ইলিয়াস শাহী শাসন: আযম শাহ, রাজা গণেশ ও পরবর্তী ইলিয়াস শাহী সুলতান

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ইলিয়াস শাহী শাসন: আযম শাহ, রাজা গণেশ ও পরবর্তী ইলিয়াস শাহী সুলতান  – যা বাংলায় মুসলিম শাসন এর অন্তর্ভুক্ত।

ইলিয়াস শাহী শাসন: আযম শাহ, রাজা গণেশ ও পরবর্তী ইলিয়াস শাহী সুলতান

 

ইলিয়াস শাহী শাসন: আযম শাহ, রাজা গণেশ ও পরবর্তী ইলিয়াস শাহী সুলতান

 

সুলতান সিকান্দার শাহ

সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তবে তাঁর দীর্ঘ রাজত্বকালের কিছু মুদ্রা ও কয়েকটি শিলালিপি ছাড়া অন্য কোন সূত্রে তাঁর সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তাঁর রাজত্বের প্রারম্ভে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক কর্তৃক দ্বিতীয় বার বাংলা আক্রমণ এবং এই প্রসঙ্গে দিল্লির ঐতিহাসিকদের লেখনিতে সিকান্দর শাহের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ফিরোজ শাহের প্রত্যাবর্তনের পর দিল্লির সাথে বাংলার সম্পূর্ণভাবে সম্পর্কছেদ ঘটে। ফলে এরপর বাংলা সম্বন্ধে দিল্লির ঐতিহাসিকদের তেমন কোন সম্যক জ্ঞান ছিল না।

সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহের রাজত্বকালে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক প্রথম বাংলা আক্রমণ করেন। কিন্তু তেমন কোন সাফল্য অর্জন না করে ফিরে যান। ইলিয়াস শাহের জীবিতাবস্থায় উভয়ের মধ্যে মিত্রতা বজায় ছিল এবং উভয়ের মধ্যে একাধিকবার উপঢৌকন বিনিময় হয়েছিল। ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর সময় ফিরোজ শাহের দূত উপহার নিয়ে বাংলা আসার পথে ইলিয়াস শাহের মৃত্যু সংবাদ পান, ফলে তিনি বাংলায় না এসে দিল্লিতে ফিরে যান।

তদুপরি সিকান্দর শাহের সিংহাসন আরোহণের পর পরই ফিরোজ শাহ বাংলার বিরুদ্ধে তাঁর দ্বিতীয় অভিযান প্রেরণ করেন। দিল্লির সুলতান সম্ভবত ইলিয়াস শাহের রাজত্বের অবসানের অপেক্ষায় ছিলেন। তাই সিকান্দার শাহের রাজত্বের প্রারম্ভেই বাংলায় দিল্লির শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপযুক্ত সময় মনে করে কাল বিলম্ব না করে তিনি আবার বাংলা আক্রমণ করেন।

প্রথমবারের মতো এবারও ফিরোজ শাহ এক বিরাট সৈন্যদল ও নৌবহর সঙ্গে নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন। কনৌজ, অযোধ্যা ও জৌনপুর হয়ে ফিরোজ শাহ বাংলায় এসে পৌঁছালে সুলতান সিকান্দার শাহ তাঁর পিতার পথ অনুসরণ করে দুর্ভেদ্য ও জলেবেষ্টিত একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন। ফিরোজ শাহ একডালা দুর্গ অবরোধ করেন এবং উভয়পক্ষে যুদ্ধ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে উভয়পক্ষ বিরক্ত হয়ে সন্ধির জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন এবং অবশেষে উভয় পক্ষে সন্ধি স্থাপিত হয়। ফিরোজ শাহ ৮০,০০০ টাকা দামের একটি মুকুট এবং ৫০ আরবি ও তুর্কি ঘোড়া সিকান্দার শাহকে উপহার দেন।

সুলতান সিকান্দার শাহ ফিরোজ শাহকে চল্লিশটি হাতি এবং আরো নানা মূল্যবান উপহার পাঠান যতদিন ফিরোজ শাহ ও সিকান্দার শাহ বেঁচে ছিলেন, ততদিন উভয়ের মধ্যে উপহার বিনিময় চলেছিল। সুতরাং দেখা যায় যে, ফিরোজ শাহের দ্বিতীয় অভিযানও ব্যর্থ হয়েছিল। বরং সিকান্দার শাহ তাঁর নিকট হতে স্বাধীন ও সার্বভৌম নৃপতি হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। ফিরোজ শাহের এই দ্বিতীয় অভিযান ৭৫৯ হিজরিতে শুরু হয়েছিল এবং দুই বৎসর সাত মাস চলেছিল।

সিকান্দার শাহের দীর্ঘ রাজত্বকালে ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণ ব্যতিত অন্য কোন ঘটনা সম্পর্কে তেমন কোন কিছু জানা যায় না। এ পর্যন্ত তাঁর শাসনকালের তিনটি শিলালিপি ও বেশ কিছু মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। শিলালিপি থেকে বোঝা যায় তিনি মুসলমান সুফি সাধকদের অত্যন্ত ভক্তি করতেন। তিনি ১৩৬৩ খ্রিস্টাব্দে দিনাজপুর জেলার দেবকোর্টে মোল্লা আতার দরগায় একটি মসজিদ নির্মাণ করে। পান্ডুয়ায় শায়খ আলাউল হক তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর সাথে বিহারের মনে এর বসবাসকারী শায়খ শরফউদ্দিন ইয়াহিয়া মনেরীর সৌহার্দ ও পত্রালাপ ছিল। কথিত আছে শায়খ আলাউল হকের প্রতি তাঁর প্রথমে অতীব ভক্তি থাকলেও পরবর্তীকালে উভয়ের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল।

সুলতান সিকান্দার শাহ শিল্পানুরাগী ও শিল্প স্রষ্টা ছিলেন। স্থাপত্য শিল্পে তাঁর অমর কীর্তি পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ। ১৩৪৬ হতে ১৩৭৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি নির্মিত হয়। আয়তনের বিশালতায় ও উচ্চমানের কারুকার্যের জন্য এই মসজিদটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের ইতিহাসে অতুলনীয়। বিশালাকার এই মসজিদটি ছিল দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫০৭ ফুট ও প্রস্থে প্রায় ২৮৫ ফুট।

মসজিদের অঙ্গসজ্জায় বাংলাদেশের সনাতন পোড়ামাটির শিল্পের ব্যবহার একে বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যে সুশোভিত করেছে। তবে এত বড় স্থাপত্য নির্মাণে বাংলাদেশের কারিগরদের অদক্ষতার কারণে মসজিদটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে এটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। পশ্চিমদিকের কিছু অংশ এখনও এর অবস্থানের চিহ্ন বহন করছে।

মুদ্রা ও শিলালিপিতে সুলতান সিকান্দর শাহ কর্তৃক ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাধি পাওয়া যায়। কোন কোন মুদ্রায় *আল-মুজাহিদ ফি সবিল উর রহমান” ( আল্লাহর রাস্তায় যোদ্ধা) বা “ইমাম-উল-আজম” (প্রথম ইমাম) উপাধির ব্যবহার দেখা যায়। মনে হয় যে, তিনি ধর্ম বিষয়ে মুসলমানদের নেতৃত্ব দান করেছিলেন।

সিকান্দার শাহের শেষ জীবন সুখে কাটেনি। রিয়াজ-উস-সলাতীন গ্রন্থে উল্লেখিত আছে যে, সিকান্দার শাহের পুত্র গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ বিমাতার চক্রান্তে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছিলেন এবং পিতা-পুত্রের সংঘর্ষে পিতার মৃত্যু হয়। বুকাননের পান্ডুলিপির বিবরণেও এই তথ্য পাওয়া যায়। মুদ্রা প্রমাণে এই ঘটনা সত্য বলে মনে হয়। ৭৫৯ হিজরি থেকে ৭৯১ হিজরি পর্যন্ত জারিকৃত সিকান্দার শাহের মুদ্রা পাওয়া যায়। ৭৯০ হিজরিতে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কর্তৃক উৎকীর্ণ মুদ্রা এই বিদ্রোহেরই প্রমাণ বলে মনে করা হয় ।

সিকান্দর শাহের মৃত্যুর সঠিক তারিখ নিরূপন করা সম্ভব নয়। তবে ৭৯১ হতে ৭৯৫ হিজরির মধ্যবর্তী কোন সময়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। সুলতান হিসেবে গিয়াসউদ্দিন কর্তৃক উৎকীর্ণ মুদ্রার প্রথম তারিখ ৭৯৫ হিজরি। সুতরাং সিকান্দার শাহের রাজত্বকাল মোটামুটিভাবে ৭৫৯ হিজরী (১৩৫৮ খ্রিঃ) হতে ৭৯৫ হিজরি (১৩৯৩ খ্রি:) পর্যন্ত ধরে নেয়া যেতে পারে।

সিকান্দার শাহের প্রায় ৩৫ বৎসরব্যাপী দীর্ঘ রাজত্বকাল বাংলার মুসলিম শাসনকালের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণ ব্যতিত অন্য কোন দুর্যোগের সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়নি। সমগ্র বাংলায় বিস্তৃত রাজ্য তিনি অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। যদিও উৎসের অভাবে তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানতে পারি। তবুও স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ লক্ষ করে এ কথা বলা যেতে পারে যে, তাঁর শাসনামলে দেশে সুশাসন ও শান্তি বিরাজিত ছিল। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক প্রবর্তিত স্বাধীন সুলতানি দৃঢ় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল সিকান্দার শাহের শাসনকালে ।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ বিমাতার চক্রান্তে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং পিতা-পুত্রের সংঘর্ষে সিকান্দার শাহের মৃত্যু হলে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি বৈমাত্রেয় ভাইদের প্রতি কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন এবং তাঁদের অন্ধ করে দেন বা হত্যা করেন।

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ তাঁর পিতা ও পিতামহের মত দক্ষ নৃপতি ছিলেন। কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব যুদ্ধ বিগ্রহের ক্ষেত্রে নয়। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, বিদ্বান ও কবিদের পৃষ্ঠপোষক, সুফি-সাধকদের প্রতি ভক্তি, ইসলামি সভ্যতার কেন্দ্রস্থলে মাদ্রাসা স্থাপন এবং চীন সম্রাটের সঙ্গে দূত বিনিময়ের জন্য তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কামরূপ আক্রমণ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। গৌহাটি যাদুঘরে আজম শাহের একটি শিলালিপি রক্ষিত আছে। অনুমান করা হয় এটি কামরূপের কোন অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছিল। আমরা জানি, সুলতান ইলিয়াস শাহের রাজত্বকালের শেষের দিকে কামরূপ বিজিত হয়েছিল। এমন হতে পারে যে সিকান্দার শাহের রাজত্বকালে কামরূপে মুসলমান অধিকার লোপ পায় এবং গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ এই অধিকার পুন:প্রতিষ্ঠা করেন। আসাম বুরুঞ্জীতে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কর্তৃক কামরূপ আক্রমণ ও বাংলার সুলতানের পরাজয়ের কথা উল্লেখিত আছে।

তবে ১৩১৬ বঙ্গাব্দে (১৩৯৪-৯৫ খ্রি:) লিখিত যোগীনিতন্ত্র নামক গ্রন্থে মুসলমানদের কামরূপ আক্রমণ ও অধিকারের কথা উল্লেখিত আছে। যদিও অসমিয়া সূত্রে তাঁর পরাজয়ের কথা আছে। মুদ্রা ও লিপি তাঁর বিজয় ও অধিকারের কথাই প্রমাণ করে । তবে এই অধিকার বেশিদিন স্থায়ী হয়েছিল কিনা বলা যায় না ।

রিয়াজ- উস-সালাতীন গ্রন্থে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের ন্যায়পরায়ণতার কাহিনী বর্ণিত আছে। তিনি নিজে বিদ্বান ছিলেন এবং বিদ্যার সমাদর করতেন। তিনি ফার্সি ভাষায় কবিতা লিখতেন এবং একবার তিনি ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণ জানান। রিয়াজ-উস-সালাতীনে কবি হাফিজের সঙ্গে গিয়াসউদ্দিনের যোগাযোগের একটি কাহিনী পাওয়া যায়।

একবার সুলতান ফার্সি ভাষায় একছত্র কবিতা লিখে দ্বিতীয় চরণটি আর রচনা করতে পারলেন না। তখন সুলতান এই চরণটি লিখে একজন দূত মারফত ইরানে কবি হাফিজের নিকট পাঠিয়ে দেন। কবি হাফিজ দ্বিতীয় চরণটি রচনা করেন। সাথে সাথে তিনি একটি গজল রচনা করে বাংলার সুলতানের নিকট পাঠান। সুলতান হাফিজের নিকট বহুমূল্যবান উপহার পাঠালেন। গজলটি “দিওয়ান-ই-হাফিজ” নামে হাফিজের কাব্য সংগ্রহের মধ্যে হুবহু পাওয়া যায়।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মক্কা ও মদিনা শরিফে বহু টাকা ব্যয়ে মাদ্রাসা স্থাপন করেন ও এই দুই শহরের অধিবাসীদের মধ্যে বিলি করার জন্য বহু অর্থ প্রেরণ করেন। পিতা এবং পিতামহের মতো তিনিও মুসলমান সুফিদের অত্যন্ত ভক্তি করতেন। তাঁর সমসাময়িক সুফিদের মধ্যে শায়খ আলাউল হকের পুত্র ও শিষ্য শায়খ নূর কুতুবই আলমের নাম বিখ্যাত। তাঁর ভাই আজম খান মুলতানের উজির ছিলেন। বিহারে শামস্ বলখি নামে আর একজন দরবেশকে তিনি বিশেষ ভক্তি করতেন।

বিদেশে দূত প্রেরণ গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বের একটি অভিনব ও প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য। পারস্যের কবি হাফিজের নিকট দূত প্রেরণ ছাড়াও বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্যও যে তিনি দূত পাঠিয়েছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আজম শাহ জৌনপুরের কাকী সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা খাজা জাহান মালিক সরওয়ারের নিকট দূত প্রেরণ করেন। তিনি চীন সম্রাটের সাথেও দূত এবং উপহার বিনিময় করেন। চীনা গ্রন্থের সাক্ষ্যে ১৪০৫, ১৪০৮, ১৪০৯ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কর্তৃক চীনে দূত ও উপহার প্রেরণের কথা জানা যায়।

চীনা প্রতিনিধি দলের সাথে আগত দোভাষী মা-হুয়ান বাংলা সম্বন্ধে একটি মনোজ্ঞ বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কর্তৃক প্রকাশিত ৮১৩ হিজরি (১৪১০ খ্রি:) পর্যন্ত মুদ্রা পাওয়া যায়। সুতরাং মুদ্রা প্রমাণে বলা যায় যে, তিনি ৭৯৫ হতে ৮১৩ হিজরি (১৩৯৩ -১৪১১ খ্রি:) পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছর কাল রাজত্ব করেন। রিয়াজ-উস-সালাতীনে বলা হয়েছে যে, রাজা কানস্ (সম্ভবত রাজা গণেশ) নামক জমিদারের ষড়যন্ত্রে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ উত্তরাধিকারসূত্রে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েছিলেন। এই সাম্রাজ্য সম্প্রসারণে খুব একটা সাফল্য অর্জন না করলেও তিনি তা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। সুশাসক বিদ্যোৎসাহী ও ন্যায়বিচারক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন।তদানীন্তন ইসলামি বিশ্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপন এবং চীন দেশের সাথে দূত বিনিময় করে তিনি বাংলার সাথে বহির্বিশ্বের পরিচয় ঘটান। তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় চরিত্রের অধিকারী। তাঁর জীবনের কোন কোন ঘটনা এতই বৈচিত্র্যপূর্ণ যে সেগুলো হতে তাঁকে রূপকথার রাজপুত্রের সমপর্যায়ভুক্ত বলে মনে হয়।

মা-হুয়ানের বিবরণ

মা-হুয়ানের বিবরণে তৎকালীন বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থার একটি সুস্পষ্ট চিত্র বিধৃত রয়েছে। এতে বাংলার সামুদ্রিক বন্দর, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প ও সমাজ সংস্কৃতির তথ্য পাওয়া যায়। বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান দুই ভিন্ন জনগোষ্ঠীর অবস্থান এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন খাদ্য পোষাক ও সংস্কৃতির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। কৃষি প্রধান বাংলায় উৎপাদিত বিভিন্ন শস্যের কথা জানা যায়।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এদেশে চা উৎপাদিত হতো না, তাই পান দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হতো। দেশের অধিকাংশ অধিবাসী ছিল কৃষিজীবি। এছাড়া বণিক, জ্যোতিষ, শিল্পী এবং পন্ডিত ছিল। ধনী বণিকরা পণ্য সম্ভার নিয়ে বিদেশে বাণিজ্য করতে যেতো এবং সে উদ্দেশ্যে বৃহৎ নৌযান নির্মাণ করা হতো শিল্প দ্রব্যের মধ্যে বাংলার সূক্ষ্ণ সুতি বস্ত্রের বেশ প্রশংসা করা হয়েছে। এবং ছয় প্রকার সূক্ষ্ণ সুতি বস্ত্রের উল্লেখ এতে রয়েছে। এ দেশের মুদ্রার নাম ছিল টংকা। তবে সাধারণ বিমিয়ের জন্য কড়ির ব্যবহারও প্রচলিত ছিল।

অপরাধীদের শাস্তির জন্য ভারি বাঁশ নিয়ে প্রহার ও নির্বাসনের প্রচলন ছিল। এদেশের জনসাধারণের ভাষা যদিও ছিল বাংলা, তবে সরকারি কাজকর্ম ফার্সি ভাষায় হতো এবং উচ্চপদস্থ মুসলমান কর্মচারীও ফার্সি ভাষা ব্যবহার করতো। মা-হুয়ান নানা প্রকার আমোদ-প্রমোদ, ক্রীড়া-কৌতুকের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও মা-হুয়ানের বিবরণ অনেকটা সমাজের উচ্চ শ্রেণীভিত্তিক, তথাপি পঞ্চদশ শতাব্দীর বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থা জানার জন্য একান্তভাবেই চৈনিক তথা মা-হুয়ানের বিবরণের ওপর ভরসা করতে হয়।

সুলতান সাইফউদ্দিন হামজা শাহ

গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র সাইফউদ্দিন হামজা শাহ সুলতান হন। এ পর্যন্ত তাঁর শাসনকালের কোন লিপি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে মুদ্রার সাক্ষ্যে বলা যায় যে, তিনি ৮১৩ হিজরি (১৪১০-১১ খ্রি:) হতে ৮১৪ হিজরি (১৪১১-১২ খ্রি:) পর্যন্ত রাজত্ব করেন। মুদ্রায় তিনি ‘সুলতান-উস- সালাতীন’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালেও চীন দেশের সাথে সদ্ভাব অক্ষুন্ন ছিল এবং দূত বিনিময় হয়েছিল । রাজা গণেশের চক্রান্তে সুলতানের ক্রীতদাস শিহাবউদ্দিন তাঁকে হত্যা করেন এবং নিজেই সিংহাসনে আরোহণ করেন।

সুলতান শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ

মুদ্রায় প্রমাণ পাওয়া যায় যে, শিহাবউদ্দিন সুলতান হয়ে শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ নামে ৮১৪ হিজরি (১৪১১-১২ খ্রিঃ) হতে সুলতান সাইফউদ্দিন হামজা শাহের ক্রীতদাস ছিলেন এবং বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বীয় প্রভুকে হত্যা করে সিংহাসন অধিকার করেন। শিহাবউদ্দিনের রাজত্বকাল সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। সম্ভবত, রাজা গণেশের চক্রান্তে তাঁকে হত্যা করা হয়।

সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ

মুদ্রা প্রমাণে বলা যায়, শিহাবউদ্দিন ফিরোজ শাহ সুলতান হন। সাতগাঁও ও মুয়াজ্জামাবাদ টাকশাল হতে উৎকীর্ণ তাঁর ৭১৭ হিজরির (১৪১৪-১৫ খ্রি:) মুদ্রা পাওয়া গেছে। এমনও হতে পারে যে, গনেশের চক্রান্তে পিতার মৃত্যু হলে আলাউদ্দিন রাজধানী ফিরোজাবাদ ত্যাগ করে রাজ্যের কিছু অংশে নিজেকে সুলতান বলে ঘোষণা করতে সমর্থ হন। তবে তাঁর রাজত্বকাল ক্ষণস্থায়ী হয়েছিল। রাজা গণেশ তাঁকে অপসারিত করে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিলো।

এভাবে সাময়িকভাবে বাংলার রাজধানীতে রাজা গণেশের আবির্ভাবই ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন অবসানের প্রধান কারণ। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের হত্যা হতে শুরু করে আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহের হত্যা ও অপসারণ পর্যন্ত রাজা গণেশের প্রভাবই বাংলার রাজনীতির ধারা নির্ধারণ করেছিল।

রাজা গণেশ

৮১৭ হিজরি (১৪১৪-১৫ খ্রি:) সালের পর বাংলার ইতিহাসে প্রায় ত্রিশ বৎসরকাল রাজা গণেশ ও তাঁর বংশধরগণ শাসন বজায় রেখেছিলেন।রাজা গণেশের ইতিহাস পুনরুদ্ধার কষ্টসাধ্য।কারণ সমসাময়িককালের কোন ইতিহাস নেই বললেই চলে। কিংবদন্তী ও কুলপঞ্জিতে রাজা গণেশ সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায় । কিন্তু তাদের মধ্যে গণেশ ও তাঁর বংশের ইতিহাস পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের প্রামাণিকতা সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ আছে। যে সমস্ত সূত্রের মধ্যে গণেশ ও তাঁর বংশের ইতিহাস পাওয়া যায় তার মধ্যে আবুল ফজল রচিত আইন-ই-আকবরী, নিজামউদ্দিন বখ্শী রচিত তাবাকাৎ-ই-আকবরী ও গোলাম হোসেন সলিম রচিত রিয়াজ-উস-সালাতীন উল্লেখযোগ্য।

তবে পরবর্তী সময়ে লিখিত এসব সূত্রে ঘটনার যে বিবরণ পাওয়া যায় তার মধ্যে কতখানি সত্যতা নিহিত আছে বলা কঠিন। মুদ্রার মত প্রামাণিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মোটামুটিভাবে রাজা গণেশ ও তাঁর বংশধরদের ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা যায়।

বাংলার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের পূর্বে গণেশের পরিচয় সম্বন্ধে মতানৈক্য রয়েছে। রিয়াজ-উস- সালাতীনের মতে, গণেশ ছিলেন ভাতুড়িয়ার জমিদার। গণেশ যে একজন জমিদার ছিলেন তা শেখ নূর কুতুব-ই-আলমের একখানি চিঠি হতেও জানা যায়। ফিরিশতার বিবরণ হতে জানা যায় যে, শাসন ক্ষমতা হস্তগত করার পূর্বে গণেশ ইলিয়াস শাহী সুলতানদের অমাত্য ছিলেন।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মৃত্যু প্রসঙ্গে আমরা গণেশের প্রথম উল্লেখ পাই এবং পরবর্তী সুলতানদের সময় তাঁকে বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন অমাত্য হিসেবে দেখতে পাই। এই সময় গণেশের ক্রমাগত ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিণতি হয়েছিল বাংলার সিংহাসন অধিকার। আজম শাহের পরবর্তী তিনজন সুলতানের শাসনকালে গণেশ অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ছিলেন এবং তাঁরই ষড়যন্ত্রে শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহের মৃত্যু হয় এবং আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ অপসারিত ও নিহত হন। রাজা গণেশ বাংলার সর্বময় ক্ষমতা অধিকার করতে সক্ষম হন ।

রিয়াজ-উস-সালাতীন হতে জানা যায়, ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন উচ্ছেদ করে রাজা গণেশ নিজেই সিংহাসনে বসেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মুসলমান দরবেশদের সাথে তাঁর বিরোধ দেখা দেয়। গণেশ অনেক মুসলমান দরবেশকে হত্যা করেন। দরবেশদের নেতা নূর কুতুব-ই-আলম জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শৰ্কীকে বাংলা আক্রমণের আহ্বান জানান।

সুলতান ইব্রাহিম সসৈন্য বাংলায় উপস্থিত হলে রাজা গণেশ নতি স্বীকার করেন এবং নূর কুতুব-ই-আলমের সাথে আপোষ করেন। আপোষের শর্তানুযায়ী রাজা গণেশের পুত্র যদুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয় এবং যদুই জালালউদ্দিন মাহমুদ নাম ধারণ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন। সুলতান ইব্রাহিম শর্কী জালালউদ্দিনকে সিংহাসনে বসিয়ে জৌনপুরে ফিরে যান। বুকাননের বিবরণীতেও এ ঘটনার সমর্থন পাওয়া যায়।

মুদ্রা প্রমাণেও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ৮১৮ হিজরি হতে সুলতান জালালউদ্দিন মাহমুদ বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ৮১৭ হিজরিতে জারিকৃত সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহের মুদ্রা পাওয়া গেছে। সুতরাং রাজা গণেশ অতি অল্পকালের জন্য (৮১৭ হিজরির শেষের দিকে বা ৮১৮ হিজরির প্রথম দিকে) সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। ৮১৮ হিজরি হতে তাঁর পুত্র যদু জালালউদ্দিন নামে বাংলা শাসন করতে থাকেন ।

কোন কোন সূত্রে রাজা গণেশ কর্তৃক দ্বিতীয় বার সিংহাসন অধিকারের উল্লেখ আছে। সুলতান ইব্রাহিম শর্কীর প্রত্যাবর্তনের পরপরই রাজা গণেশ শাসনদন্ড পরিচালনা আরম্ভ করেন এবং পুত্র যদুকে সুবর্ণধেনু ব্ৰত দ্বারা পুনরায় হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করেন। ১৩৩৯ ও ১৩৪০ শকাব্দে পান্ডুনগর, সুবর্ণগ্রাম ও চাটিগ্রাম টাকশাল হতে প্রকাশিত দনুজমর্দন দেব নামে একজন হিন্দুরাজার কিছু মুদ্রা পাওয়া গেছে।

১৩৪০ শকাব্দে পান্ডুনগর ও চাটিগ্রাম টাকশাল হতে প্রকাশিত মহেন্দ্রদেব নামে একজন রাজার মুদ্রাও পাওয়া গেছে। মুদ্রা প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী মত প্রকাশ করেন যে, এ সময় রাজা গণেশ গৌরবসূচক “দুনজমর্দন” ও ”চন্ডীচরণ পরায়ণ” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ভট্টশালীর এই মত সর্বজনস্বীকৃত নয় । অনেকে দনুজমর্দন দেবকে পূর্ববঙ্গীয় রাজা বলে মত প্রকাশ করেছেন। তবে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কঠিন।

সুলতান জালালউদ্দিন মাহমুদ শাহ

৮২১ হিজরি হতে আবার জালালউদ্দিন মাহমুদের মুদ্রা পাওয়া যায়। যদি রাজা গণেশ কর্তৃক দ্বিতীয় বার সিংহাসন অধিকারের কথা সত্য হয়ে থাকে তবে মনে করতে হবে যে, রাজা গণেশ ৮১৯-২০ হিজরিতে ক্ষমতাসীন ছিলেন। মুদ্রা প্রমাণে বলা যায় যে, জালালউদ্দিন মাহমুদ ৮২১ হিজরি হতে ৮৩৫ হিজরি পর্যন্ত (১৪১৮-১৪৩১ খ্রি:) রাজত্ব করেছিলেন।

অনেকে দনুজমর্দন দেবের উত্তরাধিকারী মহেন্দ্র দেব ও জালালউদ্দিনকে এক ও অভিন্ন বলে মনে করেন। আবার কেউ কেউ মহেন্দ্ৰ দেবকে গণেশের দ্বিতীয় পুত্র বলে মত প্রকাশ করেছেন। সীমিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত করা সম্ভব নয়। এমনও হতে পারে যে, দনুজমর্দন দেব ও মহেন্দ্র দেব সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি এবং তাঁরা জালালউদ্দিনের রাজত্বকালে বাংলাদেশের কিছু অংশে ক্ষমতা বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শাসক হিসেবে জালালউদ্দিন মাহমুদ সুনাম অর্জন করেছিলেন। ফিরিশতা, নিজামউদ্দিন বখ্শী ও গোলাম হোসেন সলিম তাঁর সুশাসনের প্রশংসা করেছেন। ফিরোজাবাদ, সোনারগাঁও, মুয়াজ্জামাবাদ, সাতগাঁও, চাটগাঁও, ফতেহাবাদ ও রোতাসপুর টাকশাল হতে তাঁর মুদ্রা প্রকাশিত হয়েছিল। এ থেকে মনে হয় উত্তরবঙ্গ, পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, ও দক্ষিণ বঙ্গের বৃহদাংশ তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। রিয়াজ-উস-সালাতীন হতে জানা যায় যে, তিনি রাজধানী পান্ডুয়া হতে গৌড়ে স্থানান্তর করেন। একই সূত্রে জানা যায় যে, জালালউদ্দিন মাহমুদ স্ত্রী ও পুত্রসহ পান্ডুয়ায় একলাখী সমাধি সৌধে সমাহিত আছেন। এই সমাধি সৌধ বাংলার মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্যসাধারণ নিদর্শন।

জালালউদ্দিন মাহমুদ নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। তিনি তাঁর রাজত্বের শেষের দিকে মুদ্রায় ‘খলিফাতুল্লাহ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। তিনি চীনা সম্রাট, মিশর ও পারস্যের সুলতান এবং দামেস্কের খলিফার সাথে দূত বিনিময় করেছিলেন।

সুলতান জালালউদ্দিন মাহমুদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শামসউদ্দিন আহম্মদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ৮৩৬ হিজরিতে উৎকীর্ণ তাঁর একটিমাত্র মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। শামসউদ্দিন আহম্মদ শাহ সম্বন্ধে ফিরিশতা ও রিয়াজ-উস-সালাতীনে পরস্পর বিরোধী তথ্য আছে। ফিরিশতা তাঁকে ন্যায়পরায়ণ ও উদার বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সলিম তাঁকে অত্যাচারী ও রক্তপিপাসু বলে আখ্যা দিয়েছেন। সভাসদগণের ষড়যন্ত্রে সুলতানের দুজন ক্রীতদাস সাদী খান ও নাসির খান সুলতানকে হত্যা করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর সঠিক তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

পরবর্তীকালে সাদী খানকে হত্যা করে নাসির খান নিজেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। কিন্তু ক্রীতদাসের আধিপত্য অপমানজনক বিবেচনা করে গৌড়ের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ সাত দিনের মধ্যেই তাঁকে হত্যা করে। অমাত্য ও সেনানায়কগণ ইলিয়াস শাহের এক বংশধর নাসির খানকে সিংহাসনে বসান। এভাবে ইলিয়াস শাহী বংশের পুনরাভ্যুদয় হয়।

পরবর্তী ইলিয়াস শাহী যুগ

ইলিয়াস শাহের পরবর্তী এক বংশধর নাসির খান ৮৪৬ হিজরিতে (১৪৪২ খ্রি:) সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ উপাধি ধারণ করে রাজ্যশাসন করতে থাকেন। ৮৯০ হিজরি পর্যন্ত ৪৫ বৎসর কাল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন বাংলায় কায়েম ছিল |

সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ

সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ন্যায়পরায়ণতা ও উদারতার সাথে রাজ্যশাসন করেছিলেন। রিয়াজ-উস- সালাতীনে উল্লেখিত আছে যে, তাঁর শাসনকালে বৃদ্ধ-যুবা নির্বিশেষে সমস্ত প্রজা তৃপ্ত ছিল। বাংলার মুসলিম রাজ্যে পুনরায় সামরিক শক্তি সঞ্চার হয়েছিল বলে মনে হয়। বাগেরহাটের খান জাহানের সমাধি গাত্রে উৎকীর্ণ লিপি হতে জানা যায় যে, যশোর ও খুলনা অঞ্চল নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল। এ অঞ্চলে ব্যাপক প্রবাদ আছে যে, খান জাহান নামে বাংলার সুলতানের একজন সেনাপতি ঐ অঞ্চলে প্রথম মুসলমান রাজত্বের প্রতিষ্ঠা করেন।

উড়িষ্যা রাজ কপিলেন্দ্র দেবের এক শিলালিপি হতে জানা যায় যে, তাঁর সাথে গৌড়েশ্বর-এর যুদ্ধ হয়েছিল। সম্ভবত কপিলেন্দ্র দেবের সমসাময়িক গৌড়ের সুলতান ছিলেন নাসিরউদ্দিন মাহমুদ। মিথিলা রাজ্যের সাথে নাসিরউদ্দিনের যুদ্ধ হয়েছিল বলেও অনুমান করা হয় ।

নাসিরউদ্দিন মাহমুদের রাজত্বকালের টাকশাল ও বিভিন্ন শিলালিপির অবস্থান হতে তাঁর রাজ্যসীমা অনুমান করা সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ ও বিহারের কিছু অংশ তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, তাঁর রাজ্যসীমা পশ্চিমে ভাগলপুর, পূর্বে ফরিদপুর, উত্তরে গৌড় পান্ডুয়া এবং দক্ষিণে ত্রিবেণী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ।

তাঁর রাজত্বকালে বহু মসজিদ, খানকাহ্, তোরণ, সেতু, সমাধিসৌধ ও প্রাসাদ নির্মিত হয়েছিল বলে লিপি প্রমাণ আছে। সুতরাং মনে হয় তাঁর রাজত্বে দেশে শান্তি বিরাজমান ছিল। সুলতান নাসিরউদ্দিন স্থাপত্য শিল্পে মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন। ৮৬৩ হিজরি পর্যন্ত তাঁর মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। খুব সম্ভবত ঐ বৎসরই তাঁর মৃত্যু হয়।

সুলতান বরবক শাহ

নাসিরউদ্দিন মাহমুদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রুকনউদ্দিন বরবক শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। ৮৬৩ হতে ৮৭৮ হিজরি পর্যন্ত তাঁর মুদ্রা পাওয়া গেছে। সিংহাসনে আরোহণের পূর্বে পিতার রাজত্বকালে তিনি সাতগাঁও-এর শাসনকর্তা হিসেবে কর্মদক্ষতার পরিচয় দেন। সুলতান হিসেবেও তিনি অনুরূপ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তাঁর সুদীর্ঘ রাজত্বকাল বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।

বরবক শাহের সামরিক ক্ষেত্রে কৃতিত্বের ইতিহাস আমরা বিখ্যাত সৈনিক দরবেশ শাহ ইসমাইল গাজির জীবনী “রিসালাত-উস-কোহাদা’ হতে জানতে পারি। পীর মুহাম্মদ শাহ্তারী ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে এটি রচনা করেন। বরবক শাহ তাঁর রাজত্বের প্রথম দিকে উড়িষ্যারাজ গজপতির বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন। শাহ ইসমাইল গাজির নেতৃত্বে এই বাহিনী গজপতিকে পরাজিত করে গড়মন্দারণ উদ্ধার করেন। এর কিছুকাল পর শাহ ইসমাইল কামরূপরাজ কামেশ্বরের বিরুদ্ধে অভিযানে নেতৃত্ব দেন। সন্তোষের রণক্ষেত্রে তুমুল যুদ্ধে বাংলার সেনাবাহিনীর পরাজয় ঘটে।

সামরিক বিজয়ে ব্যর্থ হলেও শাহ ইসমাইল গাজি তাঁর সাধুগুণের দ্বারা উদ্দেশ্য হাসিল করেন। তাঁর গুণে মুগ্ধ হয়ে কামরূপরাজ আত্নসমর্পন করেন ও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। পরবর্তীতে ঘোড়াঘাটের হিন্দু সেনাধ্যক্ষ ভান্ডসী রাওয়ের কুপ্ররোচনায় বরবক শাহের আদেশে (১৪৭৪ খ্রি:) ইসমাইলকে হত্যা করা হয় ।

বরবক শাহের রাজত্বকালে হাবশী দাসগণ শাসনকার্যে প্রাধান্য লাভ করে। কথিত আছে, তিনি প্রায় আট হাজার ক্রীতদাস সংগ্রহ করে রাজ্যের দায়িত্বশীল পদে নিয়োগ করেছিলেন। হাবশীদের এই প্রাধান্য বিস্তারের ফলেই পরবর্তীকালে তারা সিংহাসন অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বরবক শাহ নিজে বিদ্বান ছিলেন এবং পন্ডিত ব্যক্তিদের তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয় গ্রন্থ রচনা করেন। বরবক শাহ মালাধর বসুকে ‘গুণরাজ খান উপাধি দান করেছিলেন। মালাধর বসুর পুত্র সত্যরাজও ‘খান’ উপাধি পেয়েছিলেন। স্থাপত্য শিল্পক্ষেত্রেও বরবক শাহের অবদান রয়েছে। গৌড়ে রাজপ্রাসাদ এবং ‘দাখিল দরওয়াজা’ নামে পরিচিত বিরাট প্রবেশ তোরণটি তাঁর স্থাপত্যকীর্তির অন্যতম নিদর্শন।

সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ

বরবক শাহের উত্তরাধিকারী হিসেবে তাঁর পুত্র শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজত্বকালের বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকগণ তাঁকে ধর্মনিষ্ঠ, সচ্চরিত্র, আদর্শবাদী, ন্যায়নিষ্ঠ ও সুদক্ষ নরপতি বলে প্রশংসা করেছেন। স্থাপত্য শিল্পে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল বলে মনে হয়। তাঁর আদেশে বেশ কয়েকটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।

এর মধ্যে গৌড়ের কদমরসুল মসজিদ, দরসবাড়ি মসজিদ ও তাঁতীপাড়া মসজিদ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কানিংহামের মতে গৌড়ের লোটন মসজিদও তাঁরই কীর্তি। তাঁর আমলের শিলালিপিসমূহের প্রাপ্তিস্থান হতে মনে হয় যে, তিনি বিশাল সাম্রাজ্য অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। মুদ্রা ও শিলালিপি প্রমাণে বলা যায় যে, তিনি ৮৮৫ হিজরি পর্যন্ত (১৪৮০-৮১ খ্রি:) রাজত্ব করেন।

ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দর শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিছু মস্তিষ্ক বিকৃতির জন্য অল্পদিন পরেই তাঁকে অপসারিত করে ইউসুফ শাহের অন্য পুত্র জালালউদ্দিন ফতেহ শাহকে সিংহাসনে বসানো হয়। লিপি ও মুদ্রা প্রমাণে বলা যায় যে, তিনি ৮৮৬ হতে ৮৯২ হিজরি (১৪৮১-৮৬ খ্রি:) পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

রুকনউদ্দিন বরবক শাহ ও ইউসুফ শাহের শাসনকালে হাবশী ক্রীতদাসদের প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। অত্যাধিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তারা অকস্মাৎ উদ্ধত হয়ে ওঠে। ফতেহ শাহ তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে মনস্থ করেন এবং উদ্ধত দাসদের প্রাণদন্ডের আদেশ দেন। ফলে বিরোধীদল ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ফতেহ শাহকে হত্যা করে প্রাসাদরক্ষী সুলতান শাহজাদা “বরবক শাহ” উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এইভাবে বাংলার মুসলিম রাজ্যে ইলিয়াস শাহী বংশের গৌরবময় শাসনের অবসান ঘটে। এবং হাবশী ক্রীতদাসদের শাসনের সূত্রপাত ঘটে।

প্রায় ছয় বৎসর কাল (৮৯০-৮৯৬ হিঃ ; ১৪৮৭-১৪৯৩ খ্রি:) বাংলায় হাবশী শাসন কায়েম ছিল। বাংলার মুসলিম শাসনের ইতিহাসে এই ছয় বৎসর এক কালো অধ্যায়। এই ছয় বৎসরে চারজন হাবশী বরবক শাহ, মালিক আন্দিল, দ্বিতীয় নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ ও শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ সিংহাসন অধিকার করেন এবং প্রত্যেক সুলতানই নিহত হয়েছিলেন। ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ, হত্যা ও নাতিদীর্ঘ রাজত্ব বাংলাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

ইলিয়াস শাহী যুগের কৃতিত্ব

বাংলার ইতিহাসে ইলিয়াস শাহী যুগ একটি স্মরণীয় যুগ। এই বংশ বাংলায় প্রায় ১২০ বৎসর কাল শাসনকার্য পরিচালনা করে। ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ যদিও প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে ইলিয়াস শাহই সমগ্র বাংলায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে স্বাধীন সুলতানি দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফিরোজ শাহ তুঘলকের বাংলা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা দুই দুইবার ব্যাহত করে ইলিয়াস শাহী সুলতানগণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। বাংলার স্বাধীনতা দীর্ঘস্থায়ী করতে তাঁদের এই সাফল্য নিশ্চয়ই সাহায্য করেছিল।

দিল্লির সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ফলে বাংলাদেশের ইলিয়াস শাহী শাসকগণ স্বাভাবিক কারণেই দেশীয় জানগণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে মুসলিম শাসন বাংলাীয় মুসলিম শাসনে পরিণত হয়। উচ্চ রাজপদে হিন্দুদের নিয়োগ, দেশীয় ভাষা ও সাহিত্যের সমাদর এবং দেশীয় পন্ডিত ও কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা ইলিয়াস শাহী শাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশে মুসলিম সামরিক বিজয়কে সাংস্কৃতিক বিজয় দ্বারা সুসম্পন্নকরণে ইলিয়াস শাহী বংশের বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে।

স্থাপত্য শিল্পের উৎকর্ষের ক্ষেত্রেও ইলিয়াস শাহী বংশের বিশেষ অবদান রয়েছে। এই যুগে বাংলার মুসলিম স্থাপত্য শিল্প স্থানীয় বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ হয়ে এক নতুন রূপ ধারণ করেছিল। বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ্ ও সমাধিসৌধ এই যুগে নির্মিত হয়েছে।

ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতির বিস্তার ও প্রসারের ক্ষেত্রেও ইলিয়াস শাহী সুলতানগণ বলিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। মসজিদ মাদ্রাসা, ও খানকাহ্ স্থাপনের সাথে সাথে তাঁরা প্রায় সকলেই সুফি ও আলেমদের বিশেষভাবে সাহায্য করতেন। ফলে ইসলাম ধর্মও ব্যাপক প্রসার লাভ করে ।

বাংলার মুসলিম রাজ্যকে বহির্বিশ্বের সাথে পরিচিত করার কৃতিত্বও ইলিয়াস শাহী সুলতানদের। আরবদেশ ও পারস্যের সাথে সংযোগ স্থাপন করে এবং দীর্ঘকালব্যাপী চীনের সাথে দূত বিনিময়ের মাধ্যমে ইলিয়াস শাহী সুলতানগণ বাংলাকে বহির্বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়েছিলেন।

সুতরাং বলা যায় যে, স্বাধীনতা দৃঢ় করে সমগ্র বাংলাব্যাপী মুসলিম রাজ্য অক্ষুন্ন রেখে, স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতা লাভ করে, স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিল্পকলা বিশেষ করে স্থাপত্য শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে ইলিয়াস শাহী শাসকগণ বাংলার মুসলিম রাজ্যকে এক নতুন রূপ দান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

ইলিয়াস শাহী শাসন: আযম শাহ, রাজা গণেশ ও পরবর্তী ইলিয়াস শাহী সুলতান

 

সারসংক্ষেপ

ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীগণ শাসন অব্যাহত রাখেন। সুলতান সিকান্দার শাহ ৩৫ বছর যাবত অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে রাজ্য শাসন করেন। এরপর গিয়াসউদ্দিন আযন শাহ বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন। তিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয় চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। এর কিছুকাল পর বাংলার রাজনীতিতে রাজা গণেশের আবির্ভাব ঘটে। বলা হয়ে থাকে আযম শাহের হত্যা হতে শুরু করে ফিরোজ শাহের হত্যা ও অপসারণ গণেশের প্রভাবেই ঘটে। পরবর্তী ইলিয়াস শাহী যুগে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ, বরকত শাহ, শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহ প্রমুখ রাজত্ব করেন।

রাজত্বের শেষ দিকে ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ, হত্যা ও নাতিদীর্ঘ রাজত্ব ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাংলার ইতিহাসে ইলিয়াস শাহী যুগ স্মরণীয়। রাজনৈতিক কৃতিত্বের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিজয় এই যুগকে মহিমান্বিত করেছে। বাংলার মুসলিম রাজ্যকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করার কৃতিত্ব একান্তই ইলিয়াস শাহী সুলতানদের।

Leave a Comment