আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ভারতীয় পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
ভারতীয় পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন

ভারতীয় পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন
ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনা সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নয়, আগে থেকে অনুমানের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়। তাদের পরিকল্পনায় অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ভুল-ভ্রান্তি ছিল । তারা ভূ-প্রকৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের লড়াই করার সামর্থ্য বিবেচনায় আনতে ব্যর্থ হয়।
স্থানীয় জনগণের পূর্ণ সমর্থন, স্থানীয় সম্পদের ওপর পূর্ণ আধিপত্য, আমাদের সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য, অনুকূল পরিবেশ এবং সব কিছুতেই শ্রেষ্ঠত্ব থাকায় তারা তাদের লড়াই করার সামর্থ্য এবং দ্রুত বিজয় অর্জনে তাদের সম্ভাবনা সম্পর্কে অতি আশাবাদী হয়ে ওঠে।
তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিকল্পনা ছিল তাদের সামরিক পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়নের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর। ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে সক্ষম হন। তিনি শরণার্থী সমস্যাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন এবং রাশিয়ার সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পশ্চিম রণাঙ্গনে অদূরদর্শীভাবে ভারতের ওপর হামলা শুরু করলে ইন্দিরা গান্ধী প্রকাশ্যে রাশিয়াকে ভারতের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণে সফল হন। রুশরা বিশেষ টহল বিমান, অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে।
ভারতের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দ্বি-জাতি তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করা। ভারতীয়রা তিনটি পর্যায়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাদের তৎপরতা পরিচালনা করে। সেগুলো হচ্ছে :
১. বিদ্রোহ;
২. পরোক্ষ যুদ্ধ এবং
৩. প্রকাশ্য যুদ্ধ।
বিদ্রোহ
আমাদের সৈন্যদের বিশৃঙ্খল ও ক্লান্ত করার লক্ষ্যে ভারতীয়রা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর-এর বিদ্রোহে সমর্থন দেয়। প্রাথমিকভাবে তারা বিদ্রোহ উস্কে দিতে সফল হয়। তবে তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। তাদের পরিকল্পনায় ত্রুটি থাকায় তা ব্যর্থ হয়। তারা আমাদের সামর্থ্য, দৃঢ়তা ও প্রস্তুতিকে অবজ্ঞা করে।
কমান্ড গ্রহণ করার পর আমি ক্ষিপ্র আক্রমণ ও উপর্যুপরি অভিযানের মাধ্যমে বিদ্রোহী ও গেরিলাদের উচ্ছেদ করার নির্দেশ দিই। দুই মাসের মধ্যে আমরা পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত পুনরুদ্ধার এবং বিদ্রোহীদের ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করি। ১৯৭১ সালের মে মাসে আমরা ফিরে আসি স্বাভাবিক অবস্থায়।
পরোক্ষ যুদ্ধ
বিদ্রোহ তৎপরতা ব্যর্থ হওয়ায় ভারতীয়রা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় একটি ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা করে। ওদের একজন জেনারেল মন্তব্য করেন যে, প্রতিটি গেরিলা একজন করে সৈন্য হত্যা করলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে।
ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী বেসামরিক লোকজনের ছদ্মাবরণে বহু নাশকতামূলক তৎপরতা চালিয়েছে এবং রাস্তাঘাট ও রেল যোগাযোগ ধ্বংস করেছে।এ ছাড়া তারা আড়াই হাজার মাইলব্যাপী সীমান্ত বরাবর সীমান্তের ওপার থেকে গোলাবর্ষণ করে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছে এবং ফরমেশন আকারে হামলা চালিয়েছে।
বিলোনিয়ায় এক ব্রিগেড ভারতীয় সৈন্যের হামলা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়। তাদের হামলায় আবার বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। তারা সুশৃঙ্খভাবে হামলা চালালে এবং তাদের অভিযান সুসমন্বিত হলে আমাদের প্রচুর প্রাণহানি ঘটতো। বস্তুত, নভেম্বরের মধ্যে ভারতের পরোক্ষ যুদ্ধ নিঃশেষ হয়ে যায়।
প্রকাশ্য যুদ্ধ
ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে সমন্বিত করা হয়। আমাদের কোনো নৌবাহিনী না থাকায় এবং বিমান বাহিনীর এক স্কোয়াড্রন পুরনো এফ-৮৬ অকেজো হয়ে যাওয়ায় ভারতীয় নৌ ও বিমান বাহিনীর কোনো করণীয় ছিল না।

তবে ভারতীয় নৌ ও বিমান বাহিনী স্থল যুদ্ধে সহায়তা দিয়েছে প্রচুর। এ ছাড়া তাদের বিমান বাহিনী ফেরি, ক্ষুদ্র সেতু ও নৌকা ধ্বংসে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। মূলত এ লড়াই ছিল স্থলযুদ্ধ। এ যুদ্ধে ভারতের ১২টি পদাতিক ডিভিশন অংশগ্রহণ করে।
