জাতীয় সম্মেলন ২০১২ উদ্বোধনী ভাষণ শেখ হাসিনা এমপি

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় – জাতীয় সম্মেলন ২০১২ উদ্বোধনী ভাষণ শেখ হাসিনা এমপি। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

জাতীয় সম্মেলন ২০১২ উদ্বোধনী ভাষণ শেখ হাসিনা এমপি

 

জাতীয় সম্মেলন ২০১২ উদ্বোধনী ভাষণ শেখ হাসিনা এমপি

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলে আগত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট, সম্মানিত কূটনীতিকবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক বন্ধুরা, উপস্থিত সুধিমণ্ডলী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আগত আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মী ভাই ও বোনেরা,

আস্‌সালামু আলাইকুম।

বাঙালি জাতির বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মদান, তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং সাত কোটি বাঙালির অপরিসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর আমরা অর্জন করি চূড়ান্ত বিজয়, স্বাধীন বাংলাদেশ। বিজয়ের এই মাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে উপস্থিত সবাইকে জানাচ্ছি বিজয়ের শুভেচ্ছা, ইংরেজি নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা। বক্তব্যের শুরুতেই গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে গণমানুষের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট কালরাতে ঘাতকের নির্মম বুলেটে নিহত জাতির পিতার সহধর্মিণী, রামার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর পুত্র, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধকালীন বীর সেনা কর্মকর্তা শেখ কামাল, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, জাতির জনকের কনিষ্ঠ পুত্র শিশু শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর দুই নবপরিণীতা পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, কৃষক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণি, তার স্ত্রী বেগম আরজু মণি, ছোট্ট শিশু সুকান্ত বাবু, আরিফ এবং আব্দুল নঈম খান রিন্টুকে।

স্মরণ করছি শহীদ বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জামিলকে যিনি বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।

স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় নিহত চার জাতীয় নেতা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে যারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জন করেছিলেন।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদান আর তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন স্বদেশ। আজকের এ কাউন্সিল অধিবেশনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাদের অবদানকে স্মরণ করছি। গভীর সহমর্মিতা জানাচ্ছি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি যারা বয়ে বেড়াচ্ছেন স্বজন হারানোর বেদনা।

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের এই দীর্ঘ পদযাত্রায় অসংখ্য নেতা-কর্মী জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়ে, ঘাম-শ্রম ও মেধা দিয়ে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করেছেন। তাদের সবার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সকল শহীদদের। স্মরণ করছি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শহীদ আইভি রহমানসহ ২২ নেতা-কর্মীকে।

সমবেদনা জানাচ্ছি আহতদের প্রতি যারা অনেকেই এখন পঙ্গুত্বের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। স্মরণ করছি সাবেক অর্থমন্ত্রী এসএএমএস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার এমপি, সাবেক এমপি মমতাজউদ্দিনসহ বিএনপি-জামাত জোটের দুঃশাসনে নিহত ২১ হাজার নেতা-কর্মীকে।

স্মরণ করছি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জননেতা আব্দুর রাজ্জাক, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জনাব এমএ মান্নান, আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়ামের সদস্য জনাব আতাউর রহমান খান কায়সার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জনাব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এমপি, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক জনাব আলমগীর কুমকুম, টাঙ্গাইল-৩ আসনের এমপি ডা. মতিউর রহমান, নেত্রকোনার সাবেক এমপি জালালউদ্দিন তালুকদার, বগুড়ার আওয়ামী লীগ নেতা ফেরদৌস জামান মুকুল, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান লাবলুসহ সকল প্রয়াত নেতা-কর্মীকে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেটবৃন্দ,

বিগত ২০০৯ সালের ২৪ জুলাইয়ের ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিলের মাধ্যমে আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। আমরা চেষ্টা করেছি জনতার সংগঠন আওয়ামী লীগকে আরও গণমুখী ও মজবুত করতে, জনগণের কল্যাণে গৃহীত আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে।

এই তিন বছরে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে, মোকাবিলা করতে হয়েছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টিকারী সেই দুর্নীতিবাজ অপশক্তিকে যারা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায়, জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার হরণ করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে।

সারাদেশের অগণিত নেতা-কর্মী এই আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে আমাদের পাশে ছিলেন। আমরা লড়াই করেছি মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনাকে ধারণ করে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। আজকের এই কাউন্সিলের মাধ্যমে আপনারা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন যারা আগামী তিন বছরের জন্য আমাদের এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগের পক্ষে, মহাজোটের পক্ষে, নৌকার পক্ষে বিপুল ম্যান্ডেট দেয়। এই রায়ের মাধ্যমে আমাদের প্রতি মানুষ বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটারদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে।

২০২১ সাল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। ২০২০ সাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে আমরা নির্বাচনী ইশতেহারে ভিশন ২০২১ ঘোষণা করেছিলাম।

আমরা বলেছিলাম, ভোটারদের রায় পেলে আমরা একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলব। যেখানে প্রতিটি মানুষ স্বচ্ছল এবং সুন্দর জীবন পাবে। বলেছিলাম, ২০২১ সালের মধ্যে আমরা এমন একটি উন্নত দেশ গড়ে তুলতে চাই- যেখানে থাকবে না ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অশিক্ষার অন্ধকার।

জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আপনাদের প্রিয় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম প্রহর থেকেই আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আগামী ৬ জানুয়ারি

১৯তম জাতীয় সম্মেলন 2012

সরকার পরিচালনায় আমাদের চার বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। আজ আমরা বলতে পারি, জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিটি ওয়াদা আমরা বিশ্বস্ততার সাথে পালন করার চেষ্টা করেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগঠন, আপনাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ জাতির সামনে দিনবদলের অঙ্গীকার করেছিল।

আজ আনন্দের সাথে বলতে পারি, দুর্নীতি, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও অশিক্ষার অন্ধকারকে পেছনে ফেলে শিক্ষা, শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও আলোকিত আগামীর পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভোটার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তাদের ভোটের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। তাদের আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ।

প্রিয় নেতা-কর্মী ভাই ও বোনেরা,

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অবকাঠামো ছিল না। সমস্ত দেশকে পাকিস্তানিরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। ব্যাংকে কোনো বৈদেশিক রিজার্ভ ছিল না, কারেন্সি নোট ছিল না। অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব ছিল বিধ্বস্ত।

বঙ্গবন্ধু দ্রুততার সাথে যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিজ-কালভার্ট-সড়ক-রেলপথ, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাইন অপসারণ করে বন্দর দুটিকে ব্যবহার উপযোগী করেছিলেন।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এক কোটিরও অধিক শরণার্থীর পুনর্বাসনের মতো দুরূহ কাজ সম্পাদন করেছিলেন। তিন মাসের মধ্যে মিত্রবাহিনীকে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা।

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধুই একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। স্বাধীনতার দশ মাসের মধ্যে জাতিকে সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন যা আজও সারা পৃথিবীতে একটি শ্রেষ্ঠ লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আসছে।

বঙ্গবন্ধুর সরকারই দেশে একটি সার্বজনীন ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতি দিয়েছিলেন। প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত মেয়েদের জন্য শিক্ষা অবৈতনিক করেছিলেন। মাদ্রাসা বোর্ড গঠন করে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মদ-জুয়া-হাউজি-ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ করে যুবসমাজের অবক্ষয় রোধ করেছিলেন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে অর্ডিন্যান্স জারি করে। ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইন করেছিলেন। যে সমস্ত স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা হত্যা-ধর্ষণ- লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের সাথে জড়িত ছিল তাদের বিচার শুরু হয়েছিল। গোলাম আযমসহ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের অনেকেরই নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল। ১১ হাজারেরও বেশি যুদ্ধাপরাধী কারাগারে আটক ছিল। ধর্মভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়েই বাংলাদেশ জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ও ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু স্বাধীনতা দেননি। ১৯৭৪ সালে সমুদ্রসীমা নির্ধারণেরও উদ্যোগ নেন। টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম আইন করেছিলেন।

তখন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আর কেউ এ আইন করেনি। এমনকি জাতিসংঘ ১৯৮২ সালে এ আইন করে। জাতির পিতার সেই দূরদর্শিতার ধারাবাহিকতায় এবার আমরা আন্তর্জাতিক সমুদ্র ট্রাইব্যুনালে জিতে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সরকারই ভারতের সাথে স্থল সীমান্ত প্রটোকল স্বাক্ষর করে অপদখলীয় জায়গা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিল।

যমুনা নদীর সেতু নির্মাণের জন্য জাপান সরকারের অনুদান সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জাপান সফরের সময়ে। জাতির পিতার অবিসংবাদিত নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল তখনই দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ধ্বংস করার চেষ্টা হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে।

বন্দুকের নল দিয়ে রাতের অন্ধকারে ক্ষমতা দখল করে সেনাছাউনিতে বসে দলছুট রাজনীতিবিদদের নিয়ে দল গঠনের যে অশুভ সংস্কৃতি সেনাশাসক জিয়া শুরু করেছিল, তা দীর্ঘ ২১ বছর জাতির ওপরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। জিয়া থেকে শুরু করে এ সময়ের প্রতিটি সরকারের একমাত্র কাজ ছিল জনগণকে শোষণ করে অবৈধ সম্পদ কুক্ষিগত করা, মানুষের অধিকার হরণ করা, রাজনীতিকে কলুষিত করা।

এই অন্ধকারের ২১ বছরে পরিকল্পিত উপায়ে আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাস ও তরুণ প্রজন্মকে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে। এই স্বৈরশাসকেরা দেশকে নব্য পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা করেছে।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি জারি করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করেছে, বিদেশে মিশনে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করেছে। যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে এবং স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকে মন্ত্রী বানিয়ে জিয়া প্রমাণ করেছে, সে কখনোই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। জিয়ার সময়েই কারাগার থেকে ১১ হাজার স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে তার স্ত্রী বর্তমানের বিএনপি নেত্রী সরকার গঠন করে যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে উপহার দেয় লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা জাতীয় পতাকা। বঙ্গবন্ধুর খুনি রশীদ ও হুদাকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনে এমপি বানিয়ে তিনি প্রমাণ করেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সাথে তার আত্মার আত্মীয়তা এবং এই ষড়যন্ত্রের সাথে তারা জড়িত।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

আপনারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি গত বিএনপি-জামাত জোটের দুঃসহ নির্যাতনের সেই বিভীষিকাময় দুঃসময়ের কথা। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে প্রতিহিংসার কালো অধ্যায় হিসেবে চিরদিন লেখা থাকবে।

২০০১ সালে কারচুপির নির্বাচনে জনগণের ভোট কেড়ে নিয়ে বিএনপি-জামাত জোট রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। নির্বাচনের রাত থেকেই শুরু করে আওয়ামী লীগ নিধন অভিযান। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা- কর্মীদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।

শুধুমাত্র নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে ভোলার চর অন্নদা প্রসাদ গ্রামে এক রাতে শতাধিক নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। গফরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীর ভিটাবাড়ি কেটে পুকুর বানানো হয়। বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, বরিশাল, নড়াইল, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ সারাদেশে হত্যা, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, দখল, মামলা, হামলা ও নির্যাতন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতাকে ব্যবহার করেছে দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ লালনের উদ্দেশে। তাদের অপকর্মের কারণে বাংলাদেশ বারবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হয়েও বিএনপি নেত্রী জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছেন। তার ছেলেরা আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতিবাজ ও অর্থপাচারকারী হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছে।

আমেরিকা, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার আদালতে এদের দুর্নীতির বিচার হয়েছে। সিঙ্গাপুরের আদালতের নির্দেশে সে দেশের সরকার বিএনপি নেত্রীর ছোট ছেলের পাচার করা অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করেছে। এরপরেও তিনি যখন বলেন, তার ছেলেরা সৎ জীবনযাপন করত তখন সততার নতুন কোনো সংজ্ঞা আবিষ্কার হয়েছে কি-না মানুষ তা জানতে চায়।

প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সার্ভিস কমিশন এমনকি সর্বোচ্চ আদালতও বিএনপি-জামাত জোটের দলীয়করণের শিকার হয়েছিল। হাওয়া ভবনের সিন্ডিকেট লুটপাটের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য জনগণের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের সরকার যে চাল রেখে গিয়েছিল ১০ টাকা কেজি, তা মানুষ ৪০ টাকা কেজি দরে খেতে বাধ্য হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই ছিল বিএনপি-জামাতের একমাত্র নীতি। সাবেক অর্থমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এসএএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজউদ্দিন, খুলনার আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জুরুল ইমামসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে।

বগুড়ায় মসজিদে কোরআন তেলাওয়াতরত অবস্থায় কৃষক লীগ নেতা আজমকে হত্যা করেছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমতে আমি প্রাণে বেঁচে গেলেও জীবন দিতে হয়।

আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২২ নেতা-কর্মীকে। পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। তাদের অনেককেই সারাজীবন পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে চলতে হবে। আজ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল খালেদা জিয়ার এক উপমন্ত্রী, যার এক ভাই জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জেহাদের নেতা।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক দল। জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা এ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আমাদের বিশ্বাস ছিল, জনগণ যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের রায় প্রদান করতে পারে তবে তারা বিএনপি-জামাত জোটের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, দলীয়করণের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দেবে। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট জানত, তারা এত বেশি অন্যায় করেছে, জনগণকে এতটাই প্রতারিত করেছে যে, অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে কোনো অবস্থাতেই জনগণ তাদের পক্ষে রায় দেবে না।

সে কারণেই তারা জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। ভোটার তালিকায় ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার অপচেষ্টা করে।

জনগণ এই নীল নকশা মেনে নেয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দলীয়করণের বিরুদ্ধে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। জনগণের আন্দোলনকে দমন করতে বিএনপি-জামাত আশ্রয় নেয় হত্যা, সন্ত্রাস ও দমননীতির। বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীরা ঢাকায় প্রকাশ্য রাজপথে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে।

জামাতের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পুলিশের ছত্রছায়ায় আন্দোলনকারী জনতার ওপর হামলা চালায়। প্রকাশ্যে নির্দেশ দেয়- “বৃষ্টির মতো গুলি কর, মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী”। নিরস্ত্র জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। আন্দোলনের চাপে কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে।

বিএনপি-জামাতের রাষ্ট্রপতি মরহুম ইয়াজউদ্দিন আহমদ সংবিধান লঙ্ঘন করে নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়ে কারচুপির নির্বাচন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা বারবার পদত্যাগ করেন। ফলে জাতীয় সংকট সৃষ্টি হয়।

একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্রপতি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন, নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল বাতিল করেন। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে। ছবিসহ ভোটার লিস্ট এবং আইডি কার্ড করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশে যাতে গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার না আসতে পারে সেজন্য ষড়যন্ত্র শুরু করল। শুরু হলো দল ভাঙা-গড়ার খেলা। যারা কোনোদিন জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসতে পারবে না অথচ ক্ষমতা দখলের লোভ আছে ষোলআনা সেইসব লোকদের ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করা হলো।

দুর্নীতিবাজদের ধরার নামে কোনো নিয়মনীতি না মেনে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ গ্রেফতার, হয়রানি ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অনৈতিক কাজ শুরু হলো। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা তথাকথিত সুশীল সমাজের কেউই এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি। কিন্তু আমি বলেছি।

সে কারণেই অসুস্থ পুত্রবধূ ও সন্তান-সম্ভবা কন্যাকে দেখতে বিদেশ যাওয়ার পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হলো। আমি দেশে ফিরে এসে মিথ্যা মামলার মোকাবিলা করতে চাইলাম। তারা আসতে বাধা দিল। মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা থাকার পরেও আমি দেশে আসার পদক্ষেপ নেই।

তারা চেষ্টা করল বিএনপি নেত্রীকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার। তিনিও বিদেশ চলে যেতে রাজি হলেন। আমি বললাম- কেউ যদি অপরাধ করে দেশের মাটিতেই তার বিচার হবে। জোর করে কাউকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া আমি সমর্থন করি না।

আমি আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে আসার জন্য রওনা হলাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত এয়ারলাইন্সকে জানিয়ে দেওয়া হলো যাতে আমাকে নিয়ে ঢাকায় না আসে। ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন এলাম। লন্ডন থেকে ঢাকার উদ্দেশে প্লেনে উঠতে দেওয়া হলো না।

আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করলাম। প্রবাসী বাঙালি, আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আপনারা, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহ আমার দেশে ফেরার পক্ষে জনমত গঠন করলেন। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা।

আমি মুসলমান। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া আমি আর কারও কাছে মাথা নত করিনি, করব না। তাই সকল হুমকিকে উপেক্ষা করে আমি দেশে ফিরে এলাম। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই বিনা ওয়ারেন্টে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। বাসা তল্লাশি করে সব কাগজপত্র নিয়ে যায়। এমনকি ড. ওয়াজেদ মিয়াকেও লাঞ্ছিত করে। সেদিন থেকেই তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যান।

আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়। নির্জন সাব-জ্বেলে মাসের পর মাস বন্দী রাখা হয়। বিশেষ আদালতে অনেক মামলা চালু করলেও আমাকে আমার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি।

রোদ-ঝড়-বৃষ্টি ও নিরাপত্তা বাহিনীর হুমকিকে উপেক্ষা করে দিনের পর দিন সাব-জেল ও আদালতের সামনে উপস্থিত থেকে অনেকেই আমাকে মনোবল ও সাহস যুগিয়েছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আমার মুক্তির দাবিতে স্বাক্ষর অভিযান পরিচালিত হয়।

জরুরি অবস্থাকে উপেক্ষা করে শুধু ঢাকা শহরে ২৫ লাখ মানুষ আমার মুক্তির দাবিতে স্বাক্ষর করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তীব্র আন্দোলনের সূচনা

করেন । গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। তাদের এই বলিষ্ঠ ভূমিকা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়। আমি তাদের জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ। বন্দী অবস্থায় আমি দল-মত নির্বিশেষে বাঙালি জাতির যে আস্থা ও বিশ্বাস পেয়েছি তার জন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

২০০৮ সালের ২৬ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় ষড়যন্ত্রকারীদের ভয়- ভীতি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন তাতে জাতি উপলব্ধি করতে পেরেছে, একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে। আপনাদের সাহসী ভূমিকা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে সম্ভবপর করেছে।

জনগণ ফিরে পেয়েছে তাদের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলতে চাই। আজ যখন বিরোধীদলীয় নেত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বায়না ধরেন তখন তিনি কি ভুলে যান। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে কীভাবে দেশ থেকে বের করে দিতে চেয়েছিল?

তিনি কি ভুলে গেছেন তার ছেলেদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস? তার বড় ছেলের মুচলেকা দিয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর কথা? তার দলের সিংহভাগ নেতা- কর্মীর দল ভেঙে আরেক দল গঠনের কথা? তার এত শখের তত্ত্বাবধায়ক এলে যে তার পুনরাবৃত্তি হবে না তার গ্যারান্টি কি?

প্রিয় কাউন্সিলার এবং ডেলিগেট ভাই ও বোনেরা,

আমরা সরকার গঠনের পর থেকেই নানা ধরনের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার ৫১ দিনের মাথায় বিডিআর সদর দফতরে নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ৫৮ সেনা কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষসহ ৭৩ জনকে হত্যা করা হয়।

আমি তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। এই ঘটনাকে পুঁজি করে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। যখন বিরোধী দলের উচিত ছিল সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া তখন তারা চেষ্টা করেছে দেশকে অস্থিতিশীল করতে।

জনগণের সমর্থন নিয়ে আমরা এই রক্তক্ষয়ী সমস্যার সমাধান করেছি, যা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। বিদ্রোহের সাথে জড়িতদের বিচার সমাপ্ত হয়েছে। হত্যাকারীদের বিচারকাজ চলছে। ১৮ হাজার আসামির বিচারকাজ আমরা দক্ষতার সাথে করে যাচ্ছি।

আমরা যখন সরকার গঠন করি তখন দুনিয়াজুড়ে চলছে বিশ্বমন্দা। তারপরেও অর্থনীতির চাকাকে আমরা সচল রেখেছি। সরকার গঠন করার সময় চালের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও আমরা তা ২৬ থেকে ২৮ টাকায় কমিয়ে এনেছি।

জনগণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এখন মাথাপিছু আয় ৬৬০ থেকে বেড়ে ৮৫৮ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন বেড়েছে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ১ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা হয়েছে।

শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ১৭৫ টাকা হয়েছে। ক্ষেতমজুর যেখানে ১০০ টাকা দৈনিক মজুরি পেত তা আজ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। মজুরির টাকায় চাল কিনতে পারত আড়াই থেকে ৩ কেজি। এখন কিনতে পারে ৮ থেকে ১০ কেজি।

দারিদ্র্যের হার ৪০ থেকে ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের ৫ কোটি মানুষ নিম্ন আয়ের স্তর থেকে মধ্য আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি আজ বাংলাদেশ। প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬.৫ শতাংশ।

সরকার গঠনের সময়ে রিজার্ভ ছিল ৫.৭৮ বিলিয়ন ডলার। এখন ১২.৪ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। চার বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে আমরা বিদেশে কর্মসংস্থান দিতে পেরেছি। তারই সুফল হিসেবে বর্তমান অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স দাঁড়াবে ১৪ বিলিয়ন। ডলারের বেশি। প্রবাসীদের এই অবদানকে সম্মান জানিয়ে আমাদের সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে।

সরকার গঠনের পর বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৪১ শতাংশ। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর চার বছরে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ হাজার ৮১৫ মিলিয়ন ডলার। চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও এ বছর আমাদের রপ্তানির পরিমাণ ২৪.৩ বিলিয়ন ডলার।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ায় শিল্পোৎপাদন বেড়েছে ১০ শতাংশ। আমরা সরকারি খাতে সাড়ে চার লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করতে পেরেছি। বেসরকারি খাত মিলিয়ে আরও ৮০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ৬ লাখ বেকার যুবককে প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ন্যাশন্যাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রাম, বরগুনা ও গোপালগঞ্জ জেলার ৫৫ হাজার ২৫৪ যুবকের অস্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো জেলাকে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে যুবকদের বিনা জামানতে ১ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে সারাদেশে ছিল বিদ্যুতের জন্য হাহাকার।

বিএনপি-জামাতের পাঁচ বছর ও তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরে এক মেগাওয়াট উৎপাদন বাড়েনি। ২০০১ সালে আমরা ৪,৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন রেখে এসেছিলাম। সাত বছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩,২৬৮ মেগাওয়াটে।

চার বছরের পরিশ্রমে আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। গ্যাস উৎপাদন ও বিতরণ খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। ফলে দৈনিক ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন আধুনিক ড্রিলিং রিগ ও একটি ওয়ার্কওভার রিগ ক্রয় করে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

আমাদের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। সরকার এই অঙ্গীকার পূরণে অনেকটাই সফল হয়েছে। খাদ্য গুদামগুলোতে রেকর্ড ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। সারাদেশে ২ লাখ ১৯ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, জিআর, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির পরিধি ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছি। উপকারভোগীর সংখ্যা ৩ কোটি থেকে ৪ কোটি ১৭ লাখে উন্নীত হয়েছে। স্বল্পআয়ের মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে ৭৭ লাখ পরিবারের মধ্যে ফেয়ার প্রাইস কার্ড বিতরণ হয়েছে। মঙ্গার জনপদ উত্তরবঙ্গে আজ মানুষ দু’বেলা পেটভরে খেতে পাচ্ছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কৃষক-শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কাজ করে।

সে কারণেই সরকার গঠনের পর আমরা দেশে প্রথমবারের মতো ১ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড দিয়েছি। ১ কোটি কৃষক ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ পেয়েছেন। আমরাই প্রথম এ দেশে বর্গাচাষিদের বিনা জামানতে ঋণ দিচ্ছি। বিএনপি সরকারের আমলে সার চাওয়ার অপরাধে ১৯ কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

আমরা সরকারে এসে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সারের দাম কমিয়েছি। নন-ইউরিয়া সারের দাম তিন দফা কমানো হয়েছে। ৮০ টাকা কেজি টিএসপির বর্তমান মূল্য ২২ টাকা। এমওপির দাম ছিল ৭০ টাকা, এখন ১৫ টাকা। ডিএপির কেজি ৯০ থেকে কমিয়ে ২৭ টাকা করা হয়েছে। কৃষক আজ সময়মতো সার পাচ্ছে। ১৪ লাখ কৃষককে বিনামূল্যে সার দেওয়া হয়েছে। সার, বিদ্যুৎ ও ডিজেলে কৃষককে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আমরাই সর্বপ্রথম বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও দুস্থ নারী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করি। এবার সরকার গঠনের পর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও উপকারভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ভাতাভোগীর সংখ্যা ১ লাখ থেকে দেড় লাখে উন্নীত করা হয়েছে। মাতৃকালীন ভাতাভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১ হাজার ২০০ জনে উন্নীত করা হয়েছে।

বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা আজ ২৪ লাখ ৭৫ হাজার। ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় সাড়ে ৭ লাখ নারীকে মাসিক ৩০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ভিজিএফ কার্ড সংখ্যা ৭০ লাখ ৬৭ হাজার থেকে ১ কোটি ৭৬ হাজারে উন্নীত হয়েছে। ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে গৃহীত ‘ঘরে ফেরা’ কর্মসূচি বিএনপি-জামাত জোট সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল।

আবারও এই কর্মসূচি চালু হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচির আওতায় ১০ লাখ ৩৮ হাজার পরিবার সরাসরি সুফলভোগী। ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ এর মাধ্যমে দুই দফায় মোট ১ লাখ ৯ হাজার পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ২০১৪ সালের মধ্যে দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করা। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৯৯.৬৪ শতাংশ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে।

সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য প্রায় ৬৩ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৭৮ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এ বছর মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল ছাত্র-ছাত্রীকে বছরের প্রথম দিনেই বিনামূল্যে ২২ কোটি ১৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩৮৩টি পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারির প্রথম দিনে প্রায় ২৭ কোটি বই বিনামূল্যে দেওয়া হবে।

সাড়ে চার হাজার সরকারি ও রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ইতিহাস বিকৃতি রোধ করতে পাঠ্যপুস্তকে জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ণ করা হয়েছে। ভর্তি সংকট সমাধানে ঢাকায় ১১টি মাধ্যমিক স্কুল ও ৬টি কলেজ নির্মাণের কাজ চলছে। ১০০টি মাদ্রাসায় ভোকেশনাল কোর্স ও ৩১টি মাদ্রাসায় গুটি করে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে।

ঢাকায় ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৬টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় ও মেরি একাডেমি স্থাপন করেছি। আরও সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ চলছে।

উপজেলা সেবাকেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিদ্যালয় পর্যায়ে ৩ হাজার ৪৭টি আইসিটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০ হাজার ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু ও ১০৬টি পাঠ্যপুস্তককে ই-বুকে রূপান্তরিত করে ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রমের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা দিতে সরকার ১ হাজার কোটি টাকার শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

বিগত নির্বাচনের আগে আমরা সবার জন্য বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছিলাম। সরকার গঠনের পর স্বাস্থ্যসেবায় আমরা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছি। ইতোমধ্যে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক পুনরায় চালু করেছি, যা বিএনপি-জামাত জোট সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল।

১৩৬টি ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। ২০০টির নির্মাণকাজ চলছে। ২৭২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সবগুলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ৩১ থেকে ৫০-এ উন্নীত করার কাজ চলছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আধুনিকায়ন ও বার্ন ইউনিটে আইসিইউ চালু করা হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইএনটি এবং হেড-নেক ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো- সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কুর্মিটোলায় ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ চালু করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্স-এ পরিণত হয়েছে।

গোপালগঞ্জে শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। খুলনায় বিএনপি-জামাত আমলে বন্ধ হওয়া শেখ নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু হয়েছে। পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুমৃত্যুর হার কমে এখন প্রতিহাজারে ৫৩ জন। মাতৃমৃত্যুর হার কমে এখন প্রতিলাখে ১৯৪-এ নেমে এসেছে।

আমাদের গড় আয়ু বেড়ে ৬৯ বছর হয়েছে। ৫টি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ১০টি ইনস্টিটিউট নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। চট্টগ্রামে নার্সিং কলেজ স্থাপিত হয়েছে। মানিকগঞ্জে একটি নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণাধীন। আরও ৬টি নতুন নার্সিং কলেজ ও ১৫টি নার্সিং ইনস্টিটিউটকে নার্সিং কলেজে উন্নীত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।

এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৭০০ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২০১০-এ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে জাতীয় পর্যায়ে শিশুমৃত্যুর হ্রাস সংক্রান্ত এমডিজি-৪ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ জাতিসংঘ এমডিজি পুরস্কার লাভ করেছে।

স্বাস্থ্য খাতের গুণগত উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বীকৃতি হিসেবে আমাকে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন, সাউথ সাউথ নিউজ ও জাতিসংঘের আফ্রিকা সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কমিশন ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড ২০১১’ প্রদান করে।

 

প্রিয় সহযোদ্ধাগণ,

আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর যোগাযোগ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। চার বছরে ২১টি বৃহৎ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে তিস্তা সেতু, দপদপিয়ায় আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু, ঢাকার বসিলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু, টঙ্গীতে শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু, শীতলক্ষ্যার ওপর সুলতানা কামাল সেতু, কর্ণফুলী নদীর ওপর শাহ আমানত সেতু, চট্টগ্রাম বন্দর উড়াল সেতু, হালুয়াঘাটে ভোগাই সেতু,

বিরিশিরি-শ্যামগঞ্জ সড়কে সোমেশ্বরী, শুকনাকুড়ি ও জারিয়া সেতু, নেত্রকোনা-কলমাকান্দা সড়কে দসাদার ও কলমাকান্দা সেতু, হাজীরহাট- গঙ্গাচড়া সড়কে লাঙলের হাট সেতু, রংপুর-পার্বতীপুর সড়কে যমুনেশ্বরী সেতু, বান্দরবান সাভু নদীর ওপর রুমা সেতু ও থানচি সেতু, মাদারীপুরে শেখপাড়া সেতু, পিরোজপুরে নাজিরপুর সেতু, গৌরনদীতে পয়সারহাট সেতু, জামালপুরে ব্রহ্মপুত্র সেতু ও পাইকগাছা-কয়রা সড়কে শিবসা সেতু ও কয়রা সেতু।

মাদারীপুরে আড়িয়াল খাঁ নদীর ওপর সাত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। রাজধানীর যানজট নিরসনে বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। গত ২৭ ডিসেম্বর বনানী রেলক্রসিংয়ে ওভারপাস ও সংযোগ সড়ক উদ্বোধন করেছি। মিরপুর-বিমানবন্দর সড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ, রংপুর বিভাগীয় সড়ক, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক, নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ঢাকার যানজট নিরসনে ৭৮৪টি নতুন বাস আমদানি করা হয়েছে।

রাজধানীতে ১৪টি স্কুলবাস ও ১০টি মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। বিগত সবগুলো সরকার গণমানুষের পরিবহন রেলওয়েকে উপেক্ষা করেছে। কিন্তু আমরা রেলওয়েকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। ৩০০টি রেল ব্রিজ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ সমাপ্ত হয়েছে।

৮৬টি রেলওয়ে স্টেশন পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ৯টি লোকোমেটিভ ও ৫৫টি ওয়াগন সংগ্রহ এবং ৪৫টি লোকোমোটিভ ও ২৭৭টি ওয়াগন সংস্কার করা হয়েছে। আমরা সরকার গঠনের পর এ পর্যন্ত ৪৫টি নতুন ট্রেন চালু করেছি। বিভিন্ন রুটে ১০ জোড়া ট্রেন সার্ভিস সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

ফেরি, পন্টুন, ওয়াটার বাস ও জাহাজ নির্মাণের মাধ্যমে নৌ-পরিবহনে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। নৌ-পথের নাব্যতা বৃদ্ধি করতে ৩টি ড্রেজার কেনা হয়েছে। পুরনো দুটি ড্রেজার সংস্কার করা হয়েছে। আরও ১৭টি ড্রেজার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন। ৪টি অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর স্থাপন করা হয়েছে।

ঢাকা ও বরিশাল নদীবন্দরকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ঢাকার পানগাওয়ে দেশের প্রথম অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। কাঁচপুর, সন্দ্বীপ ও কুমিরায় নৌ- যানের ল্যান্ডিং সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একসময়ের মৃতপ্রায় মংলা বন্দর আমাদের সরকারের সময়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে আমরা বিমানের জন্য দুটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ উড়োজাহাজ সংযোজন এবং একটি ৩১০-৩০০ ও দুটি ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ সংগ্রহ করেছি। আরও দুটি উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঢাকা-ব্যাংকক, ঢাকা-দিল্লি ও চট্টগ্রাম-ব্যাংকক রুট এবং সিলেট-লন্ডন রুটে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট চালু হয়েছে।

পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, জাফলংসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

বিশ্বমন্দার প্রভাব মোকাবিলার জন্য ৩ হাজার ৪২৪ কোটি টাকার প্রথম প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়িত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে শিল্প স্থাপনকে উৎসাহিত করতে শিল্পনীতি ঘোষণা করা হয়েছে। বার্ষিক ৫ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন শাহজালাল ফার্টিলাইজার কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যে চীনের সাথে চুক্তি হয়েছে।

আরও ৩টি ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণের লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা ও মিরেশ্বরাইয়ে নতুন শিল্পপার্ক নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। বিএনপি-জামাত আমলে বন্ধ খুলনার পিপলস জুট মিলস এবং সিরাজগঞ্জের কওমী জুট মিল। চালু করেছি। বিজেএমসির ২৭টি পাটকলের মধ্যে ২৩টি চালু হয়েছে। আরও তিনটি চালু হবে। বিটিএমসির ১৮টি বন্ধ মিলের মধ্যে ৮টি চালু হয়েছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আমরা মনে করি, অবাধ তথ্যপ্রবাহই প্রকৃত গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারে। সে কারণেই আমাদের সরকার দেশে সর্বপ্রথম তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন ও তথ্য কমিশন গঠন করেছে। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া যেকোনো সময়ের তুলনায় পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে।

আমরা ১৪টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার অনুমোদন দিয়েছি। ৭টি এফএম রেডিও এবং ১৪টি কমিউনিটি রেডিও-র লাইসেন্স প্রদান করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। তাই স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে দক্ষ ও শক্তিশালী করতে ৪৯৪ কোটি টাকার বিশেষ কার্যক্রম চলছে।

জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়েছে, যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কাজ করছেন। ১৬টি নতুন উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ও ৭৬৫টি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

১ লাখ ৩০ হাজার ৭৬১ মিটার ব্রিজ ও কালভার্ট এবং ১৬ হাজার ২৫০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ৯টি নতুন বাস টার্মিনাল ও ৬৭টি টাউন সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। ১ লাখ ১১ হাজার ৬৭৩টি ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে প্রায় ৫২ হাজার একর কৃষি খাসজমি দেওয়া হয়েছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

বাংলাদেশের নারীদের বিপুল সমর্থনে আমরা সরকার গঠন করেছিলাম। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা একটি যুগোপযোগী নারী উন্নয়ননীতি প্রণয়ন করেছি। নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি চার থেকে ছয় মাসে উন্নীত করেছি। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন সভাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা ৫০-এ উন্নীত করেছি। উপজেলায় নারী ভাইস চেয়ারম্যানের পদ রাখা হয়েছে, যেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধি নারীর প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে তিনজন করে নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলায় উন্নয়ন সহযোগীদের অংশগ্রহণে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে। ট্রাস্ট ফান্ড আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবেশ আদালত আইন-২০১০ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন-২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে।

বনায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ৭টি নতুন জাতীয় উদ্যান ও ৮টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ণ করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। অগ্নিনির্বাপক, ভূমিকম্প ও দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়েছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

যে কোনো সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণের জানমালের হেফাজত করা। বর্তমান সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশই পুরোপুরি অপরাধমুক্ত নয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে, আমাদের সরকার অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় দেয় না। যে কোনো অপরাধীকেই আমরা বিচারের আওতায় আনি।

বাংলাদেশে এখন একই সময়ে ৫০০ স্থানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে না। বিএনপির আমলের মতো বিরোধী দলের এমপিদের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে না। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা হয় না। এ দেশে এখন বুয়েট ছাত্রী সনি বা বাবার কোলে শিশু নওশীনকে জীবন দিতে হয় না। পুরনো ঢাকার ব্যবসায়ী শামসুল হকের মতো কয়েকশ’ টুকরো লাশ হতে হয় না।

ঈদ-পূজা বা অন্যান্য উৎসবে নারীরা এখন গভীর রাত পর্যন্ত কেনাকাটা করতে পারে। কোনো ধরনের অপরাধের শিকার হয় না। ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ চলছে। পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

শিল্প এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ইউনিট গঠন করেছি। পুলিশের ৬২টি মডেল থানা, ১০টি নতুন তদন্ত কেন্দ্র ও ৩টি নতুন থানা স্থাপন করা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ, মেরিন পুলিশ, পৃথক তদন্ত ইউনিট, জঙ্গি দমনে ন্যাশনাল পুলিশ ব্যুরো অব কাউন্টার টেরোরিজমসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে যে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও পেশাদার প্রতিরক্ষা বাহিনীই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। সে জন্যই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

আমাদের সরকারও সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়নে সম্ভাব্য সবকিছুই করছে। সেনাবাহিনীর জন্য আধুনিক ট্যাংকবহরসহ প্রয়োজনীয় যুদ্ধসরঞ্জাম কেনার কাজ অব্যাহত আছে। বিমানবাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার কেনা হয়েছে। বিমানবাহিনীতে ‘ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র’ অন্তর্ভুক্তি এবং ‘বঙ্গবন্ধু

অ্যারোনটিক্যাল সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। নৌবাহিনীকে একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে তৈরির কাজ চলছে। দক্ষ সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ভাটিয়ারীতে বিএমএ বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সংখ্যক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ।

নারী অফিসারসহ সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। ভূমিহীন অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ২ হাজার ৯১৫ ইউনিট আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণকাজ বিএনপি-জামাত বন্ধ করে দিয়েছিল। তা আবার শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন দেশের নাগরিক ও সংগঠনকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি করা হয়েছে। সেখানে ভূমি কমিশন কাজ করে যাচ্ছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

যে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রজন্ম আমাদের ভোট দিয়েছিল তাদের জন্য একটি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণ ছিল আমাদের অঙ্গীকার। চার বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের নির্মাণ প্রক্রিয়ায় আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে তথ্য ও সেবাকেন্দ্র চালু হয়েছে। প্রতিমাসে ৪০ লক্ষাধিক গ্রামীণ মানুষ সেবা পাচ্ছে। গ্রামে গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের মাসিক আয় গড়ে ৫ কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সরকারি উদ্যোগে দোয়েল ল্যাপটপ উৎপাদন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৬ হাজার ল্যাপটপ বিক্রয় করা হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিতে মোবাইল ব্যাংকিং পদ্ধতি এবং ২ হাজার ৭৫০টি পোস্ট অফিসে ইলেকট্রনিক মানিঅর্ডার চালু হয়েছে। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত ও জমাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে অনলাইন ও মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা চালু হয়েছে। এখন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ বিভিন্ন সেবার বিল অনলাইন ও মোবাইল ফোনে দেওয়া যায়।

সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতি বৃদ্ধির জন্য ই-টেন্ডার চালু করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ই-গর্ভনেন্স চালু করা হয়েছে। সকল জেলায় জেলা ই-সেবা কেন্দ্র এবং জেলা ও উপজেলায় ওয়েবপোর্টাল চালু হয়েছে। পরীক্ষার ফল ও নিয়োগ পরীক্ষার ফল ওয়েবসাইট, এসএমএস ও ইমেইলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন অনলাইনে সম্পাদন হচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে আইসিটি আইন ও আইসিটি নীতি প্রণয়ন করেছি। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি হাইটেক পার্ক স্থাপনের কাজ চলছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশের ৯৯ শতাংশ জনগণ ও ৯৫ শতাংশ এলাকা টেলিকম সার্ভিস ও নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো তিন পার্বত্য জেলা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। থ্রি-জি প্রযুক্তির মোবাইল সেবা চালু করা হয়েছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করে তখনই ক্রীড়া-শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে সাফল্যের ধারা বিরাজ করে। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১১ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন স্টেডিয়ামগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে।

সিলেট স্টেডিয়ামের উন্নয়ন কাজও শুরু হচ্ছে। ঢাকা শহরের ক্রীড়া অবকাঠামোগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, জিমনাস্টিকস, অ্যাথলেটিক, টেনিস, কাবাডিসহ বিভিন্ন ক্রীড়ায় খেলোয়াড়রা দেশের জন্য সাফল্য নিয়ে আসছে।

আমাদের মেয়েরা ক্রিকেটে ওয়ান-ডে স্ট্যাটাস অর্জন করেছে। আমাদের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলে- মেয়েরা এথেন্সে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্পেশাল অলিম্পিকস ২০১১-এ অংশ নিয়ে ২৯টি স্বর্ণ, ১২টি রৌপ্য ও ৩টি ব্রোঞ্জসহ ৪৪টি পদক জয় করেছে। এই বিজয়ের মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সিরিজ জয় করেছে।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হচ্ছে, “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়। সেই নীতিতে বিশ্বাসী আমাদের সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। দক্ষিণ

এশিয়াসহ বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির দেশ হিসেবে নেতিবাচক পরিচয় ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবাধিকার রক্ষাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত।

সেপ্টেম্বর ২০১১-এ অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৬৬তম অধিবেশনে আমি একটি ‘শান্তির মডেল’ উপস্থাপন করি যার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন’। গত ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে এই প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। জাতিসংঘের ৩২টি সংস্থায় বাংলাদেশ নির্বাচিত হয়েছে।

তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারতের সাথে সীমানা চিহ্নিতকরণ, বাংলাদেশী। পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারসহ অমীমাংসিত সমস্যাসমূহের সমাধান করা হচ্ছে। চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার (অনুদান) চুক্তি স্বাক্ষর, কাজিরটেক সেতু নির্মাণে পত্রবিনিময় এবং তেল ও গ্যাস সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে।

বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের অনথিভুক্ত শরণার্থীদের তাদের দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি ও ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সম্মতি দিয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে।

সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি। পোল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি, আলজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, অ্যাঙ্গোলা ও কঙ্গোয় জনশক্তি প্রেরণ শুরু হয়েছে।

বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। সে দেশে অবৈধভাবে বসবাসরত ২ লাখ ৬৮ হাজার বাংলাদেশির বৈধকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। হজ ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন, অনলাইনে আবেদনের সুযোগ ও যুগোপযোগী হজনীতির কারণে ২০১২ সালে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৯ হাজার ৬৬০ জন হজ পালন করেছেন।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

জাতীয় সংসদ দেশ পরিচালনার মূল কেন্দ্র। জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে আমরা স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলের পথ চিরতরে রুদ্ধ করেছি। কেয়ারটেকার সরকারের নামে আর কোনো চেয়ার-টেকার যাতে ১/১১-এর মতো আতঙ্কের শাসন কায়েম করতে না পারে তা নিশ্চিত করেছি।

নবম জাতীয় সংসদে ১৯৬টি আইন পাস হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সভাপতি হিসেবে সরকারি দলের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল এবং অন্য দলের সদস্যদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়। ‘সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন’ চালু করে জনগণের কাছে সংসদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছি।

সম্মানিত কাউন্সিলার ও ডেলিগেট ভাই-বোনেরা,

আপনাদের প্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার যখন বাংলাদেশকে একটি উন্নত, আধুনিক ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে রাত-দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে তখন একটি বিশেষ মহল বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা রোধ করার চক্রান্তে লিপ্ত।

আজ দেশের মানুষ যখন দু’বেলা পেটভরে ভাত খেতে পারছে, সাধারণ মানুষ যখন স্বস্তি ও শান্তিতে আছে তখন কেউ কেউ অশান্তির আগুন দিয়ে মানুষের সর্বনাশ করতে চায়। এদের পরিচয় বাংলাদেশের মানুষ জানে। এরা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-হানাদারদের তাঁবেদারি করেছে।

স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার সুবিধাভোগী হয়েছে। এরাই গণতন্ত্র হত্যা করে বন্দুকের নলের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল। এ দেশের জনগণ দেখেছে, এদের রাজনীতি মানুষকে শোষণ করার রাজনীতি, লুটপাটের রাজনীতি, সন্ত্রাসের রাজনীতি, জঙ্গিবাদ সৃষ্টির রাজনীতি।

জাতি দেখেছে, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে কীভাবে বিরোধী দলের নেত্রী যুদ্ধাপরাধী, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের রক্ষার জন্য হরতাল দেয়, জ্বালাও-পোড়াও করে। মানুষের গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারে। তিনি চান লাশের প্রাচীর তৈরি করে যুদ্ধাপরাধী খুনিদের রক্ষা করতে। বগুড়ায় হরতালের মধ্যে রোগীবহনকারী অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়েছে।

হরতালের আগের রাতে বাসের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা গরিব ড্রাইভারকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীতে বিএনপি-জামাতের আমলে এভাবে মানুষ হত্যা করা হতো। জাতি এই দেশকে আর মৃত্যু-উপত্যকা হিসেবে দেখতে চায় না । অতীতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন, পারেন নি। যুদ্ধাপরাধীদেরও রক্ষা করতে পারবেন না। বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে এই মানবতাবিরোধী ও

স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার করার। ইনশাল্লাহ্ কোনো অপশক্তিই এদের রক্ষা করতে পারবে না। যারা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা করছে এ দেশের মানুষ একদিন তাদেরই বিচার করবে। এই কাউন্সিল থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, নারী ও তরুণ সমাজসহ সবার প্রতি এই অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা যে দলই করি না কেন, যে অবস্থানেই থাকি না কেন লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও জাতীয় পতাকা রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব আমাদের সবার। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে ইতিহাস। আমাদের ক্ষমা করবে না।

বিএনপি নেত্রী বলেছেন, আবার সুযোগ দিলে নাকি দেশের চেহারা পাল্টে দেবেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ অবস্থানে আছে। তা পাল্টে আবারও নিচের দিকে নামাবেন? বাংলাদেশকে পাঁচবার দুর্নীতির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। আবারও দুর্নীতির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করবেন? আবারও আপনার ছেলেদের অবৈধ টাকা বিদেশে পাচারের সুযোগ দেবেন?

তিনি বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের দেশ বানিয়েছিলেন। আবারও জঙ্গিবাদ ও বাংলাভাই বানাবেন? বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেছেন, তার ছেলেরা নাকি সৎ জীবনযাপন করত। ডান্ডি ডায়িং, কোকো জাহাজ, খাম্বা কোম্পানি, চ্যানেল ওয়ান, নামে-বেনামে আরও বহু কোম্পানি করল।

মালিক কীভাবে হলো? ছেঁড়া গেঞ্জি ও ভাঙা সুটকেস ছাড়া জিয়া নাকি কিছুই রেখে যায়নি। ইকুইটির টাকা কোত্থেকে এল? কোনো চাকরি-বাকরি না করে তার ছেলে চার বছর ধরে লন্ডনে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, এই টাকার উৎস কি?

বিশ্বের সেরা অর্থপাচারকারীর তালিকায় ছোট ছেলে কোকোর নাম। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের কোর্টে বিচার হয়েছে। এফবিআই সাক্ষ্য দিয়েছে। সিঙ্গাপুর থেকে কোকোর পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা হয়েছে। এগুলোই কি তার ছেলেদের সততার নমুনা?

অবশ্য তিনি নিজেও জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ আর কোনোদিন দুর্নীতিবাজ, জঙ্গিবাদের দোসর ও যুদ্ধাপরাধীদের যারা রক্ষা করতে চায় তাদের ভোট দেবে না। আমরা স্বাধীন নির্বাচন কমিশন করেছি।

সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এবং সংসদ উপ-নির্বাচনসহ প্রায় ছয় হাজার নির্বাচন হয়েছে। কেউ কারচুপির অভিযোগ করতে পারেনি। প্রতিটি নির্বাচন ছিল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। যদি জনতার রায়ের ওপর আস্থা থাকে তবে নির্বাচনে আসুন। জনতাই সিদ্ধান্ত দেবে তারা দুর্নীতিবাজ ও যুদ্ধাপরাধীদের ভোট দেবে কি-না।

প্রিয় নেতা-কর্মী ভাই ও বোনেরা,

জাতির পিতার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে আমরা দেখেছি তিনি কীভাবে লোভ-লালসা ও ভয়-ভীতিকে উপেক্ষা করে মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ভোগে নয়, ত্যাগে বিশ্বাসী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী প্রতিটি নেতা-কর্মীর দায়িত্ব মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করা।

আওয়ামী লীগ সরকার। জনগণের শাসক নয়, আমরা জনগণের সেবক। দলের কোনো পর্যায়ে কোনো নেতা-কর্মীর ব্যক্তিগত লোভ-লালসা বা অন্যায় আচরণের দায়-দায়িত্ব দল নিতে পারে না। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আমাদের একমাত্র সম্পদ। এটি মনে রেখেই সবাইকে পথ চলতে হবে। মনে রাখবেন, অসৎ পথে চলে ধনী হওয়া যায়, জনগণের ভালোবাসা পাওয়া যায় না।

আদর্শবান, চরিত্রবান এবং ত্যাগী নেতা-কর্মীরাই একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণ। প্রতিটি নেতা-কর্মীকে আদর্শবান ও চরিত্রবান হতে হবে। লোভ-লালসা ও অর্থ-বিত্তের মোহ নয়, জনগণের সেবায় নিয়োজিত হতে হবে। তবেই আমরা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মী হিসেবে দাবি করতে পারব।

এই আওয়ামী লীগই আমার শেষ এবং একমাত্র ঠিকানা। বারবার আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রহমত এবং আপনাদের ভালোবাসাই আমাকে দেশবাসীর কাছে ফিরিয়ে এনেছে। আমার পিতা বঙ্গবন্ধু জীবন দিয়ে গেছেন কিন্তু আপনাদের ভালোবাসার অমর্যাদা করেন নি। ইনশাল্লাহ্ জীবন দিয়ে হলেও বাংলার মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষা করব।

 

জাতীয় সম্মেলন ২০১২ উদ্বোধনী ভাষণ শেখ হাসিনা এমপি

 

আসুন, সবাই মিলে দেশকে গড়ে তুলি। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ক্ষুধা, দারিদ্রা ও অশিক্ষামুক্ত আধুনিক উন্নত ও সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে একসাথে কাজ করি।

সবাইকে ধন্যবাদ । খোদা হাফেজ।

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু । বাংলাদেশ চিরজীবী হোক

Leave a Comment