আমাদের আজকের আলোচনা বিষয়-সংগঠনবিরোধী তৎপরতা। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
সংগঠনবিরোধী তৎপরতা

প্রিয় কাউন্সিলর ভাই ও বোনেরা,
দেশের বর্তমান প্রতি বিপ্লবী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে আমরা যখন বেহু গুণীজনের বিগত ৩০ বছরের বহু ত্যাগ তিতিক্ষা, এদেশের লাখো কোটি রাজনৈতিক সচেতন মানুষের চেতনায় ভাস্বর, লাখো লাখো কর্মীর আবেগ চেতনায় সমৃদ্ধ ।
সর্বোপরি জাতির জনক তাঁর পরিবার পরিজন ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের বুকের রক্তে সিজ আমাদের এই প্রাণপ্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে তার সাংগঠনিক বিপর্যয় কাটিয়ে দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যসমূহকে সংরক্ষণের জন্য আন্দোলনের ডাক দিতে যাচ্ছিলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ কতিপয় লোক সংগঠনের পৃষ্টে ফুরিকাঘাত হানতে উদ্যত হন। আমরা যখন গত ১৫ই আগস্ট জাতির জনকের শাহাদাতবরণের তৃতীয় বার্ষিকী পালনের কর্মসূচী গ্রহণ করি ।
দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় এদিন পালনের জন্য আমাদের ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দিয়ে এর প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি, তখন হঠাৎ করে গত ১১ই আগস্ট জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী সম্পূর্ণরূপে অগঠনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁর বাসভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলন আহ্বান করে, তাতে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন মতাদর্শে অবৈধভাবে গঠিত এক আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষণা করেন।
বন্ধুগণ,
জনাব মিজান রহমান চৌধুরীদের সংগঠনের বিরুদ্ধে এহেন অপতৎপরতা এই প্রথম নয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর আমলে বিভিন্ন অকাজ কুকাজের জন্য বহিষ্কৃত জনাব মিজান চৌধুরী ও জনাব মতিউর রহমানের মত লোকেরা সংগঠনের নেতৃত্ব কুক্ষিগত ও কজাভূত করার জন্য উঠে পড়ে লাগেন।
সে সময় আমাদের অনুপস্থিতিতেই দলের ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জঙ্গী কর্মী বাহিনী তাঁদের সে খায়েশ পূর্ণ করতে দেননি। ১৯৭৬ সালে দলের পুনরুজ্জীবনের পর থেকে গত কাউন্সিল অধিবেশন পর্যন্ত জনাব মিজান চৌধুরী মোট ৬ বার এহেন অপতৎপরতা চালিয়েছেন।
কিন্তু প্রতিবারই দলের শুভানুধ্যায়ী এবং আমাদের সংগঠনের প্রবীণ নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপের ফলে কেবলমাত্র বৃহত্তর সাংগঠনিক ঐক্যের খাতিরে আমরা তাঁদের প্রতি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করি ।
কিন্তু কথায় বলে ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। জনাব মিজান চৌধুরীরা গত কাউন্সিল অধিবেশনের পর আবার নতুন করে তাঁদের সেই অপতৎপরতা চালাতে শুরু করেন। গত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকালে তাঁদের উপর যেসব এলাকা সফরের এবং কর্মীসভা ও জনসভা অনুষ্ঠানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তাঁরা যেসব এলাকায় গমনে বিরত থাকেন।
পরম্ভ কোন কোন ক্ষেত্রে এমন সব বক্তব্যও দিতে থাকেন যা আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সম্পূর্ণ বিরোধী এবং আমাদের বিরুদ্ধবাদীদের সহায়ক। এহেন পরিস্থিতি বিগত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী সংগঠন কর্তৃক দায়িত্ব প্রাপ্ত না হয়েও হঠাৎ আওয়ামী লীগের স্ব-ঘোষিত মুখপাত্র হয়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকার দান করে বলেন যে, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করা নাকি ভুল হয়েছিলো এবং এ ভুলের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
মাননীয় কাউন্সিলরগণ,
“বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করা ভুল হয়েছিল’ এ যে কত বড় ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি, তা আপনারা সহজেই অনুমান করতে পারেন। এ উক্তি দ্বারা সরাসরিভাবে আমাদের মহান নেতা ও শিক্ষক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চিন্তাধারার উপর আঘাত হানা হয়েছে- তাঁকে অবমাননা করা হয়েছে।
তাঁর এহেন উক্তিতে সারাদেশের আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীরা তো বটেই, রাজনৈতিক সচেতন ও প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীও স্তম্ভিত হয়ে যান। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ই জুনের বর্ধিত সভায় জনাব মিজান চৌধুরীর কাছে এ প্রশ্নে ২৩শে এপ্রিলের বর্ধিত সভায় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ সংক্রান্ত দলীয় বক্তব্য চূড়ান্ত করে এক সর্বসম্মত ব্যাখ্যাদাবী করা হলে, তিনি তাঁর বক্তব্যে অনড় থাকেন।
অথচ, আপনারা জানেন যে সংগঠনের গত ২১, ২২ ও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জনগণের সার্বিক মুক্তি অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু যে কার্যক্রম প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছিলো। এই প্রস্তাবে বলা হয়েছিলো যে, “বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় জাতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি, গ্রহণ করেছিলেন, অর্থাৎ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন, তা একটি নির্ভুল ও বাস্তবভিত্তিক সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো।
কিন্তু বর্তমানকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে।” জনাব মিজান চৌধুরী এবং তাঁর সাথীরা তাঁদের আন্তর্জাতিক প্রভুদের এবং এদেশীয় এক অদৃশ্য অস্তে শক্তি ইঙ্গিতে এই সর্বসম্মত প্রস্তাবটিকে লঙ্ঘন করে বক্তব্য দান করতে থাকেন।
এতে সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীরা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রত্যয়ে দুর্জয় হয়ে উঠলে জনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী, অধ্যাপক ইউসু আলী, জনাব শামসুল হক, জনাব সোহরাব হোসেন, জনাব ময়েজুদ্দীন আহমদ, জনাব মোহাম্মদ মুহসিন, কাজী মোজাম্মেল হক প্রমুখ দল থেকে সটকে পড়েন।
বন্ধুগণ সংগঠন থেকে সটকে পড়লেও তাঁরা আসলে আমাদের এই প্রাণপ্রিয় সংগঠন সম্পর্কে বিভ্রাপ্তি সৃষ্টির ধীন উদ্দেশ্যে সকল প্রকারের রীতিনীতি ভঙ্গ করে আমাদের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাম, পতাকা ও বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করতে থাকেন।
কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, “বঙ্গবন্ধুর ছবি পেছনে রেখে যাঁরা বলেন : কুইর শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন ভুল হয়েছিলো” তাঁরা কি আসলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে যুক্তিযুক্ত করে তুলছেন নার কেননা, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরাও সেদিন তাঁর হত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগা গঠনের কথা উল্লেখ করেছিলো।
তাছাড়া, এই তথাকথিত নির্ভেজাল গণতন্ত্রের এই মুখোশধারীদের আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, সার্বভৌম পার্লামেন্টে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠনের যে ঐতিহাসিক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো, উপরোক্ত “ভুল হয়েছিলো” বক্তব্যের দ্বারা তাঁরা সেই পার্লামেন্টকে অবমাননা করছেন না? আর তা কি গনতন্ত্রের প্রতিও অবমাননা নয়?
এতসব কিছু করার পরও তাঁরা ক্ষান্ত হননি। বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপকৌশলের উদ্দেশ্যে তাঁরা আমাদের বিভিন্ন জেলা, থানা এমন কি ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা ও কর্মীর নাম, তাদের কারো সাথে যোগাযোগ না করেই সেই তথাকথিত আহ্বায়ক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকেন।
কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীরা সাথে সাথে তাদের এই অপতৎপরতার প্রতি ধিক্কার জানিয়ে নাম প্রত্যাহার করে নেন এবং প্রতিবাদ জানান। চলতি মাসের ৩রা ও ৪ঠা তারিখে তাঁরা আবার তাঁদের সেই অবৈধ সংগঠনের একটি কাউন্সিল অধিবেশনও অনুষ্ঠান করেন।
কিন্তু আমি অত্যন্ত জোর গলায় বলতে পারি, সেই তথাকথিত কাউন্সিলে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচিত কোন কাউন্সিলরই যোগদান করেন নি। আসলে তাঁদের এই কাউন্সিল ছিলো কাউন্সিলর ছাড়া কাউন্সিল- তাঁদের সংগঠন হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগার ছাড়া আওয়ামী লীগ এবং তাদের সেই তথাকথিত সংগঠনের।
তথাকথিত কমিটি হচ্ছে গঠনতন্ত্রবিহীন সংগঠন ও তার কমিটি। আসলে তাঁদের এসব অপ-তৎপরতা ও বক্তব্য সম্পূর্ণ যে অসার- এটা তাঁরাও জানেন। কিন্তু কথায় বলে, সুতোর টানে পুতুল নাচে- সেই পুতুল নাচের আসরই এখন তাঁরা গুলজার করছেন।
তাই বন্ধুগণ, সংগঠনের গত ১৭ ও ১৮ই আগস্ট অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় আমরা গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রথমে তাঁদের কারণ দর্শাও নোটিশ দান করি এবং ৪ঠা অক্টোবরের সভায় তাঁদের দল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
এই সভাতে জনাব মতিউর রহমান, দেওয়ান ফরিদ গাজী, জনাব সিরাজুল হক, জনাব এ. কে. মুজিবুর রহমান, জনাব আজিজুর রহমান আক্কাস, জনাব আবদুর রউফ, জনাব মোজাফফর হোসেন পল্টু, জনাব খালেদ মোহাম্মদ আলী, সৈয়দ হায়দার আলী ও জনাব মহিউদ্দিন আহমদকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
প্রিয় কাউন্সিলর ভাই ও বোনেরা,
আওয়ামী লীগ থেকে কোন কোন লোকের বেরিয়ে যাওয়া কোন নতুন ঘটনা নয়। সংগ্রামী ঐতিহ্য নিয়ে সংগ্রামের জন্যই যে আওয়ামী লীগের জন্ম সে আওয়ামী লীগ বিগত ৩০ বছরে যখনই কোন সংগ্রামের কর্মসূচী হাতে নিয়েছে, তখনই কিছু কিছু সংগ্রাম বিমুখ সুবিধাবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল লোক এই সংগঠন থেকে চলে গেছে।
১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৭, ১৯৬৪, ১৯৬৬, ১৯৭০-৭১-৭২, ১৯৭৫-৭৬ সালেও বহু লোক আওয়ামী লীগ থেকে চলে গেছে। এবং এঁদের দল থেকে চলে যাওয়ায় দলের কোন ক্ষতি হয়নি বরং ক্ষতি তাদের হয়েছে। আওয়ামী লীগে থেকে একদিন যাঁরা মন্ত্রা পর্যন্ত হতে পেরেছিলেন, দল থেকে বেরিয়ে যাবার পর এঁদের অনেকেই এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।

থেকেও হারিয়ে গেছেন। যারা আছেন, কোনমতে হয়ত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছেন। জনাব মিজান গংও একদিন এই ভাগ্যই বরণ করবেন। পক্ষান্তরে এ জাতীয় রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল ভিন্ন মতাদর্শীরা যখনই দল থেকে বেরিয়ে গেছে, দল তখনই জঞ্জালমুক্ত হয়ে সংগ্রামের পথে এগিয়ে গেছে।
জনাব মিজান গং গেছেন- ইনশাল্লাহ, আমরা এবার আন্দোলন আর সংগ্রামের কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে যাব- বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় জয় আমাদের সুনিশ্চিত।
