আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বাংলায় মুসলিম শাসন। সোনার বাংলায় ঐতিহাসিক অপরিহার্যতায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস পাঠ আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে এবং বাংলাদেশি কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং মন ও মানস গঠন প্রক্রিয়ায় তা গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অতীত গৌরব, বর্তমান গর্ব এবং সুন্দর সোনালী ভবিষ্যৎ গঠনে ইতিহাসই হচ্ছে একটি জাতির সামনে জীবন্ত প্রেরণা। তাই বাংলায় মুসলিম শাসনের ইতিহাস চর্চা এবং গবেষণা আমাদের জন্য অতীব জরুরি।
১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় থেকে ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলাহর ইতিহাস এবং ১৯৪৭-এ ভারত বিভক্তি থেকে পরবর্তী পূর্ব-পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় – এই সমগ্র সময়টি আমাদের গর্বিত ইতিহাসেরই অংশবিশেষ।
বাংলায় ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয় থেকে মুসলিম শাসনের শুরু। সেই থেকে আজকের ২০২০ সাল পর্যন্ত ৮১৬ বছর এবং ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলাহর পলাশীর প্রাঙ্গণে ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে পরাজয় এবং অতপর ১৯৪৭ পর্যন্ত ১৯০ বছর ইংরেজ শাসন, এই সময়কাল বাদ দিলে ৬২৬ বছর বাংলা ছিলো মুসলিম শাসনাধীন। এর মাঝে কিছু সময়কাল দিল্লী ও ইসলামাবাদকেন্দ্রীক শাসনের অধীনেও বাংলা শাসিত হয়েছে।
যখন ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা জয় করেন, দিল্লীতে তখন মোহম্মদ ঘোরী রাজবংশীয় শাসন বলবৎ। আর ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলাহর সময়ে দিল্লীতে ক্ষমতাসীন ছিলেন মোগল সম্রাট আলমগীর শাহ, যার সময়কাল ১৭৫৪ থেকে ১৭৫৮ সাল পর্যন্ত।
বাংলায় মুসলিম শাসন

সর্বভারতীয় মুসলিম-শাসনের প্রেক্ষাপটে বাংলায় মুসলিম-শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাংলার ভূখন্ডে মুসলিম-শাসনের তিন শতাধিক বৎসরের ইতিহাস নবম ইউনিটের বিষয়। বখতিয়ার খলজী মুসলিম-শাসন প্রতিষ্ঠা করেন (১২০৪ খ্রিস্টাব্দে) বাংলার অংশ বিশেষে এবং সমগ্র বাংলায় বিস্তার লাভ করে চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে। এই প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের ইতিহাস প্রথম দু’টি পাঠের বিষয়বস্তু।
১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মুসলিম শাসকগণ দিল্লির সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ করে স্বাধীন সুলতানি প্রতিষ্ঠা করে। যে স্বাধীনতা চলেছিল দু’শ বছর ধরে। বাংলার এই দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীনতা দৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সুলতান ইলিয়াস শাহ। ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন দীর্ঘস্থায়ী ছিল; অবশ্য মাঝখানে স্থানীয় রাজা গণেশের উত্থান ঘটেছিল। ইলিয়াস শাহী শাসনের পর ক্ষণস্থায়ী হাবশী শাসন এবং হাবশী শাসনের অবসান ঘটিয়ে উত্থান ঘটে হুসেন শাহী বংশের। আলাউদ্দিন হুসেন শাহই ছিলেন এই বংশের শাসনের প্রতিষ্ঠাতা ও নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ সুলতান ।

ইলিয়াস শাহী ও হুসেন শাহী শাসনামল বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে বাংলার একক রাজনৈতিক সত্তা প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হয়। বাংলার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ এই সময়কে করেছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইলিয়াস শাহী শাসন স্থান পেয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ পাঠে এবং পঞ্চম পাঠে রয়েছে হুসেন শাহী শাসন।
