১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। সিপাহি বিদ্রোহ বা সৈনিক বিদ্রোহ ১৮৫৭ সালের ১০ মে অধুনা পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরে শুরু হওয়া ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর সিপাহিদের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ। ক্রমশ এই বিদ্রোহ গোটা উত্তর ও মধ্য ভারতে (অধুনা উত্তরপ্রদেশ, বিহার, উত্তর মধ্যপ্রদেশ ও দিল্লি অঞ্চল ) ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ

 

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ

 

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহ ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। ১৭৫৭ খ্রি. পলাশীর প্রান্তরে যে ইংরেজ শাসনের মূলভিত্তি ভারতে প্রোথিত হয়েছিল তা সর্বপ্রথম প্রচন্ডভাবে আলোড়িত হয়েছিল এই সিপাহী বিদ্রোহে। পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে কখনও দ্রুতগতিতে কখনও বা ধীরগতিতে কখনও যুদ্ধের সাহায্যে কখনও কূটনৈতিক চালের দ্বারা সর্বত্র ভারতবর্ষের ওপর ব্রিটিশ প্রভুত্ব এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন ভারতবাসীর চিরাচরিত জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, প্রশাসনিক প্রভৃতি কারণে ক্রমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সকল শ্রেণীর ভারতবাসীর মধ্যে বিক্ষোভ দেখা দেয়।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের পূর্ববর্তী একশত বৎসরে বহু সংখ্যক বিদ্রোহ এবং গণঅভ্যুত্থান প্রধানত আঞ্চলিক ভিত্তিতেই সংঘটিত হয়েছিল বলেই ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে সেগুলো দমন করা সম্ভবপর হয়েছিল।

এই বিদ্রোহগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হল, সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ (১৭৭২), চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৯৯), বেরিলির বিদ্রোহ (১৮১৬), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), ফরায়েজি ও ওয়াহাবি বিদ্রোহ এবং বৃটিশ সৈন্যবাহিনীভুক্ত ভারতীয় সিপাহীদের একাধিক বিদ্রোহ।

 

সিপাহী বিদ্রোহের কারণ

সিপাহী বিদ্রোহের কারণ সম্বন্ধে সমসাময়িক ইংরেজদের মধ্যেও মতবিরোধ ছিল। স্যার জন লরেন্স একে সামরিক বিদ্রোহ হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল কার্তুজ সংক্রান্ত বিষয়। কিন্তু লর্ড সালসবেরির মতে, এইরূপ একটি ব্যাপক ও শক্তিশালী বিদ্রোহ কেবলমাত্র কার্তুজের ঘটনা থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল তা বিশ্বাস করা কঠিন।

অপরদিকে জেমস্ আউট্রাস একে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং এর মূল উদ্দেশ্য ভারত থেকে ইংরেজ শাসনের অবসান বলে মনে করতেন। তাঁর নিকট এটি ছিল হিন্দুদের সহযোগিতায় মুসলমানদের ষড়যন্ত্র। পরবর্তীকালেও অনেক সময় চর্বি মাখানো কার্তুজের বিষয়কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে এই বিদ্রোহকে গুরুত্বহীন করবার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ সম্বন্ধে বহু ঐতিহাসিক বিবরণ লিখিত হয়েছে।

ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পূর্ববর্তীকালে যে সকল বিবরণ লিখিত হয় সেগুলো প্রধানত ব্রিটিশ শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুসরণ করায় পরাজিতদের পক্ষ সমর্থন করে সমসাময়িক কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। এ কারণে এই অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য এবং গুরুত্ব কি তা আমাদের অনুধাবন করা বিশেষ কষ্টসাধ্য। কিন্তু এ সত্ত্বেও নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সিপাহী বিদ্রোহের মূল কারণ বহু গভীরে প্রোথিত ছিল।

এর সঙ্গে ভারতে ইংরেজ শাসনের চরিত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। প্রধানত রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, শাসনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক এবং সামরিক কারণের সমন্বয়ে এই বিদ্রোহের উদ্ভব হয়েছিল ও তা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল।

 

সিপাহী বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণ

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রধানত লর্ড ডালহৌসির অনুসৃত সাম্রাজ্যবাদী নীতি ভারতবর্ষের রাজন্যবর্গের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। তাঁর স্বত্ববিলোপ নীতি সমগ্র ভারতেই তুমুল বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। এই নীতির মধ্য দিয়ে ডালহৌসি যে নির্লজ্জ পররাজ্য লোলুপতার পরিচয় দিয়েছিলেন তাতে দেশীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব তীব্রতা লাভ করেছিল।

সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গিয়ে লর্ড ডালহৌসি ভারতীয়দের চিরাচরিত প্রথা ও সংস্কারকে কোন মর্যাদা দেননি। পেশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও- এর দত্তকপুত্ৰ নানা সাহেবকে বৃত্তিদান বন্ধ করে দেওয়ায় হিন্দুদের মধ্যে আক্রোশের সৃষ্টি হয়েছিল।

কুশাসনের অভিযোগে যখন ডালহৌসি অযোধ্যা রাজ্যটি গ্রাস করেন এবং দিল্লির মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহকে তাঁর পূর্বপুরুষদের রাজপ্রাসাদ লালকেল্লা থেকে বহিষ্কার করেন তখন মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। ডালহৌসির নীতি শুধুমাত্র রাজন্যবর্গকেই অসন্তুষ্ট করেনি, তাঁর অনুসৃত নীতির ফলে রাজানুগৃহীত কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং শঙ্কার ভাব সৃষ্ট হয়।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায় যে, অযোধ্যার ওপর প্রত্যক্ষ ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার পর যে রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় তাতে পূর্বতন তালুকদার ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীসমূহ বিপদের সম্মুখীন হয় এবং তাদের অসংখ্য অনুচর চরম দুর্দশায় পড়ে। বোম্বাই অঞ্চলে ইনাম কমিশন এর কার্যকলাপে প্রায় বিশ হাজার ভূস্বামী জমির অধিকারচ্যুত হন।

ফলে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের প্রায় সর্বত্র জনসাধারণের মনে বৃটিশ রাজস্ব সম্বন্ধে বিদ্বেষ, বিতৃষ্ণা ও বিক্ষোভ বৃদ্ধি পেতে থাকে। স্থানীয় কর্মচারী, স্থানীয় শাসকের সৈন্যবাহিনী প্রত্যেকেই ব্রিটিশ শাসকের উগ্রনীতিতে আশঙ্কিত হয়ে পড়ে। এক কথায় উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলমান সকলের মধ্যে এক বিচিত্র শঙ্কা, ভীতি এবং বিদ্বেষভাব সৃষ্টি হতে থাকে ।

 

সিপাহী বিদ্রোহের সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ

উল্লেখিত রাজনৈতিক আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক ও ধর্মীয় আশঙ্কা। ব্রিটিশ শাসনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের যে সকল সামাজিক কুপ্রথা দূর করা হয়েছিল তা রক্ষণশীল হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। স্বধর্মনাশ ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের ফলে তাদের মধ্যে একটা ভীতির সঞ্চার হয়েছিল।

সতীদাহ নিবারণ, বিধবা-বিবাহ প্রবর্তন, গঙ্গাসাগরে সন্তান নিক্ষেপ বেআইনী ঘোষণা, হিন্দু ধর্মত্যাগীদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার প্রথাকে নিষিদ্ধকরণ প্রভৃতি সামাজিক সংস্কার, রেলপথ নির্মাণ, টেলিগ্রাফের প্রবর্তন, দেশীয় শিক্ষার পরিবর্তে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন প্রভৃতি আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এদেশের জনসাধারণের মধ্যে এই ধারণাই বদ্ধমূল হয় যে, ইংরেজরা এদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনে বদ্ধপরিকর।

স্বভাবতই তারা এতে ভীত হয়ে পড়ে। এছাড়া এই সময়ে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকরা ভারতীয়দের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্যে সক্রিয় নীতি গ্রহণ করতে থাকেন। সুতরাং ভারতীয়রা স্বভাবতই ইংরেজদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সন্বিগ্ধ ও আশঙ্কিত হয়ে পড়ে। এছাড়া দেশীয় রাজন্যবর্গ তাঁদের পূর্ব ক্ষমতা ও প্রাধান্য হারালে দেশীয় শিল্পী ও কারিগরগণ তাদের জীবিকা অর্জনের সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হতে থাকে ।

এমনকি দেশীয় রাজন্যবর্গের অনুগৃহীত পন্ডিত ও মৌলভিগণ সরকারি অর্থানুকূল্য থেকে বঞ্চিত হন। ফলে অর্থনৈতিক কারণে এই দুই শ্রেণী ব্রিটিশ শাসনের চরম শত্রু হয়ে ওঠে এবং বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইংরেজ কর্মচারীদের ঔদ্ধত্য ও উচ্চপদ থেকে এদেশীয়দের বঞ্চিত করায় এদেশীয়দের মনোগত বিক্ষোভ ।

 

সিপাহী বিদ্রোহের শাসন সংক্রান্ত ও অর্থনৈতিক কারণ

ভারতে বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার ফলে এদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের ওপর নিদারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্ট হয়।ভারতীয় অভিজাত সম্প্রদায় তাদের পূর্বতন প্রভাব ও মর্যাদা হারায়।নতুন শাসনব্যবস্থায় তাঁদের উচ্চপদ লাভের সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়। কেননা সকল সরকারি উচ্চপদ একমাত্র ইউরোপীয়দের জন্যে নির্দিষ্ট রাখা হয়।

যদিও ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের কোম্পানির সনদে উচ্চপদে ভারতীয়দের নিয়োগের নীতি গৃহীত হয়েছিল, তথাপি তা কার্যে পরিণত করা হয়নি। সামরিক বিভাগেও উচ্চপদ লাভের কোন সম্ভাবনা ছিল না। একজন ভারতীয়ের পক্ষে মাসিক ৬০ থেকে ৭০ টাকা বেতনের সুবাদারের পদ লাভই যথেষ্ট মনে করা হতো। বেসামরিক বিভাগে সর্বাপেক্ষা উচ্চপদ যা একজন ভারতীয়ের পক্ষে লাভ করা সম্ভব ছিল তা হল সদর আমিনের পদ।

নতুন শাসনব্যবস্থায় এদেশীয়দের পদোন্নতির সম্ভাবনা প্রায় ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত সংক্রান্ত অর্থনৈতিক নীতি ভারতীয় শিল্প ও বাণিজ্যকে বিপর্যস্ত করে তোলে। কোম্পানি তার বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা ভারতীয় হস্তশিল্পকে বিলুপ্ত করে এবং ভারতের সকল উৎপাদনকেই বিদেশী শোষণের বস্তুতে পরিণত করে।

ভারতের শিল্পোৎপাদন ধ্বংস হবার ফলে কৃষি এবং ভূমির ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ে। কৃষির অগ্রগতির সম্ভাবনা রুদ্ধ হয়ে যায় এবং এতে দেশের দারিদ্র্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

 

সিপাহী বিদ্রোহের সামরিক কারণ

এভাবে যখন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে তীব্র আশঙ্কার মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল তখন সামরিক বাহিনীর অসন্তোষই বিদ্রোহের দাবানল সৃষ্টি করে। সিপাহীদের অসন্তোষ এই বিদ্রোহের একটি প্রধান ও প্রত্যক্ষ কারণ। ভারতে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠায় ভারতীয় সিপাহীদের অবদান ছিল অপরিসীম। ভারতীয় সিপাহীদের মধ্যে বহু ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল। এই সৈন্যবাহিনীকে বহু দূরবর্তী অঞ্চলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হতো।

এই সেনাবাহিনীর মধ্যে ইংরেজ ও ভারতীয়দের সংখ্যায় বিরাট তারতম্য ছিল। যদি সামরিক বাহিনীতে ইউরোপীয়দের সংখ্যা অধিক হতো তাহলে হয়তো অসন্তোষ এরূপ তীব্র আকার ধারণ করতো না। এছাড়া সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মানুবর্তিতাও শিথিল হয়ে পড়েছিল। এই বিদ্রোহী বাহিনীর মধ্যে উত্তর ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দু সৈনিকদের সংখ্যাই ছিল অধিক। তারা সমুদ্র যাত্রাকে অশাস্ত্রীয় কাজ বলে মনে করতো।

হিন্দুদের সমুদ্রযাত্রার প্রতি এই আপত্তি অগ্রাহ্য করে ১৮৫৬ খ্রি. লর্ড ক্যানিং ‘General Services Enlistment Act’ নামে একটি আইন প্রবর্তন করেন এবং এর দ্বারা সিপাহীদের যে কোন স্থানে যুদ্ধ করতে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তাছাড়া সিপাহীদের অসন্তোষের একটি প্রধান কারণ ছিল তাদের স্বল্প বেতন।সিপাহীদের বেতন বৃদ্ধির দাবি বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।

সর্বশেষে ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ভারতীয় সিপাহীদের প্রতি দুর্ব্যবহার তাদের মনে তীব্র ইংরেজ বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করেছিল। এই অবস্থায় একটি বিশেষ গুজব দেশের সর্বত্রই বিস্তৃত হয় যে, পলাশীর যুদ্ধের একশত বৎসর পরে ভারতে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটবে। এই বিশ্বাস সিপাহীদের মধ্যে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

 

সিপাহী বিদ্রোহের বিস্তার ও দমন

সিপাহীদের বিদ্রোহ ব্যারাকপুর থেকে দিল্লিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহী সিপাহীগণ দিল্লিতে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের সম্রাট বলে ঘোষণা দেয়। অতপর ক্রমে ফিরোজপুর, মুজাফফরনগর, পাঞ্জাব, নৌসেরা, হতমদান, অযোধ্যা, মথুরা, লক্ষ্ণৌ, মোরাদাবাদ, আজমগড়, কানপুর, এলাহাবাদ, ফৈজাবাদ, ফতেপুর, ফতেহগড়, বাংলা, বিহার প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহ বিস্তৃতি লাভ করে।

স্থানে স্থানে কিছু কিছু জনসাধারণ, সম্পত্তিচ্যুত তালুকদার, নির্যাতিত কৃষক এই বিদ্রোহে যোগদান করে। কানপুরের নানাসাহেব, তাঁতিয়া তোপী, আজিম উল্লাহ, জগদীশপুরের রাজপুত দলপতি কুনওয়ার সিং, ফৈজাবাদের মৌলভী আহমদ উল্লাহ, ঝাঁসির রাণী এই বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ইংরেজরা চরম নৃশংসতার মধ্য দিয়ে এই বিদ্রোহ দমন করে।

মাত্র চার মাস যুদ্ধ করে ইংরেজগণ দিল্লি পুনরুদ্ধার করে; বৃটিশ শাসক বৃদ্ধ বাহাদুর শাহকে যুদ্ধ অপরাধী বলে দক্ষিণ বার্মার মান্দালয়ে নির্বাসিত করে। তিনি সেখানে ১৮৬২ খ্রি. ৮৭ বৎসর বয়সে মারা যান।

 

সিপাহী বিদ্রোহের ফলাফল

সিপাহী বিদ্রোহের ফলাফল সম্পর্কে স্যার লেপেন গ্রিফিন মন্তব্য করেছেন, “The revolt of 1857 swept the Indian sky clear of many clouds.” প্রকৃতপক্ষে এই বিদ্রোহের ফলে বহু অনিশ্চয়তার অবসান এবং ভারতের শাসন ব্যবস্থার বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল।

মহাবিদ্রোহ ভারতের রাষ্ট্র পরিচালকদের শাসননীতির ক্ষেত্রকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। ইংরেজ শাসকগণ এ যাবত অনুসৃত শাসননীতির মৌলিক ব্যর্থতা উপলব্ধি করেছিলেন এবং শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করতে এগিয়ে আসেন। কোম্পানির ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি ভারতের জনসাধারণের স্বার্থের পরিপন্থী বিবেচনা করে ব্রিটেনের কর্তৃপক্ষ ভারতের শাসনভার একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে রাখতে স্বীকৃত হলেন না।

ফলে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইন পাশ করে ভারত সাম্রাজ্যের শাসনভার ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার হাতে অর্পণ করে। ফলে ভারতে ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রত্যক্ষ শাসন প্রবর্তিত হয়। বোর্ড অব কন্ট্রোলের পরিবর্তে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের মধ্য থেকে একজনকে ভারত সচিবের পদে নিযুক্ত করা হয়।

তিনি ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত একটি কাউন্সিলের সাহায্যে ভারত সাম্রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনা করবেন- এরূপ সিদ্ধান্ত হয়। ভারতের গভর্নর জেনারেল ‘ভাইসরয় বা রাজপ্রতিনিধি নামে পরিচিত হন। ‘গভর্নর জেনারেল’ লর্ড ক্যানিং প্রথম ‘ভাইসরয় বা রাজপ্রতিনিধি পদে নিযুক্ত হন। এই ক্ষমতা হস্তান্তর করাকে কানিংহাম ‘বাস্তব পরিবর্তন অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক মাত্র’ বলে বর্ণনা করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে ১৭৮৪ খ্রি. পিটের ভারত আইন লিপিবদ্ধ হওয়ার সময় থেকে ভারত সম্পর্কিত সকল ক্ষমতা বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল এবং ডাইরেক্টর সভার ক্ষমতা ও দায়িত্ব বহুক্ষেত্রে হ্রাস করা হয়েছিল। দেশীয় রাজ্যগুলোর আনুগত্য লাভের উদ্দেশ্যে এবং একে চিরস্থায়িত্ব প্রদানের আশায় লর্ড ডালহৌসি প্রবর্তিত স্বত্ববিলোপ নীতি পরিত্যক্ত হয় এবং দেশের চিরাচরিত রীতিগুলোকে লঙ্ঘন করা হবে না বলে উল্লেখ করা হয়।

দেশীয় রাজাদের এই বলে আশ্বাস দেয়া হয় যে, ব্রিটিশ সরকার আর রাজ্য বিস্তার করবেন না। তাদের সঙ্গে যেসব সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেগুলো বলবৎ থাকবে এবং সকল বিষয়ে তাদের অধিকার ও মান মর্যাদা রক্ষা করা হবে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের অভ্যুত্থান সংঘটনে ব্রিটিশ শাসকদের প্রবর্তিত কয়েকটি সংস্কারের দায়িত্ব রয়েছে মনে করে বিদ্রোহের পর থেকে কর্তৃপক্ষ সমাজ সংস্কার বিষয়ে সতর্ক হয়। ভারতের সামাজিক রীতিনীতি ও ধর্মীয় ব্যাপারে সরকার হস্তক্ষেপ করবেন না বলে আশ্বাস দেয়া হয় ।
মহারাণীর ঘোষণাপত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, একমাত্র ব্রিটিশ নাগরিক ও প্রজাদের হত্যাকান্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ ভিন্ন অপর সকলকে শাস্তিদান থেকে নিষ্কৃতি দেয়া হবে এবং জাতিধর্ম নির্বিশেষে যোগ্যতানুযায়ী ভারতবাসীকে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত করা হবে। ঘোষণাপত্রের এই আশ্বাস বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য ১৮৬১ খ্রি. ভারতীয় সিভিল সার্ভিস আইন পাশ করা হয়।

ভারতীয় সামরিক বিভাগ পুনর্গঠিত করা হয়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে সিপাহীদের ভূমিকা প্রধান ছিল বিবেচনা করে ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ নীতি (Divide and rule) অবলম্বন করে প্রেসিডেন্সি সেনাবাহিনীকে পৃথক করে রাখা হয়, ইউরোপীয় সৈন্যসংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি করা হয়, গোলন্দাজ বাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয় এবং সীমান্ত রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার দায়িত্ব ইউরোপীয় সামরিক কর্মচারীদের ওপর অর্পণ করা হয়।

ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত কয়েকটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে বেশি সংখ্যায় সৈন্য নিয়োগ করা শুরু হয়। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয়করণ নীতি ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের কাউন্সিল আইন দ্বারা পরিত্যক্ত হয় এবং বোম্বাই ও মাদ্রাজ কাউন্সিলকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রত্যর্পিত হয়। এই নতুন কাউন্সিল আইন দ্বারা ভারতের নতুন আইনসভা গঠিত হয়।

নতুন আইন সভায় পাতিয়ালার মহারাজা, বেনারসের রাজা ও স্যার দীনকর রাওকে বেসরকারি সভ্যরূপে গ্রহণ করা হয়।
বিদ্রোহের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেয়া হয় এবং তাঁর পুত্র ও পৌত্রগণকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ‘১৮৭৬ খ্রি. রাজনকীয় অধিকার’ আইন ইংল্যান্ডের মহারাণী ভিক্টোরিয়াকে ‘ভারত সম্রাজ্ঞী’ আখ্যা দেয়া হয়। এইভাবে ইতিহাস খ্যাত মুঘল বংশের অবসান ঘটে।

বিদ্রোহ দমনের পর ভারতের সামাজিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। হিন্দুগণ পাশ্চাত্য সাহিত্য এবং বিজ্ঞান সর্বান্তকরণে গ্রহণ করে আধুনিকতার পথে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু ভারতীয় মুসলমানগণ তীব্র ইংরেজ বিরোধী মনোভাব গ্রহণ করে এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতা সর্বোতভাবে বর্জন করে পিছিয়ে পড়তে থাকে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে যেমন একটি যুগের পরিসমাপ্তি তেমনই একটি নতুন যুগের আবির্ভাবের সুযোগ হয়।

ব্রিটিশ শাসকগণ তখন থেকে ভারতের অভ্যন্তরে সাম্রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি করা অপেক্ষা অর্থনৈতিক শোষণের প্রতি অধিকতর দৃষ্টি দিতে থাকেন। ভারতের সামন্ততান্ত্রিক শক্তির নিকট থেকে যে বিরোধিতার আশঙ্কা এতদিন পর্যন্ত ছিল তার অবসান হয়। তখন থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে এক নতুন আন্দোলনের সম্মুখীন হতে হয়।

এই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজ। নব উদ্ভূত মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রথম পর্যায়ে বৃটিশ সরকারের চরিত্র পরিবর্তন করে তাকে ভারতের স্বার্থের উপযোগী করে তুলতে সচেষ্ট হয়।

 

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সারসংক্ষেপ

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহ বিগত একশত বৎসরে ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকার কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা ও অনুসৃত নীতির প্রতি ভারতীয় জনগণের চরম অসন্তোষের ফল। রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শাসন সংক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক, সামরিক কারণে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। ঔপনিবেশিক শাসন তথা শোষণ, বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবার আশায় সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভিতকে কঠোরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

বৃটিশদের কূটকৌশল, সিপাহীদের সুষ্ঠু সামরিক সংগঠন, পরিকল্পনাহীন বিদ্রোহ ও অস্ত্র-শস্ত্রের অভাব এবং ইংরেজদের সামরিক সংগঠনের দক্ষতা, সর্বোপরি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের অভাবে এই বিপ্লব ব্যর্থ হয়। বিপ্লবের ফলস্বরূপ ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ভারতের শাসনভার সরাসরি বৃটেনের রাণীর অধিকারে চলে যায়।

পার্লামেন্টে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত কাউন্সিল ভারতের শাসনভার পরিচালনা করবে। এসঙ্গে স্বত্ববিলোপ নীতির বিলুপ্তি ঘোষণা, ইউরোপীয় সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি, ভারতীয়দের উচ্চ রাজপদে নিয়োগ দান প্রভৃতি সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়। ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটে।

 

সহায়ক গ্ৰন্থপঞ্জী :

১। রতন লাল চক্রবর্তী, সিপাহী যুদ্ধ ও বাংলাদেশ, ঢাকা ।

২। এ.কে.এম. আবদুল আলীম, ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস, ঢাকা

 

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। সিপাহী বিদ্রোহের রাজনৈতিক কারণের ওপর একটি টীকা লিখুন।

২। সিপাহী বিদ্রোহের অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করুন।

৩। সিপাহী বিদ্রোহের সামরিক কারণসমূহ উল্লেখ করুন ।

৪। পরিকল্পনাহীন বিদ্রোহ সিপাহী বিদ্রোহের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ— স্বপক্ষে যুক্তি দিন।

 

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা করুন।

২। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের স্বরূপ উল্লেখপূর্বক এর ব্যর্থতার কারণ বর্ণনা করুন।

৩। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের বিস্তার ও দমনের বিশেষ উল্লেখপূর্বক এর ফলাফল বর্ণনা করুন ।

Leave a Comment