আজকে আমদের আলোচনার বিষয় আলীগড় আন্দোলন ও মুসলিম জাগরণ
আলীগড় আন্দোলন ও মুসলিম জাগরণ

আলীগড় আন্দোলন ও মুসলিম জাগরণ
১৮৫৭ খ্রি. সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তী সময় ভারতীয় মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ ছিল। ঔপনিবেশিক শাসকগণ বিদ্রোহের সার্বিক দায়িত্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে তাদের উপর নানা ধরনের উৎপীড়ন চালাতে শুরু করে। এমনিতেই ঔপনিবেশিক শাসন ভারতীয় মুসলমানদের জন্য অধিকতর দুর্দশার কারণ হয়েছিল; সিপাহী বিদ্রোহ উত্তরকালে এই দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে।
এই সময়ে উত্তর ভারতে মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হন স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮)। তিনি ছিলেন আলীগড় আন্দোলনের পুরোধা। এই আন্দোলনের মূলকথা ছিল-
(১) মুসলিম সম্প্রদায়ের ইহজাগতিক উন্নতি;
(২) বৃটিশ শাসকদের সঙ্গে একটা সমঝোতা ও সম্প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন, এবং
(৩) আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের সার্বিক আন্তান্নয়ন ও হিন্দুদের সাথে সমমর্যাদার আসন লাভ করা।
এই লক্ষ্যসমূহকে সামনে রেখে আলীগড় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তিনি এই শহরে মোহামেডান এ্যাংলো-অরিয়েন্টাল কলেজ স্থাপন করেন। স্কুল শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৫ খ্রি. এবং কলেজ শাখা ১৮৭৭ খ্রি. । পরবর্তীকালে এই কলেজ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত হয়। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই অক্টোবর দিল্লির এক অভিজাত পরিবারে সৈয়দ আহমদ খান জন্মগ্রহণ করে।
তার পূর্বপুরুষগণ মুঘল দরবারের সহিত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি দিল্লির বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শাহ ওয়ালিউল্লাহ্ বিদ্যালয়ে আরবি, ফারসি ও উর্দুতে শিক্ষালাভ করেন। ১৮৩৮ খ্রি. সৈয়দ আহমদ খান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে মুন্সেফের পদে যোগদান করেন । সিপাহী বিদ্রোহ যখন শুরু হয় তখন তিনি বিজনোর শহরে কর্মরত ছিলেন। এই শহরের ইংরেজ অধিবাসীগণ বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়।
সৈয়দ আহমদ খান অত্যন্ত সুকৌশলে বিদ্রোহীদের নেতার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ইংরেজদের জীবন রক্ষা করেন। পরবর্তী সময়ে বিজনোরের ইংরেজ কালেক্টর সৈয়দ আহমদের এই কাজের প্রশংসা করেন এবং কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে অবহিত করেন। এভাবে সৈয়দ আহমদ খান ইংরেজ শাসকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন, যা আলীগড় আন্দোলনে তাঁর সহায়ক হয়।
সিপাহী বিদ্রোহের অব্যবহিত পরবর্তী দিনসমূহ সৈয়দ আহমদ খান শাসক গোষ্ঠীর আক্রোশ থেকে মুসলমানদেরকে রক্ষা করার কাজে মনোনিবেশ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ‘The Causes of Indian Revolt’ নামক একখানা পুস্তিকা রচনা করেন। মূল পুস্তিকাটি উর্দু ভাষায় লিখিত ছিল। বিদ্রোহের প্রধান দায়ভার তিনি শাসকদের উপর ন্যস্ত করেন। তাঁর মতে, শাসিতদের অনুভূতি সম্পর্কে শাসকদের অজ্ঞতাই বিদ্রোহের মূল কারণ।
তিনি বলেন, লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ভারতীয়দের কোন প্রতিনিধিত্ব ছিল না বিধায় শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোন যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি। তিনি আরো মনে করেন যে, নিষ্কর ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারও সিপাহী বিদ্রোহের ইন্ধন যোগায়। তদুপরি, যে বিশেষ কারণে ভারতীয় সরকার মুসলমানদেরকে বিদ্রোহের প্রধান হোতা মনে করে তা ছিল মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ কর্তৃক বিদ্রোহীদের নেতৃত্বদান।
এই প্রসঙ্গে সৈয়দ আহমদ খানের বক্তব্য ছিল এই যে, বৃদ্ধ সম্রাট স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব গ্রহণ করেননি; তাঁর সেই ক্ষমতাও ছিল না। নেতৃত্ব তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং তিনি ছিলেন বিদ্রোহীদের হাতের পুতুল। শাসকদের নীতির সমালোচনা সত্ত্বেও বৃটিশ ভারতীয় সরকার বুঝতে পারে যে, সৈয়দ আহমদ খান ইংরেজ শাসনের সমর্থক ছিলেন।
অতপর Loyal Mohammedans of India নামক অন্য একটি পুস্তকে তিনি বিদ্রোহীদেরকে দুষ্কৃতিকারীরূপে অভিহিত করেন এবং তাদের জন্য পুরো মুসলিম সম্প্রদায়কে অপরাধী সাব্যস্ত করার নীতির কড়া সমালোচনা করেন । সৈয়দ আহমদ খান উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের যা বিশেষ করণীয় তা হচ্ছে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করে আত্মোন্নতির ব্যবস্থা এবং সমস্ত বৈষয়িক ব্যাপারে প্রাগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়ের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করা।

আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি প্রথমে Scientific Society (১৮৬৪ খ্রি.) এবং পরে আলীগড় কলেজ স্থাপন করেন। ১৮৭৬ খ্রি. তিনি সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেন এবং আলীগড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আলীগড় কলেজের জন্য তিনি উপযুক্ত ইংরেজ অধ্যক্ষ, শিক্ষকমন্ডলী নিয়োগ দান এবং তাদের হাতে ছাত্রদের লেখাপড়া ও চরিত্র গঠনমূলক কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
আলীগড় আন্দোলনের মূলনীতি ছিল সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। সৈয়দ আহমদ মনে করতেন শাসকদের সহায়তা ব্যতীত মুসলমানদের উন্নতি সম্ভব নয়। শিক্ষার ব্যাপকতর বিস্তারের জন্য ১৮৮৬ খ্রি. সৈয়দ আহমদ খান Mohammedan Educational Conference স্থাপন করেন। এই সংস্থার মাধ্যমে মুসলিম কবি- সাহিত্যিকগণ নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ লাভ করেন।
মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চেতনাও এর মাধ্যমে বিকশিত হয়। স্যার সৈয়দের মৃত্যুর পরও এই সংগঠন সক্রিয় ছিল। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে ঢাকায় Mohammedan Education Conference-এর বিংশতিতম সভার সমাপ্তিপর্বে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নামক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। আলীগড় আন্দোলনের মাধ্যমে সৈয়দ আহমদ খানের রাজনেতিক মতাদর্শ স্পষ্টতর হয়— যা পরবর্তীকালে ভারতীয় মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।
১৮৮৫ খ্রি. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হওয়ার পর তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে বিকাশমান জাতীয়তাবাদী চিন্তার সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। তিনি ভারতীয় মুসলমানদেরকে কংগ্রেস থেকে দূরে সরে থাকার পরামর্শ দেন। কারণ, প্রথমত, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বৃটিশ সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা বিদ্যমান ছিল যা স্যার সৈয়দের আনুগত্যের ধারণার বিপরীত ছিল।
দ্বিতীয়ত, হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত কংগ্রেস দলের নীতি ও কার্যাবলী মুসলিম স্বার্থের অনুকূল হবে না বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। স্যার সৈয়দের ঐ সময়কার চিন্তা-ভাবনার মধ্যে পরবর্তীকালের দ্বিজাতিতত্ত্বের আভাস পাওয়া যায়। অবশ্য প্রথম দিকে অনেক উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুও কংগ্রেস দলকে সমর্থনদানে বিরত ছিলেন। এর সুযোগ নিয়ে ১৮৮৮ খ্রি. সৈয়দ আহমদ খান United Indian Patriotic Association নামে হিন্দু-মুসলিমের মিলিত একটা সংগঠন গড়ে তোলেন।
১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে বোম্বাইতে কংগ্রেস দলের পঞ্চম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে ইংল্যান্ড থেকে আগত স্যার উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন সভাপতিত্ব করেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের প্রতি সহানুভূতিশীল বৃটিশ আইনসভার খ্যাতনামা সদস্য চার্লস ব্রাড়ল। এর কার্য বিবরণী স্যার সৈয়দের উদ্বেগের কারণ হয়।
কেননা এই সভায় ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কাউন্সিলসমূহের কমপক্ষে অর্ধেক সদস্য নির্বাচনের ভিত্তিতে নিয়োগের দাবি জানানো হয়। নির্বাচনের নীতি চালু হলে পশ্চাৎপদ মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষতি হবে বলে স্যার সৈয়দ আশঙ্কা করেন। তথাপি পরবর্তী কয়েক বছরের সরকারি নীতি ও কার্যাবলীতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার প্রবর্তন শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার।
১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের কাউন্সিল আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক পরিষদসমূহের সদস্য সংখ্যা এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। একই সময়ে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক কোন্দল ও দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে স্যার সৈয়দ মুসলমানদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন। এর ফলস্বরূপ ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় Mohammedan Anglo- Oriental Defence Association। এই সংগঠনের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল-
১) ইংরেজ জাতি ও সরকারের নিকট মুসলিম সম্প্রদায়ের মতামত তুলে ধরার মাধ্যমে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ;
২) রাজনৈতিক আন্দোলনে মুসলমানদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করা;
৩) বৃটিশ সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব রক্ষার জন্য যে কোন সরকারি নীতির সমর্থন এবং ভারতে শান্তি ও আনুগত্যের উৎসাহ প্রদান করা।
এই সংগঠনের মাধ্যমে স্যার সৈয়দ মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচন এবং আসন সংরক্ষণের দাবি জানান । এ ধরনের দাবি-দাওয়া কয়েক বছর পর মুসলিম লীগের রাজনীতিতে আরো পূর্ণতররূপে প্রকাশিত হয়। ধর্ম ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও আলীগড় আন্দোলনের বিশেষ অবদান ছিল। ইসলাম ধর্মের যুক্তিসম্মত (rational) ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল স্যার সৈয়দের ধর্ম-চিন্তার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
এজন্য অবশ্য তিনি রক্ষণশীল উলেমা কর্তৃক সমালোচিত হয়েছিলেন। উর্দু সাহিত্যের কতিপয় দিকপাল আলীগড় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এঁদের মধ্যে উলে-খযোগ্য হলেন- আলতাফ হোসেন হালী, মৌলভী নাজির আহমদ, মৌলভী জাকা উল্লাহ এবং শিবলী নোমানী। আলীগড় আন্দোলন ভারতে মুসলিম জাগরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এর প্রভাব বাংলায়ও দেখা যায়।
স্যার সৈয়দ বৃটিশ সরকারের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য সমালোচিত হয়েছেন। তবুও ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে এবং তাদের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার উন্মেষে আলীগড় আন্দোলনের ভূমিকা সুদূরপ্রসারী ছিল।
সারসংক্ষেপ
আলীগড় আন্দোলনের প্রধান স্থপতি ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮)। সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের দুর্দশা লাঘব করার জন্য তিনি এই আন্দোলনে ব্রতী হন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মুসলমানদের উচিত ঔপনিবেশিক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের সার্বিক উন্নতি সাধনে সচেষ্ট হওয়া। আধুনিক শিক্ষাই হচ্ছে সেই উন্নতির প্রধান উপায়।
শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ ১৮৭৫ খ্রি. আলীগড়ে Mohammedan Anglo- Oriental College-এর গোড়াপত্তন করেন, যা পরবর্তীকালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে স্যার সৈয়দ মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাস করতেন। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার খাতিরে তিনি মুসলমান সমাজকে কংগ্রেস পার্টির রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকার পরামর্শ দেন। সাধারণভাবে মুসলিম সম্প্রদায় তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়।
সহায়ক গ্ৰন্থপঞ্জী :
১। Aziz Ahmed, Islamic Modernism in India and Pakistan. London, 1967.
2। S.M. Burke and Salim Al-Din Quraishi, The British Raj in India: An Historical Review, Dhaka, 1995.

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :
১। সিপাহী বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের দুর্দশার কারণ কি?
২। স্যার সৈয়দ আহমদ খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সংস্থার নাম এবং প্রতিষ্ঠার তারিখ উল্লেখ করুন।
৩। Mohammedan Anglo-Oriental Defence Association-এর উদ্দেশ্যগুলো কি ছিল?
রচনামূলক প্রশ্ন :
১। আলীগড় আন্দোলনে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের ভূমিকার মূল্যায়ন করুন।
২। মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে আলীগড় আন্দোলনের অবদান কি ছিল?
আরও দেখুন:
