আজকে আমদের আলোচনার বিষয় বাঙালি ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৭-৫৮
বাঙালি ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৭-৫৮

বাঙালি ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৭-৫৮
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর একদিকে নতুন রাষ্ট্রে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অনুকূল পরিবেশ পেয়ে অপরদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র কর্তৃক বাঙালিদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে এ অঞ্চলে কতগুলো রাজনৈতিক, ছাত্র ও যুব সংগঠন গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে আদর্শগত অমিল থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানকেন্দ্রিক দলগুলোর উদ্দেশ্য ছিল গণমানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠা।
এসব দলের মধ্যে কোন একটি ছিল পাকিস্তানের দু’অংশে সক্রিয়, কোন কোনটি পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রিক । উল্লেখ্যযোগ্য দল হচ্ছে মুসলিম লীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), কৃষক-শ্রমিক পার্টি (কে.এস.পি.), নিজাম-ই-ইসলামী, জামায়াতে ইসলামী ও কমিউনিস্ট পার্টি।
১৯৪৭-৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের গঠন, নীতি, আদর্শ ও ভূমিকা
মুসলিম লীগ:
উপমহাদেশে মুসলমানদের সবচেয়ে পুরাতন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ। ১৯০৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ হিসেবে এ দলের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর নিখিল ভারত মুসলিম লীগ থেকে পাকিস্তান মুসলিম লীগের জন্ম হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নতুন রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল হওয়ায় চৌধুরী খালেকুজ্জামান পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি পদে আসীন হন।
এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগকে সংগঠিত করার দায়িত্ব দেয়া হয় মাওলানা আকরাম খাঁর ওপর। ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে সভাপতি এবং ইউসুফ আলী চৌধুরীকে (মোহন মিঞা) সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ গঠিত হয়। এছাড়া ২৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি ওয়ার্কিং কমিটিও গর্বিত হয়। মুসলিম লীগ মুসলমানদের সংগঠন।
১৮ বছর বা তদুর্ধ পাকিস্তানের যে কোন মুসলমান নাগরিক এর সদস্য হতে পারতো। আদর্শগতভাবে মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বে অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলমান পৃথক জাতি- এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও মুসলিম লীগ হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য ‘পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা’ বহাল রাখার পক্ষে বেশ কিছুদিন ধরে ছিল। মুসলিম লীগ ছিল ধর্মীয় চেতনাসমৃদ্ধ একটি রক্ষণশীল দল ।
ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের একই পতাকা তলে ঐক্যবদ্ধ করে মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে। এত বড় অবদান সত্ত্বেও পাকিস্তান আন্দোলনের একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজেকে সুনির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি ভিত্তিক আধুনিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন রাষ্ট্রে দ্রুত এর আবেদন সীমিত হয়ে পড়ে।
১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগ মূলত পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগকে এর অঙ্গসংগঠন হিসেবেই মূল্যায়ন করতে থাকে। এ অঞ্চলে দলকে সুসংগঠিত করার তেমন কোন গুরুত্বারোপ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং ১৯৪৯ সালের জুনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে অভ্যন্তরীণ সংকট খোলাখুলিভাবে দেখা দেয় যা ১৯৫১ সালে আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
যার পরিণতিতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের চরম ভরাডুবি ঘটে। মোট কথা, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দল হিসেবে মুসলিম লীগের উল্লেখযোগ্য কোন অবদান দৃষ্টিগোচর হয় না। এমনকি, নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান রচনা করতে দীর্ঘ নয় বছর সময় লাগে। মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দল আওয়ামী মুসলিম লীগ ও রিপাবলিকান পার্টি গড়ে ওঠে।
আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরে আওয়ামী লীগ):
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী সরকারি দল মুসলিম লীগকে কার্যত সুবিধাভোগী সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলেন। লীগে ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের কোন স্থান হলো না। সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি এবং রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সরকারি জুলুম-নির্যাতন বিশেষ করে পূর্ববাংলায় প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করে। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ ছিলেন বাংলা ভাষার বিপক্ষে।
এমনি এক পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদগণ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং পূর্ববাংলার স্বার্থ রক্ষার্থে মুসলিম লীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উপলব্ধিথ করেন এবং তারই পথ ধরে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেন’-এ এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি,
টাঙ্গাইলের শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমানকে অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক এবং ইয়ার মোহাম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। নবগঠিত দলের ১২ দফা কর্মসূচির মধ্যে স্বায়ত্তশাসন, পূর্ববাংলার প্রাদেশিক নির্বাচন, বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দান ও পাটশিল্প জাতীয়করণ প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলটিকে একটি অসাম্প্রদায়িক রূপ দেয়া হয়। এর মূল নেতা নির্বাচিত হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই দলটির কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থকেন্দ্রিক হওয়ায় খুব তাড়াতাড়ি গণমানসে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে ।
মূলনীতি কমিটির বিরোধিতা, ভাষা আন্দোলনে সমর্থন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের শরীক দল হিসেবে এ দল মুসলিম লীগের পরাজয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মূলত আওয়ামী লীগের ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে মুসলিম লীগ বিতাড়িত হয়।
ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র পাওয়ার পর সংখ্যালঘুদের অনেকে এ দলে যোগ দিয়ে এর শক্তি বৃদ্ধি করে। এসব কারণে এদল থেকে প্রভাবশালী নেতা যেমন- ভাসানী, আতাউর রহমান বেরিয়ে গেলেও দলটির শক্তিশালী অবস্থান ছিল।
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ):
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে এ নতুন দলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সমসাময়িক আওয়ামী লীগ নেতা এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সাথে রাজনৈতিক মতবিরোধই এ দল গঠনের প্রধান কারণ। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি তথা পাশ্চাত্য ঘেষা পররাষ্ট্রনীতির কট্টর সমর্থক।
অপরদিকে ভাসানী ছিলেন মার্কিন নীতিবিরোধী জোটনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাসী এবং পূর্ববাংলার জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অনমনীয়। তাই সোহরাওয়ার্দীর সাথে ভাসানীর মতবিরোধ দেখা দেয়। ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে তা প্রকাশ্য রূপ নেয়।
এ বছরই মাওলানা ভাসানী সহ সমমনা ন’জন সদস্য আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। ২৫-২৬ জুলাই ঢাকার ‘রূপমহল সিনেমা হল’-এ নিখিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, খান আবদুল গাফ্ফার খান, জি.এম. সৈয়দ, মাহমুদুল হক ওসমানী প্রমুখ বামপন্থী নেতা উপস্থিত হন।
এ সম্মেলনে মাওলানা ভাসানীকে সভাপতি এবং মাহমুদুল হক ওসমানীকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ’ (ন্যাপ) গঠিত হয়। পূর্ববাংলার কিছু সংখ্যক বামপন্থী কর্মীর উদ্যোগে গঠিত ‘গণতন্ত্রী দল’, পশ্চিম পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল পার্টি’ সহ আরো কতিপয় দল এতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণায় পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে বলা হয়: দেশ রক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রা ব্যতীত সকল বিষয় প্রদেশের কর্তৃত্বে দেয়া হবে। দলের কর্মসূচিতে ভূমি সংস্কার, বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদের অঙ্গীকার করা হয়। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ নীতি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়।
ন্যাপ গঠনের পর বেআইনি ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা-কর্মী এ দলে যোগ দেয়ায় এর শক্তি বৃদ্ধি পায়। পূর্ব পাকিস্তানে ন্যাপ শক্তিশালী হয়। প্রগতিশীল সংগঠনগুলো এ দলে অন্তর্ভুক্ত হয়।
কৃষক-শ্রমিক পার্টি (কেএসপি)
কৃষক-শ্রমিক পার্টি ছিল ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টির নব সংস্করণ। ব্রিটিশ শাসনকালে অবিভক্ত বাংলায় প্রজা আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯২৯ সালে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৩৭ সালে নির্বাচনের পূর্বে ফজলুল হকের নেতৃত্বে তা কৃষক-প্রজা পার্টি নামধারণ করে।
এ দলের সভাপতি হিসেবে ফজলুল হক ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ পূর্বক পর পর দু’ দু’বার কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং নিজে মুখ্যমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হন। অথচ ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে এ দল মাত্র চারটি আসন লাভ করে। এরপর ক্রমশ এ দল নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং দেশ বিভাগের পর এ.কে. ফজলুল হক নিজেকে রাজনীতি থেকে আড়াল করে রাখেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে ফজলুল হক রাজনৈতিক অঙ্গনে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সারা প্রদেশব্যাপী সফর করে তাঁর অনুসারীদের সংগঠিত করে ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই ‘কৃষক-শ্রমিক পার্টি’ গঠন করেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে মুসলিম লীগ থেকে কতিপয় নেতা এসে এ নতুন দলে যোগদান করেন। এদের মধ্যে ইউসুফ আলী চৌধুরী, সৈয়দ আজিজুল হক, আবু হোসেন সরকার ও হামিদুল হক চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার চিফ মিনিস্টার থাকাকালীন কৃষক প্রজার স্বার্থে অনেক অবদান রাখেন। তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবেরও উত্থাপক ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময় ভিন্নমুখী অবস্থান গ্রহণ করলেও ফজলুল হক ছিলেন বাংলা ও বাঙালির স্বার্থের প্রতিনিধি। রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তাঁর নবগঠিত কৃষক-শ্রমিক পার্টিও এ নীতি বা আদর্শে বিশ্বাসী ছিল।
পাকিস্তান রাষ্ট্রে কেএসপি পূর্ববাংলার জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, জনসংখ্যা অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব এবং যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষ নেয়। ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। যদিও ১৯৫৮ সালে এসে এ দলটি আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
নিজাম-ই-ইসলামী:
ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে ১৯৫৩ সালে ‘নিজাম-ই-ইসলাম পার্টি’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এটি ছিল ইসলামপন্থী দল। এর প্রধান ছিলেন মাওলানা আতাহার আলী। কুমিল্লার আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এর সেক্রেটারি জেনারেল। ‘৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরীক দল হিসেবে নিজাম-ই-ইসলামী থেকে ১৯ জন সদস্য পূর্ববাংলার আইন পরিষদে নির্বাচিত হন। এটি অবশ্য তেমন কোন গণভিত্তিক দল ছিল না।
কিন্তু যুক্তফ্রন্টে অন্তর্ভুক্ত থাকায় নির্বাচনে এরূপ সফলতা পেয়েছিল। নির্বাচনের পর এ. কে. ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় এ দল থেকে আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী মন্ত্রী হিসেবে স্থান পান। অচিরেই যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরীক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ফজলুল হকের মতবিরোধ দেখা দিলে নিজাম-ই-ইসলামী তাঁর পক্ষ অবলম্বন করেন এবং বেশ কিছুকাল তাঁর সঙ্গে থাকেন। যদিও ভিন্নভাবে কর্মসূচি না দেয়ায় এ দলটি বিশেষ প্রসার লাভ করেনি।
গণতন্ত্রী দল:
১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে বামপন্থী কর্মীদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে তেভাগা আন্দোলনের প্রখ্যাত কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশকে সভাপতি এবং মাহমুদ আলীকে সাধারণ সম্পাদক করে ‘পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল’ গঠিত হয়। পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ছিল মূলত বামপন্থী কর্মীদের একটি সংঘ বা গ্রুপ।
এরা র্যাডিক্যাল কর্মসূচিতে বিশ্বাসী ছিল। এ দল গঠনের পিছনে কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থন ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের শরীক দল হিসেবে হাজী দানেশ সহ এ দল থেকে কয়েকজন প্রার্থী হন এবং দু’জন বিজয়ী হন।
জামায়াতে ইসলামী:
১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ভারতে মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ গঠিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এর নাম হয় “জমায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ”। ১৯৫১ সালে এ দলের পূর্ব পাকিস্তান শাখা মাওলানা আবদুর রহিমের নেতৃত্বে গঠিত হয়। ১৯৬৯ সালে অধ্যাপক গোলাম আজম পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর নিযুক্ত হন। জামায়াতে ইসলামী একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল।
প্রথমে এটি অখন্ড ভারতীয় মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হলেও পরে দেশ বিভাগকে মেনে নেয় এবং তাদের কর্মকান্ড অব্যাহত রাখে। এটি গণসংগঠন অপেক্ষা ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠনে বিশ্বাসী। কোরান ও সুন্নাহ্র ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন ছিল এ সময়ে এর মূল দাবি। পাকিস্তানের রাজনীতিতে দলটির তৎপরতা প্রথম দশ বছর অপেক্ষা আইয়ুব আমলে অধিকতর সক্রিয় হয়।
পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস:
অমুসলিমদের মধ্যে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস ছিল প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন। ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান ভুক্ত কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের নিয়ে এ দল গঠিত হয়। নতুন রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুর অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট হওয়া ছাড়াও কংগ্রেস বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি, যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে সোচ্চার হয়। পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদে কংগ্রেসই ছিল সরকারিভাবে স্বীকৃত বিরোধী দল।
উল্লেখ্য যে, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতা কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর সাথে বাংলাকেও পরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫২ সালের প্রথম দিকে পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদে এ দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৫।
এদের মধ্যে কামিনীকুমার দত্ত, বসন্ত কুমার দাস, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মনোরঞ্জন ধর, প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী, ড. প্রতাপচন্দ্র গুহ রায়, রাজকুমার চক্রবর্তী সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন ।
গণআজাদী লীগ:
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানভুক্ত পূর্ববাংলায় মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানস্থ মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এক পক্ষে ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন এবং অপর পক্ষে ছিল তাঁর বিরোধী গ্রুপ।
দেশ বিভাগের পর পূর্ববাংলায় খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠন নিশ্চিত হলে বিদ্রোহী গ্রুপ একটি পৃথক রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশ স্বাধীন হবার পূর্বেই (জুলাই মাসে) মুসলিম লীগের বিদ্রোহী গ্রুপ ‘গণআজাদী লীগ’ নামক একটি দল গঠন করে। এর আহ্বায়ক নিযুক্ত হন কামরুদ্দিন আহমদ।
মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আক্রোশ ও ক্রোধের অভিব্যক্তি থেকেই এ সংগঠনের জন্ম। কিন্তু এ সংগঠন বেশিদিন স্থায়ী হতে পারে নি । এর কারণ প্রথমত, আহ্বায়ক কামরুদ্দিন আহমদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা, কারাগার ভীতি ও ত্যাগী মনোভাবের অভাব; দ্বিতীয়ত, সমগ্র দেশে সাম্প্রদায়িক আবহাওয়া; তৃতীয়ত, মুসলিম লীগ সরকারের কঠোর দমননীতি।
ছাত্র সংগঠনের গঠন ও কর্মকান্ড
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (পরে ছাত্রলীগ):
১৯৩৫ সালে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘All Bengal Muslim Student Accosiation’ নামক একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলায় এ সংগঠনটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দলের কল্যাণের প্রতি লক্ষ রেখে বাংলায় মুসলিম ছাত্রদের সংগঠিত করার উদ্দেশে ১৯৩৭ সালে ‘All India Muslim Student Federation’ নামে আরও একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলেন।
ফলে বাংলার মুসলমান ছাত্ররা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লে ১৯৩৮ সালে দু’টি সংগঠনকে একত্রিত করে ‘All Bengal Muslim Student League’ গঠন করা হয়।
ছাত্র ফেডারেশন:
দেশ বিভাগের পর পূর্ববাংলা ছাত্র ফেডারেশনের যে শাখা গঠিত হয় তা গোড়াতেই বেশ দুর্বল ছিল। এই সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত ছিল। এর অধিকাংশ সদস্য ছিল হিন্দু। দেশ বিভাগের পর হিন্দু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা ব্যাপক হারে ভারতে গমন করায় পার্টি ও ছাত্র ফেডারেশন উভয় সংগঠন এখানে দুর্বল এবং অকার্যকর হয়ে পড়ে।
তাছাড়া সরকারের দমননীতির কারণেও ছাত্র ফেডারেশন এখানে স্থায়ী হতে পারেনি। পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালে এ দলের কতিপয় নেতা-কর্মীর উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ইউনিয়ন গঠিত হলে পূর্বের দলটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে ।
ছাত্র এসোসিয়েশন: দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের অঙ্গসংগঠন হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র এসোসিয়েশন’ নামে একটি ছাত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দলের এ নামকরণ করা হয়েছিল। মুসলিম লীগ সরকারের শাসনামলে এ দলের বিকাশ সম্ভবপর হয়নি।
ছাত্রী সংগঠন:
কমিউনিস্ট পার্টির অনুপ্রেরণায় এ সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে ইডেন ও কামরুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের একত্রীকরণের বিরুদ্ধে তীব্র ছাত্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলে এ সংগঠন অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। তবে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের রাজপথে ছাত্রদের সঙ্গে মিছিল করায় এ সংগঠন তৎকালীন সরকার ও সমাজপতিদের তীব্র কটাক্ষের সম্মুখীন হয়। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নানা প্রতিকূলতার জন্য শেষপর্যন্ত এ সংগঠন তার স্থায়িত্ব সমুন্নত রাখতে পারেনি।
যুব সংগঠন ও কর্মকান্ড
পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ (যুবলীগ): ১৯৫১ সালের প্রথম দিকে ছাত্রলীগের নেতা আনোয়ার শহীদ, সোহরাওয়ার্দীর প্রাক্তন প্রাইভেট সেক্রেটারি মাহমুদ নূরুল হুদা, তৎকালীন ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির সেক্রেটারি আবদুর রউফকে পূর্ববাংলার যুবকদের জন্য একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তখন থেকে এ রকম সংগঠন গড়ার তৎপরতা শুরু হয়।
কিছুদিনের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির কিছু কিছু নেতা এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। ১৯৫১ সালের ৬ মার্চ ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে যুব সম্মেলনের ব্যাপারে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন বদিউর রহমান। সভায় যুবলীগের উদ্দেশ্য ইত্যাদি ব্যাখ্যা করেন মোহাম্মদ তোয়াহা। যুবলীগ গঠনের উদ্দেশে যুব সম্মেলনের পরবর্তী তারিখ নির্ধারিত হয় একই বছর ২৭ মার্চ।
কিন্তু এদিন সরকার সম্মেলন পন্ড করার লক্ষে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এ পরিস্থিতিতে স্থান নির্ধারিত হয় বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে জিঞ্জিরায়। সন্ধ্যা ৭টায় সম্মেলন শুরু হয়। তৎকালীন ঢাকার ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার’-এর সম্পাদক আবদুস সালাম সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন নূরুল হুদা। সম্মেলনে যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। মাহমুদ আলী।
সভাপতির অভিভাষণের পর নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সামাদ একটি খসড়া ম্যানিফেস্টো সম্মেলনে পেশ করেন। সামান্য রদবদলের পর প্রথম অধিবেশনে পেশকৃত খসড়া ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। যুবলীগের ঘোষণাপত্রের মূলকথা ছিল-
(ক) যুদ্ধের বিরোধিতা, (খ) পাকিস্তানকে কমনওয়েলথ ত্যাগ, (গ) জাতি-ধর্ম-বর্ণ-রাজনীতি নির্বিশেষে সকলের চাকরির সমানাধিকার, (ঘ) সার্বজনীন ভোটাধিকার, (ঙ) বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু, (চ) যুব সমাজের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ,
(ছ) জনসাধারণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ, (জ) জমিদারী ও জায়গীরদারী প্রথা উচ্ছেদ, (ঝ) শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ, (ঞ) বিদেশী মূলধন বাজেয়াপ্তকরণ ও বড় বড় শিল্পগুলোর জাতীয়করণ।
তৎকালীন রাজনীতিতে ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক সংগঠনের ভূমিকা মূল্যায়ন
পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত্ জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কে.এস.পি. কমিউনিস্ট পার্টি, গণতন্ত্রী দল। আবার ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন ও ছাত্র ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়। যুবলীগও তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদেরকে এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ এবং মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র আদায়ের আন্দোলনে মুসলিম লীগের অবদান অনস্বীকার্য। দেশ বিভাগোত্তর জাতীয় রাজনীতিতে এ দলের ভূমিকা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে এবং ১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ভরাডুবির পর এ অঞ্চলে মুসলিম লীগের ভূমিকা স্তিমিত হয়ে পড়ে।
আওয়ামী মুসলিম লীগ বা আওয়ামী লীগ ছিল সমসাময়িককালে পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দল। এ দল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যুক্তফ্রন্টে আওয়ামী লীগ ছিল প্রধান শরিক দল। পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনাধিকার আদায়, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদানের দাবি সহ আপামর বাঙালির স্বার্থ রক্ষায় এ দল সর্বদাই ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল।
ন্যাপ, কে.এস.পি. ও কমিউনিস্ট পার্টিও সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কমিউনিস্ট পার্টি ‘৫২র ভাষা আন্দোলনে এবং কে.এস.পি. ‘৫৪-র নির্বাচনে উলে-খ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করে। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করা এবং নির্বাচনোত্তর মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে কে.এস.পি. অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
ন্যাপ ভিন্ন আঙ্গিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। পূর্ব পাকিস্তানে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনে ন্যাপ প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে।
সারসংক্ষেপ
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা লগ্নে নতুন রাষ্ট্রে বিবিধ আদর্শের অনুসারী বহুবিধ রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও যুব সংগঠন গড়ে ওঠে। এতে যেমনি ছিল ক্ষমাসীন দলের সমর্থক, তার চেয়ে বেশি ছিল সরকারের নীতি ও আদর্শের বিরোধী দল। দলগুলো কখনো পৃথকভাবে আবার কখনো যৌথভাবে (‘৫৪ সালে) ক্ষমতাসীন দলকে মোকাবেলা করে এবং নির্বাচনে পর্যুদস্ত করে।
তাই ক্ষমতাসীন দল প্রথমাবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্কে উদারনীতি অনুসরণ করলেও পর্যায়ক্রমে নিজেদের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ উপলব্ধি করতে পেরে ১৯৫৭ সালে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং সাথে সাথে ঐসব দলের নেতা-কর্মীদের কারাগারে নিক্ষেপ করে নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করার প্রয়াস নেয়।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। বদরুদ্দীন উমর, পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, ঢাকা, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ১৯৯৫ ।
২। ড. মো: মাহবুবর রহমান, বাংলাদেশের ইতিহাস ঃ ১৯৪৭-৭১, ঢাকা, সময় প্রকাশনী, ১৯৯৯।
৩। আবুল কাশেম (সম্পাদনা), বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক দলিল, ঢাকা, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০০১।
৪। নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস’, প্রফেসর সালাহউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ১৯৪৭-১৯৭১, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৭।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। মুসলিম লীগের গঠন, বিকাশ ও কর্মসূচি (১৯৪৭-৫৮) সংক্ষেপে লিখুন।
২। আওয়ামী লীগের গঠন, বিকাশ ও কর্মসূচি (১৯৪৯-৫৮) বর্ণনা করুন ।
৩। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের গঠন ও কর্মসূচি সংক্ষেপে বর্ণনা করুন।
রচনামূলক প্রশ্ন:
১। ১৯৪৭-৫৮ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের গঠন ও নীতি সংক্ষেপে আলোচনা করুন। তৎকালীন রাজনীতিতে দলগুলোর ভূমিকা মূল্যায়ন করুন ।
