গণ-ঐক্যজোট গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –গণ-ঐক্যজোট গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

গণ-ঐক্যজোট গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

 

গণ-ঐক্যজোট গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

 

বিগত এপ্রিল ১৯৭২ সালে আমাদের উপর আপনারা যে দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, বিভাগীয় সম্পাদকমণ্ডলীর কার্য- প্রণালীর খতিয়ানের মাধ্যমে তার বিফলতা এবং সফলতা নিরূপণ করা আপনাদের পক্ষে সম্ভব হবে। জাতীয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের গুরু দায়িত্ব বহন করে প্রতিটি দিকে আমরা লক্ষ্য রেখেছি তারই চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। আগেই উল্লেখ করেছি আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জটিলতা সমাধানের জন্য আমরা আমাদের কার্যকালের শেষার্ধ্বে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।

তা হলো ‘বাংলাদেশ গণ-ঐক্যজোট’ গঠন। আমি এ সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোকপাত করতে চাই। ইতিহাসের ধারায় প্রগতিশীল, দেশাত্ববোধের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ রাজনৈতিক দলের এবং মতাদর্শের মিলন একটি স্বাভাবিক সত্য। আপাত-দৃষ্টিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সাথে ঐক্যম পৌঁছানো সম্ভব কিনা এ প্রশ্ন আমাদের মনকে আন্দোলিত করলেও যাঁরা জাতীয় স্থিরীকৃত লক্ষ্য জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতিতে আস্থাবান তারা আমাদের সহযাত্রী এতে কোন দ্বিমত নেই। বিশেষ করে সেই রাজনৈতিক দলসমূহ যদি স্ব স্ব কর্মসূচীর কাঠামোতে নিষ্ঠাবান থেকেও একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্নির্মাণের প্রশ্নে ন্যূনতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে তাঁদের সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করেন তাকে স্বাগত জানানো রাজনৈতিক উদারতা এবং রাজনৈতিক কর্তব্য।

জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সফলতার পর এ দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলা গড়ে তোলার জন্য গণ-ঐক্যজোট গঠনের মাধ্যমে আমরা সেই রাজনৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালন করেছি। বাংলার গ্রামে গ্রামে এ মিলনের মূল সুর এবং গূঢ় অর্থ পৌঁছে দেবার পবিত্র দায়িত্ব আমাদের সকলের। গণ-ঐক্যজোট গঠনের মূল প্রেরণা হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি প্রধান অতিথির ভাষণে এক ছাত্র সমাবেশে সকল প্রগতিশীল দেশ-প্রেমিক শক্তিসমূহকে একত্রিত হয়ে জাতি গঠনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার আহ্বান জানান।

তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর) এগিয়ে আসেন। প্রবাহমান নদীগুলি যেমন সাগরের মিলন মোহনায় একত্রিত হয়, তেমনি বাংলাদেশ এবং বাংগালী জাতির মিলন মোহনা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের দূত বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা একত্রিত হয়েছি। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বঙ্গবন্ধু তাঁর সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলোকে এ সত্য স্বভাবতঃই উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের মিলন অনিবার্য তাই কালক্ষেপ না করে এ ডাক তিনি দিয়েছিলেন। তাই “১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবর্গের এক যুক্ত- সভায় তিনটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আমরা ঐক্যজোট প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছি। এতে নেতৃত্ব থাকবে আওয়ামী লীগের।”

“আপনারা জানেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার পাকিস্তানী হানাদারদের সৃষ্ট সংকট মোচনের জন্য কতকগুলি প্রগতিশীল নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।বাংলাদেশে পরাধীন আমলের সামন্তবাদী ভূমি ব্যবস্থার ভগ্নাংশ জোতদার ও বৃহৎ ভূস্বামীদের উচ্ছেদকল্পে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকার বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

 

১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চের ঘোষণা অনুযায়ী জমির ব্যক্তিগত মালিকানার সিলিং ১০০ বিঘাতে ধার্য্য করা হয় এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকের খাজনা মওকুফ করা হয়। এদ্ব্যাতীত ৭৫ হাজার একর জমি, ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে বণ্টন করার ব্যবস্থা সম্পন্নের পথে। চর মুজিবে সমবায় যৌথ খামার প্রতিষ্ঠা সহ সরকার ভূমি-ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট। আর তা মূলতঃ জনগণকে প্রদত্ত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদা পালনেরই পদক্ষেপ। এতদ্ব্যাতীত ইজারদারী প্রথা উচ্ছেদ করে সরকার হাট বাজারগুলোকে গণকমিটির নিকট হস্তান্তর করেন।

খাদ্যে স্বয়ং নির্ভরতা অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগ ও তার সরকার প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চলতি বাজেটের এক সিংহভাগ এবং প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনার মোট ব্যয় বরাদ্দ ৪,৪৫৫ কোটি টাকার মধ্যে কৃষি, সমবায়, পল্লী উন্নয়ন ও বন্যানিয়ন্ত্রণ খাতে ১,০৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনাকালে বার্ষিক খাদ্য উৎপাদন শতকরা ৩৬ ভাগ বাড়িয়ে ১৫৪ লক্ষ টনে উন্নীত করার প্রচেষ্টা চালানো হবে। সাথে সাথে সার, কীটনাশক ওষুধ, পাওয়ার পাম্প, উচ্চ ফলনশীল বীজ ইত্যাদি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

পাটের উৎপাদন বাড়িয়ে ৯১ লক্ষ বেলে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে । এ ছাড়াও তুলা ও রাবার চাষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সাড়ে একষট্টি লক্ষ একর জমি সেচ ব্যবস্থার অধীনে আনার প্রকল্পও সরকারের হাতে রয়েছে। আর সবকিছুর বাস্তবায়নের কাজই দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ সব ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এদেশের গ্রামীণ কৃষকরা জোতদার, ভূস্বামী ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক শোষকদের হাত থেকে রক্ষা পাবে, তাদের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটবে, দেশে সফল সবুজ বিপ্লব সংঘটিত হবে। অর্জিত হবে খাদ্যে স্বয়ং নির্ভরতা। একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ভূমি ব্যবস্থা কার্যকরী করার পথ হবে সুগম ।

ব্যাঙ্ক, বীমা ও শিল্প জাতীয়করণ, ছিন্নমূলদের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন প্রগতিশীল বৈদেশিক নীতি, জাতীয় বেতন কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ, পাকিস্তান থেকে আটক বাংগালীদের ফিরিয়ে আনা এবং সর্বশেষ শ্রমিকদের মজুরী কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ প্রভৃতি রয়েছে এর মধ্যে। এতদ্‌সত্ত্বেও দেশে গণধিকৃত এবং জনসমর্থনহীন এক শ্রেণীর লোক বাংলাদেশের সার্বিক উন্নতি ও প্রগতির অব্যাহত গতিকে বিপথগামী করার চক্রান্তে সারা দেশে উত্তেজনা জিইয়ে রাখার অপপ্রয়াসে লিপ্ত।

এ দেশের মুক্তি এবং স্বাধীনতার সময় যে সমস্ত উপকরণগত সাহায্য দিয়ে বিশ্বের স্বাধীনতাকামী এবং মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত সকল জাতিসমূহের বিরোধিতা করেছে বিদেশী শক্তি আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বিদেশী ঔপনিবেশবাদী শাসকের দখলে রাখবার জন্য আর্থিক ও তাদেরই সরাসরি মদদ নিয়ে এক জাতীয় স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ঘৃণ্য খেলায় মেতে উঠেছে। তাই আমরা ঐক্যজোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সারা দেশে এই সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এক দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার সংকল্প গ্রহণ করি। আমরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক কমিটির ১৩-৯-৭৩ তারিখের বৈঠকে ঐক্যজোট গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

ঐক্যজোট মনে করে যে, “অতীতের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের জের হিসেবে যে, দুর্নীতিবাজ, মুনাফাশিকারী, চোরাকারবারী, মজুতদার, অর্থলোলুপ গণস্বার্থবিরোধী ব্যক্তিরা সমাজদেহে থেকে যায়। তারা আমাদের স্বাধীনতা উত্তর সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে জনগণের জীবনের চরম দুর্গতির বিনিময়ে নিজেদের সৌভাগ্য গড়ে তোলার পথধীনতা নিয়েছে। দেশের এই সঙ্কটের মধ্যে সমাজবিরোধী দুষ্কৃতকারীরা সারা দেশে বিশেষতঃ বাংলার গ্রামাঞ্চলে সুপরিকল্পিতভাবে লুট, গুপ্তহত্যা, ডাকাতি প্রভৃতি নাশকতামূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে সন্ত্রাস সৃষ্টি করবার অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে।

 

গণ-ঐক্যজোট গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

 

“আমরা মনে করি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সমস্যাসমূহ জাতীয় সমস্যা। এই সব সমস্যা ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে।”

ঐক্যজোট গঠনের পর ১৬-১২-৭৩ এবং ২৯-১২-৭৩ তারিখে ঢাকার বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণের গণ- সমাবেশে মিলিত বক্তব্য পেশ করি। এবারের জাতীয় দিবসে আমরা ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে কর্মসূচী প্রণয়ন করি । এবারের জাতীয় দিবসে ছিল একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতা এবং প্রগতির দুশমনরা জাতীয় মুক্তির মহা- আনন্দের দিনই তারা তাদের ঘৃণ্য খেলার দিন হিসাবে বেছে নিয়েছিল। তাই রাতের অন্ধকারে এ মহামূল্য দিনটির মহত্ব বিনষ্ট করার জন্য গুপ্তহত্যামূলক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালিয়েছিল।

কিন্তু জাতীয় দিবসে ঐক্যবদ্ধ উদ্বেল জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিজয় উল্লাসের অতল তলে তলিয়ে গেছে তাদের গণ-বিরোধী ষড়যন্ত্র। জনতা প্রত্যাখ্যান করেছে এ জাতীয় শত্রুদের। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে জাতি। এবারের জাতীয় দিবস পালনের দৃশ্য ছিল যেন একটি জাতির মহাজাগরণের দিন- মহা-আনন্দের দিন। এ আনন্দ যেন দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে জাতীয় স্বাধীনতা সুসংহত করে একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণার আনন্দ- যেন নব-সৃষ্টির আনন্দে উদ্বেল একটি জনতার সাগরে জেগেছিলো উর্মি। তাই, “আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, মোর চোখ হাসে, মোর মুখ হাসে, মোর টগবগিয়ে খুন হাসে”- এ ছিল সমগ্র জাতির অভিব্যক্তি এবারের ১৬ই ডিসেম্বরে। আর ঐক্যজোট এরই হাল ধরেছিল।

Leave a Comment