগে ফাটল ধরিয়ে দেওয়া ও স্বায়ত্তশাসনবাদীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলার অপপ্রয়াস চালায়। স্পষ্টত এটা করা হয় স্বীয় স্বার্থ রক্ষার সুযোগ আরো উজ্জ্বল করার তাগিদে। তবে ঐ সময়কার ব্যবস্থায় গোটা সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার তৃণমূল ও শীর্ষ স্তরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের অবকাশ না থাকায় ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ বিভ্রান্ত হন ও তাদের এই ধারণা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ নেতারা আবছা প্রলোভনের টোপ গিলবেন ও তাঁদের আনুগত্য বদলাবেন। আর তার পরেই স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন খতম হয়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আফতাব আহমদ নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত পশ্চিম পাকিস্তানী আমলা ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কয়েকজন জেলা পর্যায়ে উঠতি ও সম্ভাবনাময় নেতার সাথে যোগাযোগ করেন।
এঁদের মধ্যে ছিলেন টাঙ্গাইলের মান্নান ও খুলনার মোমেন। কিন্তু ঐ আমলা তাঁদেরকে তাঁর টোপ গেলাতে পারেননি। এই আমলা তাঁদেরকে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, “তাঁরা যদি ছয়-দফা ছাড়েন তাহলে ছয় মাসের মধ্যে সব কিছু বিলকুল ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু এ সবে আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে আদৌ টলানো যায়নি। আফতাব আহমদ সব কিছু “ঠিকঠাক” করে দেওয়ার উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির ব্যাপারে তাঁদেরকে আস্থায় আনতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মর্মে জানা যায়:
এ ধরনের আলোচনার ফলাফল শেষ পর্যন্ত গোপন থাকেনি। কেননা, এই এ উদ্দেশ্যে পিণ্ডি থেকে বিশেষ কিছু দূত সম্প্রতি এলেও তাঁরা এতে আদৌ দাঁত বসাতেই পারেননি। কারণ আওয়ামী লীগাররা তাঁদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, জনসাধারণের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য তাঁরা যে কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতায় রাজি থাকলেও দলীয় পর্যায়ে তাঁদের ছয়-দফার আন্দোলন চলতেই থাকবে।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক তবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত তখনো আসেনি। ১৯৬৭ সালের বসে । এই বৈঠকে প্রাদেশিক সংগঠন কেন্দ্রীয় সংগঠনকে একটি সম্মিলিত বিরোধী ফ্রন্ট গঠন সম্পর্কে আলোচনা করতে দিতে সম্মত হয় যদিও পূর্ব পাকিস্তানী আওয়ামী লীগারদের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যেই প্রস্তাবিত ফ্রন্টে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে।
এ সব আওয়ামী লীগারদের কাছে বিষয়টি নীতির প্রশ্ন তো ছিলই, সেই সাথে কৌশলগত প্রশ্নও ছিল বটে। এ ধরনের কোয়ালিশনের ব্যাপারে মুজিবের অনীহা ছিল সর্বদাই অত্যন্ত প্রবল। তাছাড়া, জনসাধারণ ছয়-দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে—এই বিবেচনার আলোকে তিনি ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কোনো নতুন ও অপেক্ষাকৃত নিচু লয়ের কর্মসূচি নতুন করে শুরু করা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্য লাভজনক হবে না।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ছয়-দফা কর্মসূচিতে অটল প্রত্যয় ও বিশ্বাসের বিষয়টি ১৯৬৭ সালের মে মাসে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট নামে এক মোর্চা গঠনের সময় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। গুটিকয়েক সপক্ষত্যাগী ছাড়া, পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ পিডিএম থেকে দূরে থাকে।
এতে শেষাবধি পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের পাকিস্তান আওয়ামী -লীগে বিভক্তি ঘটে । আর তাতে শুধু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী -লীগের ভেতরেই নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী -লীগের ভেতরেও অন্তর্দলীয় সংঘাতের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী-লীগের অভ্যন্তরে এ নিয়ে যে মেরুকরণ ঘটে তাতে তাৎপর্যপূর্ণভাবে অঞ্চলভিত্তিক গ্রুপিংয়ের বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ পায় ৷
পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে সব কিছু যে সত্যি ঠিকঠাক চলছিল না ছয়-দফা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী -লীগ আয়োজিত আলোচনায় যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে মিজানুর রহমান চৌধুরীর সফরের কিছুকালের মধ্যেই তার আভাস পাওয়া যায়।
করাচি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ভাঙন সম্পর্কে এক শ্রেণীর খবরের কাগজে বিভিন্ন খবরাখবর প্রকাশিত হলে করাচি আওয়ামী- লীগ সভাপতি শেখ মঞ্জুরুল হক সে খবরের সত্যতা অস্বীকার করেন।৪৮ করাচি আওয়ামী লীগের মঞ্জুরুল হক ও তিরমিযী এর আগে ছয়-দফার প্রতি তাঁদের অনুকূল সাড়া ব্যক্ত করেছিলেন।
![স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 3 স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/03/আওয়ামী-লীগের-অভ্যুদয়-পটভূমি-3.jpg)
কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী -লীগের সভাপতি মোহাম্মদ লুন্দখোর ছয়-দফা প্রশ্নে প্রতিকূল সাড়া ব্যক্ত করেন । এই পরিস্থিতির আলোকে দেখা যায়, পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী- লীগের মুখপাত্রস্থানীয় লুন্দখোর ও নসরুল্লাহ খান করাচি আওয়ামী- লীগে ছয়-দফা- সংক্রান্ত অবস্থানের বিরোধিতা করছেন। এভাবে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী -লীগের অভ্যন্তরে মতভেদ ও এর পরিণতি হিসেবে পাকিস্তান আওয়ামী -লীগে ছয়-দফা ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে মতপার্থক্যের বিষয়টি একান্তই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী- লীগের একাংশ স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পিডিএম-এ যোগ দেওয়ার জন্য তৈরি হন। তবে পরবর্তীকালের ঘটনাবলির আলোকে দেখা যায়, এদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। যা হোক, দলের কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনায় এ সম্পর্কিত ইস্যুর নিষ্পত্তি হয় ৷
![স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 1 স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/04/স্বায়ত্তশাসন-আন্দোলন-পর্ব-১.png)