আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় – গৌরবোজ্জ্বল পাঁচ বছর শেখ হাসিনার প্রথম সরকার
১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা দিবসে শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন।মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ হচ্ছেন-

গৌরবোজ্জ্বল পাঁচ বছর শেখ হাসিনার প্রথম সরকার
মন্ত্রিসভাঃ জাতীয় ঐক্যের সরকার
প্রধানমন্ত্রীঃ শেখ হাসিনা
| মন্ত্রীদের নাম | মন্ত্রণালয় |
| ১. আবদুস সামাদ আজাদ | পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| ২. জিল্লুর রহমান | স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয় |
| ৩. এসএএমএস কিবরিয়া | অর্থ মন্ত্রণালয় |
| ৪. এএসএইচকে সাদেক | শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় |
| ৫. আবদুর রাজ্জাক | পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় |
| ৬. লে. জেনারেল (অব.) নুরুদ্দিন খান | বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় |
| ৭. মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম (বীরউত্তম) | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| ৮. মোহাম্মদ নাসিম | ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় |
| ৯. বেগম মতিয়া চৌধুরী | কৃষি, খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় |
| ১০. আনোয়ার হোসেন মঞ্জু | যোগাযোগ মন্ত্রণালয় |
| প্রতিমন্ত্রীদের নাম | মন্ত্রণালয় |
| ১. মোজাম্মেল হোসেন | মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় |
| ২. ওবায়দুল কাদের | যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় |
| ৩. আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার | পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় |
| ৪. ক্ষিতীশ চন্দ্র রায় | মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রনালয় |
| ৫. আলহাজ সৈয়দ আবুল হোসেন | স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় |
| ৬. মাওলানা মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম | ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় |
| ৭. আফছার উদ্দিন আহমদ খান | গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় |
| ৮. অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু | আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় |
২৯ জুন ২ জন মন্ত্রী ও ৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। এরা হলেন-
| মন্ত্রী | মন্ত্রণালয় |
| ১. সালাহউদ্দিন ইউসুফ | স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় |
| ২. আ.স.ম. আবদুর রব | নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় |
| প্রতিমন্ত্রী | মন্ত্রণালয় |
| ১. একে ফয়জুল হক | পাট মন্ত্রণালয় |
| ২. এম এ মান্নান | শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয় |
| ৩. মো. হাজী রাশেদ মোশাররফ | ভুমি মন্ত্রণালয় |
| ৪. অধ্যাপক আৰু সাইয়িদ | তথ্য মন্ত্রণালয় |
জাতীয় পার্টি সরকার গঠনে আওয়ামী লীগকে নিঃশর্ত সমর্থন জানায়। জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং জাসদের আ. স. ম. আবদুর রবকে মন্ত্রিসভার সদস্য করা হয়। ২৩ জুলাই নির্দলীয় ব্যক্তি সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বিএনপিকেও মন্ত্রিসভায় যোগদানের আহ্বান জানান হয়। কিন্তু তারা সায় দেয়নি। এবারই প্রথম একটি নির্বাচিত সরকার তার পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় পুনঃপ্রত্যাবর্তনের ফলে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সূচিত স্বৈরশাসন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ধারার অবসান হয়। শেখ হাসিনার সরকার জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সংসদকে সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোতে মন্ত্রীর বদলে সংসদ সদস্যদের চেয়ারম্যান করা এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি প্রশ্নোত্তর প্রথা চালু প্রকৃতির ভেতর নিয়ে সরকারের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়।
ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর (১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬), পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি সম্পাদন (২ ডিসেম্বর ১৯৯৭) ও সেখানে দুই যুগের ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি-রক্তপাত বন্ধ হয়। আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাজি (১২ নভেম্বর ১৯৯৬) এবং জাতির পিতার হত্যার বিচার প্রভৃতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে।
মাত্র পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ক্ষেত্রে অর্জিত হয় চমকপ্রদ সাফল্য। এই প্রথম দেশ খালো আরনির্ভরশীলতা অর্জন করে। মুদ্রাস্ফীতির হার নেমে আসে ১.৫৯ শতাংশে অথচ পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে পকে যায় ৬ শতাংশ হারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি। জনগণের মাথাপিছু আয় ২৮০ মার্কিন থেকে বেড়ে ৩৮৬ ডলারে উন্নীত হয়।
মানব দারিদ্র্যসূচক ১৯৯৫-৯৬ সালের ৪১.৬ শতাংশ থেকে ২০০১ সালে ৩২ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ৫৮ ৭ বছর থেকে ৬২ বছরে উন্নীত হয়। সাক্ষরতার হার পূর্বতন বিএনপি আমলের ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে আওয়ামী লীগ আমলে ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়। স্থাপিত হয় নতুন নতুন শিল্প-কারখানা ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা। বেড়ে যায় বৈদেশিক বিনিয়োগ। একটি শিল্প সভ্যতার ভিত্তি রচনার শুভ সূচনা হয়।
দারিদ্র্য বিমোচনে দেওয়া হয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম ‘বয়স্ক ভাতা’, ‘বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা ভাতা”, “অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা’, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ ‘গৃহায়ন’, ‘আদর্শ গ্রাম’, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ ‘কর্মসংস্থান ব্যাংক সহ আত্মকর্মসংস্থানমূলক বহুমুখী সৃজনশীল প্রকল্প ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। অতীতের শাসকদের লুটপাট, দুর্নীতি ও অস্থিতিশীলতা এবং এডহক ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার ধারা পরিহার করে শিক্ষানীতি, শিল্পনীতি, কৃষিনীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও জ্বালানিনীতির মতো প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয় দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দান করে আওয়ামী লীগ আমলেই ক্রীড়া ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে খেলার মর্যাদা লাভ করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ লাভ, বাংলাদেশের ডি-৮ গ্রুপের নেতা নির্বাচিত হওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার (১ এপ্রিল ১৯৯৯) ও ফাও-এর ‘সেরেস’ পদক লাভ প্রভৃতির ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ লাভ করে অভূতপূর্ব মর্যাদার আসন।
১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ ছিল স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি। সাড়ম্বরে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালনের আয়োজন করে সরকার। ২৬ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তী নেতা এবং রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত এবং তুরুস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরিলের উপস্থিতিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিখা চিরন্তন প্রজ্বলিত করেন।
১৯৯৭ সালের ৬ ও ৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিল শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত করে। ‘৯৭ সালে গঠিত কমিটি ছিল-
সভাপতি
১. শেখ হাসিনা
সভাপতিমণ্ডলী
২. সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন
৩. আবদুস সামাদ আজাদ
8. আবদুল মান্নান
৫. অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান
৬. বেগম সাজেদা চৌধুরী
৭. আবদুল মমিন
৮ পুলিন দে
৯. আমির হোসেন আমু
১০. আবদুর রাজ্জাক
১১. তোফায়েল আহমেদ
১২. ড. মোহাম্মদ সেলিম
১৩. সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
১৪. মো. আবদুল জলিল
সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
১৫. জিল্লুর রহমান – সাধারণ সম্পাদক
১৬. শামসুর রহমান খান শাহজাহান – যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
১৭. আজিজুর রহমান – যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
১৮. মোজাফফর হোসেন পল্টু – যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
সম্পাদকমণ্ডলী
১৯. মোহাম্মদ নাসিম – সাংগঠনিক সম্পাদক
২০. আবদুল মান্নান – প্রচার সম্পাদক
২১. আবদুল মান্নান খান – দফতর সম্পাদক
২২. বেগম মতিয়া চৌধুরী – কৃষি সম্পাদক
২৩. রহমত উল্লাহ চৌধুরী – শ্রম সম্পাদক
২৪. আতাউর রহমান কায়সার – অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক
২৫. নূরুল ইসলাম নাহিদ – শিক্ষা সম্পাদক
২৬. আকতারুজ্জামান চৌধুরী – শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক
২৭. অধ্যাপক আৰু সাইয়িদ – তথ্য সম্পাদক
২৮. ওবায়দুল কাদের – যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক
২৯. আবুল হাসান চৌধুরী – ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক
৩০. অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন – আইন সম্পাদক
৩১. ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন – স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সম্পাদক
৩২. আলমগীর কুমকুম – সাংস্কৃতিক সম্পাদক
৩৩. এইচ এন আশিকুর রহমান – কোষাধ্যক্ষ
৩৪. নুরুল ফজল বুল্বুল – সহ-প্রচার সম্পাদক
৩৫. সিদ্দিকুর রউফ খান – সহ-প্রচার সম্পাদক
সদস্য
৩৬. সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসি
৩৭. ফজলুল করিম
৩৮. মোহাম্মদ হানিফ
৩৯. আবদুল কাদের সিদ্দিকী
৪০. দেওয়ান ফরিদ গাজী
৪১. ইউনুস আলী অ্যাডভোকেট
৪২. সিদ্দিক হোসেন
৪৩. আবদুল আউয়াল
৪৪. অ্যাডভোকেট এবিএম তালেব আলী
৪৫. মতিউর রহমান তালুকদার
৪৬. ইমাম উদ্দিন আহম্মেদ
৪৭. মো. রহমত আলী
৪৮. সুধাংশু শেখর হালদার
৪৯. রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু
৫০. আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ
৫১. শেখ ফজলুল করিন সেলিম
৫২. এমএ মান্নান
৫৩. বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান
৫৪. ফজলুর রহমান খান অ্যাডভোকেট
৫৫. খ ম জাহাঙ্গীর
৫৬. মির্জা সুলতান রাজা
৫৭. নুরুল মজিদ হুমায়ূন
৫৮. ফুলু সরকার
৫৯. অধ্যাপক ফজলুল হক
৬০. মাহমুদুর রহমান মান্না
৬১. আখতারুজ্জামান
৬২. সুলতান মো. মনসুর আহমেদ
৬৩. নূহ-উল-আলম লেনিন।
মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলে যিনি সভানেত্রী নির্বাচিত হবেন তিনিই পদাধিকারবলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা হবেন ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ও একজন সদস্যের নাম পরে ঘোষণা করা হবে। ১৯৯৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের সুবর্ণজয়ন্তী (৫০ বছর পূর্তি) পালিত হয় জাঁকজমকের সাথে। প্রতিটি বিভাগীয় সদরে বিশাল উৎসব সমাবেশের অনুষ্ঠান করা হয়। ২৩ জুন ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য সুবর্ণজয়ী অনুষ্ঠানমালা। অনুষ্ঠানে ভারত ও নেপালের দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ ৮টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের এই পাঁচ বছরের শাসনামল কুসুমাঞ্জীর্ণ ছিল না। প্রথম থেকেই বিএনপি অসহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে। সরকারের প্রায় প্রতিটি ইতিবাচক পদক্ষেপের তারা বিরোধিতা করে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি, জামাত এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে ও সারাদেশে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
হরতাল, রাজপথ অবরোধ এবং পাহাড়ি-বাঙালি জাতিগত দাঙ্গা বাধানোর ষড়যন্ত্রের ফলে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে বড় ধরনের কোনো ইসু ছাড়াই উপর্যুপরি হরতাল আহ্বান, সন্ত্রাস, বোমাবাজি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করার চেষ্টা করে তারা। জনগণের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে বিএনপির ছত্রছায়ায় ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীগুলো আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিরুদ্ধে উন্মাদনা সৃষ্টি এবং সাম্প্রদায়িক হানাহানি বাধানোর চেষ্টা চালায়।
১৯৯৯ সালের শেষ দিকে বিএনপি দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর জোট গঠনের উদ্যোগ নেয়। ৩০ নভেম্বর ৯৯ বিএনপি, এরশাদের জাতীয় পার্টি (ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টি থেকে মিজান চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্র জাতীয় পার্টি গঠন করেন) জামায়াতে ইসলামি ও ইসলামি ঐক্যজোট শীর্ষ বৈঠক করে ২৪-দফা কর্মসূচি ও অঙ্গীকার ঘোষণা করে।
এই কর্মসূচি সামনে রেখে বিএনপি ও তার সহযোগীরা একের পর এক হরতাল, অবরোধ এবং জ্বালাও-পোড়াও প্রকৃতি ধ্বংসাত্মক তৎপরতা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে। তবে এতসব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত এবং ধ্বংসাত্মক কর্মসূষ্টি সত্ত্বেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করতে সক্ষম হয়।
২০০১ সালের ১৫ জুলাই শেখ হাসিনার সরকার শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতার পর অতিথিরা বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেওয়ার পর মুহূর্তেই বিচারপতি লতিফুর রহমান ১৩ জন জ্যেষ্ঠ সচিবকে তাদের চলতি দায়িত্ব হতে অব্যাহতি নিয়ে বদলি করেন।
লতিফুর রহমান উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের আগেই প্রশাসন ও দেশবাসীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেন। যে, তিনি নিরপেক্ষ নন। কিছু দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে অনেক আগে থেকেই তার সঙ্গে বিএনপি-জামাত জোটের যোগসাজশ ছিল। তাদের ইঙ্গিতে, জোটের জয়লাভে প্রশাসনকে কাজে লাগানোর জন্য আগে থেকেই তিনি হোমওয়ার্ক করে রেখেছিলেন। “বিএনপি-জামাত জোটকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেসব ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপের আশ্রয় গ্রহণ করে, সেগুলো নিম্নরূপ-
ক) সিভিল প্রশাসনকে বিএনপি-জামাতের পরামর্শ মতো সজ্জিত করা:
খ) নির্বাচন কমিশনকে চারদলীয় জোটের পক্ষে ভূমিকা রাখতে সাহায্য করা:
গ) সেনা মোতায়েনসহ সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকাকে পক্ষপাতমূলক করে তোলা এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নামানো
ঘ) চারদলীয় জোটের সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের প্রতি বিরূপ আচরণ প্রদর্শন ও তাকে কোনঠাসা করা:
ঙ) দেশের গুটিকতক এনজিও-কে রাজনৈতিক বিশেষ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব করা:
চ) নির্বাচনের দিন পোলিং ও প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব করা: ২) সরকারের কাজ ও প্রচারে এমন একটা আবহাওয়া সৃষ্টি করা, যাতে আওয়ামী লীগ সরক সাফল্যগুলো ঢাকা পড়ে যায় এবং মনে হয়, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সব কাজই ক্ষতিকর অবৈধ ও ভুল ছিল।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামাতের পরামর্শমতো তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশাসনকে সা ব্যবস্থা করে। ‘হাওয়া ভবনের’ দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ২০ জন জেলা প্রশাসক, ২১ জন এমপি, ৪৫ জন ইউএন ৩৭ জন ওসিকে পছন্দমতো স্থানে নিয়োগ দেওয়া হয়। ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১৪০০ সরক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি হচ্ছে এই যে, নির্বাচনের আগে অতীতের স রীতি-প্রথা ভেঙে প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান ডিসি-এসপিদের সম্মেলন করে ব্যক্তিগতভাবে তাদে ব্রিফিং দেন । এটা ছিল নজিরবিহীন এবং নির্লজ্জ পক্ষপাতমূলক কাজ।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের কিছুদিন আগেই স্পষ্ট হয়ে ১ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়লাভ করতে দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়ের আগে প্রতিটি নির্বাচনী এলা সেনাবাহিনী ও বিডিআর নিয়োগ, দুষ্কৃতি ধরার নামে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি সেনাবাহিনী ও পুলিশের তল্লাসি, গ্রেফতার ও ভয়ভীতি প্রদর্শন চলতে থাকে। পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘুদের ভোট কেন্দ্রে যাওরে। ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন, অনেক জায়গায় হামলা, গ্রেফতার, নির্যাতন পরিচালিত হয়। নির্বাচনের দিন আওয়ামী প্রভাবিত নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনীর তাণ্ডব, বুথ দখল, সিলমারাসহ সম্ভাব্য সকল উপায়ে আওয়ামী লীগে বিজয় ঠেকানোর তৎপরতা চালানো হয়।
পরিণামে ১ অক্টোবরের নির্বাচনে পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিএনপি-জামাত জোট দুই-তৃতীয়াংশ হাস পেয়ে বিজয়ী ঘোষিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন, আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামি ১৯ এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি, মঞ্জুর জাতীয় পার্টি ১টি, নাজিউর রহমানের জাতীয় পার্টি ৪টি এবং ইসলামি ঐক্য জোট ২টি আসন লাভ করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট (বিএনপি-জামাত + জাতীয় পার্টি-নাজিউর+ইসলামি (ঐক্যজোট) সর্বমোট ২১৬টি আসন লাভ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংরক্ষিত ৪২টি মহিলা আসন। অর্থাৎ চারদলীয় জোট ২৫৮টি আসনের অধিকারী হয়।
বিএনপি-জামাত জোটের এই বিজয় নিশ্চিত করার জন্য “তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও চারদলীয় জোট সমঝোতার মাধ্যমে সারাদেশে তাদের সুবিধামতো স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ আসন ও ভোটকেন্দ্রের তালিকা তৈরি করে। এরকম ঝুঁকিপূর্ণ আসনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫৮টিতে। এর মধ্যে ১৪২টিতে তারা নানামাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৩৩টি এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৫৪টি অর্থাৎ ৮৭ টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় মাত্র ৮টি আসন; যদিও ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৫৪টি আসন। আর সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ৫৫টিতে আওয়ামী লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। অর্থাৎ আসন ঝুঁকিপূর্ণ করার ভেতর দিয়েই ষড়যন্ত্রকারীরা দুই-তৃতীয়াংশ আসনের বিজয় ছিনিয়ে নেয়।
ভোট বিশ্লেষণে দেখা যায় ১৯৯৬-এর তুলনায় একমাত্র আওয়ামী লীগেরই ভোট বেড়েছে। আওয়ামী লীগ পেয়েছে মোট প্রদত্ত ভোটের ৩৯.৯৪ শতাংশ, সম্মিলিতভাবে ৪ দল পেয়েছে ৪৬.৪৭ শতাংশ, জাপা (এরশাদ) ৭.২১ শতাংশ এবং অন্য ৫.৫৯ শতাংশ ভোট। ১০ অক্টোবর খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদসহ মন্ত্রিসভা গঠন করেন ।
১ অক্টোবর নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর থেকে সারাদেশে বিএনপি-জামাত জোটের সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চট্টগ্রামে অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরি, রাঙ্গুনিয়ার বৌদ্ধভিক্ষু জ্ঞানজ্যোতি মাহাদেরসহ শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়। বিএনপি-জামাতের তাণ্ডবের ফলে হা হাজার হিন্দু নর-নারী গ্রাম থেকে পালিয়ে যান।
বরিশালের আগৈলঝাড়ার শত শত হিন্দু নর-নারী কোটালীপাড়ার এবং ঢাকার আওয়ামী লীগ অফিসের আশ্রয়কেন্দ্রে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেয়। অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালানো হয় অসংখ্য গ্রামে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বিএনপি-জামাতের দুর্বৃত্তদের ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হন অগণিত নারী নারী-শিশু। সারাদেশে চলে দখল, চাঁদাবাজি এবং নারকীয় সন্ত্রাস।
এই তাণ্ডবের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ দেশবাসীকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয় ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ শীর্ষক কনভেনশন। বাংলাদেশের এই অমানবিক পরিস্থিতি সমগ্র বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ।

আওয়ামী লীগের ওপর নেমে আসা পাশবিক অত্যাচার ও দমন-পীড়ন রুখে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দলীয় সংগঠনকে নতুন উদ্যমে সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিলে শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। কাউন্সিলের ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। নির্বাচিত হয় নতুন নেতৃত্ব। শেখ হাসিনা সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হন মো. আবদুল জলিল এমপি। কাউন্সিলের পর ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি হচ্ছে-
সভাপতি
১. শেখ হাসিনা এমপি
সভাপতিমণ্ডলী
২. সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন ৩. জিল্লুর রহমান এমপি ৪. সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি ৫ আমির হোসেন আমু এমপি ৬. আবদুর রাজ্জাক এমপি ৭. তোফায়েল আহমেদ এমপি ৮ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপি ৯. মতিয়া চৌধুরী এমপি ১০. শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি ১১ ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি ১২. আতাউর রহমান খান কায়সার ১৩ কাজী জাফর উল্লাহ
সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
১৪. মো. আবদুল জলিল এমপি – সাধারণ সম্পাদক
১৫. ওবায়দুল কাদের এমপি – যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
১৬. সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি – যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
১৭. মুকুল বোস – যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
সম্পাদকমণ্ডলী
১৮. সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি – সাংগঠনিক সম্পাদক
১৯. আবদুল মান্নান এমপি – সাংগঠনিক সম্পাদক
২০. মাহমুদুর রহমান মান্না – সাংগঠনিক সম্পাদক
২১. আখতারউজ্জামান – সাংগঠনিক সম্পাদক
২২. সুলতান মো. মনসুর আহমেদ – সাংগঠনিক সম্পাদক
২৩. আবদুর রহমান এমপি – সাংগঠনিক সম্পাদক
২৪. বীর বাহাদুর এমপি – সাংগঠনিক সম্পাদক
২৫. অধ্যাপক আলী আশরাফ এমপি – অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক
২৬. সৈয়দ আবুল হোসেন এমপি – আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক
২৭. অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি – আইন বিষয়ক সম্পাদক
২৮. . ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি – কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক
২৯. নূহ-উল-আলম লেলিন – তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক
৩০. অধ্যাপিকা নাজমা রহমান – ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক
৩১.অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান এমপি – দফতর সম্পাদক
৩২. আলহাজ অ্যাড. শেখ মোহাম্মদ আবদুলাহ – ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক
৩৩. আসাদুজ্জামান নূর এমপি – প্রচার সম্পাদক
৩৪. ড. হাছান মাহমুদ এমপি – বন ও পরিবেশ সম্পাদক
৩৫. স্থপতি ইয়াফেস ওসমান – বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক
৩৬. ডা. দীপু মনি – মহিলা বিষয়ক সম্পাদক
৩৭. ক্যাপ্টেন এবি তাহুল ইসলাম (অব.) এমপি – মুক্তিযোদ্ধা সম্পাদক
৩৮. দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল – যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক
৩৯. নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি – শিক্ষা সম্পাদক
৪০. লে. কর্নেল মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি (অব) – শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক
৪১. হাবিবুর রহমান সিরাজ – শ্রম সম্পাদক
৪২. আলমগীর কুমকুম – সাংস্কৃতিক সম্পাদক
৪৩. ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এমপি – স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সম্পাদক
৪৪. বিএম মোজাম্মেল হক এমপি – উপ-দফতর সম্পাদক
৪৫. অসীম কুমার উকিল – উপ-প্রচার সম্পাদক
৪৬. এইচএন আশিকুর রহমান এমপি কোষাধাক্ষ
সদস্য
৪৭. মোহাম্মদ নাসিম
৪৮. আবুল হাসনাত আবদুলাহ
৪৯. অধ্যাপক আবু সাইয়িদ
৫০. মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম
৫১. আবদুল লতিফ সিদ্দিকী এমপি
৫২. অধ্যাপক মো হানিফ
৫৩. রাজিউদ্দিন আহম্মেদ রাজু এমপি
৫৪. আখম জাহাঙ্গীর হোসাইন
৫৫. কোম মনুজান সুফিয়ান এমপি
৫৬. মির্জা সুলতান রাজা
৫৭. আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এমপি
৫৮. ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি
৫৯. এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী
৬০. তালুকদার আবদুল খালেক
৬১. মোস্তফা রশিদী সুজা
৬২. আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) এফসিএ, এমপি
৬৩. মো একেএম রহমতউলাহ এমপি
৬৪. হাবিবুর রহমান মোল্লা এমপি
৬৫. অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী এমপি
৬৬. হাবিবুর রহমান খান
৬৭. শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু
৬৮. মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার এমপি
৬৯. খায়রুজ্জামান লিটন
৭০. বিপুল ঘোষ
বিএনপি-জামাত জোটের পাঁচ বছরে দুঃশাসনের ফলে দেশ পরিণত হয় মৃত্যু উপত্যকায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট চারদলীয় জোট সরকারের মদতে শেখ হাসিনাকে হত্যার লক্ষ্যে গ্রেনেড হামলায় নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ নিহত হন। সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শাহ এএমএস কিবরিয়া, শ্রমিক নেতা ও সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম ও মমতাজউদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে বিএনপি-জামাত জোট ও তাদের সহযোগী সন্ত্রাসীরা হত্যা করে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ হাজার হাজার আওয়ামী লীগ সমর্থক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজার হাজার নারী ও নারীশিশু হয় ধর্ষণ, গণধর্ষণের শিকার শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, নারী-শিশু, ব্যবসায়ী- কেউই ওই ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পায়নি। জনগণের জীবন হয়ে পড়ে নিরাপত্তাহীন। সরকারি মদতে উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান, গ্রেনেড হামলা, বোমাবাজি এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশ পরিণত হয় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নতুন টার্গেট।
এই সময় জেএমবি নামক জঙ্গি সংগঠন সরকারের ছত্রছায়ায় উত্তরবঙ্গের, বিশেষত বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে বিকল্প প্রশাসন গড়ে তোলে। তারা ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একই সময়ে ৬৩টি জেলায় ৫ শতাধিক জায়গায় বোমা হামলা চালায়। ঝালকাঠিতে হামলা চালিয়ে ২ জন বিচারককে হত্যা করে তারা। চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, নেত্রকোনা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, হবিগঞ্জ প্রভৃতি জায়গায় আদালত, সিনেমা হল, দরগা শরীফ, উদীচী কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বোমা-গ্রেনেড হামলায় অনেক মানুষ নিহত হয়।
সিলেটে শাহজালালের দরগায় ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী গ্রেনেড হামলার শিকার হন। অঙ্গিনেতা ‘বাংলাভাই’ সম্পর্কে বলা হয় এটা মিডিয়ার সৃষ্টি। এই নামে কেউ নেই। যদিও পরবর্তী সময়ে বাংলাভাই ও জেএমবি প্রধান আবদুর রহমানকে তারা গ্রেফতার করতে মাধা হয় । ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায় যে হরকাতুল জেহাদ। তার সঙ্গে হাওয়া ভবন, বিশেষ করে তারেক রহমান প্রতিমন্ত্রী সালাউদ্দিন পিন্টু ও সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা- ডিজিএফআই, এনএসআই’র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িত বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এছাড়া সরকারের উদ্যোগে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের নামে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে ‘অপারেশন ক্লিনহাট অভিযান পরিচালনা করা হয়। অপরাধী ধরার নামে এই অভিযানে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়। ৮৭ দিনের অপারেশন ক্লিনহার্ট’ অভিযানে বিনা বিচারে ৫৮ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। বস্তুত আইনের শাসন ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশকে চিহ্নিত করা হয় অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে।
বিএনপি-জামাত জোটের পাঁচ বছরে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। জোট সরকার ও হাওয়া ভবনের পৃষ্ঠপোষকতায় খাদ্য সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ আমলের তুলনায় দ্রব্যমূল্য ১০০-২০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। মুদ্রাস্ফীতির হার আওয়ামী লীগ আমলে ১.৫৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
পক্ষান্তরে, গড় প্রবৃদ্ধির হার ৫.৬ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৫.১ শতাংশে। পাঁচ বছরে জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি বাড়লেও খাদ্য উৎপাদন আওয়ামী লীগ আমদের ২ কোটি ৬৮ লাখ থেকে কমে। দাঁড়ায় ২ কোটি ৬১ লাখ টন। দারিদ্রা হ্রাসের হার কমে আবার ০.৫০ শতাংশে নেমে আসে। দরিদ্র মানুষের সংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। বিএনপি-জামাত জোটের পাঁচ বছর ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরসহ মোট সাত বছরে নতুন করে দরিদ্র হয় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। বাড়ে ধন-বৈষম্য। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পায়।
বিএনপি-জামাত জোট দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় এলেও, দুর্নীতি-লুটপাট ও দুর্বৃত্তায়নই এ সরকারের নীতি হয়ে দাঁড়ায়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অতি নিকটজনের নেতৃত্বে ১১১ গডফাদারের দৌরাত্মা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য হাওয়া ভবন’কে রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্রে পরিণত করা হয় এবং এটি হয় দেশের সমুদয় দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের প্রসূতিকেন্দ্র।
প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী কালোটাকার অধিকারী হয়ে পড়েন এবং প্রধানমন্ত্রীর ছেলেরা বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত হন। বিএনপি-জামাত জোটের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নেতাকর্মী এবং দলীয় প্রশাসনের অকল্পনীয় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, লুটপাট, চাঁদাবাজি প্রভৃতির কলে টিআইবি পরপর চারবার বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে।
সর্বক্ষেত্রে সরকারের দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে উন্নয়ন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট হয়ে ওঠে অসহনীয়, পাঁচ বছরে জোট সরকার ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারেনি। বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে সৃষ্টি হয় চরম সংকট। বিদ্যুতের দাবি জানাতে গেলে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলার কানসাটে ২০ কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয় । বস্তুত জোট সরকারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নারী উন্নয়নসহ সকল ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয় স্থবিরতা।
জোট সরকার জনপ্রশাসন, পুলিশ বাহিনী সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ রাষ্ট্র ও সরকারের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। শত শত উচ্চপদস্থ বেসামরিক, সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাকে পদচ্যুত, বাধ্যতামূলক অকালীন অবসর প্রদানের পাশাপাশি দলীয় অনুগত অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি প্রদান ও নিয়োগদান করে।
দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগদানের জন্য কর্মকমিশনের প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় দলীয় অনুগত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের চাকরির বয়সসীমা দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়। অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের বিচারপতি নিয়োগ করে সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদা ও মানুষের শেষ ভরসাস্থলটিকে ফং করা হয়।
বিএনপি-জামাত জোট সংসদকে অকার্যকর এবং সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে। সংসদে বিরোধী দলকে কথা বলতে না দেওয়া, স্থায়ী কমিটিগুলোর কর্মকাণ্ডকে স্থবির এবং ব্রুট মেজরিটির জোরে গণতন্ত্র চর্চার সকল পথ রুদ্ধ করে দেয়। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনকে আজ্ঞাবহ দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।
সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায় উপেক্ষা করে ১ কোটি ১৩ লাখ ভুয়া ভোটারসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে ৩ শতাধিক দলীয় ক্যাডারকে নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগদান করে। জনগণের ভোটাধিকার হরণ ও কারচুপিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যার ফলে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
