বিশেষ গুরুত্বারোপিত সমস্যা গুলি

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বিশেষ গুরুত্বারোপিত সমস্যা গুলি। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

বিশেষ গুরুত্বারোপিত সমস্যা গুলি

 

বিশেষ গুরুত্বারোপিত সমস্যাগুলি

 

আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি জাতীয় সমস্যা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম আমরা একই ভাবে মোকাবিলা করার দ্বৈত প্রচেষ্টা চালিয়েছি অবিরাম । যে কোন উদ্ভূত পরিস্থিতির রাজনৈতিক মোকাবিলার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মসূচী নিয়েছি। দেশের খাদ্য পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য, পাকিস্তানে আটক বাংগালীদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনা, লুটতরাজ, গুপ্তহত্যার মাধ্যমে ঘোলা জলে মাছ শিকার করে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করা প্রভৃতি সমস্যাগুলি আমাদের কার্যক্রমের সময়কালে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলার প্রচেষ্টা চালিয়েছি।

পাকিস্তানে আটক বাংগালী ভাইদের কৃত্রিম দরদী অনেকে সেজেছেন, কিন্তু আমাদের বাস্তব কর্মপন্থা এবং জনাব ভুট্টোর সেই হুমকী দেওয়ার দিনগুলিতে বিশ্ববাসীর প্রতি আমাদের আবেদন কতটা কার্যকর হয়েছিল তা দেশবাসী জানেন। আটক বাংগালীদের মুক্তির জন্য সাংগঠনিক কমিটির ২০-৭-৭২, ১৯-৩-৭৩, ৩০-৫-৭৩ তারিখের পৃথক পৃথক তিনটি বৈঠকে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় ।

অনুরূপভাবে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত, এবং গুপ্তহত্যার বিরুদ্ধে আমরা ২৯-৭-৭২, ২৭-৯-৭২, ১৯-৩-৭৩, ৩০-৫- ৭৩ তারিখের বৈঠকগুলিতে তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং দেশবাসীর কাছে এই গণবিরুদ্ধ চক্রের স্বরূপ উদ্ঘাটন করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আবেদন জানাই। উল্লেখিত প্রস্তাবাবলীর সবগুলিতেই দ্রব্রমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ কল্পে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা চালাই ।

সাংগঠনিক কমিটির বৈঠক ছাড়াও জরুরী ভিত্তিতে মোকাবেলা করার জন্য উদ্ভূত জাতীয় সমস্যার আলোকে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সম্পাদক মণ্ডলীর সভা আহ্বান করে অবস্থার পর্যালোচনা করা আমার কার্যকালের একটি বিশেষ দিক। আমার সহকর্মীরা প্রতিটি বিষয়ে সম্পাদক মণ্ডলীর সভায় আলোচনা করে পরবর্তী কার্যনীতি নির্ধারণ করতেন।

সফরসূচী থেকে শুরু করে জেলায় জেলায় নির্দেশ পাঠানো, সাংগঠনিক কমিটির বৈঠকের পূর্বে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা পর্যন্ত পর্যালোচনা করা। উল্লেখ্য যে বন্যা সমস্যার মত জাতীয় সমস্যা, খাদ্য সমস্যার মত জটিল বিষয় আমরা সম্পাদক মণ্ডলীর সভায় সাময়িক গুরুত্ব উপলব্ধি করে আলোচনা করেছি এবং আমাদের সীমিত কিন্তু সুচিন্তিত সুপারিশ বিভাগীয় মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছি।

১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে সংগঠনের কর্মীদের আমাদের বক্তব্য দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়লো দেশ এবং সংগঠন উভয়েরই স্বার্থে। খাদ্যসমস্যা এক প্রকট রূপ নিল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হু হু করে চালের দাম বেড়ে গেল। আমাদের এপ্রিলের ৩০ তারিখ থেকে মে-এর ২ তারিখ পর্যন্ত চারদিন সম্পাদকমণ্ডলীসহ খাদ্যমন্ত্রী শ্রী ফণিভূষণ মজুমদারের সাথে বিস্তারিত আলোচনার আলোকে সমস্যা মোকাবিলার জন্য সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় আমরা ২০-দফা কর্মসূচী প্রণয়ন করে বঙ্গবন্ধুর নিকট পেশ করলাম ।

 

নিম্নোক্ত সুপারিশগুলি কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১। যেহেতু ব্যক্তিগত পর্যায়ে চাল সংগ্রহের চুক্তি প্রায়ই ব্যর্থ হয়েছে সেহেতু আরও অধিক চাল সংগ্রহের জন্য সরকারের সাথে সরকারের চুক্তির উপর নির্ভর করতে হবে। 

২। অন্ততঃপক্ষে ৫ থেকে ১০ মাইল সীমান্ত এলাকায় বাধ্যতামূলকভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ পদ্ধতি প্রচলন করা উচিত। আশা করা যাচ্ছে যে এর দ্বারা ১ লক্ষ টন চাল সংগ্রহ করা যাবে।

৩। খাদ্যশস্য ঠিকমত বিভিন্ন সরকারী গুদামে সরবরাহের জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় রেলওয়ে ওয়াগন সরবরাহ করতে হবে। ইতিমধ্যেই পাঁচ শত ওয়াগন প্রদানের জন্য ভারত সরকারকে রাজী করানো হয়েছে।

৪। যানবাহন চলাচলের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় জ্বালানী সরবরাহ করতে হবে।

৫ ।খাদ্যশস্য চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে কোস্টার, বার্জ টাগ প্রভৃতি বিভিন্ন হালকা জলযানের ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী ডিসেম্বর মাসে আনরব চলে গেলে প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৬। খাদ্যশস্য বিতরণের জন্য বর্তমানের প্রশাসনিক যন্ত্রকে আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। আস্তে আস্তে সমস্ত শহরগুলোকে রেশনিং এলাকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

৭। বিভিন্ন স্থানের শ্রমিক অসন্তোষ দূরীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ-ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ কর্তব্য রয়েছে। খাদ্য সমস্যাকে জাতীয় এবং মানবিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং শ্রমিক সংস্থাগুলোকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। খাদ্যশস্য অবাধে চলাচলের ব্যাপারে কেউ যেন কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে তার জন্য জনগণের সহযোগিতা কামনা করতে হবে।

৮। টেলি যোগাযোগ সহ সামগ্রিক ব্যবস্থা অবিলম্বে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে হবে। ভৈরবের পুল যথাসম্ভব শীঘ্র চালু করতে হবে। বর্তমানে ভৈরবে ফেরীর মাধ্যমে পারাপারের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা আরও উন্নত ও তরিৎ করতে হবে।

৯। বিভিন্ন পর্যায়ে বিতরণ পদ্ধতিতে যে দুর্নীতি চলছে তা প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) এবং সার্কেল অফিসার (রাজস্ব)-কে ইউনিয়ন পর্যায়ে খাদ্যশস্য বিতরণ-ব্যবস্থা তত্ত্বাবধানের জন্য দায়িত্ব দিতে হবে। বর্তমানের ইউনিয়ন ফুড কমিটিতে নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক কর্মী ছাড়া স্থানীয় শিক্ষক এবং চরিত্রবান রাজনৈতিক কর্মী সমাজসেবী ব্যক্তিগণকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

১০। (ক) মাল মজুতকরণ এবং মাল চলাচল সংক্রান্ত বিষয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য আওয়ামী ভলন্টিয়ারসহ আওয়ামী লীগের নিষ্ঠাবান কর্মীদেরকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। পূর্বেকার বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে এ ধরনের দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য এনফোর্সমেন্ট শাখা ছিল। উহা পুনরায় চালু করলেও অথবা বর্তমানে পুলিশ বা দুর্নীতিদমন বিভাগ দ্বারা উপরি উক্ত দুর্নীতি দূর করা যাবে না। আওয়ামী লীগ কর্মী এবং ভলন্টিয়ারদেরকে এ কাজের জন্য দায়িত্ব দিলেই ভাল ফল আশা করা যেতে পারে।

(খ) মজুত এবং চোরাচালান বন্ধের জন্য আমাদের দলের কর্মীগণকে ও আওয়ামী ভলন্টিয়ার বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের নিজ নিজ এলাকায় তাদের উপর দায়িত্ব দিতে হবে। তারা সরকার প্রশাসন যন্ত্রের মাধ্যমে এ-ব্যাপারে বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।

১১। যেহেতু আমাদের খাদ্য ঘাটতি বিশেষভাবে প্রকট সেহেতু আমাদের জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে ভারতে মাছ প্রভৃতি খাদ্যদ্রব্য রপ্তানী বন্ধ করা প্রয়োজন। এ-ছাড়া রপ্তানীর মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তা অন্য ভাবে অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। তা সম্ভবপর না হলেও আমাদের প্রকট খাদ্য সমস্যা সমাধানের সাহায্যকল্পে ভারতে মাছ প্রভৃতি রপ্তানী বন্ধ করা প্রয়োজন। এটা করলে আমাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রও সঙ্কুচিত হবে।

১২। খাদ্যশস্য ছাড়া দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসপত্রও বেশী পরিমাণ জনগণের কাছে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য রেশন সপ এবং ন্যায্যমূল্যের দোকান আরও অধিক পরিমাণ খুলতে হবে। রেশন সপ এবং ন্যায্যমূল্যের দোকানের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য ও জিনিসপত্র বেশী পরিমাণে সরবরাহ করতে পারলে মুনাফাখোর, মজুতদারী এবং কালোবাজারীর প্রবণতা কমে যাবে। তবে আমাদের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, খাদ্যদ্রব্য সহ জীবনের সকল নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বিলি ব্যবস্থা। কেবল একই সংস্থার মাধ্যমেই দেওয়া উচিত।

১৩। একই ব্যক্তির নামে সারা দেশে কেবল মাত্র একটা রেশন কার্ড থাকবে। দেখা গেছে যে, সরকারী অফিস আদালত এবং বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত কর্মচারীরা যেসব জায়গা থেকেও কিছু কিছু জিনিসপত্র ন্যায্যমূল্যে পেয়ে থাকে এবং তাদের রেশনিং এলাকা থেকেও রেশনের জিনিসপত্র পেয়ে থাকে। এ ব্যবস্থা চলা উচিত নয় ।

১৪। মুদ্রাস্ফীতি রোধের জন্য অবিলম্বেই কিছু কিছু ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমাদের মনে হয় আয়কর, কৃষি ও আয়কর, পৌরকর, চৌকিদারী ট্যাক্স, বিদ্যুৎ এবং পানি উন্নয়ন সংস্থার অধীনস্থ বৈদ্যুতিক বিলসমূহ, খাজনা, সরকারের মালিকানাধীন বাড়ীসমূহের ভাড়া আদায়ের জন্য কড়া ব্যবস্থা অবলম্বন করা দরকার। এ ছাড়া কিছু লোকের হাতে বিভিন্ন অসাধু উপায়ে যে অর্থ পুঞ্জীভূত হয়েছে তা উৎপাদনশীল কার্যক্রমে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল অবস্থা এবং সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নুতন ভাবে সেভিংস সার্টিফিকেট বা এ ধরনের অন্য সার্টিফিকেট ইস্যু করা যেতে পারে।

১৫। যেহেতু দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের সাথে দ্রব্যের মূল্যের সম্বন্ধ রয়েছে সেহেতু সাধারণভাবে জিনিসপত্রের দাম স্থিতিশীল করার একটা ব্যাপক কার্যসূচী গ্রহণ করা উচিত। প্রাইস কমিশন গঠিত হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। উক্ত কমিশনকে তাড়াতাড়ি তার সুপারিশ প্রদানের জন্য বলা যেতে পারে ।

১৬। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন মন্ত্রণালয়সমূহকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একটা অতিরিক্ত শীতকালীন ফসল উৎপাদন সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

১৭। সাধারণ আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি আরও উন্নত হওয়া দরকার। তার ফলে খাদ্যশস্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল এবং কিয়ৎ পরিমাণে উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।

 ১৮। সারা দেশের রেশন দোকানগুলোর একটা বিরাট সংখ্যা পাকিস্তানী মনোভাবাপন্ন লোকদের হাতে আছে বলে আমরা মনে করি। অবিলম্বে সে সব দোকানগুলো সৎ এবং রাষ্ট্রানুগত নাগরিকদের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

১৯। দেশের বিভিন্ন রেশনিং এলাকায় বিশেষতঃ ঢাকা নগরে বহুসংখ্যক ভুয়া রেকর্ড কার্ড আছে। উহা খুঁজে বের করে ঐ সব কার্ডধারী ব্যক্তিগণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এরূপ করলে ভুয়া রেশন কার্ড রাখার প্রবণতা কমে যাবে বলে আমরা মনে করি।

২০। এর সাথে সারা দেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যসূচীকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

 

বিশেষ গুরুত্বারোপিত সমস্যাগুলি

Leave a Comment