বৈপ্লবিক নারীবাদ

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বৈপ্লবিক নারীবাদ – যা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলার নারী |

বৈপ্লবিক নারীবাদ

 

 

বৈপ্লবিক নারীবাদীরা নারী-পুরুষের জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্যের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁদের মতে প্রজনন সম্পর্কের ভিত্তিতে লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণীবিভাজন নারীর অধস্তনতার জন্য দায়ী। সিমোন দ্যা বোভয়ার বৈপ্লবিক নারীবাদের প্রবক্তা বলা চলে।

“The Second Sex” গ্রন্থে তিনি তাঁর নারী বিষয়ক চিন্তা চেতনা তুলে ধরেন। তিনি প্রথম যে জিজ্ঞাসাটি সামনে আনেন তা হচ্ছে ‘নারী কী? (What is a woman?) তিনি বলেন একজন পুরুষকে কখনই বলতে হয় না আমি একজন পুরুষ, কিন্তু একজন নারীকে সবসয়েই তার লিঙ্গ পরিচয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়, তার নিজের পরিচয়ের সূত্রপাত করতে হয় ‘“আমি একজন নারী” এই বক্তব্য স্বীকার করে নিয়ে।

তাঁর মতে মানবজাতি শব্দটি দ্বারা কেবল পুরুষকেই বোঝানো হয় এবং মানব শব্দটি একই সঙ্গে ইতিবাচক এবং নিরপেক্ষ, অন্যদিকে নারী শব্দটির মাধ্যমে কেবল নেতিবাচক দিকই বোঝানো হয়ে থাকে।

নারীর জরায়ু রয়েছে এবং তার এই বিশিষ্টতাই তাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। পুরুষরা প্রায়ই বলে থাকে নারী চিন্তা করে তার গ্রন্থি দিয়ে, বোয়ার বলেন, পুরুষরা এ বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যান যে তাদের দেহেও গ্রন্থি রয়েছে। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন যে, পুরুষ হচ্ছে মানব জাতি এবং নারী হচ্ছে পুরুষ যা ঘোষণা করে তাই। পুরুষ নারীকে স্বাধীন-স্বকীয় সত্ত্বা হিসেবে বর্ণনা করে না বরং পুরুষের সঙ্গে তুলনা করে বর্ণনা করে। পুরুষের কাছে নারী হচ্ছে একটি বিশুদ্ধ যৌন সত্ত্বা।

পুরুষ নিজেকে দেখে আত্ম বা পরম সত্ত্বা হিসেবে আর নারীকে বিবেচনা করে দ্বিতীয় সত্ত্বা, অপর সত্ত্বা বা দ্য আদার হিসেবে। বোভয়ার প্রশ্ন রেখেছেন নারী কেন অপর সত্ত্বা হিসেবে নিজের এই ভূমিকা কোন প্রতিরোধ ছাড়াই মেনে নেয়ার জন্য অনুগত হয় ? কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন পুরুষের বিপরীতে নিজেকে পরম সত্ত্বা হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানোর মতো বাস্তব উপায় নারীর নেই।

নারীর কোন অতীত নেই, ইতিহাস নেই, কোন ধর্ম নেই। নারীরা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের সাথে যুক্ত নয় বরং অর্থনৈতিক শর্ত বা সামাজিক অবস্থানের দ্বারা পিতা বা স্বামীর সাথে যুক্ত, আর তাই নারী পিতৃতন্ত্রকে ধ্বংস করার চিন্তাও করতে পারে না।

এই তত্ত্ব অনুসারে নারীর অপর সত্ত্বা হতে অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে উচ্চবর্ণের সাথে সখ্যতার মাধ্যমে অনুগ্রহ প্রাপ্তির সুবিধা পরিত্যাগ করা। পুরুষ-নির্ভরশীল নারীসত্ত্বা নারীকে সকল বস্তুগত নিরাপত্তা দেয়। এই সুবিধা প্রাপ্তি নারীকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণ ও স্বাধীনতার ঝুঁকি গ্রহণে নিরুৎসাহিত করে।

বোভয়ার নারীর এই অপরত্বের ধারণার অবসান কামনা করেছেন এবং আশা করেছেন নারী তার নারীত্বের মিথকে আসনচ্যুত করবে এবং নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করবে।

বোভয়ারের ধ্যানধারণা গ্রহণ করে তা আরো প্রসারিত করেই বৈপ্লবিক নারীবাদীরা তাদের তত্ত্ব প্রণয়ন করেন। ইভা ফিগস তাঁর তত্ত্বে পিতৃতান্ত্রিকতাকে নারীর মর্যাদাহানীর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং নারীর অধীনতার জন্য দায়ী করেছেন। ইভা ফিগস এর মতো কেট মিলেটও পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর মত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে ক্ষমতা হচ্ছে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই ক্ষমতার কারণেই নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য গড়ে ওঠে।

তিনি যুক্তি দেখান পরিবারের কাঠামো রচিত হয় পিতৃতান্ত্রিকতার ভিত্তিতে, আর এই পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তৈরি হয় অর্থনৈতক, সামাজিক ও রাজনৈকিত কাঠামো। রাজনীতির প্রচলিত সংজ্ঞা অস্বীকার করে মিলেট বলেন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও রাজনীতির অস্তিত্ব বোঝা যায়।

 

বৈপ্লবিক নারীবাদীরা পুরুষ কর্তৃক নারীর দেহ নিয়ন্ত্রণের দিকটিকে অধিক গুরুত্ব সহকারে ব্যাখ্যা করেছেন। এই মতবাদ অনুসারে পুরুষরা নারীর দেহকে ও যৌনতাকে ব্যবহার করে আপন স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে।

বৈপ্লবিক নারীবাদী জারমেইন থিয়ার-এর অভিমতে, অসমকামিতা নারীর অধীনতার প্রধান হাতিয়ার। তিনি নারীর প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নারীর স্বাভাবিক নারীত্বের বৈশিষ্ট্যগুলি অনুধাবনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সুলামিথ ফায়ারষ্টোন নারীর প্রজনন ক্ষমতাকে নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য ও নিপীড়নের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

তিনি মার্কসের ঐতিহাসিক জড়বাদের ব্যাখ্যা নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এভাবে দিয়েছেন, “ঐতিহাসিক জড়বাদ হচ্ছে ইতিহাসের গতিধারার ঐ দৃষ্টিভঙ্গি যা সেক্সের দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে সকল ঐতিহাসিক ঘটনার কারণ ও পরিবর্তনের শক্তি অনুসন্ধান করে:

সন্তান পুনরুৎপাদনের জন্য দুটি ভিন্ন জৈবিক শ্রেণিতে সমাজের বিভক্তি এবং এসব শ্রেণির পারস্পরিক সংগ্রামের মধ্যে, এসব সংগ্রামের ফলে সৃষ্ট বিয়ে, প্রজনন ও সন্তান লালনপালনের ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে দৈহিকভাবে পৃথকীকৃত অন্যান্য শ্রেণির (বর্ণ) সংযুক্ত উন্নয়নের মধ্যে; এবং (অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক) শ্রেণীব্যবস্থায় বিকশিত সেক্সভিত্তিক প্রথম শ্রমবিভাজনের মধ্যে।

তিনি মার্কসবাদের অর্থনৈতিক বিপ্লবের বিপরীতে নারীর মুক্তির জন্য জৈবিক বিপ্লবের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অর্জিত সমতা নয় বরং পুরুষতান্ত্রিক প্রজনন ও পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার উচ্ছেদ নারীর অবস্থার পরিবর্তনের পূর্বশর্ত।

 

 

বৈপ্লবিক নারীবাদীরা নারীর হীন অবস্থার ব্যাখ্যায় জেন্ডার এবং সেক্স প্রত্যয়দুটিতে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। বৈপ্লবিক নারীবাদের মতে, নারীকে তার অধস্তন অবস্থা থেকে মুক্ত করতে সর্বপ্রথম প্রয়োজন যৌনতা বিষয়টির পুনঃসংজ্ঞায়ন ও পুনঃনির্মাণ এবং এবিষয়ে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

Leave a Comment