জাফরওয়ালের যুদ্ধ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ জাফরওয়ালের যুদ্ধ। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

জাফরওয়ালের যুদ্ধ

 

জাফরওয়ালের যুদ্ধ

 

জাফরওয়ালের যুদ্ধ

মাত্র এক রাত সুন্দরভাবে কাটানোর পর সন্ধ্যায় আমাকে আবার ডেকে পাঠান জেনারেল আবরার। তিনি আমাকে বললেন, ‘আমার আশঙ্কা আপনাকে আবার জাফরওয়াল দখল করতে হবে। আমি এই অক্ষরেখা সম্পর্কে এখনো শঙ্কিত। এটা দুর্বলভাবে ধরে রাখা যাবে না। রাল এবং আল্হারে দুটি ব্যাটালিয়ন রেখে তৃতীয় ব্যাটালিয়ন নিয়ে জাফরওয়ালে রওনা হোন।’

তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন আমি এক ব্যাটালিয়ন নিয়ে জাফরওয়াল দখল করতে পারবো কি-না। হ্যাঁ, এটা সম্ভব। এটা প্রচুর ঘরবাড়ি অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় গোলাবর্ষণের জন্য ভালো ক্ষেত্র। তাকে বললাম আমি, এবং অনুরোধ করলাম সাঁজোয়া ও গোলন্দাজ সমর্থন দেবার জন্য।

তার আশীর্বাদ ও সাঁজোয়া বাহিনীর সমর্থনের আশ্বাস পেয়ে আমি জাফরওয়ালের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। ৪-এফএফ-কে অবিলম্বে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। এটা ছিল সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শত্রুর আগে সেখানে পৌঁছানো এক প্রতিযোগিতা।

কয়েকদিন আগে আমরা জাফরওয়ালের যে স্কুলে অবস্থান নিয়েছিলাম সেই একই স্কুলে আমি অবস্থান নিই। ৪-এফএফ এসে পৌঁছে যায় এবং এটাকে জাফরওয়াল গ্রামে মোতায়েন করা হয়। ৪-এফ এফ আগেও এখানে এসেছিল। তাই এলাকাটি চিনতে তাদের কষ্ট হয় নি।

মেজর হাশেম খানের নেতৃত্বে ২২ ক্যাভালরির এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক ও ফিল্ড রেজিমেন্টের একটি ব্যাটারি আমার অধীনে দেওয়া হয়। ঠিক করা হয়। ট্যাংকের অবস্থান। আর্টিলারির গোলাবর্ষণের জন্যও টার্গেট নির্বাচন করা হয়। আমি ভোর ৪টায় ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার্সে ফিরে এলাম। ঘুমাতে চলে গেলাম এবং ব্যাটমানকে বললাম বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া আমাকে না জাগাতে।

সকাল ৬টায় আমার ব্রিগেড মেজর, মেজর ইমতিয়াজ জেগে ওঠেন এবং আমাকে জানান যে, ৪-এফএফ শত্রুর গোলাবর্ষণের আওতায় এবং আক্রান্ত হওয়ার পথে রয়েছে। কমান্ডিং অফিসার ভীত হয়ে পড়লেন। আমি ৪-এফএফ- এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল লতিফের সাথে আলাপ করলাম।

তিনি আমাকে জানালেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী তার বাহিনীকে ঘেরাও করে ফেলেছে। আমি তাকে বললাম, জাফরওয়ালে প্রচুর পাকা বাড়ি-ঘর রয়েছে এবং জায়গাটি উঁচু, তাই এখানে খুব ভালোভাবে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেওয়া সম্ভব এবং এখান থেকে শত্রুর ওপর দক্ষতার সাথে গোলাবর্ষণ ও সহজতর।

আবার ১৫ মিনিট পর তিনি আমাকে ফোন করলেন এবং বললেন যে, তারা সবাই মারা পড়বে। আমি তার এ ভীতি দেখে হতাশ হলাম এবং বুঝতে পারলাম যে, তার এ ধরনের ভীরু মানসিকতার প্রভাবে তার অধীনস্থ অফিসার ও সৈন্যদের মনোবল একেবারে ভেঙে পড়বে।

তখন আমি তার সেকেন্ড-ইন- কমান্ডকে ডাকতে বললাম। তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন একজন পাঠান ।। নাম মেজর মোহাম্মদ হায়াত। তিনি এ ব্যাটালিয়নে নতুন যোগ দিয়েছেন। আমি মেজর হায়াতকে বললাম, ‘তোমার কমান্ডিং অফিসার ভেঙে পড়েছেন ।

তুমি কি দায়িত্ব গ্রহণ এবং যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে?’ জবাবে তিনি ছিলেন খুব আত্মবিশ্বাসী। বললেন, “ইনশাল্লাহ, আমরা শত্রুকে পিছু হটিয়ে দেবো। আমি লেফটেন্যান্ট কর্নেল লতিফকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিই। তিনি ফিরে আসতে চাইলেন। কিন্তু আমি তাকে ফিরে আসার অনুমতি দিলাম না। আমি তাকে বললাম ট্রেঞ্চে বসে থাকতে এবং সৈন্যদের সামনে না যেতে।

প্রায় দেড় ঘণ্টা পর মেজর হায়াত আমাকে ফোন করলেন। তিনি আমাকে বললেন যে, শত্রুর হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। শত্রুরা এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক ও দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য নিয়ে হামলা চালায়। দুটি ট্যাংক ঘায়েল হয়।

মেজর হায়াত শত্রুর পশ্চাদ্ধাবনে আমার অনুমতি প্রার্থনা করেন। আমি তাকে শত্রুদের অনুসরণ করার অনুমতি দিলাম। তবে তাকে সতর্ক করে দিলাম শত্রুর ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য।

মাত্র একজন ব্যক্তি পরিস্থিতি বদলে দেন। মেজর হায়াতের সাহস ও দৃঢ়তায় তার সৈন্যরা অনুপ্রাণিত হয়। এটা সত্য যে, যুদ্ধ জয়ে বহু লোক নয়, একজনই যথেষ্ট। বীরত্বের জন্য মেজর হায়াতকে ‘সিতারা-ই-জুরাত’ পদকে ভূষিত করা হয়।

ভারি কামানের কমান্ডার মেজর দিলওয়ার ভাট্টি শত্রুর ট্যাংকগুলোর প্রতি আতংক সৃষ্টি করেন। তাকেও ‘সিতারা-ই-জুরাত’ পুরস্কার। দেওয়া হয়।ফিল্ড ব্যাটারি কমান্ডার মেজর হাশেমের আওতাধীন কামানের ওপর সার্বক্ষণিক গোলাবর্ষণ করা হয়।

কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। আমার যতো দূর মনে পড়ে মেজর হাশেমকে ‘সিতারা-ই সনদ’-এ ভূষিত করা হয়েছিল। ট্যাংক বহরের স্কোয়াড্রন কমান্ডার এবং তার দুজন সৈন্য পালিয়ে যায়। তবে একজন সৈনা ফিরে এসে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। যুদ্ধ থেমে যাবার পর এ স্কোয়াড্রন কমান্ডারের কোর্ট মার্শালে বিচার হয়।

 

৩/১৪ পাঞ্জাবের একটি কোম্পানি আমার সাথে ছিল এবং এ কোম্পানিকে জাফরওয়ালে ৪-এফএফ-এর সাথে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় । আমি তাদের সাথে রওনা হলাম। অফিসার ও জওয়ানদের মনোবল ছিল খুবই দৃঢ়।

তাদের সাথে এক কাপ চা পানের পর আমি আমার ব্রিগেড সদর দপ্তরের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। লেফটেন্যান্ট কর্নেল লতিফকে ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার্সে রিপোর্ট করতে বলা হয়, সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় তার রেজিমেন্টাল সেন্টারে।

মাত্র কয়েক দিন গেল। যুদ্ধ স্থিত হয়ে এলো। ফ্রন্ট স্থিতিশীল। ভারতীয় সেনাবাহিনী কোণঠাসা অবস্থায়। ব্রিগেডিয়ার রিয়াজুল করিমকে ব্রিগেডিয়ার ইফেন্দির স্থলাভিষিক্ত করা হয়। ডিভিশনের অবস্থা তখন অত্যন্ত সংহত। এর সব কিছুই জেনারেল আবরারের দক্ষতা, ব্যক্তিগত স্পর্শ ও সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কারণে হয়।

আমি হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারে ভারতীয়দের ওপর হামলা করার জন্য। জেনারেল আবরারের কাছে প্রস্তাব করি। এ সময় ভারতীয়দের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। রণাঙ্গনে তাদের প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল। তখন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার মতো অবস্থা তাদের ছিল না।

পরদিন আমরা রওনা হলাম। আমি বিস্তারিতভাবে আক্রমণ পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করলাম। স্থির করা হয় যে, বাম পাশ থেকে আমার ব্যক্তিগত কমান্ডে দুই ব্যাটালিয়ন সৈনা ওয়াদিনওয়ালা গ্রামে হামলা চালাবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে একটি ট্যাংক রেজিমেন্ট আমার সাথে যোগ দেবে।

তৃতীয় ব্যাটালিয়নকে অগ্রবর্তী হামলার জন্য প্রস্তুত রাখা হবে। মূল লড়াই করবে দুটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন। তাদেরকে সহায়তা দেবে একটি ট্যাংক রেজিমেন্ট। জেনারেল আবরার প্রতিশ্রুতি দেন যে, আমরা ওয়াদিনওয়ালা থেকে দুই মাইল দূরে একটি গ্রামে পৌঁছালে একটি ট্যাংক রেজিমেন্টের সহায়তা নিয়ে সাঁজোয়া বাহিনী আমাদের দক্ষিণ পাশে শত্রুর ওপর হামলা চালাবে।

হেডকোয়ার্টার্স জেনারেল আবরার অনুমোদিত এ পরিকল্পনা জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে পাঠায়। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স এ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে তাতে সম্মতি দেয়। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের অনুমোদন লাভের পর জেনারেল আবরার সবুজ সংকেত দেন।

আমি আমার ট্যাকটিক্যাল হেডকোয়ার্টার্সসহ দুটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যাই। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ শুরু হবে। হঠাৎ নির্দেশ এলো, অপারেশন বন্ধ করো। বসে থাকো চুপচাপ। পাকিস্তান ও ভারত যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়। যুদ্ধ বিরতির নির্দেশ দেওয়া হলো। এভাবে থেমে গেল ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ।

জেনারেল আবরারের সৈন্যরা প্রচণ্ড গতিতে যুদ্ধ করেছে। আমার অধীনস্থ ১৪তম প্যারা ব্রিগেড লড়াইকালে ১৩৪ মাইল পথ অতিক্রম করেছে এবং কয়েকটি ভয়াবহ যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগা হচ্ছে যে, শিয়ালকোট যুদ্ধে বিজয়ের সবটুকু কৃতিত্ব দেওয়া হয় জেনারেল টিক্কাকে।

এ ধরনের বিভ্রান্তি আজো আমাদের মাঝে বিরাজ করছে। জেনারেল আবরারের ৬ষ্ঠ সাঁজোয়া ডিভিশন এবং তার নেতৃত্বাধীন পদাতিক বাহিনী বেদিয়ানা থেকে রাভি নদী পর্যন্ত বিশাল এলাকা রক্ষা করেছে। জেনারেল আবরার এবং তার ব্রিগেড, ব্যাটালিয়ন ও কোম্পানি কমান্ডাররাই শিয়ালকোট সেক্টরে যুদ্ধে জিতেছে।

যুদ্ধে পদক প্রাপ্তির ঘটনাই প্রকৃত সত্য তুলে ধরছে। ১৯৬৫ সালে যুদ্ধের পর পরিকল্পনা ও বীরত্বের জন্য জেনারেল আবরারকে ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাব দেওয়া হয়। একইভাবে ব্রিগেডিয়ার আব্দুল আলী ও আমি ‘হিলাল-ই-জুরাত’ পুরস্কার পেয়েছিলাম যুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতার জন্য। পক্ষান্তরে, জেনারেল টিকা খান অথবা তার ব্রিগেড কমান্ডারদের কেউই কোনো পদক পান নি।

সত্যি কথা বলতে কী, জেনারেল টিক্কা যুদ্ধকালে তার অবস্থানের পেছনে। ভারতীয় গেরিলা তৎপরতা সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিয়েছিলেন। এ জন্য তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়। তবে অল্পের জন্য তিনি রেহাই পেয়ে যান। জেনারেল টিক্কা যুদ্ধের পুরোটা সময় ছায়ার পেছনে ছুটেছেন কারণ, যুদ্ধে ভারতীয় গেরিলাদের কোনো তৎপরতা ছিল না। কিন্তু টিক্কার রিপোর্টে আহেতুক ভীতি সৃষ্টি হয়।

আমি আমার বক্তব্যের সমর্থনে ছোট্ট একটি ঘটনার বর্ণনা দেবো। যুদ্ধ বিরতির পর আমি আমার বন্ধু টিক্কা খানের অধীনস্থ একজন ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদের সাথে দেখা করতে গেলাম। একটি তাঁবুতে বসা ছিলেন। তিনি। আমাকে বললেন তাঁবু থেকে বের হয়ে যেতে।

 

জাফরওয়ালের যুদ্ধ

 

আমি এর কারণ জানতে চাইলাম। তিনি আমাকে বললেন যে, কয়েকজন অতিথি আসছেন। যেহেতু আমাদের ডিভিশন কোনো যুদ্ধ করে নি, তাই আমি তাদেরকে ৬ষ্ঠ সাঁজোয়া ডিভিশনের এলাকায় নিয়ে যাবো এবং যুদ্ধক্ষেত্র দেখাবো। তোমার সামনে আমি বিব্রত বোধ করছি, তোমরা যখন যুদ্ধ করেছ, আমরা তখন ছিলাম শিয়ালকোটে ।

Leave a Comment