পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ]

আজকের আলোচনার বিযয় পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-২, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত । 

পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-২

 

পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-২

 

তাই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে কথা বলার পর শেখ মুজিবের সাথে দেখা করতে ভুট্টো যখন পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন তখন তিনি ক্ষমতার লীলাখেলায় কোনো অচেনা খেলোয়াড় ছিলেন না । প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন যে, মতভেদ মিটিয়ে ফেলার জন্য মুজিব-ভুট্টো বৈঠক হওয়া দরকার । কোনো কোনো পূর্ব পাকিস্তানীরও এ রকম ধারণা ছিল ।

আবুল মনসুরের মতে, তাঁদের ধারণা ছিল এই, “ভুট্টো যাতে তাঁর নির্বাচকমণ্ডলী—পশ্চিম পাকিস্তানীদের কাছে এই ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব পালন করতে পারেন যে, ছয়-দফা মেনে না নিলে তার বিকল্প হবে হয়তোবা এক-দফা, সে জন্য ঐ বৈঠক হবে প্রয়োজনীয় গৌরচন্দ্রিকাবিশেষ । ছয়-দফা গৃহীত না হলে অনিবার্য কারণে এক-দফা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।

”২৯ আবুল মনসুরের মতো ব্যক্তিবর্গ যাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে আর আওয়ামী লীগের কিংবা ছয়-দফার প্রচার-প্রচারণার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন না অথচ এ ধারাপ্রবণতার স্থপতি, যাঁদের এর বুনিয়াদ ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি ছিল তাঁরা কিন্তু যে পরিস্থিতি সামনে আসছে তার দাবি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে কোনো ভুল করেননি ।স্পষ্টত ভুট্টোর কাছে ছয়-দফার পুরোটা গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়।

এটির কল্পনাও কষ্টসাধ্য যে, তিনি বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ফেডারেশনের ইউনিটগুলির স্বাধীনতার শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টিতে সম্মত হবেন । কেননা, তাঁর পুরোপুরি ভালো করেই জানা যে, প্রস্তাবিত ফেডারেশনের অন্তত একটি ইউনিট এমন এক দেশের সঙ্গে স্বাধীন বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করবে যে দেশের বিরুদ্ধে তিনি হাজার বছরের যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

বলাবাহুল্য, তাঁর এ অবস্থান ছিল, বিশেষ করে, পাঞ্জাবে ব্যালট জয়ের অন্যতম স্তম্ভ। এ এমন এক অবস্থান যা তাঁকে এমনকি নির্বাচনের পরেও বজায় রাখতে হয়েছে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হকি বিশ্বকাপে ভারতীয় হকি দলের বিরুদ্ধে তাঁর হুমকি, কাশ্মীর ও ফারাক্কা ইস্যুর বারংবার উল্লেখ ও পরিশেষে, বিমান ছিনতাই ঘটনায় তাঁর অবস্থান—এ রকম নানা ভারতবিরোধী কার্যকলাপের মাধ্যমে। এ সব কারণে তিনি আর্থিকভাবে দুর্বল কোনো কেন্দ্রের ধারণায় সম্মত হতে পারেন না যে কেন্দ্র “প্রয়োজনের” নিক্তির চুলচেরা মাপে ইউনিটসমূহ কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ চাঁদানির্ভর হবে।

আর জাতীয় আইন পরিষদের “নিরঙ্কুশ, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ” তেমন মনে করলে প্রতিরক্ষা বাজেট কেন্দ্রীয় বিষয় হলেও সেটিকে নিচু পর্যায়ে রাখতে পারবে। আর তাতে তার অবস্থানের মূল্য আরো কমে যাবে। এ সব ও আরো অনেক বিচার-বিবেচনা বরাবরই পাকিস্তান ও গণতন্ত্রের মাঝে স্থায়ী অন্তরায় হয়েছিল। আর এমন বিশ্বাসের কোনো কারণ ছিল না যে, ঐ পরিবেশের জাতক ভুট্টো ইয়াহিয়া খানের মতো পাকিস্তানের কায়েমি শাসক মহলেরই অন্যতম হিসেবে কোনো ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেরণায় সঞ্জীবিত হয়েছিলেন । ভুট্টো ইয়াহিয়া খানের মতোই একই শাসকগোষ্ঠীস্বার্থের শরিক ছিলেন।

তাঁরা উভয়েই একই ধ্যানধারণারই লোক। তাঁদের মধ্যেকার তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য হলো: ইয়াহিয়া তখনো ক্ষমতায় ছিলেন, অন্তত আরো কিছুকাল থাকবেন। আর ভুট্টোর অবস্থা ছিল: তিনি তখন ক্ষমতা লাভের চেষ্টায় লিপ্ত । পাঞ্জাব ও সিন্ধু—দুই প্রাদেশিক পরিষদের ‘চাবি’ দুই পকেটে রেখে, পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের আয়োজন রেখে গোড়ার দিকে ভুট্টো ভেবেছিলেন, তাঁর খুশিমতো কেন্দ্রীয় সরকারকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর মতো কলকাঠি তিনি হাতে পেয়ে যাবেন।

৩০ তখন তিনি যা ভুল করেছিলেন এবং পরে বুঝতে পেরেছিলেন (কিংবা উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়েছিলেন) যে, ছয়-দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্রের আওতায় সে ধরনের কোনো কলকাঠি কোনো কাজে দেবে না। তাই একমাত্র উপায় ছিল ছয়-দফার পরিবর্তন- পরিমার্জনা। এ কারণেই, এ পরিবর্তন সম্ভব করার জন্য তিনি পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। স্পষ্টত তাই দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও পাকিস্তান পিপল্স পার্টি পরস্পরের বিরুদ্ধেই মূলত ক্রিয়াশীল ছিল।

তাই সম্ভবত কারও পক্ষে রফায় আসা সম্ভব ছিল না। অন্তত পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতিকদের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশের জন্য এ অবস্থাটি ছিল সংশয়াতীতভাবেই আগে থেকে জানা বিষয়। এরা ছিল ছাত্র ও যুবতরুণ সমাজ যাদের মাঝে মধ্য ও চরমপন্থী দুই-ই ছিল। তবু মতবিনিময়ের সুযোগ ছেড়ে দেওয়া আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ ধরনের বৈঠকের আবশ্যকতা বাস্তবিকই ছিল প্রতিপক্ষের তা প্রেসিডেন্ট বা ভুট্টো যিনিই হন না কেন তাঁর বিরোধিতা কিংবা সংশয় সন্দেহের চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়ার জন্য।

কেননা তাঁদের কেউই আওয়ামী লীগের শাসনতন্ত্র প্রস্তাবের পাশাপাশি তাঁদের পছন্দসই কোনো শাসনতান্ত্রিক ফর্মুলা দেননি। আর ভুট্টোর কাছে আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত ছয়-দফাভিত্তিক শাসনতন্ত্রের কোনো কোনো বিষয় একেবারেই অগ্রহণযোগ্য—সে বিষয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা খোদ ভুট্টোর কাছ থেকেই আসার প্রয়োজন ছিল। ভুট্টোর এ সব অগ্রহণযোগ্যতার নেপথ্য মতলব জানা ছিল আর এই আগে থেকে জানা থাকার কারণেই ছয়-দফাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে হবে—এ দাবিতে আওয়ামী লীগ অটল ও অপরিবর্তনীয় থাকে। তাই এটি এ ক্ষেত্রে মুখ্য কারণ বলতেই হয়।

আর এ কারণে অনিবার্যভাবে এই সিদ্ধান্তে আসতেও হয় যে, আওয়ামী লীগ ও ভুট্টোর মধ্যেকার মতপার্থক্য নিরসন হওয়ার নয়। এই মতভেদ এতই মৌলিক যে, অন্য যে সব বিষয়ে যেমন, কমবেশি একই ধরনের অর্থনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে উভয় তরফের মতৈক্যে পৌঁছানোর যে সম্ভাবনাটি ছিল তা-ও তাদের দু’তরফকে কাছাকাছি আনতে ব্যর্থ হয়।

বলাবাহুল্য, এ মতৈক্যের বুনিয়াদ হতে পারতো সাধারণ মানুষের কল্যাণের অভিন্ন লক্ষ্যটি । বিশেষ করে, ভুট্টোর দলের ঘোষিত মূল উদ্দেশ্যই ছিল এটি আর এ নিয়ে প্রচুর বাগাড়ম্বরও ঘটে। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে ভুট্টো-মুজিব আলোচনা স্বভাবতই নিষ্ফল হয়। এ সময়ে তাঁদের আলোচনার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়নি, কেবল ফলটি জানা যায় মাত্র। ১৯৭১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় কমিটিকে ভুট্টো ও পশ্চিম পাকিস্তানের অন্য নেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিবের আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ জানানো হয় ।

পরে জানা যায়, ওয়ার্কিং কমিটি, যেভাবে এ আলোচনা হয়েছে তা অনুমোদন করে । আর ঐ আলোচনায় সারকথা ছিল: শেখ মুজিব ছয়-দফার প্রশ্নে অটল থাকেন, আর ভুট্টোর কাছে ছয়-দফার কোনো কোনো অংশমাত্র গ্রহণযোগ্য হয় । স্পষ্টত তাঁর কাছ থেকে ঐ প্রতিক্রিয়াই প্রত্যাশা করা হয়েছিল, কেননা শেখ মুজিব পরে মন্তব্য করেছিলেন: তিনি ভুট্টোকে নিয়ে তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট কোনোটাই নন। ভুট্টো আলোচনাকে এভাবে তুলে ধরেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানে ছয়-দফা ব্যাখ্যা করার জন্য তাঁর সময়ের দরকার । এটি করার পর এর ওপর তিনি তাঁদের রায় চাইবেন।

আর সে কারণে, ১৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সভা আহ্বানের জন্য শেখ মুজিবের অনুরোধ প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে মঞ্জুর করা যাবে না। ছয়-দফা ছাড়াও, আরো যে অস্বস্তিকর কারণটি ছিল ভুট্টোর জন্য তা হলো: জাতীয় পরিষদে ভোটদান পদ্ধতি যা তখনো অমীমাংসিত ছিল ।তাৎপর্যপূর্ণ এই যে, ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে ভুট্টো কেবল ছয় ও এগারো-দফার কোনো কোনো বিষয়ে মন্তব্য করেন। বৈদেশিক বাণিজ্য, বিদেশী মুদ্রা, হিসাব ও কারেন্সি ইত্যাদির বিলিবণ্টন সম্পর্কিত বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে যান।

ছয়-দফা মেনে নেওয়ার পথে “সত্যিকারের অসুবিধাগুলি” বলতে তিনি কী বোঝাতে চান—এ ধরনের প্রশ্নের জবাব ভুট্টো এড়িয়ে যান। ৩২ পাকিস্তানের আত্মপরিচয়ের মৌল বিষয় হিসেবে ধর্মের স্থলে এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক ঐক্যের প্রত্যাশা যাঁরা করেছিলেন, তাঁদের কাছে এ দুই নেতার আলোচনার ফলাফল ছিল হতাশাব্যঞ্জক। তবে এক ভাষ্যকারের মন্তব্য অনুযায়ী, ঐ ঐক্য বস্তুত সম্ভব ছিল না।

কেননা, পূর্ব পাকিস্তান এখন স্থানীয় পর্যায়ের জাতীয়তাবাদ বাতিল করে “শোষণমুক্ত” সুসংহত পাকিস্তান গড়তে পারে এবং পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অঙ্গীকার বিসর্জন দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ঐক্যের শক্তিশালী কেন্দ্র ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈষম্য দূর করার প্রয়াস চালাতে পারে—এ ধরনের প্রস্তাবনাকে তাই “সম্ভাব্যতা”র নিরিখেই দেখা যায় । বলা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

প্রথমটি হলো, দুই অঞ্চলের সামাজিক গঠন বা নির্মিতির মধ্যে বৈষম্য: আর দ্বিতীয়টি, পাকিস্তানের অঞ্চলগুলির সহজাত স্ববিরোধিতা বা স্বার্থের সংঘাত অথচ সে অবস্থায়ই তাদেরকে “সম্পদের অভিন্ন সঞ্চয়” নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করতে হবে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা হয়, “ভূমি সংস্কার সিন্ধুর অপেক্ষাকৃত বেশি সামন্ত প্রতিনিধিদের তুলনায় পাঞ্জাবের অধিকতর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পিপিপি পার্লামেন্টারিয়ানদেরকেই বরং একগুচ্ছ সমস্যার মুখোমুখি করবে।” আরো উল্লেখ করা হয় যে, “কোনো সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে এ দুই প্রদেশে অভিন্ন ভূমি সংস্কার বাস্তবায়িত করা শক্ত হবে।

” আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের জনপ্রতিনিধির শ্রেণীচরিত্র বিবেচনায় সেখানে আদৌ সংস্কার ঘটবে—এমনটি প্রত্যাশা করা যায় না। সে জন্য, কর্মসূচির বৈপ্লবীকরণের মাত্রা অনিবার্য কারণেই ভিন্ন হবে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বেপরোয়া শ্রেণী শক্তিগুলির কারণেই নয় বরং খোদ পিপিপির অভ্যন্তরেও শ্রেণী বিভিন্নতার কারণেও অবস্থা সে রকমই দাঁড়াবে ।

আর “যদি কোনো কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে গেলেই দেশের পশ্চিমাঞ্চলে এত সব সমস্যা দেখা দেয় তাহলে সে ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা কী? জীবনধারণ-নির্ভর প্রান্তিক চাষী ও পল্লীবাংলার দ্বান্দ্বিক সমস্যা বিরাট জোতমালিকপ্রধান পশ্চিম পাকিস্তানী সামন্ত সমাজের সমস্যার চেয়ে একেবারে সহজাতভাবেই ভিন্ন প্রকৃতির।” তাই প্রতিটি ইউনিট বা প্রদেশের একান্ত স্বকীয় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে— এমন পাঁচটি প্রদেশের এক ফেডারেশন বা কেন্দ্রীয় সরকারকে বাংলাদেশে সম্পত্তি ব্যবস্থার সম্পর্কগুলি কী হবে তা নির্ধারণ করতে দেওয়া কেবল অযথার্থ, অদক্ষই হবে না বরং তা হবে বিপজ্জনকও।”

শহর-নগরের বড় বড় ব্যবসায়ের বেলায় বলায় যায়, কোনো একটি সংহত সমন্বিত- অর্থনীতির জনসমাজে এই ব্যবসায় সংগঠনগুলি নিশ্চিতভাবেই যেমন পূর্ব তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রগতিশীলদের জীবন কঠিন করে তুলবে। কেননা, বহুকাল ধরেই এ সব পশ্চিম পাকিস্তানী প্রতিষ্ঠানের পূর্বাঞ্চলের সাথে ব্যবসায় যোগসূত্র রয়েছে। অন্যদিকে, অসমন্বিত অর্থনীতির জনসমাজ হিসেবে চিহ্নিত বাংলার ঋণজর্জর ও সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীন নব্যবুর্জোয়া সমাজ কিন্তু সে তুলনায় প্রগতিবাদীদের কর্মসূচিকে সেভাবে কূটাঘাত করতে পারবে না।

এ ছাড়াও বলা হয়েছে যে, দুটি সমাজতান্ত্রিক সরকারের কোনো সরকারই জাতীয় সম্পদে অধিকতর বড় ভাগ পাওয়ার ব্যাপারে কম অঙ্গীকৃত হবে—এমন মনে হয় না। তাই বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “পাকিস্তানের সকল অঞ্চলেই জাতীয় চেতনার উত্তাপ বাড়াতে দেশটির ইতিহাস ও ভূগোলের মণিকাঞ্চন সংযোগই ঘটেছে। এখন আমরা যদি সমাজতান্ত্রিক সংহতির আবেদনের পুরানো কথাতেই নাচার হয়ে ফিরে যাই তাহলে তাতেও দেখা যাবে পাকিস্তানের তখনকার পরিস্থিতিতে এই সমাজতন্ত্রের আবেদনও পুরানোপন্থীদের “ইসলাম পসন্দ” জোশের মতোই এক অলীক কল্পনাবিশেষ।

” তখনকার পাকিস্তানী রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতায় কিছুটা সত্য এই মর্মে ছিল যে, “সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ তাত্ত্বিক দিক থেকে আলোচনার জন্য ভালো বিষয় হলেও এ বাস্তবতাও ভোলার নয় যে, আমরা এক জাতীয়তাবাদী দুনিয়ার অধিবাসী । তা যদি না-ই হয় তাহলে ভুট্টো তথা পিপিপির উচিত ছিল আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে তাদের নিজ গণমানুষের স্বার্থের পোষকতার আলোকে দেখা।” অত্যন্ত অকাট্য প্রশ্ন তাই উঠেছিল: “পশ্চিম পাকিস্তানের শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থ কি ছয়-দফার কারণে এতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে যাতে কায়েমি স্বার্থও প্রভাবিত হবে? যদি তা না হয় তাহলে এই মৌলিক ও সর্বজনীন দাবির বিরোধিতাই বা কেন?”

 

পাকিস্তানের সংহতির প্রতি হুমকির ব্যাপারে ভুট্টো যে সব যুক্তি প্রদর্শন করেছেন সেগুলি এর বাস্তব অর্থে বুঝতে হবে। এই হুমকির উৎপত্তি যে শুধু পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতায় নিহিত তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের একজন সাংবাদিকের জবানিতে:অধিকাংশ পশ্চিম পাকিস্তানী এ কথা ভেবে আশঙ্কিত যে, ছয়-দফায় যা আছে সে অবস্থাযতা মেনে নেওয়া হলে তার নিহিত তাৎপর্য হবে এই যে, বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশকেওঅভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

… . যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়েছে, একবার পাঁচটি স্বতন্ত্র অর্থনীতির স্বীকৃতি দেওয়া হলে ঐ পাঁচটি ইউনিট নিজ নিজ স্বতন্ত্র পথে এগিয়ে যাবে। 08 আর তাতে পাকিস্তান বলে কিছু থাকবে না।যাঁরা এ সব এত নিশ্চিত হয়ে ভেবেছিলেন তাঁদের সে ভাবনার যুক্তিও ছিল। তবে এ কথাও ঠিক যাঁরা এর বিপরীত ধারণায় বিশ্বাসী তাঁদেরও ভাবনা ঐ একই ভাষ্যকারের ভাবনার সাথে আবশ্যিকভাবেই মিলে যায়। তা হলো:

যদি পাকিস্তানের আদর্শ ও পাকিস্তানের অধিবাসীদের একত্র ধরে রাখার উপাদানগুলি যথেষ্ট শক্তিশালী না হয় আর একই কারণে তাদের অর্থনীতিকে একক, সমন্বিত করতে না পেরে থাকে তাহলে বরাতজোর খুব মন্দই বলতে হবে। (তবে) কোনো দেশকে যদি কপটাচার, প্রতারণা কিংবা কলকৌশলে এক জায়গায় ধরে রাখতেই হয় তাহলে তেমন ধরে রাখায় সার্থকতা নেই।

অবশ্য সন্দেহ আছে আদৌ কতজন পাকিস্তানী (পূর্বাঞ্চলের পাকিস্তানীরাসহ) এই ভাষ্যকারের সাথে একমত হতে পারবেন যে, “দেশের বৃহদাংশের বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকলেও অস্তিত্ব সংরক্ষণে জনঅভিপ্রায়ের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার মনোবল পাকিস্তানের থাকা উচিত। দুর্বলচিত্ততার কোনো অবকাশই নেই এতে এই কারণে যে, যদি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কোনো আশা আদৌ থেকে থাকে তবে সেটি হলো এ অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া, অন্য কোনোভাবে নয়।

পরবর্তীকালের ঘটনাবলিতে দেখা যায়, পাকিস্তানীরা সেই “অগ্নিপরীক্ষা যাচাইয়ের” পথে আগুয়ান হয়েছে যদিও অনেকেই তার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এমনকি, যাঁরা পশ্চিম পাকিস্তানের অনিবার্য কী তা বুঝতে পেরেছিলেন তাঁদেরও বেশিরভাগ সেই অনিবার্য পরিণতি মেনে নিতে তখন তৈরি ছিলেন না। ওদিকে পূর্ব পাকিস্তানকে সেই অনিবার্যতার জন্যই মানসিকভাবে তৈরি করার কাজ চলছিল, সেই অনিবার্যতা যতই অরুচিকর হয়ে থাক না কেন তাদের জাতীয়তাবাদী পাকিস্তানী মনস্তত্ত্বের জন্য।

পূর্ব পাকিস্তানীদের এই মনন অভিমুখিনতা সম্ভব হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানী জনসমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্বশীল সমর্থকদের মাঝে প্রধানত আওয়ামী লীগের থেকে থেকে তীব্র, নিবিড় প্রচারাভিযানের সুবাদে ।অবশ্য, বিস্ফোরণমুখী নাটকীয়তার চূড়ান্ত জমে ওঠা ভাবটা তখনো আসেনি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের প্রথম সভার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তারিখটি ঘোষণা করলেন (এ ঘোষণা দেওয়া হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে) যদিও মুজিব-ভুট্টো সংলাপের ফল হিসেবে উভয় তরফের মনোভাব আরো অনমনীয় ও কঠোর হওয়ায় বিরাজমান পরিস্থিতিতে কোনোই পরিবর্তন আসেনি।

এভাবে মেরুকরণের নিখুঁত পরিপূর্ণতায় পৌঁছে যায় দুই পক্ষ। আর দুই তরফের দুই নেতা ১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারি লাহোরে একটি ভারতীয় বিমান ছিনতাই ও পরে সেটিকে বিধ্বস্ত করার ঘটনায় যেভাবে নিজ নিজ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তার মাঝেই সম্ভবত তার অত্যন্ত ভাবব্যঞ্জনাময় প্রতিফলন ঘটে। শেখ মুজিব একাজের নিন্দা জ্ঞাপন করেন ও ঘটনার তদন্তের দাবি জানান। আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ১৯৭১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইস্যুটি নিয়ে আলোচনায় বসে। কেননা দলের মতে, “এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমাদেরকে ভারতের সাথে এক সংঘাতময় অবস্থায় নিয়ে গেছে।””

এর বিপরীত দৃশ্যে, ভুট্টো এতে হরষিত হন এবং তাঁর ভারতবিরোধিতাকে এ সুযোগে আরো তীক্ষ্ণ, শাণিত করে তোলেন। ভুট্টোর অনুসারীরাও মুজিবকে ভারতপন্থী বলে অভিহিত করে আর পূর্ব পাকিস্তানীরা ভুট্টোর প্রতিক্রিয়াকে গণবিরোধী চক্রান্তের একটি অংশ বলে সাধারণভাবে মনে করতে থাকে। এ একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যে জনগোলযোগ ও হাঙ্গামা দেখা দেয় পূর্ব পাকিস্তানীরা সে সবকে ঐ চক্রান্তেরই অংশ বলে মনে করে।

 

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দলের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় জাতীয় পরিষদ উদ্বোধন করার ব্যাপারে প্রত্যাশিতভাবেই প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় । সভায় কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব না নেওয়া হলেও শাসনতন্ত্র প্রণয়ন সম্পর্কিত দলীয় সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়াও, পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে, পশ্চিম পাকিস্তানের সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক সমস্যাসমূহের ব্যাপারে শাসনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় বিধান সন্নিবেশিত করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপূরক এমন যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এই সভা শেখ মুজিবকে প্রদান করে। তবে এও প্রত্যাশা করা হয় যে, শেখ মুজিব পরের দিন শাসনতান্ত্রিক ইস্যুতে আওয়ামী লীগের অবস্থান ব্যাখ্যা করে এক “বড় রকমের নীতিনির্ধারক বিবৃতি” দেবেন। ধারণা করা হয়েছিল যে, “তিনি ঘোষিত দলীয় অবস্থানের কথাই পুনর্ব্যক্ত করবেন। আর সে ঘোষণা হবে আরো বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে।” পরের দিন আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমএনএ ও এমপিএদের এক যৌথ সভায় শেখ মুজিব দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথেই দলীয় সংকল্প সম্পর্কে বক্তব্য পেশ করেন।

তিনি গণবিরোধী চক্রান্ত সম্পর্কেও উল্লেখ করেন। অন্যান্য দিক থেকেও তাঁর এ বক্তৃতা নানাভাবে বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করে ও এ থেকে নানা বিষয় জানা যায় । ভুট্টোর সাথে তাঁর আলোচনাকে তিনি সন্তোষজনক বা অসন্তোষজনক কিছু নয় বলে উল্লেখ করলেও বোঝা যায় এ ছিল তাঁর রসবোধক এক লঘু উক্তিমাত্র। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় এই যে, তিনি মন্তব্য করেন, ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন পাঞ্জাব ও সিন্ধুর প্রতিনিধি হিসেবে।

এ কথা বলার মধ্য দিয়ে তিনি প্রচ্ছন্ন তাৎপর্যে বুঝিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের গোটা পশ্চিমাঞ্চলের মুখপাত্র হিসেবে কোনো বৈধতা ভুট্টোর নেই । পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির জন্য কতিপয় আমলা চক্রান্তে নিয়োজিত বলে যে অভিযোগ তখন ছিল শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদের প্রচণ্ড ধিক্কার জানিয়ে বলেন, যাঁরা কেবল বন্দুকই বোঝেন, রাজনীতি বোঝেন না, তাঁদের কোথাও জায়গা নেই। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল দলছুট বা বিরোধীদেরকে তাঁর এই মর্মে সতর্কবাণী যে, ১৯৫২ বা ১৯৫৪ সালের পরিস্থিতি আর ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি এক নয় ।

তিনি জনগণের ক্ষমতায় প্রাধান্য আরোপ করে আগামীর গর্ভে কী শঙ্কা, কী প্রত্যাশা নিহিত রয়েছে সে বিষয়ে প্রদত্ত বক্তব্যে কোনো রকম সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশমাত্র রাখলেন না। তিনি বলেন, ১৯৬৮-৬৯ সালের আন্দোলনে জনগণই আইয়ুব খানকে পদচ্যুত করেছে যদিও নেতারা তখন কারাপ্রাচীরের অন্তরালে ছিলেন। তিনি হুঁশিয়ার করে দেন, এখন যেহেতু জনগণের মাঝে নেতারা উপস্থিত রয়েছেন সেহেতু সেই প্রকার অথবা আরো গুরুতর পরিস্থিতি দেখা দিতেই পারে।

স্পষ্টত আওয়ামী লীগ অনভিপ্রেত কিছু ঘটার আশঙ্কা করছিল । আর তাই এ দল সঙ্কট মোকাবেলার জন্য জরুরি পরিকল্পনা ছকে রাখার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে। না হলে, কেন ঐ সভায় জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও দলের লক্ষ্য অর্জনে যে কোনো কর্মপন্থা গ্রহণের ব্যাপারে শেখ মুজিবকে সর্বাত্মক ক্ষমতা দেওয়া হবে? জাতীয় পরিষদের প্রস্তাবিত উদ্বোধনের প্রাক্কালে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবিসংবাদিত নেতাকে এ ধরনের বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি আর যা-ই হোক সাদামাটা, গুরুত্ব-তাৎপর্যহীন কিছু হতে পারে না।

তখনকার ঐ মহাক্রান্তিকালে জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা যে নিয়মতন্ত্র-বহির্ভূত, অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ওপর ন্যস্ত করলেন তার প্রয়োজন ছিল না যদি তাঁদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনে নিয়মতন্ত্র-বহির্ভূত উপায় অবলম্বনের সম্ভাবনা এতখানি অবশ্যম্ভাবী ও স্পষ্ট না হয়ে উঠতো।এখানে মনে রাখা দরকার, প্রেসিডেন্টের ঘোষণার আগেই দলীয় ওয়ার্কিং কমিটির সভার বিষয়টি স্থির হয়েছিল। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার একটি তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

এখন যদি ঐ অধিবেশন এ তারিখের পরে পিছিয়ে যায় তাহলে সে ক্ষেত্রে সভা রাজনৈতিক কৌশল কী হবে তা স্থির করবে এবং সুনির্দিষ্ট প্রত্যক্ষ কার্যব্যবস্থার পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। সন্দেহ-সংশয়ের ঘনঘটায় রাজনৈতিক আকাশ আচ্ছন্ন না থাকলে প্রেসিডেন্টের উল্লিখিত ভাষণের পর দলের সর্বস্তরের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ও তজ্জনিত অস্থিরতা, চাঞ্চল্য প্রশমিত হওয়ারই কথা। কিন্তু ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহের আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে বিরাজমান পরিস্থিতিতে তারপরেও আওয়ামী লীগকে তার অবস্থান আবারও স্পষ্ট করেই ব্যক্ত করতে হয়।

যারা প্রায় বছর দুই ধরে আওয়ামী লীগের ন্যূনতম প্রতিরোধের নীতির ধারাবাহিকতাকে সাময়িকভাবে জায়গা করে দেওয়ার জন্য প্রত্যক্ষ কর্মপন্থামূলক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলি মুলতবি রেখেছিলেন তাদের কারণেই আওয়ামী লীগকে তার অবস্থান এভাবে স্পষ্টাকারে বলতে হয় । সে কারণে, শেখ মুজিবের বক্তৃতার উদ্দিষ্ট ছিল যেমন ছাত্র ও তরুণেরা তেমনিই উদ্দিষ্ট ছিল যারা জনগণের কাছে ক্ষমতার হস্তান্তরকে বিলম্বিত করার জন্য দায়ী তারা ৷

ছাত্রফ্রন্টের দিক থেকে দেখতে গেলে বলা যায়, এ সময় নাগাদ অ্যাপস্যাক কার্যত বিলুপ্ত হয়। এটি ঘটে এ কারণে যে, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজের এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অন্যান্য মধ্যমপন্থীদের আংশিক সমর্থনে আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে, শেখ মুজিবের নির্দেশে এক ধরনের সন্ধির বিষয় মেনে নেয়। ১৯৬৯-এ যখন সহিংস ছাত্রবিক্ষোভ দাবাগ্নির মতো ছড়িয়ে পড়ছিল আর তাতে অংশ নিচ্ছিল কলকারখানার শ্রমিক ও দেহাতি মানুষের মতো জনসমষ্টির নানা অংশ এবং বিক্ষোভের দাবাগ্নি গোলটেবিল সম্মেলনের আলোচনার ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে অদম্য ব্যাপ্তি লাভ করছিল তা শুধুমাত্র সামরিক আইন পুনঃআরোপ করলেই নিভে যাবে—

এমনটি সম্ভব ছিল না। তবু এতে সংযমের যতির – ডাক দেওয়া হয় অপেক্ষাকৃত কম বাস্তব মূল্য দিয়ে নির্বাচনে অভীষ্ট লাভ ঘটে কি না—এটা দেখতে । এটা ছিল একটি পরীক্ষামূলক অবস্থান । এবং অন্য তরফের বৈরিতার আভাসের মুখে এ ধরনের সন্ধির মেয়াদ দ্রুত ফুরিয়ে যেতে বাধ্য। যখন সন্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন অ্যাপস্যাকের দাবির ভিত্তিতে (অর্থাৎ ছয়-দফা ও এগারো-দফার সম্মিলিত ভিত্তিতে) শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যে সম্ভাবনা ছিল এখন সে সম্ভাবনা যে সুদূরপরাহত হয়ে ওঠে তা খুবই স্পষ্ট হয়ে যায়।

স্পষ্টত আওয়ামী লীগেরও সেই ধারণাই হয়েছিল । স্বভাবত ছাত্রনেতারা তাঁদের নিজস্ব বিকল্প কৌশল ও প্রত্যক্ষ কর্মপন্থার পরিকল্পনা করছিল হাতের কাছে যা কিছু উপায়-অবলম্বন পাওয়া যায় তাই নিয়ে, গোড়ার দিকে তাদের আন্তঃসাংগঠনিক সংহতি ও সমন্বয়ের অভাব থাকলেও। প্রতিটি সংগঠন নিজ প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে । ছাত্রলীগ (ঢাকা সদরদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল) গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও স্থূল ধরনের বিস্ফোরক তৈরির (খুবই সীমিত মাত্রায়) অস্থায়ী প্রকৃতির ব্যবস্থায় নিয়োজিত থাকে । মতিয়াপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন (সদরদপ্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল) অল্প পরিমাণে অস্ত্র সংগ্রহেই মূলত ব্যস্ত থাকে ।

তুলনামূলকভাবে বেশি জঙ্গি (ন্যূনপক্ষে বাচনিক অর্থে) মেননপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন আত্মগোপন করে । তখনকার ধারণা ছিল এই যে, এই সংগঠনটি দেশের পল্লী জনপদে বামপন্থী আদর্শ প্রচারের সাথে সাথে এক ধরনের প্রতিরোধ দল গড়ে তুলছে। আর ছিল কিছু দলছুট চরমপন্থী যারা কাজ করছিল একই ধারায় । তবে এদের ব্যাপারে এ ধারণাও করা হতো যে, এরা বিক্ষিপ্ত সহিংসতায় নিয়োজিত ছিল । এ ছাড়াও সামরিক, আধাসামরিক ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা যারা তাদের হয় নিজ নিজ কর্মস্থলে নিয়োজিত ছিল কিংবা পূর্ব পাকিস্তানে নিজ বাড়িতে ছুটিতে ছিল তারাও ঘটনাপ্রবাহের তাৎপর্য সম্পর্কে সজাগ ছিল।

এরা ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিল। এদের উভয় পক্ষেরই আবার যুগপৎ প্রদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এভাবে যে যোগসূত্র বা নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে তা শুধু রাজনৈতিক উদ্যোগ বা তৎপরতা সম্পর্কে একটা কাজের যোগাযোগ চ্যানেলই হয়ে ওঠেনি বরং সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতির অবস্থা কেমন পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অস্ত্রের চলাচল, এমনকি, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরো সশস্ত্র সেনা আমদানির ব্যাপারে তথ্য প্রাপ্তির মাধ্যমও হয়ে ওঠে।

এ পরিস্থিতিতে ভুট্টোর প্রতিক্রিয়া যদিও অপ্রত্যাশিত ছিল না তবু সেটি আওয়ামী লীগের জন্য বাহ্যত অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন থেকে অপেক্ষাকৃত মারমুখী তরুণ সম্প্রদায় পরিবৃত হয়ে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আওয়ামী লীগকে কাজ করতে হয়। এ কারণেই ভুট্টোর বিবৃতির ওপর শেখ মুজিবের মন্তব্য ছিল এক পাল্টা প্রশ্ন বিশেষ: “ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে আজ সকালে আমি যে সব কথা বলেছি (এ বক্তৃতা সম্পর্কে আগেও উল্লেখ রয়েছে) সেগুলিকে কি আপনারা যথেষ্ট মনে করেন না?”

 

ভুট্টো যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে তার যোগদানের অক্ষমতার কথা বারংবার বলছিলেন প্রতিবারই তিনি নতুন আপত্তির কথা তুলছিলেন। অন্যদিকে, ঐ একই সময়ে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। আওয়ামী লীগ তার সংসদীয় দলের জন্য শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে যথাক্রমে নেতা, উপনেতা ও সচিব নির্বাচিত করে।

দিনাজপুরের ইউসুফ আলী, টাঙ্গাইলের আব্দুল মান্নান ও কুষ্টিয়ার আমিরুল ইসলাম যথাক্রমে চীফ হুইপ ও অপর দুইজন হুইপ নির্বাচিত হন। স্পিকার পদে খন্দকার মোশতাক আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার পদে আব্দুল মালেক উকিলকে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে শোনা যায়। শেখ মুজিব আবার প্রস্তাব দেন, পশ্চিম পাকিস্তানী এমএনএরা যদি প্রয়োজন মনে করেন তবে অধিবেশনের আগে তিনি তাঁদের কাছে ছয়-

দফা বিষয় ব্যাখ্যা করবেন। ৪৩ ১৯৭১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিতে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার করে ব্যক্ত করেন। তিনি পটভূমি বিস্তারিত তুলে ধরে, যে সব ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করছে সেগুলি নিয়ে আলোচনা করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বীকৃত একমাত্র প্রতিনিধি আওয়ামী লীগের ধারণা অনুযায়ী এ সবের বিকল্প কী হতে পারে তার আভাস দেন ।

নির্বাচন-পরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশক এক প্রচ্ছন্ন মন্তব্য দিয়ে শুরু করে, শেখ মুজিব ব্যাখ্যা দেন যে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের আশু অধিবেশন আহ্বানের জন্য বলেছিল এ কারণে যে এই দল মনে করে, জাতীয় পরিষদেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক ইস্যুগুলির নিষ্পত্তি করা যায়, তা হওয়াও উচিত।

 

কিন্তু তারপরেও আওয়ামী লীগ যে কোনো দল বা ব্যক্তির কাছে ফেডারেল পাকিস্তান রাষ্ট্রের পশ্চিম পাকিস্তানী ইউনিটগুলির “ন্যায়সঙ্গত স্বার্থের জন্য” ছয়-দফা ফর্মুলা কোনো রকম ক্ষতিকর হবে না তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের এই দাবির পুনরুক্তি করে বলেন যে, ছয়-দফা ফর্মুলা কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রীয় ইউনিটগুলির আর্থিক করুণানির্ভর করে তুলবে বলে যে বিকৃত ধারণা রয়েছে তা ঠিক নয়।

কারণ “রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ থেকে ফেডারেল সরকার পর্যাপ্ত উপযোজন বা ব্যয়বরাদ্দ নিতে পারবে আর শাসনতন্ত্রের এ সব বিধান বলে ফেডারেল আইন পরিষদ-ফেডারেশনের ইউনিটগুলির ওপর ফেডারেল লেভি ধার্য করতে পারবে।” তিনি যথেষ্ট জোর দিয়ে বলেন, “এই লেভি প্রতিটি ইউনিটের সম্পদের ওপর সবার আগে প্রথম চার্জ হিসেবে বসবে।”

পশ্চাদদৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে, শেখ মুজিব হয়তো আন্তরিকতাবশে খেয়াল করেননি যে, এখানেই তো আসল সমস্যা। জাতীয় পরিষদে “বিপুল/নিরঙ্কুশ” গরিষ্ঠতা নিয়েই তো আদত প্রশ্ন যে প্রশ্ন ঐ ফেডারেল লেভির মতো ইস্যুর সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। যদি কেন্দ্রের প্রয়োজন বা চাহিদামাফিক কেন্দ্রকে দিতে হয় আর আওয়ামী লীগ-সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয় পরিষদকে “এ সব চাহিদার”

প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাহলে কি এমন হবে না যে, ঐ জাতীয় পরিষদ কেন্দ্রের চাহিদাকে একান্ত ন্যূনতম পর্যায়ে নির্ধারণ করবে, যাতে প্রতিরক্ষার মতো বিষয়টিও থাকবে? তাহলে সে অবস্থায়স্থিতাবস্থার পরিবর্তনবিরোধীদের পক্ষে কি এ ধরনের পরিকল্পনা মেনে নেওয়া সম্ভব হবে? অনুরূপভাবে, মুজিবের আশ্বাস ছিল এই যে, বৈদেশিক সাহায্য ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউনিটগুলি তাদের ক্ষমতার অনুশীলন করবে “দেশের পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোর মধ্যে।”

সে আশ্বাসও খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়। আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্র তো এমনি করে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করতেই পারে যা কেবল নিজ দলীয় বৈদেশিক বাণিজ্য- সংক্রান্ত স্বার্থের পরিপূরক হবে! শেখ মুজিব তাঁর এই বক্তব্যে পিপিপির আসল চেহারা উন্মোচনের চেষ্টা করেন যে, এর আগে পিপিপি স্বীকার করেছে, বাস্তবিকপক্ষেই পূর্ব পাকিস্তান উপনিবেশ ছিল ।

অথচ এখন সেই পিপিপিই ছয়-দফার কোনো কোনো ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসলে কি স্ববিরোধিতা করছে না? তাঁর মতে, ছয়-দফার এ সব ব্যবস্থার সরল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক সহায়তা ও বৈদেশিক মুদ্রার মতো বিষয়কে কেন্দ্ৰীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উপনিবেশবাদী শোষণের যে ব্যবস্থা আরোপ করা হয়েছে সেই ব্যবস্থাকে নাকচ করে দেওয়া।

তিনি পিপিপির এই অভিযোগও অস্বীকার করেন যে, আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর এই বলে ছয়-দফা চাপিয়ে দিতে চেয়েছে যে কোনো ইউনিট মনে করলে তার কিছু ক্ষমতা কেন্দ্রকে ছেড়ে দিতে পারে। শেখ মুজিব তাঁর এই যে অবস্থানের কথা বললেন তা যদিও আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাপেক্ষ ও কিছুটা এক তরফাও শোনায় তবুও এটি যতোটা মনে করা হয় আসলে ততোটা উদ্ভট নয় ।

একই বিষয় ঘুরিয়ে বললে দাঁড়ায়, পশ্চিম পাকিস্তানের ফেডারেশন ইউনিটগুলিও ইচ্ছা করলে সাধারণ পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতে পারে আর তার পাশাপাশি কোনো কোনো অনিবার্য কারণে পূর্ব পাকিস্তান বিশেষ মর্যাদা ভোগ করবে।ভুট্টো ও তাঁর দল পিপিপির অবস্থানের মতলবটি উন্মোচনে শেখ মুজিবের বক্তব্যে তাঁর এই বিশ্বাস প্রচ্ছন্ন যে, ভুট্টো ও তাঁর দলের অবস্থান মূলত সে সব ষড়যন্ত্রকারীদেরই চক্রান্ত যারা বরাবর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্তরায় সৃষ্টি করেছে।

তাঁর ধারণা “এভাবেই জনগণের হাতে ক্ষমতার হস্তান্তরকে কূটাঘাত করতে চাওয়া হয়েছে।” ঝড়ের আগে তুলনামূলক থমথমে অবস্থার মতো বাহ্যত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হলেও ভেতরে যে আগ্নেয় সক্রিয়তার ধারাপ্রবাহ চলেছে ও আওয়ামী লীগও যে সে বিষয়ে সজাগ ছিল শেখ মুজিব এই সচেতনতাকেই পরিষ্কার করে তুললেন । একইসঙ্গে তিনি এও জানিয়ে দিলেন যে, ঘটনার একের পর এক উন্মোচনের মিছিলের নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন:

পাকিস্তানের সচেতন জনসাধারণের মনে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশমাত্র নেই যে, কুচক্রী, কায়েমি স্বার্থবাদী মহল ও তাদের দোসররা জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা একটি শাসনতন্ত্র অনুমোদন ও তাঁদের হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর বানচাল করার জন্য বেপরোয়া শেষ চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের এই বেপরোয়াভাব এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, তারা পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি নিয়ে উদ্বিগ্নতার ভান করলেও আসলে তারা সেই পাকিস্তানের অস্তিত্ব নিয়েই জুয়া খেলার বাজি ধরতেও তৈরি।

ওরা হলো সেই মহল যারা পাকিস্তানের সংহতিতে মারণাঘাত করতে চলেছে। আর এভাবে নস্যাৎ করতে চলেছে এক গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এক সাথে থাকার এক ভিত্তি বের করার জন্য পাকিস্তানী জনসাধারণের শেষ সুযোগকে।ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের জন্য একটা টেকসই শাসনতন্ত্র দেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রতিটি অংশের প্রত্যেক এমএনএ’র প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত বা নস্যাৎ করার চক্রান্ত প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য “পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়িত মানুষ” এবং “বাংলাদেশের জাগ্রত মানুষ” তথা চাষী, শ্রমিক ও ছাত্রদের প্রতি নিজেদেরকে প্রস্তুত করার ডাক দেন। তিনি সকল পাকিস্তানীর প্রতি এই বলে উদাত্ত আবেদন জানান; “বাংলাদেশ, পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের জাগ্রত জনসাধারণের পবিত্র দায়িত্ব হবে চক্রান্তকারীদের প্রতিরোধ করা।”

তিনি বিশেষ করে বাংলাদেশের জাগ্রত জনসাধারণকে সম্ভব সকল উপায়ে গণবিরোধী শক্তিগুলিকে প্রতিরোধ করতে তৈরি হতে বলেন যাতে ঐ সব “গণবিরোধী শক্তিকে আমাদের মাটি থেকে উৎখাত করা যায়।” তিনি আরো বলেন, “আমরা প্রয়োজনে আমাদের জীবনদান করবো—এই মর্মে আজকে আমরা নতুন করে শপথ নিচ্ছি যাতে করে আমাদের আগামী বংশধরেরা কোনো উপনিবেশের অধিবাসী না হয়ে এক মুক্ত দেশের’ মুক্ত মানুষ হিসেবে স্বাধীনভাবে মর্যাদার সাথে বসবাস করতে পারে।

তাঁর এই ‘মুক্তদেশ’ কথাটির অর্থ ঐ বিশেষ পরিস্থিতির পটভূমিকায় স্পষ্টত দ্ব্যর্থক ছিল। এই “আগামী বংশধর’ [বাংলাদেশের] হয় এক ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে বাস করবে যেখানে তারাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রদত্ত স্বাধীনতাগুলি প্রয়োগ করতে পারবে, আর যদি তা সম্ভব না হয়, তারা বাস করবে সম্পূর্ণত “মুক্ত” বাংলাদেশে।

একই সংকল্পের কথা নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নির্বাচিত এমএনএ এএইচএম কামারুজ্জামান ব্যক্ত করেছিলেন এক মাসেরও বেশি আগে রাজশাহী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ সদর মহকুমার ১৫০০ কর্মীর এক সম্মেলনে । তিনি বলেছিলেন: “পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা যদি ছয়-দফা ও এগারো-দফা দাবিকে পাশ কাটাতে চেষ্টা করেন, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দেওয়া হবে।”

কামারুজ্জামান হয়তো এ কথা বলেছিলেন মওলানা ভাসানীকে সামাল দেওয়ার জন্য । মাত্র দু’দিন আগে মওলানা ভাসানী ঐ একই শহরের মাদ্রাসা ময়দানের জনসভার উদ্দেশে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন যে, লাহোর প্রস্তাবের ধারণায় এক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে স্বাধীন ও সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাগ্রত বাঙালির উচিত হবে ২৩ বছরের শোষণের অবসান ঘটানো।

তবে নিরেট বাস্তবতা হলো এই যে, আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা কামারুজ্জামান এই বিবৃতি দেন, যার সাথে কিছু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতার ব্যক্তিগত যোগাযোগও ছিল। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, আওয়ামী লীগের হাতে বিকল্প তেমন কিছু ছিল না। ছয়-দফায় যে সব অধিকারের অঙ্গীকার রয়েছে পূর্ব পাকিস্তানকে সে সব দেওয়ার জন্য দলটি যে কোনো পর্যায়ে যেতে, এমনকি তাতে পাকিস্তানের অবশিষ্টাংশ থেকে বিচ্ছিন্নতা বোঝালেও তার জন্য তৈরি ছিল।

তবে এ ধরনের চূড়ান্ত পরিণতি তাঁরা নিশ্চয়ই এড়াতে চাচ্ছিলেন।পাকিস্তানের বাদবাকি অংশ সম্পর্কে বলা যায়, তাদের জন্য প্রশ্ন জটিল হলেও সরলও বটে। আওয়ামী লীগকে যদি জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হয় তাহলে পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ করে রাখার হাতিয়ারটি হারিয়ে যাবে চিরতরে আর দেশের অন্যান্য অঞ্চল আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কার্যত কেন্দ্রাধীন থাকবে না আর তাতে কেন্দ্র একেবারে অচল না হলেও দুর্বল হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের দাবি না মেনে নিলে তাতে বড়জোর পূর্ব পাকিস্তানই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং সম্ভবত পাকিস্তানের বাদবাকি অঞ্চলগুলি আগের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হবে। কাজেই শেষোক্ত বিকল্পটি স্পষ্টত কম ভয়াবহ ও সেটির নিরীক্ষা অর্থবহ। বস্তুত পূর্ব পাকিস্তানের এ বিষয়টি জানা ছিল। পূর্ব পাকিস্তান জানতো যে, সাধারণ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসারে, পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন কখনো অর্জন করা সম্ভব হবে না।

আর এই সত্য উপলব্ধির বিষয়টি খুবই তীক্ষ্ণ, শাণিত ভাষায় ব্যক্ত করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। যাঁরা মনে করেন, পাকিস্তানে “সংখ্যালঘিষ্ঠের একনায়কত্ব” চিরকালের নির্ধারিত নিয়তি তাঁদের যুক্তিকে তিনি শ্লেষাত্মকভাবে উপস্থাপন করেছেন । সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও তৎকালে পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খান সংবাদপত্রে দেওয়া এক বিবৃতিতে ভুট্টোকে পুঁজিপতি- আমলা আঁতাতের “ক্রীড়নক” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 

 

এভাবে সংঘাত আসন্ন হয়ে ওঠে। তবে ইয়াহিয়া খান তখনো শাসনতন্ত্র প্রশ্নে নিজ অবস্থান স্পষ্ট করেননি যাতে করে পাকিস্তানের জনসাধারণ গণতন্ত্রের প্রতি চূড়ান্ত হুমকির মোকাবেলায় নিজেদের তৈরি করতে পারে। আর এ রকমও মনে করা হচ্ছিল, এটি সম্ভব নয় যে এহেন অগ্রসর অবস্থায় মুজিব মুখোমুখি সংঘাতকে পাশ কাটিয়ে যাবেন, কারণ দেশে আগুন তখন প্রকট রূপ ধারণ করেছিল ।

  ইয়াহিয়া খান সত্যিই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চেয়েছিলেন—এ কথা ধরে নিলেও প্রশ্ন থেকে যায়, কোনো স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার মতো অবস্থা তাঁর ছিল কি? পরিস্থিতিগত আভাস পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এর সুনির্দিষ্টপ্রায় জবাব: সে রকম অবস্থা তাঁর ছিল না।

ঐ সময়ে রাওয়ালপিণ্ডিতে কর্তব্যে নিয়োজিত একজন বাঙালি সাংবাদিকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় জেনারেল ও আমলা রাওয়ালপিণ্ডির প্রেসিডেন্ট হাউসে এক “জরুরি সভায়” মিলিত হন। উল্লিখিত আমলাদের মধ্যে প্রেসিডেন্টের বক্তৃতা-ভাষণ, বিবৃতি ইত্যাদির একজন “ছায়া লেখকও’ ছিলেন। দিনটি ছিল ছুটির দিন।

আর প্রেসিডেন্ট রওনা দিয়েছিলেন করাচির উদ্দেশে ঢাকার পথে, ঢাকায় ১৯৭১ সালের ৩ মার্চে প্রস্তাবিত জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনেযোগ দিতে । উল্লিখিত জেনারেলদের তিনজন ঐ একই সন্ধ্যায় বিমানে করাচি পৌঁছান (৪৮ আর এরপর ১৯৭১ সালের ১ মার্চের এক অস্বাভাবিক সময়ে জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় প্রেসিডেন্টের এক ঘোষণায় ।

আইয়ুব খানের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সাধারণত সন্ধ্যার দিকে ব্যক্তিগতভাবে টিভি/বেতার সম্প্রচারে জানিয়ে দিতেন। কিন্তু তাঁর জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন স্থগিত করার এ অতীব নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাটি এক অজ্ঞাতনামা ঘোষক দুপুরে পাঠ করে সম্প্রচারিত করায় তাতে জনসাধারণ হতবাক ও আশঙ্কিত হন।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ৯ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধন করা হলে খাইবার থেকে করাচি হরতাল ডাকবেন বলে ভুট্টো তাঁর যে সুবিখ্যাত ঘোষণাটি দিয়েছিলেন তার অল্পসময় পরেই প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে প্রেসিডেন্টের ঘোষণা আরো তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে।

 

এও যদি ধরে নেওয়া যায়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নিজেই তাঁর এ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন তাহলেও বাহ্যত মনে হয় তিনি ভুট্টোর চরমপত্রের অপেক্ষায় ছিলেন। ভুট্টোর আবেগময়, অলঙ্কারবহুল বক্তৃতার পরিষ্কার সারবস্তুটি ছিল এই যে, এমন শাসনতন্ত্র কখনো তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না যার আওতায় বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবস্থাপনা প্রদেশের হাতে যাবে।

এ ছাড়া তিনি জাতীয় পরিষদের মিলিত হওয়ার আগে এই ইস্যুর নিষ্পত্তি না হলে দুটি বিকল্পের ধারণা দেন। এক, পরিষদ বিলোপ ও সামরিক আইন বহাল রাখা। আর দুই, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন উদ্বোধন বাতিল এবং শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ১২০ দিনের যে সময়সীমা রয়েছে তা তুলে দেওয়া।৫° তাঁর এই দুই বিকল্প প্রস্তাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর স্থগিত রাখার ইঙ্গিত নিহিত ছিল ।

 

প্রেসিডেন্টের নামে পড়া ঐ বিবৃতিতে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যে, প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রের বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটা ঐকমত্য গড়ে তোলার ব্যর্থতার কারণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক মোকাবেলা-সংঘাতের মতো একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আর পিপিপি ও অন্য কয়েকটি দল জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে তাঁর হাতে কোনো বিকল্প নেই।

তিনি নিরুপায় হয়ে পড়েছেন । এখানে তাৎপর্যের বিষয় এই যে, জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী স্থগিত রাখার জন্য আংশিকভাবে ভারতকেও দায়ী করা হয়। কেননা, অভিযোগ করা হয় যে, ভারত পাকিস্তানবিরোধী প্রচারণার মাধ্যমে বর্তমান উত্তেজনায় ইন্ধন যোগাচ্ছে। ভুট্টো যখন তাঁর চরমপত্রের কথা ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছিলেন আর পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত প্রণেতারা ওটা তামিল করার অপেক্ষা করছিলেন তখনআওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের ৩০ সদস্যের এক কমিটি দলের পক্ষ থেকে জাতীয় পরিষদে যে খসড়া শাসনতন্ত্র বিল পেশ করা হবে তার প্রতিটি দফা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত ছিলেন।

বিলের বিস্তারিত প্রকাশ না করা হলেও, জানা যায়, এ বিলে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলির জন্য ছয়- দফার বিকল্প সন্নিবেশিত করা হয়। খসড়া বিলে ১৮৮টি অনুচ্ছেদ, দশটি তফসিল এবং ফেডারেশনের ইউনিটগুলির মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্য এক ফেডারেল সমন্বয় সংস্থার ব্যবস্থা রাখা হয়। এ ছাড়া এই মর্মে একটি ফেডারেল ফাইন্যান্স কমিশনেরও প্রস্তাব ছিল।

যে, কমিশনের কাজ হবে প্রতি পাঁচ বছর পর বিভিন্ন ইউনিটের জন্য ফেডারেল লেভি বা করের হার পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা। ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগ যে সব শাসনতান্ত্রিক সংশোধনীর প্রস্তাব করে মূলত সে সবের ভিত্তিতেই শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করা হয় বলেই মনে করা হয়।রেডিও পাকিস্তানের সম্প্রচারে যখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয় তখনো ঢাকার একটি হোটেলে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ।

বাস্তবিকপক্ষে গোটা ঢাকা নগর ঐ ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের (সম্পূর্ণত স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা সরকারি প্রেসনোটসহ সকল মহল স্বীকার করে) পরই কেবল তাঁরা এ ঘটনার কথা অবহিত হন। সরকারি অফিস, আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প স্থাপনা ইত্যাদি থেকে লোকজন শোভাযাত্রা করে হয় পূর্বাণী হোটেলে (যেখানে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দল বৈঠকরত ছিল) কিংবা পল্টন ময়দানে (বড় সভাসমিতির জন্য সাধারণভাবে নির্ধারিত মাঠ) পৌঁছায়।

“ইয়াহিয়ার ঘোষণা, বাঙালিরা মানে না” – শ্লোগানে আকাশ- – বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। নগরের বাস সার্ভিসের চলাচল থেমে যায়, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় । ঢাকা স্টেডিয়ামে এ সময় একটি আন্তর্জাতিক খেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিতে দর্শকরা মিছিল করে বেরিয়ে এলে ঐ খেলার অনুষ্ঠান পরিত্যক্ত হয় ।৫২ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও ডাকসুর নেতৃবৃন্দ এবং শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবিষ্ট জনতার উদ্দেশে বক্তৃতা দেন।

এ জনতা জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে তাদের আস্থা পুনর্ব্যক্ত করে। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী জানান যে পল্টন ময়দানে বক্তৃতা দেওয়ার আগে তিনি নিজে, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন এবং (সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং ১৯৬৮-৬৯ সালের আন্দোলনের অন্যতম নেতা) তোফায়েল আহমদ এমএনএ পূর্বাণী হোটেলে শেখ মুজিবের সাথে মিলিত হন ।

তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী শেখ ফজলুল হক মণি ও তাঁরা তিনজন কোনো কোনো ছাত্র ইউনিয়ন নেতার সাথে আলোচনা করেন। কিন্তু সর্বসম্মত ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই ঐ নেতারা অনতিবিলম্বে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শেখ মুজিবের পরামর্শ অনুযায়ী পল্টন ময়দানে যান। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে নূরে আলম সিদ্দিকী স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তথা এসবিসিএসপি গঠনের কথা ঘোষণা করেন ।

তিনি আরো ঘোষণা করেন যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অনিবার্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাঁরা তাঁদের কৌশল বদলেছেন। এখন থেকে “প্রতিটি আঘাতের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হেনে জবাব দেওয়া হবে।” তাঁদের সবাই “স্বাধীন বাংলা” প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান । নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, এত তাড়াতাড়ি “স্বাধীন বাংলার” শ্লোগান তোলার জন্য কোনো কোনো মহল থেকে তাঁদের তীব্র সমালোচনা করা হয় ।

আর তাতে করে শেখ মুজিবের ওপর চাপ বাড়ে। তবে এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না, শেখ মুজিবের প্রচ্ছন্ন অনুমোদন ছাড়া ছাত্ররা এটা করতে পারতো না ।প্রেসিডেন্টের ঘোষণাকে আওয়ামী লীগ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়। শেখ মুজিব সাংবাদিকদের জানান যে, একটি সংখ্যালঘিষ্ঠ দলকে তোষামোদ করার নীতিকে বিনাপ্রতিবাদে মেনে নেওয়া যায় না।

তবে এ ধরনের অসন্তোষের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি প্রকাশের পূর্বে প্রাথমিক প্রতিবাদের পর সরকারের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময়ের দরকার ছিল । তাই শেখ মুজিব ইতোমধ্যে পরিস্থিতিতে যথেষ্ট পরিবর্তন না ঘটলে আগামী কর্মসূচি কী হবে সে বিষয়ে তিনি ৭ মার্চ এক জনসভায় ঘোষণা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

 

পরোক্ষ প্রতিরোধ পর্ব-২

 

ইতোমধ্যে ঢাকা ও গোটা প্রদেশে যথাক্রমে ২ ও ৩ মার্চ হরতাল পালনের কথা বলা হয়। তিনি ঘোষণা করেন, অতঃপর যা কিছু ঘটবে তার পরিণতির জন্য তিনি জবাবদিহি হবেন না। পরের দিন কেবল ঢাকার জন্য হরতাল ডাকা হলেও তা গোটা পূর্ব পাকিস্তানে পালিত হয় ।৫৪ এতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, জনসমষ্টির অংশবিশেষ কিংবা আওয়ামী লীগের গোষ্ঠীবিশেষই শুধু নয় বরং পূর্ব পাকিস্তানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সাথে একাত্ম রয়েছে।

Leave a Comment