১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের অভিযান

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের অভিযান। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের অভিযান

 

১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের অভিযান

 

১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের অভিযান

সৈন্য মোতায়েনে পরিবর্তন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং সর্বাত্মক যুদ্ধের আগে ভারতীয় হামলাকালে এ সৈন্য মোতায়েন কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়। আর্টিলারি ও মর্টারের সমর্থনে ভারতীয়রা হামলা চালাচ্ছিল। বিদ্রোহীরা পেছন থেকে আমাদের মূল অবস্থানে হামলা করছিল এবং শত্রুদেরকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছিল।

শোনা গেছে যে, বিদ্রোহীরা দিক-নির্দেশনা দিয়ে তাদেরকে আমাদের অবস্থান পর্যন্ত নিয়ে আসে এবং তারা তাদেরকে রাস্তা-ঘাট দেখিয়ে দেয়। আমাদের প্রতিটি অবস্থানই ছিল ভারতীয়দের চেনা। ৮ মাসের অব্যাহত লড়াইয়ে ক্লান্তি, অফিসার ও সাজ-সরঞ্জামে ঘাটতি এবং হতাহতদের অপসারণে প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও আমার নগণ্য সৈন্যদল বীরত্বের সাথে লড়াই করেছে। আমি সব কয়টি ফরমেশন ও ইউনিট সফর করি এবং এতে সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি পায়।

এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে, ঐ ৮ মাসে প্রেসিডেন্ট এবং সি-ইন-সি, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, অ্যাডজুট্যান্ট-জেনারেল, কোয়ার্টার মাস্টার-জেনারেল অথবা মাস্টার-জেনারেল অর্ডন্যান্স কেউই আমাদের দেখতে আসেন নি।

চিক অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ এবং সিজিএস লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সময় ইন্টার্ন কমান্ড পরিদর্শন করা দূরে থাকুক, আমাদের একবার টেলিফোন করার প্রয়োজনও অনুভব করেন নি। এতে আমরা দমে যাই নি। আমার সৈন্যরা ভারতীয়দের আমাদের পবিত্র ভূমির এক খণ্ড মাটিও দখল করে নিতে দেয় নি।

উপরে বর্ণিত সময়টা ছিল মূলত সীমান্ত লড়াইয়ের। যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয়রা (তাদের নিয়মিত সৈন্য এবং বিএসএফ) মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় সীমান্তে হামলা শুরু করে। স্থলবাহিনীকে সহায়তাদানে চোরাগুপ্তা বিমান হামলা শুরু হয়।

দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ধরনটা ছিল এ রকম যে, ট্যাংক ও কামানের সমর্থনের ভারতীয়রা একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে হামলা করবে এবং মুক্তিবাহিনী একই অবস্থানে হয় প্রবেশ করবে নয়তো এড়িয়ে গিয়ে পেছন দিকে এ অবস্থান অবরোধ করবে যাতে আমাদের সৈন্য প্রত্যাহার অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সাধারণত ব্যাটালিয়ন অথবা ব্রিগেড পর্যায়ে এসব হামলা হতো। এগুলোতে অন্তত ৮টি করে ট্যাংক থাকতো। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল একমাত্র হিলি । এখানে একটি পুরো রেজিমেন্ট হামলায় অংশগ্রহণ করে। ভারতীয়রা এক একটি অবস্থানে হামলা করে তা দখল করার চেষ্টা করতো এবং সেখানে কয়েকদিন কাটিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ নিতো।

১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত এ অবস্থা চলছিল। এরপর হামলার ব্যাপ্তি এবং তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। বিমান ও নৌবাহিনী পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধে নামে। আমরা তখনো তাদেরকে আটকে রেখেছিলাম সীমান্তে । ভারতীয়রা বিমান বাহিনীর ছত্রছায়া না পেলে অথবা আমি আমার কোটা অনুযায়ী ট্যাংক, দূরপাল্লার কামান এবং বিমান বিধ্বংসী আর্টিলারি পেলে আমাকে কখনো সীমান্ত থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হতো না।

 

আমি শত্রুদেরকে সেখানেই আটকে রাখতে পারতাম। ভারতীয়দের কৌশল ছিল আমাদের নিয়মিত সৈন্যদের ওপর হামলা করা এবং তাদেরকে ঢাকা প্রত্যাহারের বাধা দেওয়া। যতো দ্রুত সম্ভব একটি বড়ো শহর দখল এবং এ শহরকে বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করা এবং এটাকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদেরকে ত্রাণকর্তা হিসেবে জাহির করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।

যশোর থেকে আমাদের সৈন্য প্রত্যাহারের পর তারা তাই করেছে। ৩০ ঘণ্টা পর তারা যশোহর দখল করে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর একটি যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠা করে ।

তারা আমাদের সৈন্যদের হত্যা এবং যানবাহন, গাড়ির ইঞ্জিন, রেললাইন, নৌকা ও ফেরি ধ্বংস করে। আমাদের যোগাযোগ কাঠামো ও যানবাহন ধ্বংসে মুক্তিবাহিনী তাদের সহযোগিতা করে। সত্যি বলতে কি, তারা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা ধ্বংসে সফল হয়। তবে শেষ দিন পর্যন্তও পশ্চাদ্ভাগ এবং ঢাকায় আমাদের কিছুটা চলাচলের সুযোগ ছিল।

উভয়পক্ষে হামলায় এয়ারফোর্স অংশ নেয়। ৮টি ভারতীয় ন্যাট ও মিগ-২১ আমাদের তিনটি এফ-৮৬-এর ওপর হামলা চালায়। ২৩শে নভেম্বর যশোরে ভারতের একটি বিপরীতে আমাদের দুটি বিমান খোয়া যায়। সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্ট এক বার্তায় আমাদের তৎপরতার প্রশংসা করেন এবং অভিনন্দন জানান। ১৯৭১ সালের ২৯ নবেম্বরের মধ্যে আমরা প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলি এবং তাদের অগ্রাভিযান স্তব্ধ হয়ে যায়। তাদের প্রচুর প্রাণহানি ঘটে।

১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ দিনের যুদ্ধে ভারতীয়দের সকল সুবিধা সত্ত্বেও তারা বিজয়ী হতে পারে নি। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে ৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ দিনের যুদ্ধে তারা হাজার হাজার বর্গমাইল ব্যাপী ভূখণ্ড দখল করে নেয় এবং শিয়ালকোট ও ওয়াজিরাবাদে হুমকি সৃষ্টি করে।

ভারতীয় নৌবাহিনী করাচি পোতাশ্রয় ও পোর্ট কাসিমে প্রাধান্য বিস্তার করে। এ সময় আমাদের নৌবাহিনী অদৃশ্য হয়ে যায়।ভারতীয় বিমান বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু পাকিস্তান বিমান বাহিনী কোথাও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে নি।

 

১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের অভিযান

 

এ পর্যায়ে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিকূল পরস্থিতির কারণে প্রেসিডেন্ট আমাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। আমি অস্বীকৃতি জানালে সেনাবাহিনী প্রধান জোনারেল হামিদ ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে যোগাযোগ করেন এব পশ্চিম পাকিস্তান ব্রহ্মায় আমাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ প্রদান করেন।

Leave a Comment